হিরাকানি মঞ্জিল

রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার

শীতকাল।

ভোরের আলো তখনও ফোটেনি। কুয়াশায় চারদিক আচ্ছন্ন। কিছুই ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। প্রাচীরের গায়ে জড়ো হয়েছে সৈন্য। অনেক অনেক। মারাঠারাজ একথা শুনলে কী বলবেন। কার গর্দান যাবে! সেনিয়ে সবাই চিন্তিত। দুর্গ রক্ষীপ্রধান কিছু আগে রক্ষীদের শাসিয়ে গেলেন: ‘কর্তব্যে অবহেলার দায় তোমাদের নিতে হবে। এড়াতে পারবে না, সামলাতে হবে।’

রক্ষীপ্রধানের কন্ঠটি কর্কশ। কথাগুলি আরও কর্কশ কন্ঠে বললেন বটে। তবে তাঁর নিজের মনেও শঙ্কা গভীর। মারাঠা সেনাধ্যক্ষকে তিনি কী জবাব দেবেন! সেনাধ্যক্ষ গতকাল রাতে জ্ঞাতিভাইকে দেখতে গেছেন। তাঁর অসুস্থতার খবর শুনেই দুর্গ ছেড়েছেন। অবশ্য দুর্গ ছাড়ার আগে রক্ষীপ্রধানকে কড়া নির্দেশ দিলেন: ‘সাবধান, সতর্ক থাকতে হবে খুব। মুঘল সম্রাটের অনুচর, আফঘান সৈন্যরা কিছুতেই যেন দুর্গে প্রবেশ করতে না পারে।’ রক্ষীপ্রধান নিজের গোঁফ জোড়াতে হাত বুলিয়ে নিলেন। এটি তাঁর প্রিয় মুদ্রা। এ মুদ্রাটি একইভাবে করলেন বার কয়েক। তারপর চোখ উপরে তুলে বললেন: ‘হুজুর, নিশ্চিত থাকুন। জান কবুল।’ সেনাধ্যক্ষ খুশি হলেন। মাথা দুলিয়ে তারিফ করলেন। এমন বাক্যটি তিনি আশা করেছেন। এরপর তিনি অশ্বক্ষুরের শব্দে, ধুলোর ঝড় তুলে, দৃষ্টির বাইরে চলে গেলেন।

সেনাধ্যক্ষ চলে যেতেই সৈনিকরা উল্লসিত। সৈনিকদের একজন বলল: —‘বেটা পাজি, আমাদের নিদ (ঘুম) কেড়ে নেন। আর নিজে কেবল গাঁজার মৌতাতে মেতে থাকেন।’ একজন বয়স্ক সৈনিক বলল; ‘এমন মৌতাতে থাকেন বলেই আমরা নিশ্চিন্ত থাকি। তবে যা বল ভাই, মানুষটির গলা কিন্তু খাসা। বলো, কী সুন্দর ভজন গান করেন!’

—‘তা বটে, তা বটে।’ বলে সুর টানল আর একজন সৈনিক। বয়স্ক সৈনিকটি আবার বলল, ‘তোমরা কিন্তু সেনাধ্যক্ষ মশাইয়ের একটি মহৎ গুণের কথা বলছ না!’

সৈন্যদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত নবীন বয়সের এক সৈনিক জিজ্ঞেস করল;

—‘সেটা কীরকম শুনি?’

বয়স্ক সৈনিকটি বলল: ‘তিনি মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারান না। মনে করেন, বিশ্বাস হারানো পাপ।’ নবীন সৈনিকের চোখে কৌতূহল। ‘বলুন না, কিছু কথা।’

বয়স্ক সৈনিক বলল: ‘বিজাপুর সুলতানের রাজধানীতে এক কান্ড ঘটল। এক সম্পন্ন গৃহস্থের বাড়ি থেকে এক ছিঁচকে চোর রাতের অন্ধকারে, একটি সোনার কলসি নিয়ে পালাচ্ছিল। সেনাধ্যক্ষ মশাই তাকে দেখতে পেয়ে ধাওয়া করলেন। ধরেও ফেললেন। কলসিটির চুরি বৃত্তান্ত শুনে চোরকে তিনি তিরস্কার করলেন। বিরাশি সিক্কার চড়ও দিয়েছিলেন। এবং তাকে ধরে নিয়ে গেলেন ওই গৃহস্থের বাড়িতে। কলসিটি ফেরত দিতে।

চোরটি খুব ভয় পেয়েছিল। মনে মনে অনুতপ্ত ছিল। গৃহস্বামী বিজাপুর সুলতানের অমাত্য। খুব তাঁর প্রতাপ। তিনি গর্জে উঠলেন। তরবারি তুলে চোরকে তো হত্যা করতে উদ্যত হলেন। সেনাধ্যক্ষ মশাই ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন: ‘ওর অপরাধ ক্ষমা করুন।’

গৃহস্বামীর চোখে আগুন ঝরল; ‘চোরের শাস্তি মৃত্যুদন্ড।’

সেনাধ্যক্ষ বললেন: ‘হয়তো সেটা সত্য। তবে শাস্তি দিতে পারতেন, যদি ওকে আপনি হাতেনাতে ধরতেন। তা যখন পারেননি, ওকে আপনি ক্ষমা করে দিন। শাস্তি দেব আমি।’ ওই কথা বলে চোরকে সঙ্গে নিয়ে ফিরলেন।

নবীন সৈনিক জিগ্যেস করল, ‘শাস্তি তার হয়েছিল কি?’

‘হ্যাঁ।’ বয়স্ক সৈনিক মাথা নাড়ল।

‘কীরকম শাস্তি?’

‘দুর্গের সম্পদ রক্ষার।’

‘কে সেই চোর?’

সমবেত সৈনিকদের কৌতূহল ভরা চোখ। কারুরই চোখের পলক পড়ছে না। সবাইকে অবাক করে বলল: ‘আমিই ছিলাম সেই চোর। রবি দুগকর।’

মারাঠা রাজ্যের রায়গড় দুর্গটি সুরক্ষিত। নির্মাণ কুশলতায় শ্রেষ্ঠ। সৌন্দর্যে অতুলনীয়। ঐশ্বর্যের অসীম ভান্ডার। স্বভাবতই সেই দুর্গটি কঠিন ঘেরাটোপে থাকে। কঠিন পাহারা। দুর্গদ্বার থেকে সেনাধ্যক্ষ কিংবা রক্ষীপ্রধান না চাইলে হাতি তো দূরের কথা। বিড়ালও গলতে পারে না। আগন্তুক এলে তাকে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয় নানা পরীক্ষা ও জেরা করেই। আগন্তুকের হাতে দেওয়া হয় বরফকুচির মতো নানা রঙের পাথর। আগন্তুক ফিরে যাওয়ার সময় তার হিসেব বুঝিয়ে দেয়। দ্বারপালের সন্তুষ্টিই বড়োকথা। অন্য কিছু নয়। সকাল-সন্ধ্যায় প্রহরারত সৈনিকরা সুর করে হাঁক পাড়ত:

রায়গড় দুর্গ প্রাকার,

বড়ো বিচিত্র তার আকার।

কেউ পারবে না গলতে,

এলে আসতে পারো, মরতে।

তো সেখানে আর কে মরতে যায়! সেনিয়ে এক গল্প আছে। সত্যি-মিথ্যা বলা যায় না। সম্রাট ঔরঙ্গজেবকে মাতুল শায়েস্তা খাঁ বলেছিলেন: ‘জাঁহাপনা, রায়গড় দুর্গটি গুঁড়িয়ে দাও। মনে সুখ হবে তবে। পার্বত্য মূষিকের শিক্ষা যদি হয় তাতে।’

সম্রাট নির্দেশ পাঠালেন বিজাপুর সুলতানকে।

বললেন: ‘সুলতান, রায়গড় দুর্গ আমার চাই। দখল করুন।’

সম্রাটের আদেশ, তিনি আর কী করেন। অগত্যা এক দক্ষ সেনাপতির নেতৃত্বে দুই শত অশ্বারোহী সৈন্য পাঠালেন। দুর্গ প্রাকারের নীচে পাহাড়িয়াদের বাস। দুর্গের নজরদার একরকম তারাই। যাই হোক, সুলতানের অশ্বারোহী সৈন্যরা দুর্গপ্রাচীরের পাশে ঘোড়াগুলি রেখে; ছদ্মবেশে দুর্গ গহ্বরে ঢুকবার চেষ্টা করল বটে। তবে তারা আর ফিরতে পারেনি। কেউ তাদের খোঁজ জানে না। অবশ্য ঘোড়াগুলি যেখানে রেখেছিল, সে-জায়গার নাম হয়ে গেল ‘অশ্বতলি’। রায়গড়ে গেলে এই অশ্বতলি নিয়ে নানা গল্প শোনা যায়। রোমহর্ষক কাহিনি। তবে একটা ছড়া শিশুদের মুখে মুখে ফেরে।

ঘোড়া কোথায় বিল্লি ছিল

পাহাড় রাজা গিলে নিল।

সেতো দুর্গ নয়। আস্ত একটা নগর। মারাঠারাজের দুর্গনগরী। দিনমানে রাজধানী রায়গড় সরগরম থাকে। খড় ও টালি দিয়ে ছাওয়া অগণন কুটির। মাঝে মাঝে ছোটো বড়ো অট্টালিকা। মধ্যে চওড়া রাস্তা। তার দু-পাশে প্রায় প্রাচীরের গা ঘেঁষে জলনিকাশি ব্যবস্থা। কিছু দূরেই বাজার। বিকিকিনির হাট। পণ্য ব্যাপারীর ব্যস্ত আনাগোনা। ভোর-সকাল থেকেই চলে জনতার কোলাহল। মাঝে মাঝে ভিনদেশি বণিকও আসেন দুই-এক জন।

দুর্গনগরীর ভেতরে সরু রাস্তা বরাবর কিছুটা পথ হাঁটলে লক্ষ করা যাবে আর একটা দুর্গ। তারমধ্যে প্রথমে সেনানিবাস তারপর মারাঠারাজের আবাসভূমি। সমতল ভূমি থেকে উঁচু পাহাড়ের ওপর যেন আর একটা টিলা। সেখানে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। মারাঠারাজের বিশ্বস্ত অনুচর ও পরিবারের লোকজনই কেবল চলাফেরা করতে পারে। তবে বিধিনিষেধ মেনেই তাঁদেরও চলতে হয়। দুর্গের মূল ফটক পেরিয়ে ঘণ্টাফটক পর্যন্ত পৌঁছোতে হলে গলদঘর্ম হতে হয়।

...আমাকে যেতে দাও-না ভাই।

এই গলদঘর্ম হতে পারার সৌভাগ্য খুব কম লোকেরই ছিল। তবে ছিল। এক গোয়ালিনির। তার নাম হিরাকানি। নামটি অদ্ভুত। সেছিল এক সম্পন্ন চাষির স্ত্রী। সেসর্বদা গো-সেবায় নিয়োজিত থাকত। সুন্দর সুন্দর শাড়ি পরত। অলংকার বলতে তার কানে ঝুলতো হীরের ঝুমকো কানপাশা। সেপ্রত্যহ দুর্গে দুধ বেচত। মারাঠারাজের জন্যও দুধ নিয়ে যেত। এরজন্য তার খুব খাতির ছিল। দুর্গের মধ্যে সবাই তাকে হিরাকানি বলেই সম্বোধন করত। সেঅখুশি হতো না কখনই।

একদিন ভীষণ কান্ড ঘটল। প্রবল বর্ষণে, হীরাকানি দুর্গে আটকে পড়ল। যখন বারিপাত থেমে গেল, তখন রাতের আঁধার নেমেছে। ঘণ্টাফটক পেরুতে পারল না। অনেক কাকুতিমিনতি জানাল। তবুও দুর্গপ্রহরী তাকে ফটক খুলে দিল না। সেবলল: আমি তোমার অসুবিধের কথা বুঝতে পারছি। কিন্তু ছাড়তে পারছি না। নিয়ম নেই।’

হীরাকানি অনেক কান্নাকাটি করল। বলল, ‘ঘরে আমার শিশুপুত্র। মা ছাড়া বাছা আমার থাকবে কী করে? রাতে কষ্ট হবে যে! আমাকে যেতে দাও-না ভাই।’

প্রহরী বলল, ‘তুমি আমাকে ভাই বলেছ। তোমার কোনো বিপদ নেই এখানে। তবে আমি ফটক খুলে দিলে এখুনি আমার গর্দান যাবে। আমাকে ক্ষমা করো, বহিন।’

বরফ গলল না। নিষ্ফল রোদন। হীরাকানি অগত্যা চুপ করে থাকল। ক্ষোভে, দুঃখে।

রাত গভীর। দুর্গের প্রহরীরা ঘুমে অচৈতন্য। কিছু আগে এক প্রহরী হুঁশিয়ারি দিয়ে যেন প্রাত্যহিক কর্তব্য সমাধা করল।

রায়গড় দুর্গ প্রাকার,

বড়ো, বিচিত্র তার আকার।

কেউ পারবে না গলতে,

এলে আসতে পারো, মরতে।

হিরাকানি যেন অলক্ষে হাসল। মনে মনে বলল, প্রহরার কী ছিরি!

হঠাৎ তার জিদ চেপে গেল। যেমন করেই হোক, পালিয়ে যেতে হবে। সেএকবার খাড়া প্রাচীরের দিকে তাকিয়ে মনের জোর হারিয়ে ফেলল। আবার, তার মন বলল, চেষ্টার মার নেই। দ্যাখোনা চেষ্টা করেই।

রাজা তাঁকে অভয় দিয়ে বললেন: ‘ডেকে আনুন, সেই সাহসিনী রমণীকে।’

হীরাকানি দক্ষিণ দিকের প্রাচীরে একটি ফোকর দেখতে পেল। শাড়ির আঁচলে ছোটো ছোটো পাথরের টুকরো বেঁধে ফোকরে ছুড়ে দিল। তারপর ধীরে ধীরে সেই প্রাচীরের গা বেয়ে উঠল। সৈনিকরা হিরাকানির পালিয়ে যাওয়ার সংবাদ যখন জানতে পারল, তখনও ঠিক ভোর হয়নি। নানা গুঞ্জন শোনা গেল। কর্তব্যে অবহেলার দায় কে কার ওপর চাপাবে। সেই নিয়ে চাপান-উতোর শুরু হল।

মারাঠারাজের কাছে এই ভীষণ সংবাদটি পৌঁছোল। তখন ভোরের আলো ফুটফুট। স্নিগ্ধ প্রভাতকিরণে তাঁর মুখটি উজ্জ্বল। সদ্য তিনি স্নান করে দেবারতি সম্পন্ন করেছেন। প্রসন্ন সকালে সারাদিনের করণীয় কাজগুলির কথা মনে মনে ভাবছেন। এমন সময় সংবাদটি কাতরমুখে জানালেন রক্ষীপ্রধান।

সংবাদটি শুনেও তাঁর ভাবান্তর হল না। তিনি নীরব। কিছুটা-বা আনমনা। কিছুক্ষণ পর অবশ্য কথা বললেন। অথচ স্বর গাঢ়। তবে রুষ্টতার ছাপ নেই। তিনি শান্ত চোখে তাকালেন। কিন্তু রক্ষীপ্রধান এতটা আশা করেননি; মারাঠা নৃপতির নরম চাহনি। ভয়ে তাঁর চোখ ছলছল করে উঠল। রাজা তাঁকে অভয় দিয়ে বললেন: ‘ডেকে আনুন, সেই সাহসিনী রমণীকে।’

আরও বললেন: ‘এটা আমার আদেশ। যে-স্থান থেকে দুর্গপ্রাচীর ডিঙিয়ে ওই রমণী পালিয়েছিল; সেখানে তৈরি হোক সুরম্য অট্টালিকা। দুর্গপ্রধান ও অন্যান্য সৈনিকরা অবাকবিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। মারাঠারাজ ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বললেন: ‘এমন রমণীর সাহস, বুদ্ধি, বিচক্ষণতা তারিফ করতেই হয়। এই সুরম্য অট্টালিকা হিরাকানিকে উপহার দেব। নাম হোক তার ‘হিরাকানি মঞ্জিল’।

সমবেত সৈনিকরা মারাঠারাজকে ধন্য ধন্য করল। অদূরে বীরাঙ্গনার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে সেই রমণী,—হিরাকানি। দুই করপুট মেলে, অঞ্জলিবদ্ধ মুদ্রায় সেবলল, ‘জয়তু শিবাজি।’

অজগর, অক্টোবর-ডিসেম্বর, ২০০১

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%