মনীষ মুখোপাধ্যায়
ঢাকা ১৯৭১ সাল...
শ্রীকান্ত সামন্তর বিরাট শাড়ির দোকান পুরোনো ঢাকার বাজারে। ইদানীং ব্যবসার অবস্থা ভালো যাচ্ছে না তাঁর। পাকিস্তানি খানসেনা আর মুক্তিযোদ্ধাদের দাপটে দোকান বাজার বন্ধ রাখতে হয় প্রায়ই। তিনি অবশেষে ঠিক করলেন ইন্ডিয়া চলে যাবেন। তাঁর বড়দা শ্রীমন্ত সেখানে চাকরি করেন। শ্রীমন্তের কখনোই ব্যবসাপাতিতে মন ছিল না। তিনি চিরকালই চেয়েছিলেন চাকরিবাকরি করে জীবন কাটাতে। বছর দুয়েক আগে শ্রীমন্তের ঢাকার কোম্পানি ওঁকে কলকাতা পাঠিয়েছিল। এখন তিনি পাকাপাকিভাবে কলকাতার বাসিন্দা। শ্রীকান্ত চিঠি মারফত জানতে পেরেছেন, বড়দা হালে একটা দু'কামরার ঘর ভাড়া নিয়েছেন আলিপুরের কাছাকাছি। সেখানে গিয়েই সপরিবারে ওঠার পরিকল্পনা করেছেন শ্রীকান্ত সাহেব। কিন্তু সমস্যা হল রাধা-গোবিন্দের প্রতিষ্ঠিত মন্দির তিনি কোথায় রেখে যাবেন! এই মন্দির তাঁর ঠাকুরদার বাবা অভয়াচরণ সামন্ত তৈরি করেছিলেন। বহু বহু যুগ ধরে সামন্ত পরিবারের সেবা পেয়ে আসছে এই মূর্তিযুগল।
শ্রী মাধবের গলার কাছে একটা নীল রঙের হীরে বসানো আছে। সেই হীরের প্রতি বড্ড লোভ এই অঞ্চলের রাজাকারদের। শ্রীকান্ত ভয়ে ভয়ে থাকেন, কোনোদিন তাঁদের পরিবারকেও না একসঙ্গে খুন হয়ে যেতে হয়। রাজাকারেরা কেবল আর্মির কানে তুলে দেবে, ওই বাড়ির লোকগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের মদত দেয়। ব্যস! কেল্লা ফতে। শাড়ির ব্যবসা করে এই বাজারে নেহাত কম টাকা করেননি তিনি। সেই টাকা আর শ্রী মাধবের হীরে একসঙ্গে লুঠ হয়ে যাবে রাতারাতি। তাই যত দ্রুত কলকাতা যাওয়া যায় সেই চেষ্টাই করছিলেন তিনি। বড় ছেলে শাম্বকে দায়িত্ব দিয়েছেন নৌকো করে নদী পার করে দেওয়ার লোক ধরার জন্য। কিন্তু সেই কাজ করতে হবে রাতের অন্ধকারে। পুরো পরিবার আর ওই মূর্তিযুগল সমেত রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে বের হতেও তাঁর ভীষণ ভয় করে।
অবশেষে খবর এল। শাম্ব খবর নিয়ে এল। এক মাঝি ওদের নদী পার করে দিতে রাজি হয়েছে। আর এদেশের একজন এজেন্ট ওদের খানসেনারের চোখ এড়িয়ে পৌঁছে দেবে নদীর পাড় অবধি। কিন্তু সেটা করতে হবে বেশ রাতে। পাহারাগাড়ি চলে যাওয়ার পর অতি সন্তর্পণে পৌঁছতে হবে নদী অবধি। এজেন্ট এসবের বিনিময় ওদের বসত বাড়িটা নেবে। দেশান্তরি যখন হতেই হবে বাড়ির মায়া বাড়িয়ে কী লাভ! রাজি হয়ে গেলেন শ্রীকান্ত।
সব যখন প্রায় ঠিকঠাক তখন গোল বাঁধালো শ্রীকান্তের মেয়ে উত্তমা। উত্তমা বেঁকে বসল। সে তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে এম এ পড়ছে কম্পারেটিভ পলিটিক্স নিয়ে। অপরদিকে হিন্দু শাস্ত্রের প্রাচীন ধারার প্রতি তার প্রচুর আগ্রহ। সে বাপের অমতেই শাক্ত ঘরানা নিয়ে পড়াশোনা করে। উত্তমা কিছুতেই কলকাতা যেতে রাজি নয় পড়াশোনা মাঝপথে ফেলে। দাদা শাম্ব তাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল, কলকাতা গিয়ে প্রেসিডেন্সিতে ভরতি করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিল। কিন্তু সে নাকি এই বাংলাতেই তার আগ্রহের প্রচুর বিষয় পেয়েছে, যেগুলো ছেড়ে কলকাতা যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয় বলে সে জানিয়ে দিল। এছাড়াও একটা অন্য আগ্রহের বিষয়ও তার আছে, যেটা বাবা বা দাদাকে জানানো যায় না।
বাপের মতকে অগ্রাহ্য করা ছিল একটা কঠিন ব্যাপার। বাপও জানিয়ে দিল তাকে একা রেখে যাওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। যদি সে কলকাতা না যায়, তবে তিনি ওকে ত্যাগ করবেন। এতবড় একটা সিদ্ধান্তের কাছে হার মেনে নিল উত্তমা। অবশেষে সে রাজি হল জ্যাঠার বাড়ি যাওয়ার জন্য।
উত্তমার মন ভালো থাকে না। আসলে সে ভালোবাসে কলেজের এক প্রফেসরকে। তার কথাই সে বলতে সংকোচ করছে বাবাকে। সেই প্রফেসরই তার মাথায় ঢুকিয়েছে প্রাচীন হিন্দুশাস্ত্রের ভূত। হঠাৎ করেই বাবা তার কলেজ যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। বাবার কথা, 'ভিটামাটি যহন ছাড়তেই হইব, ল্যাহাপড়ার মায়া বাড়াইয়া কী লাভ?'
প্রফেসর সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ হওয়ার রাস্তা সবদিক থেকেই বন্ধ। একলা দুপুরে উত্তমা নিজের খেয়ালে ঘুরে বেড়ায় এদিক ওদিক। বাগানে বসে অনেক চিঠি লেখে, আবার ছিঁড়ে ফেলে। পাশের বাড়িতে থাকে উত্তমার বন্ধু সুলতানা। সে ওর কলেজেই পড়ে। সুলতানার থেকে ও খবর পায় প্রফেসর সাহেবের। সে নাকি আজকাল মনমরা হয়ে থাকে ক্লাস করানোর সময়। উত্তমার মন কেমন করে ওঠে এসব কথা শুনলেই। বাবা ওই প্রফেসর সাহেবের সঙ্গে ওর বিয়ে দিতে কিছুতেই রাজি হবেন না। প্রথমত তাঁরা উচ্চ বংশের আর দ্বিতীয়ত ওঁদের বাড়িতে আবার শক্তির উপাসনা হয়। শাক্ত আর বৈষ্ণবে বিবাহ বাবা মানতে রাজি হবেন না।
এইভাবেই চলছিল সবকিছু। শ্রীকান্ত সামন্ত তলে তলে দোকান বেচার চেষ্টা করছিলেন। আর অপেক্ষা করছিলেন সেই এজেন্টের সবুজ সংকেত পাওয়ার। মেছকন্দর উদ্দিন এক সকালে এসে দোকানের মোটামুটি একটা দাম হাঁকলো শ্রীকান্তের সামনে। মেছকন্দরের দোকান ঠিক সামন্তদের দোকানের পাশেই। কিন্তু তেমন চলে না। এই পরিবার দোকান বেচে দিতে চাইছে শুনে তার তো পোয়া বারো।
সে প্রথমেই বলে উঠল, 'আদাব নিবেন সামন্ত সাহেব! শুনতেছি দোকানডা বেচনের তদবির করতাছেন?'
মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন শ্রীকান্ত সামন্ত। ইন্ডিয়া যাওয়ার কথা প্রকাশ করলেন না। এই মুহূর্তে কাউকে বিশ্বাস করেন না তিনি। তিনি শুধু বললেন, 'পোলা মাইয়ারা ল্যাহাপড়া শিখছে, ওরা দোকান দ্যাখব না। পোলাডা নানা ধান্দায় ঘুরে মরে। আমার ব্যবসায় তার মন নাই। আর দাদায় তো কবেই সব ছাইড়া পরিবার লইয়্যা দেশান্তরি হইছেন। হাতে কিছু ক্যাশ রাইখ্যা আমিও বুড়া বয়েসে একটু শান্তিতে থাকতে চাই। এই কারণেই দোকান বেইচ্যা দিতে চাই।'
'আপনার সিদ্ধান্ত ঠিক। কী করবেন যহন পোলা মাইয়্যারাই সম্পত্তির বিষয়ে না বুঝে! তা কিছু যদি না মনে করেন একটা কথা কই। আফনে দোকানডা আমারে বেচেন।' কথাটা পেড়ে মেছকন্দর সামন্তের দিকে চাইল।
ঘাঘু ব্যবসাদার শ্রীকান্ত সামন্তও এই তালেই ছিলেন। তিনি বলে উঠলেন, 'আজ বিশ বচ্ছর আমরা পাশাপাশি দুজনা ব্যবসা করছি, আপনি আমার পরিবারের লোকের চেয়ে কম কিসু না। আপনি যহন দোকানডা কিনতেই চান, আপনারেই ব্যাচবো। তা বলেন কত দিবেন?'
'যে আজ্ঞে বোঝেনই তো সব। দাঙ্গার বাজার! আর্মির চাপে ব্যবসা চালানোই অহন প্যাচাল হইয়া যাইতে আছে। আপনার ভাবির লগে পরামর্শ কইরা দ্যাখছি হাতের ক্যাশ আর সোনাদানা মিলাইয়া হাজার পনেরো মত জোগাড় হইব।' চালটা ভালোই চাললো মেছকন্দর। কিন্তু সে বুনো ওল তো সামন্ত বাঘা তেঁতুল।
সামন্ত সাহেব আলবোলার নলটা হাতে নিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, 'দ্যাহেন! ওই দোকানের মূল্য জিনিসপত্র লইয়া পেরায় হাজার পঞ্চাশেক তো হইবই। যদি হাজার তিরিশও ব্যবস্থা করা যায় কাগজ লইয়া আসেন সই কইরা দেই।'
'বাজার তো ভালা না। অত ট্যাহা পাই কই! আমি পনেরোর বেশি দিতিই পারব না।'
'তাহলে আর কী!' ছোট্ট একটা শ্বাস ছাড়লেন সামন্ত সাহেব। তারপর হাঁক দিলেন ভিতর বাড়ির কারো উদ্দেশে 'এই আছিস কেডা, মেছকন্দর চাচারে চা নাস্তা দিয়া যা।'
মেছকন্দরের কথায় যেন গুরুত্বই দিলেন না তিনি। শ্রীকান্ত এমন হাবভাব করলেন যেন এর পরে আর কথা বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই। সামন্ত সাহেবের শরীরী ভাষায় বেশ মনঃক্ষুণ্ণ আর অপমানিত বোধ করল মেছকন্দর। দপ করে মাথাটা গরম হয়ে গেল মেছকন্দর মিঞার। হিন্দুর পোয়ের তেল বাড়ছে বেশি, মনে মনে গজগজ করে উঠল সে। তার কানে একটা উড়ো খবর এসেছে। সত্যি মিথ্যে যাচাই করে দেখেনি সে। বাজারের জুতোর দোকানি করিম বলাবলি করছিল, সামন্তরা ইন্ডিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। দাঁতে দাঁত পিষল মেছকন্দর, যাওয়াচ্ছি হালার পুতেরে ইন্ডিয়া। সোজাসাপটা একটা বাণিজ্য করতে এসেছিল সে। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল তো বেঁকাতে হবেই।
শ্রীকান্ত সামন্তের ছেলের বউ চা নিয়ে ঘরে ঢুকছিল। মেছকন্দর হাতের ইশারায় তাকে থামতে বলল। তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে প্রায় স্বগতোক্তি করল, 'নাস্তা লাগবো না। একখান আবেদন রাখছিলাম, নাকোচ যখন কইরা দিছেন, আর কথা কইয়া কী লাভ! আমি আজ আসি। ভালা থাকবেন।'
আর এক মিনিটও অপেক্ষা করল না মেছকন্দর। সে দ্রুত গতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। এই সম্পত্তি সে বিনা পয়সায় দখল করবে, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন