রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার
সুবার নাম ওড়িশা।
ওড্র, উৎকল, কলিঙ্গ—সেসব প্রাচীন নাম। সেই সুবায় চলছে গোলমাল। আসলে অসির ঝনঝনানি। তাকত-এর লড়াই। ‘শক্ত মুঠি আর কঠিন চোয়াল বজায় রাখতে পারলে জয় অনিবার্য।’ কথাটা বলেছিলেন মিরহাবিব।
মিরহাবিব মুর্শিদকুলি খানের দেওয়ান ছিলেন। আবার একদিন হয়ে গেলেন মারাঠারাজের নাজিম দেওয়ান। কেমন করে হলেন, সেবেশ লম্বা গল্প। আর রহস্যে ভরা।
ওড়িশায় কতৃত্ব করতে এলেন আলিবর্দি খান। ওড়িশার নাজিম তখন দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খান। নাজিম সাহেব তো বেজায় চটে গেলেন। তিনি আলিবর্দি খানকে অস্বীকার করলেন। সদর্পে। অবশ্য মুর্শিদকুলি খান নামেই নাজিম। দেওয়ানগিরি করতেন মিরহাবিব। দেশীয় রাজারা তাঁকে খুব সম্ভ্রমের চোখে দেখতেন। কারণ, রাজস্ব নিয়ে একদম জোরজুলুম করতেন না। বলতেন,—হাত পেতে বসে আছি। যা দেবার দাও। প্রজাদের কোনো দুঃখ দিতে চাই না। সুখ বড়ো মহার্ঘ।
বড়ো ভালো মানুষ ছিলেন মিরহাবিব। ময়ূরভঞ্জের রাজা, রঘুনাথভঞ্জ বলতেন,—হাবিব সাহেব আপনি মুঘল প্রতিনিধি। আপনার মতো সৎ, দক্ষ প্রতিনিধি থাকলে রাজ্যে রাজ্যে শান্তির হাওয়া বইবে। সুখ মানুষের করতলগত হবে।
হাবিব সাহেব বাকপটু নন। স্বল্পভাষী। মৃদুস্বরে বললেন,—মানুষের ধর্ম তো মানুষেরই কল্যাণ চিন্তা করা। সেটাই বড়ো সত্য। আর কিছু নয়।
কিন্তু তাকতও লড়াই। লড়াই করেই ওড়িশা জিতে নিয়েছে মুঘলরা। আফগানদের হটিয়ে দেন মুনিম খান ও টোডরমল। ভয়ানক ছিল সেলড়াই। তবুও মুঘলদের শত্রু নির্বাপিত হল না। সম্রাট আকবর মানসিংহকে ফের পাঠালেন। শত্রুনিধন ও শক্তিকায়েম সহজে হয়নি। কোতুল লোহানির পরাজয় ও ওড়িশা দখল ছিল ভারি আশ্চর্য রকমের।
তখনও ওড়িশা গড়ে ওঠেনি স্বতন্ত্র সুবা হিসেবে। বাংলা সুবা কটক ও মহানদী বরাবর বিস্তৃত ছিল। সম্রাট জাহাঙ্গিরের রাজত্বকালে ওড়িশা সুবা গড়ে ওঠে (১৬০৭)। প্রথম সুবেদার হয়ে এলেন হাসিম খান।

সম্রাট আকবর মানসিংহকে ফের পাঠালেন। শত্রুনিধন ও শক্তিকায়েম সহজে হয়নি।
লড়াইয়ের কথায় হাবিব সাহেব অতীতে চলে যান। তবে বর্তমানও কী কিছু কম! আবার লড়াই। মারাঠা রাজশক্তির পদসঞ্চার ঘটছে ওড়িশায়। মাঝে মাঝে ঝড় উঠছে। কালবোশেখি ঝড়ের মতো।
মনে হতে পারে এক ভ্রমণ রসিকের গল্প। ভ্রমণ তাঁর নেশা। এই নেশা ভয়ানক। তালুক-মুলুক মানে না। মনের দৃঢ়তা থাকলেই হল। আগু-পেছু ভাবলে চলে না। বেরিয়ে পড়তে হয়।
এমনিভাবেই বেরিয়ে পড়েছিলেন মিরহাবিব। আরব দেশ থেকে। তবে নিছক ভ্রমণ নয়। ছিল ভাগ্যান্বেষণও। তখন তাঁর বয়েস কুড়ি-একুশ। সদ্য যুবক। শক্তসমর্থ দেহ। চোখ দুটি উজ্জ্বল। তীক্ষ্ণ নাক। চওড়া কাঁধ। চুল ও দাড়ির পরিমিতির জন্য আরও সুন্দর লাগে। এই যুবকটি যখন পথে হাঁটেন, সবাই চেয়ে থাকে। একদৃষ্টে। এমন লম্বা সুপুরুষ মানুষ খুবই কম দেখা যায়।

তবে চেহারা দেখে চোর-ডাকাত বলে সন্দেহ করতে মন সায় দিল না।
একদিন দিল্লির শাহি সড়ক ধরে চলেছেন কোতোয়াল। ঘোড়ার পিঠে বসেই কিছু ভাবছিলেন। হঠাৎ তাঁর নজরে পড়ল। কিল্লার ভাঙা প্রাকারের দিকে। ইট কাঠ পাথরের স্তূপ। তার পাশেই আছে প্রাচীন বট। তার নীচে এক পথশ্রান্ত পথিক, নিদ্রায় বিভোর।
কোতোয়াল মানুষটি রাশভারী প্রকৃতির। গলাটি ভীষণই গম্ভীর। তবে মনটি নরম কাদার তালের মতন। ছুঁয়ে ছেনে দেখলে তার গভীর স্পর্শ যে কেউ পেতে পারে। যাই হোক, কোতোয়াল ভাবতে লাগলেন। মানুষটি এল কোথা থেকে? দিনকাল ভালো নয়। ইদানীং চুরি-ডাকাতি হচ্ছে খুব। সেই দলের কেউ নয়তো? তবে চেহারা দেখে চোর-ডাকাত বলে সন্দেহ করতে মন সায় দিল না। তিনি ডেকে তুলবেন কিনা ভাবছেন। এমন সময় সেই পথিক ঘোড়ার বিচিত্র মুদ্রার শব্দে জেগে উঠলেন। কোতোয়াল জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কে? কোন দেশ থেকে এসেছ?
পথিকের চোখ দূরমনস্ক। তবে প্রশ্নের মধ্যে কঠোরতা ছিল না। ছিল সম্ভ্রম আগ্রহ। পথিক বললেন,—‘আমার নাম মিরহাবিব। আরব দেশ থেকে এসেছি।
কোনো কোনো নাম বর্ণগন্ধময়, সুরভিত চমক হয়ে ওঠে। তাই হল। এই সুক্ষণে কোতোয়াল বললেন,—এই নামে আমার এক ভাই ছিল। বছর চারেক আগে পেশোয়ার এক গিরিখাদে পড়ে মারা গেছে।
বলার সঙ্গে সঙ্গে এক তীব্র অনুভূতির শিরশিরানি তাঁর সমগ্র শরীরকে আচ্ছন্ন করল। বললেন,—ক-টা দিন আমাদের সঙ্গে থাক। বিশ্রাম হবে।
দিল্লিতে তখন খুবই ডামাডোল। সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু হয়েছে। পুত্রদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ চলছে। মুয়াজ্জেম প্রথম বাহাদুর শাহ শাহআলম নাম নিয়ে মসনদে বসলেন। মানুষটি বিদ্বান, উদার প্রকৃতির। কিন্তু তাঁর মনে সুখ ছিল না। কারণ পুত্ররা অবাধ্য। লোভী। পিতার সিংহাসন কে নেবেন এই নিয়ে চার পুত্র লড়াই করছেন। বাহাদুর শাহ ভাবলেন, এরকম লড়াই তিনিও করেছেন। তাঁর পুত্ররাও করছে। এ আর বেশি কথা কী? ১৭১২ সালে তিনি মারা গেলেন। ওই যে বলেছিলাম লড়াই, সেই লড়াইয়ে ভাইদের মেরে জাহান্দার শাহ মসনদে বসলেন। বলাবাহুল্য, কাঁটার মসনদ।
আমরা এক ভালো মানুষের কথা বলছিলাম। সেই ভালোমানুষ কোতোয়ালের নাম খোদাবকস। তো একদিন খোদাবকস মিরহাবিবকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন মিরবকশির কাছে। মিরবকশি সামরিক বাহিনীর প্রধান। অধীনস্থ কর্মচারী খোদাবকসের সঙ্গে খুব একটা সম্পর্ক থাকার কথা নয়। আসলে ছিল বৈবাহিক সম্পর্ক। সেই সূত্রে মিত্রতা। তাই তাঁর ছিল অবাধ গতি। যখন তখন। মিরবকশির নাম ছিল দিলজান খাঁ। প্রতিদিনের মতোই ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়া গায়ে মাখছিলেন। এই সময়ের সোনা কিরণ রোদ আর নরম শিশির ভেজা ঘাস হলে তো কথা নেই। তাঁর ভারি পছন্দ।
দিল্লিতে এখন যেখানে লোদি গার্ডেন বলে জায়গাটি আছে, তারই খানিক দূরে, পূর্ব দিকে দিলজান খানের প্রাসাদোপম বাড়ি। সেবাড়ির ফুল-বাগিচাটি দেখার মতোই। খুব সুন্দর। বহু যত্নে গড়ে উঠেছে। সেখানে ছিল হরেক প্রকার গোলাপ। তারজন্যই বোধ হয় নাম হয়েছিল গোলাপ বাগ। সম্রাট একসময় এই গোলাপ বাগিচার কথা শুনে দখল নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। সামরিক প্রধানকে চটাতে চাননি। হয়তো-বা সম্রাট মনে মনে হেসেছিলেন। মসনদ কবে ওলটায় তার ঠিক নেই! তায় আবার সাধ-আহ্লাদ। ইচ্ছে বুদবুদের মতন! উঠল, ফুটল ও ফেটে গেল।
সেই ভোরসকালে দিলজান খাঁ খোদাবকসকে দেখে আদাব জানালেন। স্বাগত সম্ভাষণ। তারপর কুশল বিনিময়। ঘনিষ্ঠ আলাপন। দিলজান খাঁ এতক্ষণ খোদাবকস সাহেবের সঙ্গীকে নজর করেননি। বা করলেও গুরুত্ব দেননি। কিছুপরেই তিনি ইঙ্গিতে জানতে চাইলেন, কে এই যুবক?
খোদাবকস বললেন,—আমার বন্ধু।
দিলজান খাঁ কৌতুক হাসলেন,—এই নওজোয়ান তোমার বন্ধু! তো করেনটা কী?
খোদাবকস যেন সুযোগ খুঁজছিলেন। পেয়ে গেলেন। বললেন,—সেজন্যই তো তোমার কাছে ওকে এনেছি।
তাই বুঝি! দিলজান খাঁ চোখে চোখ রেখে হাসলেন।
সম্রাট ঔরঙ্গজেবের সময় পর্যন্ত মুঘলদের শক্তির জাঁক ছিল। ঐশ্বর্যের চমক ছিল। তাঁর মৃত্যুর (১৭০৭) সঙ্গে সঙ্গে সেই জাঁক-চমক আর অপ্রতিহত ক্ষমতা স্তিমিত হল। সম্রাটরা এলেন গেলেন। বিশাল সাম্রাজ্য অস্থিবিহীন হয়ে উঠল। অন্দরে ও বাইরে। সুকঠিন শৃঙ্খল বন্ধন নেই। তাই সুবাদারেরা স্বাধীন হয়ে উঠেছিলেন। মুঘল কতৃত্ব মানেন না। ঠিকঠাক শাসনও করেন না। সেএক অরাজকতা।
সম্রাট আকবরের আমলে ছিল পনেরোটি সুবা। সম্রাট ঔরঙ্গজেবের আমলে বেড়ে দাঁড়ায় একুশটি। ফলত, বিশৃঙ্খলা চতুর্দিকে। নানা আকারে-প্রকারে। ঔরঙ্গজেবের নজর ছিল বেশি দক্ষিণ দিকে। রাজস্বনীতির সুফল কিছু পেয়েছেন হাতেনাতে। তার মূলে ছিলেন প্রথম মুর্শিদকুলি খান। তিনি টোডরমলের রাজস্বনীতির খানিক অদল-বদল করেছেন। সময়ের প্রেক্ষিত বিবেচনায়। আশাতীত ফলও পেয়েছেন। সম্রাট খুশি হয়েছেন খুব। এরজন্য পুরস্কার পেলেন। সুবাদারি। তিনি ওড়িশায় সুবাদার নিযুক্ত হন ১৭০৩-১৭০৮ সালে। আরও একবার হয়েছিলেন ১৭১৪-১৭২৭ সালে। দক্ষ মানুষের কদর যেমন হয়!
তাঁর দেওয়ান ছিলেন জামাতা সুজাউদ্দিন মহম্মদ খান। প্রথম মুর্শিদকুলি খানের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে বাংলা, ওড়িশার সুবাদার হিসেবে (১৭২৭-৩৯) ঘোষণা করলেন। এবং পুত্র তকি খানকে দেওয়ান নিযুক্ত করলেন। তকি খান ছিলেন দাম্ভিক ও অত্যাচারী। বদনাম কুড়োলেন খুব। অবশ্য অকস্মাৎ তাঁর মৃত্যু হয়। সুজাউদ্দিন তখন জামাতা দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খানকে সুবাদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন। সম্রাটের কাছে আর্জি জানালেন। বলে রাখা ভালো, কোনো নিযুক্তি সম্রাটের অনুমোদন ছাড়া সম্ভব ছিল না। আগেই হোক বা পরেই হোক।
যাই হোক, তকি খানের মৃত্যতে কিন্তু সম্রাট স্বস্তি পেয়েছিলেন। খুব শীঘ্রই দরবারে এক বর্ধিত সভায় দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খানের নিযুক্তি পাকা হবে। এমনটি ঘটতে চলেছে। মিরবকশি দিলজান খাঁ জানতেন। তাই সুযোগ বুঝে, সম্রাটের কাছে দেওয়ান পদের জন্য মিরহাবিবের নামটি পেশ করলেন।
সম্রাট সন্ধের সময় একলা নির্জনে বসেন। তদগত চিত্তে। আফিমের মৌতাতে আচ্ছন্ন থাকেন। এমন একটি সন্ধ্যায় দিলজান খাঁ সম্রাটকে লম্বা সেলাম জানিয়ে বললেন,—‘জাঁহাপনা, ছোট্ট একটা আর্জি আছে।
সম্রাট নেশার চোখ উপরে তুলে জিজ্ঞেস করলেন,—কী এমন আর্জি খাঁ সাহেব?
সম্রাট মিরবকশিকে খুবই পেয়ার করেন। এই সময় সম্রাটের সঙ্গে দেখা করার অধিকার কেবল প্রধানমন্ত্রী, মিরবকশি এবং কোতোয়াল ছাড়া আর কারুর নেই। তাই সম্রাট বুঝলেন, নিশ্চয়ই খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা। গোপন কথা।
কিন্তু দিলজান খাঁ বলছেন কিনা একজন কর্মচারী নিয়োগের কথা। সম্রাট হাসলেন। হা-হা রবে। একটু উচ্চরবেই।
তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। এরপর বললেন,—কাল সকালে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগপত্র দেবেন। শাহি ফরমান। তাঁকে তলব জানাও।
মিরবকশি আনন্দ চিত্তে সম্রাটকে সেলাম জানাতে জানাতে পিছিয়ে এলেন। সম্রাট বিজন-বিরলে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন।
মিরহাবিব ওড়িশার দেওয়ান। একে তো ভ্রমণ রসিক। তার ওপর দেওয়ানগিরি। সম্রাটের প্রতিনিধি। যেখানে কাজ করবেন, সেজায়গাটা ভালো করে দেখে নেওয়া দরকার। তাই তিনি বেরিয়ে পড়লেন। সাগর, পাহাড়, বন, তাঁকে টানে। বড়ো আকর্ষণ। সেই হিসেবে তাঁর নসিব ভালো। আল্লার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন।
ইতিমধ্যে ক্ষুদ্র, বৃহৎ রাজারা তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। মিরহাবিব সাহেব সবাইকে আশ্বস্ত করেছেন। ওড়িশার প্রতিটি প্রান্তে তিনি যাবেন। সেই কথামতোই কাজ। ময়ূরভঞ্জ রাজার কাছে তিনি প্রথম এলেন। রাজা তাঁকে নিয়ে চলেছেন। ভূখন্ড, দেশ গাঁয়ের মানুষজন, পাহাড় প্রকৃতি বনজ সম্পদ, নদী জলধারা প্রভৃতি সম্পর্কে আন্দাজ দিতে। রাজার সঙ্গে দেওয়ান সাহেবের কতিপয অনুচরবৃন্দও আছেন। অশ্বগতি খুবই শ্লথ।
হঠাৎ দেওয়ান সাহেব দেখলেন, একফালি জমিতে কয়েকজন যুবক ঢাল তরোয়াল নিয়ে যুদ্ধ করছে, নকল যুদ্ধ। পাশেই দুই যুবক একজন ধামসা ও অন্যজনে বঁাশি বাজাচ্ছে। তাল, লয়, ভঙ্গি, মুদ্রা সবই আছে। তবে তান্ডব মুদ্রা বলেই তাঁর মনে হল।
ময়ূরভঞ্জ রাজা দেওয়ান সাহেবের চোখে লক্ষ করলে অসীম কৌতূহল। রাজা বললেন—ফরিখন্ড খেল। এই খেলাটি খুবই প্রাচীন। উৎকল রাজারা বহি:শত্রুর হাত থেকে রক্ষা পেতে সীমান্ত প্রহরায় সৈনিক পুষতেন। যখন যুদ্ধবিগ্রহ থাকত না তখন সেই ‘ফরি’ (অর্থ ঢাল) আর ‘খন্ড’ (অর্থ তরবারি) নিয়ে যুদ্ধ খেলা বজায় রাখত। আসলে শরীরী বিভঙ্গ, অস্ত্রশস্ত্রের প্রকরণ কৌশল, তাল-লয়-মুদ্রা, সংগীত-বাদ্য ও অভিনয় নিয়ে গড়ে উঠেছে এক নৃত্যরসধারা। ছ-টি বৈশিষ্ট্য সমন্বিত লোকনৃত্য—‘ফরিখন্ড খেল’।
মিরহাবিব অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলেন—‘এইরকম খেল-নৃত্য আর কোথায় আছে?’
রাজা বললেন,—ওড়িশার কয়েকটি স্থান আছে বটে। তবে এর উৎসভূমি এই বারিপদায়, ময়ূরভঞ্জে।
মিরহাবিব প্রসন্ন মনে বললেন,—এর এত রূপ-বৈশিষ্ট্য! গুণ-মাহাত্ম্য!
ময়ূরভঞ্জ রাজা আনন্দে আপ্লুত হলেন। এক বর্ণময় দ্যুতি তাঁর চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ল।
দেওয়ান সাহেবের খুবই ভালো লেগেছিল, এই খেল-নৃত্যটি। তার কারণও ছিল। সেনাবাহিনীকে শারীরিকভাবে সক্ষম, দৃঢ় রাখার পক্ষে মুদ্রাটি অভিনব। শক্ত মুঠি আর কঠিন চোয়াল বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এই নৃত্যপ্রকরণটির তুলনা নেই। এমন ভাবনাটিও অমূলক ছিল না। তার প্রমাণও অন্তত কিছুটা পেয়েছেন।
১৭৪১ সালে। নবাব আলিবর্দি খান বাংলা বিহার ও ওড়িশার নাজিম নিযুক্ত হয়েই ওড়িশার ছুটে এলেন। দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খান ও মিরহাবিব প্রতিরোধ করলেন। দেশীয় সামন্ত প্রধানরাও রুখে দাঁড়ালেন। ময়ূরভঞ্জ রাজা মিত্র হিসেবে মিরহাবিবের পাশে দাঁড়ালেন। রাজার পাইক সৈন্যরা লড়াই জমিয়ে দিল বেশ বড়ো রকমের। সুবর্ণরেখা নদীর তীরবর্তী রাজঘাট ফেরির কাছে জয় তাদের নিশ্চিত হয়ে গেল। কিন্তু শেষরক্ষা আর হল না। আলিবর্দিখান বোমাবর্ষণ করতে করতে শক্তিব্যূহ গড়ে তুললেন। মুর্শিদকুলি খান ও মিরহাবিব পরাজিত হন। পালিয়ে গেলেন।
মিরহাবিব এই পরাজয়ের গ্লানি অবশ্য ভোলেননি।
কটকের পথ ধরে হেঁটে আসছে একটি পর্যটক দল। তীর্থ পর্যটক বলেই মনে হয়। দলের মধ্যে একজনের গায়ে উত্তরীয়। কপাল চন্দনচর্চিত। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। সেই আগন্তুকটি দীর্ঘকায়, বলিষ্ঠ। চোখ দুটি উজ্জ্বল। তাঁকে পুরোহিত বলেই হয়। তাঁর মুখটি থমথমে। চিন্তার আভাস। বৈতরণী নদী তীরে এসে তিনি দাঁড়ালেন। একপ্রান্তে একটি শ্বেতপতাকা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন যে ব্যক্তিটি, তিনি আমাদের পরিচিত দেওয়ান মিরহাবিব। তাঁকে দেখে সেই আগন্তুক ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে এলেন। তাঁর সঙ্গীরা বেশ কিছুটা পিছনে পড়ে রইলেন। তিনি মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন—হাবিব সাহেব, সব কুশল তো?
মিরহাবিব মাথা নাড়লেন,—সেএকরকম। তবে আলিবর্দি খান জাঁকিয়ে সেনা সমাবেশ করেছেন। তাঁর দেওয়ান মির্জাবাকির এখন বিদ্রোহী। আমাদের দলে যোগ দিতে পারেন।
আগন্তুক শুধোলেন,—মির্জাবাকির ও দেশীয় রাজন্যবর্গ আমাদের সাহায্য করবেন?
মিরহাবিব বললেন,—তা নিয়ে চিন্তা নেই রঘুজি।
তারপর তিনি পালটা প্রশ্ন করলেন,—সৈন্যদল কবে এসে পৌঁছোবে?
—একপক্ষকালের মধ্যে।
মিরহাবিবের কপালে ভাঁজ,—একটু দেরি হল না কি?
—তা হল। নাগপুর থেকে ওড়িশা। এই দীর্ঘপথের ক্লান্তি তো কম নয়। কথোপকথনরত সেই আগন্তুক আর কেউ নন—ছদ্মবেশে মারাঠারাজ রঘুজি ভোঁসলে। মারাঠা শক্তি কয়েক বার ওড়িশায় হানা দিয়েছে। ঠিক জয় বলতে যা বোঝায়, তা হয়নি। দশ বছর ধরে চলেছে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। আলিবর্দি খানেরও শক্তিক্ষয় কম হয়নি। শেষে আলিবর্দি খানকে ওড়িশা ছেড়ে দিতে হয় মারাঠাদের হাতে। শান্তি স্থাপিত হয় এক চুক্তির সূত্রে ১৭৫১ সালে। মিরহাবিব হলেন মারাঠারাজের নাজিম দেওয়ান।
ওড়িশাবাসী ভাবলেন আফগান, মুঘল কিংবা মারাঠা সবই একপ্রকার। বর্ণ ধাতুর এপিঠ আর ওপিঠ, দুই-ই সমান। তবে মন্দের ভালো। মিরহাবিবের মতন মানুষ আছেন। তিনি আছেন, থাকবেন হয়তো ক্ষণকাল। অনিত্য সব কিছুই। সুখ-দুঃখ যেমন থাকে না চিরকাল। সেটাই বড়োকথা। সত্য কথা।
শারদীয়া কিশোরভারতী, ১৪০৯
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন