শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

সুনীলের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়কালে আর সেই সূত্রেই পরিচয় কৃত্তিবাস পত্রিকার সঙ্গে; তবে সেটা নেহাত পাঠক হিসেবে, কেননা আমি তো কবিতা লিখতে পারি না। তবে আমি লিখেছিলাম। ওরা একবার কমল মজুমদার সংখ্যা করেছিল। কমল মজুমদারের আমি খুব ভক্ত ছিলাম। তাই একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম ওঁকে নিয়ে; ওটাই আমার কৃত্তিবাসে প্রথম লেখা, পরবর্তীকালে কৃত্তিবাসে উপন্যাসও লিখেছি। সুনীল সেবার একটা মজার কথা বলেছিল, যারা উপন্যাস লিখবে তাদের বউদের সোনার গয়না দেওয়া হবে।
কৃত্তিবাসের প্রসঙ্গ তুললামই যখন, দুজনের কথা বলতেই হয়, পিনাকী ঠাকুর আর দিব্যেন্দু পালিত। দেশ পত্রিকায় চাকরি যাওয়ার পর পিনাকী কৃত্তিবাসে চাকরি করত। খুব দারিদ্র্যের মধ্যেই ছিল, কিন্তু অসম্ভব ভালো কবিতা লিখত আর অসম্ভব ভালো মানুষ, অত্যন্ত বিনয়ী ভদ্র, ওরকম মানুষ আজকাল দেখাই যায় না। আর দিব্যেন্দু দেখত মূলত বিজ্ঞাপনের দিকটা আর লিখতও খুব ভালো। ওদের দুজনের অকস্মাৎ মৃত্যুটা আমাকে ভীষণ ব্যথিত করেছে।
তবে কৃত্তিবাসের প্রাণপুরুষ ছিল সুনীল, যদিও পরবর্তীকালে ওঁর ব্যস্ততার জন্য আর টাকার অভাবে কৃত্তিবাস বার বার অনিয়মিত হয়ে গেছে। সুনীলের কিছু বন্ধু টাকাপয়সা দিয়ে সাহায্য করত, কিন্তু শুধু এভাবে তো কাগজ বেরোয় না, দরকার বিজ্ঞাপনের, সেটা না পেলে কাগজ চলে না। কিন্তু এত অচলাবস্থা সত্ত্বেও কৃত্তিবাসের প্রতি কবিদের ভালোবাসা ছিল অগাধ, কেননা কৃত্তিবাসই একমাত্র কবিদের একটা বিরাট মিলনক্ষেত্র হয়ে গিয়েছিল। কৃত্তিবাসের দপ্তরও অনেকবার বদলেছে; বর্তমানে দপ্তর গড়িয়াহাটে, ধনঞ্জয় দেখাশোনা করে এখন। তবে বড় দুঃখের কথা কৃত্তিবাস এখন অভিভাবকহীন; যদিও নতুন প্রজন্মের অংশুমান, শ্রীজাত, সম্রাজ্ঞী, অভিজিৎ চালিয়ে যাচ্ছে কৃত্তিবাসকে। বাংলায় কবিতা পত্রিকার ক্ষেত্রে কৃত্তিবাসের তো একটা বড় অবদান আছেই, তাই আমি সবসময় চাই কৃত্তিবাস চলুক। আর সুনীলও তো কোনওদিন চায়নি কৃত্তিবাস বন্ধ হোক। তরুণ কবিদের প্রতি ওর ভীষণ দুর্বলতা ও সমর্থন ছিল; আর এই কৃত্তিবাস হল তরুণ কবিদের মুখপত্র। সুনীল পারলে সকলের কবিতাই ছেপে দিত। ওর এই বাৎসল্যের ফলে কিছু কিছু কাঁচা কবিতাও বেরিয়ে যেত। শক্তি আবার অকবিতা সহ্য করতে পারত না। মাঝে-মাঝেই বলত, 'এসব কী হচ্ছে সুনীল? কাদের কবিতা ছাপছ?'
একটা মজার ঘটনা বলি, একদিন সাগরময় ঘোষ আমাকে ডেকে বললেন, 'তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। সুনীল আর শক্তিকে মুখোমুখি বসিয়ে একটা বিতর্কের ব্যবস্থা করো। বেশ বড় করে লিখবে।'
আমি ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, 'দুই বন্ধুর ঝগড়া লাগাতে হবে সাগরদা? সেটা কি আমি পারব?'
'ওটা তোমাকেই করতে হবে।'
অগত্যা। শক্তি, সুনীল, দুজনেই রাজি হয়ে গেল। শর্ত ছিল একটাই, ভালো স্কচ খাওয়াতে হবে। সাগরদাকে বলতেই সেই ব্যবস্থা হয়ে গেল। সুনীলের দশতলার ফ্ল্যাটে আমরা তিনজন এক সন্ধ্যাবেলায় বসলাম, বিতর্ক শুরু থেকেই জমজমাট। শক্তির মধ্যে একটা কবিতা-পাগল সত্ত্বা ছিল, ফলে সে খারাপ কবিতা একদম সহ্য করতে পারত না। তবে সুনীল শক্তিকে বারবার সাবধান করছিল, 'শক্তি, শীর্ষেন্দু তোমার ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছে।' সেই সাক্ষাৎকারে সুনীল খানিকটা রক্ষণাত্মক ছিল, কারণ শক্তির অভিযোগ ছিল তার ওই স্নেহপ্রবণ প্রশ্রয়দাতার ভূমিকার বিরুদ্ধে। দেশ পত্রিকার প্রচ্ছদকাহিনি হিসেবে আমাদের কার্টুনসহ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর এক তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল।
পঁচিশ বছরেরও বেশি 'দেশ' পত্রিকার দফতরে আমরা পাশাপাশি বসতাম, সুনীল ছিল অ্যাসোসিয়েট এডিটর আর আমি ছিলাম অ্যাসিস্টেন্ট এডিটর। অফিসে সবাই খুব সমীহ করত ওকে, একমাত্র আমি ওকে 'মোটুক' বলে খ্যাপাতাম। সুনীল শুনে মৃদু মৃদু হাসত।
কাজকর্মের তেমন চাপ ছিল না, আড্ডাই হত বেশি, আমাদের আড্ডা খুব বিখ্যাত ছিল। প্রায়ই আমি তাকে প্রশ্ন করতাম। 'সুনীল লেখেন কখন?'
সুনীল খুব হাসত আর বলত, 'আপনার মতো আমি রাত জেগে লিখি না, আমি লিখি সকালে। তাও দু-আড়াই ঘণ্টা মাত্র।'
কিন্তু আমার বিস্ময় যায় না। কী না লিখত সুনীল! কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ফিচার আরও কত কী!। তার ওপর তার আগ্রাসী বই পড়ার স্বভাব। এ সবের জন্য যে সময়টা দরকার, সেটা সুনীল কিভাবে বের করত ও-ই জানে।
শুধু আড্ডাই নয়, অনেক লোকও আসত ওর সঙ্গে দেখা করতে। সুনীলের বন্ধু-বাৎসল্য ছিল কিংবন্তির মতো। বন্ধুদের আবদার ফেলতে পারত না বলে নিজের জরুরি কাজ ফেলে তাদের সঙ্গ দিয়েছে, তাদের লেখা ছাপিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে, যখন ইচ্ছে নেই তখনও সুরাপান করেছে তাদের সঙ্গে বসে। প্রায় প্রতিরাতেই কোনও না কোনও বন্ধুর বাড়িতে পানভোজের নেমন্তন্ন থাকত, ফলে শুতে রাত হত। কিন্তু বিপুল যে ভালোবাসা বন্ধুদের কাছে অর্জন করেছিল, তার দায় না মিটিয়ে পারত না সে। সকালে, বিকেলে, রাতে, দেশে, বিদেশে, সর্বত্রই সবসময়ে গিজগিজ করছে তার বন্ধু। বন্ধুদের জন্য দুয়ার অবারিত করে নিজের গার্হস্থ্যকেই যেন বৃহত্তর গণ্ডিতে নিয়ে ফেলেছিল সুনীল। বাইরে থেকে কত লোক এসে যে সুনীলের ফ্ল্যাটে আশ্রয় পেয়েছে, তার গোনাগুনতি নেই। এত মানুষ আসে আর থাকে বলে কখনও সুনীল বা তার লক্ষ্মীমন্ত বউ স্বাতীকে অপ্রসন্ন হতে দেখিনি। আটাত্তরের বন্যায় একবার সুনীলের গাড়িতে বাড়ি ফেরার সময় আমরা টিভোলি কোর্টের কাছে ফেঁসে গেলাম। বুকজল ভেঙে হাঁটতে হাঁটতে গড়িয়াহাট পৌঁছলে সুনীল বলল, 'শীর্ষেন্দু, আপনার আজ আর যাদবপুরে যাওয়ার দরকার নেই, আমার বাড়িতে চলুন।' রাজি হয়ে গেলাম। সেই রাতে ওরা স্বামী-স্ত্রী আর ধনঞ্জয় মিলে আমার স্বপাক খাওয়ার সুচারু বন্দোবস্ত করে দিল। আমার শুদ্ধাচারের প্রতি ভীষণ সতর্ক ছিল সুনীল আর স্বাতী।
'যুবক-যুবতীরা' বা 'আত্মপ্রকাশ'-এর মতো উপন্যাস সুনীল লিখেছিল বত্রিশ-চৌত্রিশ বছর বয়সের মধ্যে। দুটো উপন্যাসেই ওর নিজের আর বন্ধুদের লাগামছাড়া জীবনযাপনের কথা উঠে এসেছে। ওঁর লেখনী আর কাহিনি বিন্যাস আমার খুব ভালো লাগত। আমার ব্যক্তিগতভাবে সবথেকে প্রিয় উপন্যাস 'সেই সময়' আর ছোটদের লেখার মধ্যে 'সবুজ দ্বীপের রাজা।'
সুনীল আর আমার মধ্যে কখনও তর্ক হত না, সুনীল তর্ক করতে ভালোবাসত না। আমাকে প্রায় বলত, 'আমি ভাবছি এবার থেকে নিরামিষ খাব। সিগারেট ছেড়ে দেব আর ড্রিঙ্ক করব না।' কিন্তু পেরে উঠত কই! বন্ধুরা মধুর জবরদস্তিতে ঠিক ধরিয়ে দিত। অফুরান প্রাণশক্তি ছিল বলে শরীরের তোয়াক্কা সুনীল কোনওদিন করেনি। মাঝে মাঝে নামমাত্র প্রাতঃভ্রমণ ছাড়া কোনও ব্যায়াম ছিল না তার। খাদ্য-পানীয়র ওপর ছিল না নিয়ন্ত্রণ। সুনীল ছিল অকুতোভয়, কিন্তু আমি ভয় পেতাম। মনে পড়ে, সুনীলের ৭৫তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়ে মঞ্চে আমার পাশে বসা সুনীলের চেহারাটা দেখে ভীষণ মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সেদিন বক্তৃতায় সুনীলকে লক্ষ্য করেই বলেছিলাম, সুনীল, আপনাকে কিন্তু অনেকদিন বেঁচে থাকতে হবে। আর বেঁচে থাকার জন্য যা যা করতে হয়, সবই আমাদের মুখ চেয়ে আপনি কিন্তু করবেন।' সুনীল ম্লান হেসেছিল তারপর হাতটা বাড়িয়ে ধরেছিল আমার হাত।
সেই হাতের স্পর্শটি আমার আজও হাতে লেগে আছে। সুনীল এখন আমাদের নাগালের অনেক বাইরে এক অচিনপুরের যাত্রী। সুনীলের এবছর পঁচাশি বছর হল, সম্প্রতি ম্যান্ডেভিলা গার্ডেন্সের নাম পাল্টেও তো কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সরণী' হয়েছে, আমি এই সিদ্ধান্তে ভীষণ খুশি। সুনীল আমাদের ছেড়ে চলে গেছে ঠিকই, তবুও এভাবেই রয়ে গেছে আমাদের স্মৃতিতে, মননে, ধ্যানে, পাঠে আর কৃত্তিবাসে। তাই না থেকেও সুনীল থেকে যাবে আজীবন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন