শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

তিনি সিগারেটকে শিগারেট বলতেন। প্রথম দিককার ছবিতে তিনি সংলাপ বলতেন, একটু দ্রুতগতিতে, সবটা ভালো বোঝা যেত না, প্রার্থিত বা উদ্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া হতে পারত না, প্যান্ট পরতেন, বড্ড ঢোলা, আর ওর নাকটা হ্যাঁ, নাকটা খুব কিছু সুন্দর নয় কিন্তু, না কুচ্ছিৎ ও নয়, সুন্দর না কুচ্ছিৎ সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন, হ্যাঁ, ওঁর ঠোঁট বেশ পুরন্ত অর্থাৎ পুরু, মুখের মধ্যে ঠোঁটজোড়া খুব প্রমিনেন্ট কারও কারও কাছে আকর্ষক মনে হতেই পারে বাংলা সিনেমার মধ্যযুগে কিশোরী, তরুণী, যুবতী বা মধ্যবয়স্করা, অর্থাৎ যাঁরা এখন মা, মাসি, পিসি, ঠাকুমা বা দিদিমা তাঁরা কেন তাঁকে এত পছন্দ করতেন তা এখনকার অনেক তরুণী কিশোরী ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, তবে কি তারা পছন্দ করে না তাঁকে? হ্যাঁ করে। তবে ক্রেজ নেই, উত্তমকুমারের লভ্য ফিল্মগুলোর সব কটাই টিভির কল্যাণে তারা বহুবার দেখেছে। বড্ড রোম্যান্টিক আর সুইট, বেশির ভাগ গল্পই ভ্যাদভ্যাদে, তখনকার এখনকার বেশির ভাগ বাংলা ছবিই তো ভ্যাদভ্যাদে আর বোকা-বোকা।
ওপরের মতগুলো আমার নয়। বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীর।
উত্তমকুমার ব্যায়াম করতেন, মাসাজ নিতেন বলে শোনা যায়। কিন্তু তাঁর কোনও মাচো ইমেজ ছিল না। যেমন প্রমথেশ বড়ুয়া, মুখখানা কবির মতো, ছবির মতো রোম্যান্সে ভরা, কিন্তু জামা খুললেই পৌরুষ ধুল্যবলুণ্ঠিত। জামা খোলা উত্তমকুমার প্রমথেশের চেয়ে বেশি প্রেজেন্টবল, কিন্তু হলিউড বা মুম্বই নায়কদের মতো পৌরুষদীপ্ত নয় তাঁদের শরীর। এখনকার তরুণ-তরুণী মাচো, সুগঠিত শরীর পছন্দ করে, মুখখানা তত সুন্দর না হলেও চলবে। কিন্তু হি-ম্যান হওয়া চাই।
উত্তমকুমারের নেগেটিভ দিকগুলো স্বীকার করে নিয়েও বলতে হবে, এই একজন মানুষ, বাংলা সিনেমার মধযুগে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে গোটা সিনেমাশিল্পকে শাসন করেছেন, পালনও করেছেন। শুধু উত্তমকুমাকে কাস্টিং করতে পেরে বহু ডুবন্ত প্রয়োজক আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন।
বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ধুকতে ধুকতে ফের অক্সিজেন পেয়ে তেজি ঘোড়ার মতো দৌড়েছে। বাংলা সিনেমার পরম ভাগ্য যে এমন দুর্লভ নায়ককে মুম্বই কেড়ে নিতে পারেনি। অথচ নেওয়ারই তো কথা। বাংলা ছবিতে নাম করলেই মুম্বই তাঁকে গ্রাস করে নেবে, এটাই তো নিয়ম। উত্তমকে নেয়নি কেন? নিয়েছিল। সুচিত্রা সেনের মতো সুন্দরীকেও নিয়েছিল। কিন্তু কোথায় যেন তাঁদের সঙ্গে মুম্বইয়ের একটা অবনিবনা থেকে গিয়েছিল। মুম্বই এবং এঁরা দুজনেই পরস্পকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
উত্তমকুমার যখন মধ্যগগনে তখন আমরা ছাত্র। শাপমোচন, সবার উপরে, এই সব হিট অগভীর প্যাচপ্যাচে সেন্টিমেন্টাল রোম্যান্টিক ছবি মুক্তি পাচ্ছে। ঈষৎ বোধবিশিষ্ট মানুষ তেমন পছন্দ করছে না। তবে দুটি সুন্দর মুখশ্রী ছবির ত্রুটি ঢেকে দিচ্ছে। প্যাসোনেট চেহারার নায়ক এবং অতীব সুন্দরী, কিন্তু যৌন আবেদননির্ভর নন, এমন একজন নায়িকা ক্রমশ অনিবার্য জুটি হয়ে উঠছে। বাংলা ছবির অনিশ্চয়তার লক্ষণ কাটছে। মানুষ ভরিয়ে দিচ্ছে বক্স অফিস। সেই সময় এই উত্থানের পাশাপাশি প্রায় নিঃশব্দে চলচ্চিত্রে আর একটি বন্ধ দরজা হঠাৎ হাত ধরে খুলে দিলেন দীর্ঘকায় একজন মানুষ। শুধু শরীরের নয়, দীর্ঘকায় ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বটিও। সত্যজিৎ রায়। ফিল্ম দুনিয়া নড়ে চড়ে বসল, বাংলা ভাষায় রচিত (নির্মিত?) চলচ্চিত্র সাহেবদের দেশেও সেলাম পেল সেই প্রথম। সত্যজিৎ প্রথাসিদ্ধ পথে হাঁটতেন না। উত্তমকুমারের মতো বক্স অফিস হিরো বা সুচিত্রা সেনের মতো অপ্রতিদ্বন্দ্বিকে তিনি ডাকলেন না তাঁর কাজে। অথচ পাশাপাশি সমান্তরাল অবস্থান করতে লাগলেন তাঁরা।
সত্যজিতের ছবির ভিতরে আসতে লাগল নতুন নতুন মুখ, তাঁরই আবিষ্কার, তিনি নিজের ছবির নায়ক নায়িকা নিজেই তৈরি করে নিতে লাগলেন। নতুন এক রাবীন্দ্রিক চেহারার নায়কের আবির্ভাব ঘটল। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। শিশির ভাদুড়ির কাছে তালিম-পাওয়া মঞ্চ-অভিজ্ঞ সৌমিত্র উত্তমের সমান্তরাল উদিত হতে লাগল। শর্মিলা, অপর্ণা, প্রমুখ নায়িকারা আবির্ভাবেই চিনিয়ে দিলেন, তাঁদের জাত।
শেষ অবধি উপেক্ষা করেননি সত্যজিৎ, অন্তত দুটি ছবিতে তিনি উত্তমকুমারকে নিয়েছিলেন। 'নায়ক' অবশ্যই উত্তমকুমারের জীবন-কাহিনির আদলে গড়া যেন, আর পরিণত উত্তম কি অভিনয়টাই করেছেন নায়কে। সত্যজিতের শ্রেষ্ঠ কীর্তিগুলির একটি 'নায়ক'। উত্তমকুমারেরও। একটা দুঃখ, সত্যাজিৎ সুচিত্রা সেনকে নেননি কখনও। নিতেই পারতেন। সত্যজিতের হাতে সুচিত্রা সেনের ভিন্নমাত্রিক একটা অবদান থেকে যেত।
এই প্রতিবেদন উত্তমকুমারের মুল্যায়ন নয়। প্রতিবেদক চলচ্চিত্র আনাড়ি এবং আনপড়। উত্তমের প্রসঙ্গটি উত্থাপিত হচ্ছে একজন অদ্ভুত মানুষের জন্য। তাঁর নাম পরিমল রায়। এঁর ঝোঁক বা নেশা হল চলচ্চিত্রের পোস্টার, পুস্তিকা, আলোকচিত্র সংগ্রহ। কাজটি শুরু করেছিলেন বালক বয়সে। সযত্নে সংগ্রহ করা সেইসব পোস্টার ইত্যাদি পরম মমতায় সংরক্ষণ করে এসেছেন এতদিন। সংগ্রাহক তিনি আরও অনেক কিছুর। বিস্তর ফেলানি জিনিস তিনি কুড়িয়ে রেখে দিয়েছেন নিজের ভাণ্ডারে। এর আগে তাঁর চিত্রায়িত নাটকের পোস্টার এবং সত্যজিৎ পোস্টার নিয়ে দুই প্রর্দশনী হয়ে গেছে কলকাতা আর শান্তিনিকেতনে। তারপর এই সম্প্রতি আলোকচিত্রী সৌমেন্দু রায়ের পরামর্শে রূপকলা কেন্দ্রের অধিকর্তা (কর্ত্রী নন?) অনিতা অগ্নিহোত্রীর অনুমোদনে নন্দন-৪ এ তাঁর উত্তমকুমারের পোস্টার নিয়ে উত্তম প্রদর্শনী হয়ে গেল। যাঁরা এই প্রদর্শনীতে গেছেন তাঁরা অবশ্য স্মৃতিভারাক্রান্ত হয়ে পড়বেন। বয়স্কদের মনে পড়ে যাবে, যৌবন বা কিশোর বয়সে কলকাতার দেওয়ালে দেওয়ালে সাঁটা এই সব পোস্টারের কথা। পোস্টার তাৎক্ষণিক বস্তু হারিয়ে যায় আর ফিরে আসে না। পরিমল রায় সেই সব বিস্মৃত পোস্টারকে জনসমক্ষে হাজির করে পুরোনো দিনের আভাস যেন ফিরিয়ে আনলেন।
কী উদীপ্ত, কী উৎসাহী, এই মানুষটি।
পোস্টারগুলি এখনও তরতাজা, যেন একটু আগেই ছাপা হয়েছে। কত যত্নে সংরক্ষিত হলে তবে এত পুরোনো কাগজের পোস্টার এত ঝকঝকে থাকে তা ভাবলে অবাক হতে হয়। উজ্জ্বল হাস্যময় মুখে প্রবল উৎসাহে এবং গভীর মমতায় তিনি যখন তাঁর সংগ্রহগুলি দেখাচ্ছিলেন তখন মনে হয়েছিল, কিছু কিছু ভালোবাসার পাগলামি আছে বলে আমাদের সব কিছু কালস্রোতে ভেসে যেতে পারে না। এই যে কুড়িয়ে নেওয়া সযত্নে রক্ষা করা, ভালোবেসে লোককে দেখানো এই রক্ষণশীলতাই মাঝে মাঝে আমাদের জীবনে দুর্লভ এক আনন্দের স্পর্শ বয়ে আনে।
একটি ছবির কথা মনে পড়ছে, নাম বোধহয় 'উপহার', উত্তম তাতে নায়ক ছিলেন না, পার্শ্ব চরিত্রে এক অধ্যাপকের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। গ্ল্যামার ঝেড়ে ফেলে সে যে কী দুর্দান্ত স্বাভাবিকতায় অভিনয় করেছিলেন, ভোলার নয়। সেই পোস্টারটা খুঁজে ছিলাম, পাইনি, যা পেলাম তাও বড় কম নয়। মোট ৬১টি পোস্টার, কয়েকটি আলোকচিত্র এবং পেনটিং, বেশ বড় ভোজের আয়োজন।
আমরা তাঁর পরবর্তী প্রর্দশনীর অপেক্ষায় রইলাম।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন