কুম্ভ জুড়ে মানুষের মন্থন

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

'আনন্দবাজার পত্রিকা'র প্রতিনিধি হয়ে, ১৯৭৬-এ প্রথম যখন পুর্ণকুম্ভের মেলায় ইলাহাবাদের প্রয়াগে যাই, তখন আমি সাংবাদিক হিসেবে নতুন, কুম্ভমেলা সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা ছিল না। কিন্তু এটা জানা ছিল যে, নিছক সাংবাদিকতার জন্য আমাকে পাঠানো হয়নি। সংবাদের চেয়েও বেশি কিছু আমার কাছে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। কুম্ভমেলা শুধু সংবাদের উৎস তো নয়, তার তাৎপর্য আর একটু গভীর। প্রতিদিন তাই সকালবেলাতেই আমি অনেকটা হাঁটাপথ অতিক্রম করে, ভিড় ঠেলে হাজির হয়ে যেতাম গঙ্গাদ্বীপে, সাধুদের শিবিরে। বিস্তীর্ণ চর জুড়ে সাধুদের সারি-সারি আস্তানা। আর কত সম্প্রদায়ের কত রকম সাধু। জানি, কুম্ভের প্রাণই হল সাধু-সন্ন্যাসী। এ মেলায় তাঁরাই মুখ্য। সাধুদের বহিরঙ্গের কঠিন নির্মোক ভেদ করে ঘনিষ্ঠ হওয়া কঠিন কাজ। কিন্তু চেষ্টায় কী না হয়! অচিরেই বিভিন্ন শিবিরের সাধুদের সঙ্গে আমার রীতিমতো বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। তাঁরা নেমন্তন্ন করে তাঁদের সঙ্গে বসেই মধ্যাহ্নভোজনও করিয়েছেন আমাকে। দিনান্তে সুইস কটেজে ফিরে রোমান হরফে ক্যাপিট্যাল লেটারে লম্বা প্রতিবেদন লিখতে হত, তারপর সন্ধের মুখে অনেকটা লম্বা পথ হেঁটে গিয়ে ডাকঘরে টেলেক্স করে আসতে হত। পরদিন 'আনন্দবাজার পত্রিকা'-র প্রথম পাতায় সেই প্রতিবেদন প্রকাশিত হত। সাধুসন্ত ছাড়াও বহু সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎকার ও আলাপচারিতার বিবরণও থাকত তাতে।

কুম্ভ বাস্তবিকই এক আশ্চর্য আধ্যাত্মিক মেলা। কুম্ভের পিছনে সমুদ্রমন্থনঘটিত যে-পৌরাণিক কাহিনিটি আছে, তা এখন সকলেই জানেন। সেই কাহিনির সঙ্গে এখনকার কুম্ভমেলাকে মেলানো যাবে না। শঙ্করাচার্য যে-উদ্দেশ্যে এই সাধুসঙ্গমের প্রচলন করেছেন, তাও হয়তো সর্বাংশে সফল হয়নি। সাধুদের সমন্বয় বা ঐক্য চেয়েছিলেন, তিনি, যা মত বিনিময় ও হার্দ্য আলোচনার মাধ্যমে হয়তো ঘটে ওঠার নয়। তবু বিচিত্রের সমাবেশ তো ঘটেছে।

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ শাহিস্নানের দিন ইলাহাবাদ স্টেশনে ওভারব্রিজ ভেঙে পড়ায় হুড়োহুড়ি পদপিষ্ট হয়ে কুড়িজন মারা গিয়েছেন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কুম্ভমেলায় এই ঘটনা কিছুমাত্র অভিনব নয়। ইলাহাবাদে গঙ্গা-যমুনা এবং অধুনালুপ্ত সরস্বতীর সঙ্গমস্থলের পাশেই কেল্লার মাঠে কুম্ভে যে, ভিড় আমি দেখেছি, তা অতীব বিপজ্জনক। কোনও কারণে উত্তেজনা ঘটলে ভীত ও উদ্বেল মানুষের শৃঙ্খলাহীন ছোটাছুটিতে যে-কোনও সময়েই এইরকম ঘটনা ঘটতে পারে। ভারতে জনসমাবেশ সর্বদাই অনিয়ন্ত্রিত। মানুষের কৌলিক শৃঙ্খলাবোধের একান্তই অভাব। সকালবেলায় স্নানের সময় জলে এত মানুষ নেমে পড়ত, যে জল চোখে পড়ত না। স্নানেও দু-চারটে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে যেত। এই ঘটনার প্রায় বারো বছর পর আমি ফের কুম্ভে যাই হরিদ্বারে। সঙ্গে ছিলেন কালকূট সমরেশ বসু, 'অমৃতকুম্ভের সন্ধানে'-র লেখক।

উপন্যাসের সঙ্গে বাস্তব সর্বদা মেলে না। অমৃতকুম্ভের লেখক কালকুট তা ভালোই জানেন। তবু তাঁর 'অমৃতকুম্ভের সন্ধানে'-র অন্য এক সর্বজনীন প্রসাদগুণ আছে। তা কুম্ভের গাইডবই তো নয়। এবার সমরেশদা ছিলেন 'আনন্দবাজার পত্রিকা'-র প্রতিনিধি আর আমি 'দেশ' পত্রিকার। সমরেশদা তখন হৃদরোগে অনেকটাই কাবু, সঙ্গে স্ত্রী রয়েছেন তাঁর দেখভালের জন্য। কুম্ভের ভিড়ে তাঁর পক্ষে যথেচ্ছ ঘুরে বেড়ানো সম্ভব ছিল না, পেরেও উঠতেন না, দু'তিনবার চেষ্টা করে রণে ভঙ্গ দিয়ে হোটেলে ফিরে আসতে হয়েছে। আমি সাধুদের আখড়ায় ঘোরাঘুরি করছি জেনে একদিন আমাকে ধরে পড়লেন, চলো তো, সাধুদের সঙ্গে নাকি তোমার খুব ভাব, আমাকে নিয়ে চলো। নিয়ে গিয়েছিলাম। আমার এক নাগা সাধু বন্ধু ছিল, তাঁর সঙ্গে বসে গল্প-টল্প করলেন। সেইসব কথা লিখলেনও।

সেবারও কুম্ভে পদপিষ্ট হয়ে বেশ কয়েকজন মারা যান। সংখ্যাটা কুড়ি-পঁচিশ তো হবেই। ঘটনাটা খুব ভোরবেলা ঘটেছিল, গঙ্গার একটি সেতুর ওপর। কুম্ভে-এবারও সাড়ে তিন কোটির ভিড় হয়েছিল। অর্থাৎ কুম্ভে ভিড়টাই এমন যে দুর্ঘটনা না ঘটাই অস্বাভাবিক। আমরা হরিদ্বারের কুম্ভে প্রায় কুড়ি দিন কাটিয়েছিলাম। বিভিন্ন স্নানের দিন এমন জনসমাগম ঘটত যে, বাজারের সংর্কীণ রাস্তা ধরে হর-কি-পৌরিতে যেতে দম বন্ধ হয়ে আসার জোগাড়। সেই ভিড়ে সমরেশ বসুর পক্ষে যাওয়া তখন একেবারেই অসম্ভব। হোটেলের দোতলার বারান্দা থেকে নাগাদের মিছিল বা জনতার স্রোত দেখা ছাড়া তাঁর উপায় ছিল না। তবে যেদিন বড় যোগ না থাকত, সেদিন আমরা সবাই মিলে হর-কি-পৌরিতে যেতাম। সেখানেই একদিন দুপুরে এক গেরুয়াধারী সাধুর হাতে একটা বিটকেল আঁকাবাঁকা লাঠি দেখে সমরেশদা তাঁর দুর্বল হিন্দিতে জানতে চেয়েছিলেন, ইয়ে লাঠি আপকো কাঁহাসে মিলা? সাধুজি লাঠিটা তাঁর হাতে দিয়ে পরিষ্কার বাংলায় বললেন, 'আপনি সমরেশ বসু না?' দেখা গেল সাধু দিব্যি সাহিত্যজগতের খবর রাখেন। থাকেন হৃষীকেশের এক আশ্রমে।

স্নানেই পুণ্য হয় এমন কথা বাস্তবোচিত নয়। যে সৎকর্ম না করে, সদাচার যার নেই, যে সহজীবদের প্রতি সহানুভূতি পোষণ করে না, যার ইন্দ্রিয়াদি নিয়ন্ত্রিত নয়, বাক-ব্যবহার-চিন্তা যার শুদ্ধ হয়নি সে কুম্ভের পুণ্যস্নানে কীই বা লাভ করতে পারে। বহিরঙ্গের স্নান সুতরাং প্রতীক মাত্র। আত্মশুদ্ধির জন্য বনে জঙ্গলে পাহাড়ে গিয়ে তপস্যারও প্রয়োজন নেই। যিনি নিয়ামক পুরুষ, তাঁর অধীনে নিত্য নিজেকে অনুশাসনে নিয়ন্ত্রিত করলেই ওই পুণ্যস্নান মানুষকে পবিত্রতা দান করতে পারে।

এক বিশাল মন্থন থেকেই জাত হয়েছিল অমৃত হরণের সেই দৈবী তঞ্চকতা। প্রত্যাশিত এবং ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত অসুরেরা বোধহয় আজও সেই সৌর শঠতাকে ভোলেনি। কুম্ভ কি তবু দৈবী মহিমার কথাই বলে? কে জানে। কিন্তু দেখতে পাই, কুম্ভ জুড়ে আজও চলেছে মানুষের মন্থন। দেশের আনাচ-কানাচ থেকে, বিদেশ থেকে, দূর-দূরান্ত থেকে কত রকমের মানুষের যে সমাগম, তা কল্পনাকে ছাড়িয়ে যায়। মনে হবে যেন বিশাল কুম্ভে মুক্তি-সন্ধানী মানুষ কিসের এক অদৃশ্য আকর্ষণে বিঘুর্ণিত হয়ে চলেছে। সাধু-সন্ত, কল্পবাসী, কৌতূহলী পর্যটক, সাদা-কালো, ভালো-মন্দ সব একাকার হয়ে যাচ্ছে সেই ঘুর্ণনে। ইলাহাবাদ, হরিদ্বার উজ্জয়িনী, নাসিক সব একরকম। মন্থন চলেছে মানুষের অন্তরেও। পাপ, পুণ্য, জন্ম, মৃত্যু, বন্ধন, মুক্তির প্রকৃত অর্থ জানা নেই বলেই উদভ্রান্ত প্রশ্নাতুর মানুষ ছুটে আসছে কুম্ভে। সে কী পায়, কাকে পায় কে জানে। কিন্তু আসে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%