ঈশান রাজা

রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার

ঢোল বাজছে। ঢাক বাজছে। যুবরাজ ঈশানচন্দ্র মাণিক্য আসছেন। নগরবাসী ফুলমালা স্তবক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা অনেকক্ষণ ধরেই অপেক্ষা করছে। সালংকারা রমণীরা উলুধ্বনি ও শঙ্খবাদন করছে ঘন ঘন। ত্রিপুরি উপজাতি সম্প্রদায়ের যুবক-যুবতীরা নৃত্য শুরু করেছে। হালাম, নোয়াতিয়া, মলসম, গারো উপজাতিদের জুম নৃত্য আকর্ষক। তবে কুকি সম্প্রদায়ের পনেরো জন যুবক-যুবতী তাংগডাম নৃত্য করে চলেছে দীর্ঘক্ষণ ধরে। তাদের নাচ-দৃশ্য মনোহর। সকলের চোখ টানছে।

এখন বেলা নটা। এসবের আয়োজন চলছে সূর্য ওঠা ভোর ভোরেই। প্রায় সকলেই জানে যে, যুবরাজের শোভাযাত্রা বেলা আন্দাজ এগারোটার আগে এসে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তিনি বাংলা ডেপুটি গভর্নরের প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা করতে গেছেন। তারিখটি ১৮৫০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। নতুন নিয়মে ইংরেজ সরকারকে স্বর্ণমুদ্রা ‘নজর’ দিতে হচ্ছে। সরকার কর্তৃক ‘খেলাত’ প্রাপ্ত হলেই তবে তিনি সিংহাসনে আরোহণ করতে পারবেন। রাজা হিসাবে মান্যতা পাবেন। কিন্তু গোল বঁাধল ভয়ানক। ইংরেজ সরকার একশো পঁচিশটি স্বর্ণমুদ্রা চেয়ে বসেছেন। অথচ যুবরাজ প্রস্তুত নন। এমন আন্দাজও ছিল না। যুবরাজ ভেবেছেন, তাঁর পিতাকে ‘নজর’ দিতে হয়েছে সামান্যই, তাঁর বেলায়ও নিশ্চয়ই বেশি হবে না। কথায় বলে না, লোভ বিষমবস্তু। সেই লোভের বশবর্তী হয়ে ইংরেজ প্রতিনিধি একশো পঁচিশটি স্বর্ণমুদ্রা চেয়ে বসলেন এবং বলে দিলেন, বিলম্ব হলেও চলবে না।

যুবরাজ কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ঘর্মাক্ত হচ্ছেন। প্রচন্ড শীতের দিনেও। শরীর থেকে বস্ত্র-আচ্ছাদন কিছুটা আলগা করলেন। তাঁর অনুচরদের মধ্যে সবথেকে কাছের মানুষের নাম বিনয় বর্মন। তিনি ব্যাপারটা আঁচ করলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ স্থানত্যাগ করে যুবরাজের বাল্যবন্ধু ব্রজমোহন ঠাকুরের কাছে হাজির হলেন দ্রুত। সবিস্তারে তাঁকে জানালেন। এখানে ব্রজমোহন ঠাকুরের একটু পরিচয় আবশ্যক।

বাল্যকালে ঈশানচন্দ্র মাণিক্যকে চাকলা রোশনাবাদে থাকতে হয়েছে। মাতুলালয়ে। তারও কারণ ছিল। ঈশানচন্দ্রের পিতা রাজা কৃষ্ণকিশোর মাণিক্যকে রাজজ্যোতিষী নিষেধবাক্য শুনিয়েছেন। তিনি ঈশানচন্দ্রের কোষ্ঠী বিচার করে বলেছিলেন: ‘অবিলম্বে পুত্রকে স্থানান্তরে পাঠিয়ে দিন। অন্তত বারো বৎসর কাল পর্যন্ত পিতা-মাতার সান্নিধ্যে থাকা চলবে না। এরূপ হলে পুত্রের ঘোর বিপদ।’

রাজগুরুর কথা শুনে রাজা তো ভয়ে অস্থির। তিনি পুত্রকে চাকলা রোশনাবাদে পাঠিয়ে দিলেন। মাতুলালয়ে প্রতিপালিত হতে লাগলেন। মহারানি সুদক্ষিণা কিছুতেই এই দুঃখজনক সিদ্ধান্ত সহ্য করতে পারলেন না। এ নিয়ে রাজার সঙ্গে মতান্তর হতে থাকে। পুত্রের অদর্শন তাঁকে পাগলিনি করে তুলল। একদিন সে-দুঃখ সহ্য করতে না পেরে রোগযন্ত্রণায় কাতর রানি মরণকূপে ঝাঁপ দিলেন। মৃত্যুর আগে আঁকাবঁাকা হস্তাক্ষরে মৃত্তিকার ওপর লিখে গেলেন: ‘পাষাণ হৃদয়’। রাজা মনের দুঃখ মনেই রাখলেন। সেই কূপ বঁাধিয়ে দিলেন। একটি ফলক উৎকীর্ণ করালেন। তাতে খোদিত হল বেদনার্ত অশ্রুমালা।

‘সতীর দেহত্যাগ’

‘পাষাণ হৃদয়

সত্য কথা—

কেউ বুঝল না,

আমার ব্যথা।’

চাকলা রোশনাবাদে অবস্থানের সময় ঈশানচন্দ্রের সঙ্গে ব্রজমোহন ঠাকুরের বন্ধুত্ব হল। খুব বন্ধুত্ব। যাকে বলে গলায় গলায় ভাব। অবশ্য সেই বন্ধুত্বের জের ঈশানচন্দ্রের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অটুট ছিল। তো ইংরেজ প্রতিনিধি যুবরাজকে ‘নজর’দানের নামে বেকায়দায় ফেলেছেন। তাই সংবাদটি বিজয়বর্মন পৌঁছে দিলেন ব্রজমোহন ঠাকুরকে।

ব্রজমোহনরা সাতপুরুষের জমিদার। ত্রিপুরা রাজপরিবারের অনুগৃহীত। তার ওপর ঈশানচন্দ্র তাঁর বাল্যসখা। কোনোভাবে, তিনি অপদস্থ হবেন; এটা তাঁর প্রাণে বাজল। তিনি দ্রুত চলে এলেন রত্নপেটিকা সঙ্গে নিয়ে। বললেন, ‘মিত্র, এই রত্নপেটিকায় একশ এগারোটি স্বর্ণমুদ্রা আছে। আর, আমার গলায় যে রত্নহার আছে, সেটির মূল্যমান নিশ্চয়ই এরা বুঝতে পারবেন।

ইংরেজ প্রতিনিধি অবশ্য বললেন; —‘নো, রটনোহার ডরকার না আছে। ডুবরাজের জন্য একশো এগারোটি সরনো মুডরা লওয়া হজছে।’

শব্দ ক’টি বলার সঙ্গে সঙ্গে বিউগল বেজে উঠল। এক ইংরেজ কর্মচারী রুপোর একটি রেকাবি নিয়ে এলেন। সেটি লাল রঙের সিল্ক কাপড় দিয়ে ঢাকা। কাপড়টি সরিয়ে গভর্নরের প্রতিনিধি জন ব্রাইট লাটসাহেবের মোহর অঙ্কিত সনদ ও খেলাত প্রদান করলেন। একটি স্বর্ণবর্ণ খাপযুক্ত ছোট কৃপাণও দেওয়া হল। এরপর করমর্দন ও উষ্ণ অভিনন্দনের পালা। সেই মুহূর্ত থেকে ঈশানচন্দ্র মাণিক্য রাজা হিসেবে ঘোষিত হলেন। রাজাকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হল।

এই বার্তা রটে গেছে, ইতিপূর্বেই। নগরীর প্রান্তে প্রান্তে মানুষের ঢল নেমেছে। রাজা আসছেন হাতির পিঠে। নতুন রাজা এসে কী ঘোষণা করেন তা শোনার জন্য আমজনতার কৌতূহলের অন্ত নেই। নগরীর পূর্বপ্রান্তে রাজার আগমনবার্তা রটে যেতেই তিলধারণের স্থান নেই। গজগমন তো দূরের কথা। রাজা হাতির পিঠ থেকে নেমে পড়লেন। অনুচরবৃন্দ নতুন রাজাকে অনুনয়-বিনয় করল: হাতির পিঠেই চলুন রাজা-হুজুর। না হলে কষ্ট হবে যে! রাজা বললেন,—‘এই ধূলিধূসর মাটিতে আমার জন্ম। এ রাজ্য আমার স্বপ্নভূমি। হৃদয়খানি। একটু আমায় হাঁটতে দাও। আমার প্রিয় নগরবাসীর অভিনন্দনে আমি ভরে উঠছি। আপ্লুত।’

শীতের রোদ, মিঠে আমেজ। রাজা গর্বিত। সদা হাস্যময়। ঈশ্বরের লীলাখেলা যেন টের পাচ্ছেন। কিছু আগেই ইংরেজের সঙ্গে মালিন্য হয়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছিল। দেশীয় রাজা ইংরেজদের দেবে নজরানা। কীসের নিয়ম, কার নিয়ম। কেনই-বা এমন অনিয়ম। দাবি। সময়ের কী নিষ্ঠুর পরিহাস! মনটা তাঁর বিদ্রোহী হয়ে উঠতে চাইছে। কিন্তু আজ শুভদিনে, মনকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছেন। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানান। ধন্যবাদ জানান ব্রজমোহনকে। ব্রজমোহন লজ্জায় আরক্তিম—‘কেন, রাজা লজ্জা দিচ্ছেন! মিত্রতার কী কোনও দাম নেই?’ রাজা বললেন, ‘আছে বন্ধু, দাম আছে। আছেই। কিন্তু অবাক হচ্ছি, তুমি ‘রাজা রাজা’ বলতে শুরু করেছ, আপনি-আজ্ঞে করছ বলেই না!’

ব্রজমোহন হাসলেন। প্রাণখোলা হাসি। ওহ এই কথা! আসলে কী জান! সম্মান, মর্যাদা একান্ত আপনজনদের কাছ থেকে প্রথমে এলেই তবে-না বাইরের আমজনতার কাছ থেকে আসবে। বুঝলে, ঈশান রাজা?’

ব্রজমোহনের মুখে এমন তত্ত্বকথা শুনে রাজা অভিভূত। রাজা তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন পথের মধ্যে। আবেগে। এই আলিঙ্গনাবদ্ধ দুই মান্যমান পুরুষের ওপর বর্ষিত হল পুষ্পবৃষ্টি। আবেগ, সম্মান-শ্রদ্ধায় ধ্বনি উঠল: জয় ঈশান রাজার জয়। ব্রজমোহন ঠাকুর নিজের দেওয়া রাজার এই নতুন নামায়ন শোনার জন্য বার বার ধ্বনি দিলেন। সেটি শতগুণে, উচ্চরবে সমগ্র আগরতলায় প্লাবিত হল। রাজবন্দনার আতিশয্যে।

আবেগ, সম্মান-শ্রদ্ধায় ধ্বনি উঠল: জয় ঈশান রাজার জয়।

প্রাজ্ঞজনেরা একটা কথা বলেন—রাজমুকুট তো নয়, কাঁটার মুকুট। সেই বিষমবস্তুটি রাজা টের পেলেন। হাড়ে হাড়ে। অমিতব্যয়ী পিতার ঋণ পুত্রের ওপর বর্তাল। পরিমাণও বিপুল। এগারো লক্ষ টাকা। রাজা বললেন—‘উপায় বলুন।’

পাত্রমিত্রদের মধ্য নবনিযুক্ত দেওয়ান বলরাম হাজারি বড়ো মুখ করে বললেন,—‘সময় দিন রাজা সাহেব। অচিরে ঋণ পরিশোধ করব।’ বলরাম হাজারি মানুষটি ধূর্ত। চোখে-মুখে কথা বলেন। তাঁর নজর রাজার ভান্ডার। কতখানি হাতিয়ে নেওয়া যায়, সে-চেষ্টায় তৎপর। স্বজনপোষক। ষড়যন্ত্রের জাল বুনছেন। পার্বত্য কুকি নেতাদের উস্কানি দিচ্ছেন। শুধু কি তাই। ত্রিপুরা উপজাতি সম্প্রদায়ের দুই দস্যুপ্রকৃতির লোক কীর্তি ও পরীক্ষিৎ-এর সঙ্গে তাঁর শলা চলছিল। কীর্তি ও পরীক্ষিতের কাছে রাজা শত্রু। সেএক ঘটনা।

ঈশ্বরচন্দ্র তখন তরতাজা যুবক, যুবরাজ। নোয়াখালির ছাগলনাইয়া অঞ্চলে পরিদর্শনে গেছেন। খাজনা আদায়ের তদারকিতে। সেদিন ছিল পূর্ণিমার রাত। হঠাৎ কাছারি বাড়ির সন্নিকটে খুব চিৎকার শুনলেন। তিনি কিছু একটা আশঙ্কা করে তারবারি নিয়ে বেরিয়ে এলেন। দেখলেন, দুই তস্কর ছুটে পালাচ্ছে। তাদের হাতে দুটো থলি। ঈশানচন্দ্র তাদের পিছু ধাওয়া করলেন। এবং তরবারির আঘাতে ঘায়েল করলেন। ওই দুই তস্করের নাম কীর্তি ও পরীক্ষিৎ। রাজবিচারে তাদের কারাভোগ হল খুব। কীর্তি ও পরীক্ষিতের কাছে রাজা তাই শত্রু।

ঈশানচন্দ্রের পিতা কৃষ্ণকিশোর মাণিক্যের সপ্তদশ রাজ্যাভিষেকের উৎসব উপলক্ষ্যে তাদের মেয়াদি দন্ড মকুব হল। দু-বৎসর দন্ড তখনও বাকি ছিল। এরপর তাদের সংবাদ ছিল না। গা-ঢাকা দিয়েছিল, বোধ হয়। তবে শকুনের দৃষ্টি যেমন ভাগাড়, তেমনি দুষ্ট মানুষ দুষ্টের সঙ্গে মিলবে। এটা আর বেশি কথা কী! তো তারা দুজনায় বলরাম হাজারি ও তার ভাই শ্রীদামের সঙ্গে মিলিত হল। রাজা ঈশানচন্দ্র মাণিক্যকে হত্যার ছক তৈরি করল। এই খবর জানাজানি হয়ে গেল। আশ্চর্যজনকভাবে।

রাজা ঈশানচন্দ্র ভাই উপেন্দ্রচন্দ্রকে যুবরাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন। তিনি এই খবর প্রথম জেনেছিলেন এক কুকি রমণী পুঁই মায়ের কাছ থেকে। পুঁই মা রাজবাড়ির দাসী ছিলেন। রাজা কৃষ্ণমাণিক্যের রানি অসম রাজ্যের রাজকন্যা রত্নমালার দাসী হলেও মহারানি সুদক্ষিণার পুত্রদের কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছেন। রাজপুত্ররা সবাই তাকে পুঁই মা বলে ডাকতেন। পুঁই মা যে কুটিরে বাস করতেন তার পাশেই সর্দার খাঁ নামে এক বদমানুষ থাকত। তার সঙ্গে দেওয়ান বলরাম হাজারির যোগ ছিল ঘনিষ্ঠ।

একদিন রাতে বলরাম, শ্রীদাম, কীর্তি ও পরীক্ষিৎ সর্দার খাঁয়ের গৃহে মিলিত হল। গভীর ষড়যন্ত্র। এই দুষ্ট পঞ্চক-তঞ্চকের আসরে স্থির হয় কীর্তি বলরামের সহায়তা নিয়ে রাজা ঈশানচন্দ্রকে হত্যা করবে। কথায় বলে দেওয়ালেরও কান আছে। সেই দেওয়ালের পাশে পুঁই মা কান খাড়া রেখেছিলেন। সংগোপনে। পুঁইমা বিষয়টি টের পেয়েই পরদিনই যুবরাজ উপেন্দ্রচন্দ্রকে সব বৃত্তান্ত জানালেন। উপেন্দ্রচন্দ্র কালবিলম্ব করেননি। কীর্তিকে অতর্কিতে আক্রমণ ও হত্যা করলেন। এই আকস্মিক ঘটনায় সব ফাঁস হল। দেওয়ান বলরাম-সহ সবাই বন্দি হল।

রাজার দেওয়ান পদটি শূন্য। রাজা অনুরোধ করলেন ব্রজমোহনকে দেওয়ানি পদ নেওয়ার জন্য। তিনি কিছুতেই রাজি নন। তিনি বললেন; ‘বেশ তো আছি ঈশান রাজা। এই গুরুদায়িত্ব পালন আমার কম্ম নয়। তার চেয়ে অন্য কাউকে দাও। যদি বল, আমি একজনের নাম প্রস্তাব করতে পারি।’

রাজা জানতে চাইলেন, ‘তিনি কে?

ব্রজমোহন বললেন, ‘শুনেছি, কলকাতানিবাসী ইংরেজিশিক্ষিত, হিসাবশাস্ত্রে দক্ষ দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের কথা। তাঁকে রাজি করাতে পারলে খুব ভালো হয়। এ রাজ্যের আর্থিক সমস্যার পথ বের করতে পারবেন।’

রাজা বললেন;—‘সেনাহয় হল। তবে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করো। দূত ও খত পাঠাও সেতো অনেক দিনের ব্যাপার। যতদিন না তিনি দায়িত্বভার গ্রহণ করছেন, ততদিন অন্তত দেওয়ানগিরি করো।’ অগত্যা ব্রজমোহন ঠাকুরকে দায়িত্বভার নিতে হল। সাময়িক।

দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় রাজার আমন্ত্রণ সাদরে গ্রহণ করলেন।

কিন্তু রাজগুরু বিপিন গোস্বামী বেঁকে বসলেন। বললেন: ‘বঙ্গীয়বাবুর আগমন ত্রিপুরবাসী কিছুতেই মেনে নেবেন না। নিজেদের সমস্যা নিজেদেরই মেটাতে হবে। বাইরের লোকের নাক গলানো চলবে না।’

এরপর রাজগুরু দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের নিযুক্তিপত্র টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেললেন। রাজগুরুর ক্রোধ দেখে রাজা ঈশানচন্দ্র ভীতসন্ত্রস্ত হলেন খুব। শেষে উপায় না দেখে তাঁকে শান্ত করার জন্য রাজা বললেন;—‘প্রভু আপনি যা ভালো বুঝবেন তা-ই করুন। আপনার চরণে শাসনভার অর্পণ করলাম।’ রাজগুরু শান্ত হয়ে রাজাকে আশ্বস্ত করলেন।’ তুমি নিশ্চিন্তে থাকো। রাজ্যের শাসনভার আমার স্কন্ধে তুলে নিলাম।’

রাজগুরু মানুষটি বিষয় ভাবনায় পটু। অসাধারণ স্মৃতিধর। ক্ষুরধার বুদ্ধি। দৃঢ় সংকল্পের মানুষ। বিবেকবর্জিত, ক্রোধী। এবং কূট। রাজনীতি ও কূটনীতিতে তিনি আর এক চাণক্য।

তিনি প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিলেন রাজ্যের নিষ্কর জমির বাজেয়াপ্তকরণের। চাকলা রোশনাবাদের নতুন বিলিব্যবস্থা করলেন। খাজনার নতুন হার নির্ধারণ করলেন। এমনকী, রাজপরিবারে ব্যয় সংকোচন করলেন। সৈন্যদলের নিযুক্তিকরণ করলেন চুক্তির ভিত্তিতে। এসব ব্যবস্থাদি নিয়ে রাজগুরু অসাধ্যসাধন করলেন। দু-বছরের মধ্যে।

রাজগুরু একদিন রাজাকে ডেকে বললেন: ‘ঈশানচন্দ্র, তোমার এখন আর কোনো ঋণ নেই। রাজকোষ পরিপূর্ণ। তুমি হয়তো মনে মনে অসন্তুষ্ট। রাজপরিবারে ব্যয় সংকোচন করিয়েছি বলে।’

রাজা খুব নম্র, বিনয় বচনে বললেন: ‘না গুরুদেব। আপনার কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমার কিছু বলার নেই। শুধু আপনাকে একটি সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করি।’

রাজগুরুর চোখ অপলক। কিছুটা বিক্ষিপ্ত। মুখের প্রসন্নভাবটা মিলিয়ে গেছে। তিনি বজ্রকন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন; —সেটা, কী?’

রাজা বললেন: ‘বংশ পরম্পরায় যাঁরা নিষ্কর জমি ভোগ করছেন তাঁদের সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত না করলেই ভালো হয়। বিশেষ করে চন্তাই পুরোহিতদের।’

রাজগুরু এই মুহূর্তে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন। রাজা আর কথা বাড়ালেন না। কিন্তু রাজগুরু টের পেলেন একটা ঝড় উঠছে।

বাস্তবিকই ঝড় উঠল। রাজগুরুর হাতে ক্ষমতা ন্যস্ত হতেই রাজ্যে নানান অশান্তি শুরু হল। প্রজারা বিক্ষুব্ধ। তারা ক্রমবর্ধিত রাজকর দিতে পারছে না। গুরুর প্রহরীরা আতঙ্কের সৃষ্টি করছে। কে কখন কয়েদ হবে, কী অপরাধে কার শাস্তি হবে, কেউ জানে না! কখন কী রাজার নামে আদেশ প্রচারিত হবে, নাগরিক-সুখস্বাচ্ছন্দ্য হরণ হবে — সেই ভয়ে, আশঙ্কায় প্রজাদের দিন অতিবাহিত হয়। দিনানুদৈনিক দুঃখযাপনের একটি বিহিত চায় প্রজারা। প্রজারা ক্ষোভে রোষে ফেটে পড়ল।

রাজকর্মচারীরা কাজ বন্ধ করে দিলেন। তাদের সঙ্গে যোগ দিল প্রজারা। সকলে সম্মিলিতভাবে রাজগুরুর অট্টালিকার সামনে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠল। কারণটি ভয়ানক। রাজার সিলমোহরযুক্ত আদেশনামায় ঘোষিত হয়েছে ত্রিপুরবাসীকে চতুর্দশ দেবতার মন্দিরে পুজো দিতে হলে দেবকর দিতে হবে। এই আদেশ তাদের কাছে অসহ্য ঠেকছে। অসহ্য লেগেছে চন্তাই পুরোহিতদের ভূমিকর দেওয়া নিয়েও। সবাই বলে উঠল: রাজগুরুর অন্যায় সিদ্ধান্ত আমরা মানব না। আমরা রাজার মুখে শুনতে চাই তাঁর আদেশ। রাজার কাছে এর বিহিত চাই।

এই মিলিত প্রতিবাদের কথা রাজার কানেও পৌঁছোল। রাজা দ্রুত চলে এলেন নাগরিক দরবারে। উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। রাজা এসে প্রজাদের সুমুখে দাঁড়ালেন। যুক্ত করে। রাজার এই বিনয়াবনত মূর্তি দেখে ঈশান নাগরিক শান্ত হল।

রাজা রাজগুরুকে ডেকে পাঠালেন। তিনি এলেন। এসে দেখলেন, রাজার রুদ্রমূর্তি। চোখে ভক্তির মাত্রা তিরোহিত। রাজ্যশাসনের নামে তিনি বাড়াবাড়ি করেই ফেলেছেন। হয়তো-বা কিছুটা বুঝলেন। কিন্তু রোষে ফুঁসলেন। তিনি সর্বদা একটা দন্ড হাতে রাখতেন। প্রজারা আড়ালে বলত, রাজদন্ড। কেউ বলত, গুরুদন্ড। আবার কেউ বলত, লোভদন্ড। কেউ বা বলত, জাদুদন্ড। কারণ, ছোটো লাঠি দন্ডটি উঁচিয়ে ধরলেই ঘোষিত হয় রাজাদেশ, ইচ্ছাপূরণ।

যাই হোক তিনি রাজার মুখের ওপর কোনো কথা বললেন না। হাতের দণ্ডটি ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। স্থানত্যাগ করলেন। প্রজারা ধ্বনি দিল—রাজা আপন হাতে রাজ্যশাসন করুন। দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন।

রাজা লক্ষ করলেন। অদূরে দাঁড়িয়ে আছেন ব্রজমোহন ঠাকুর। তিনি স্মিত হাস্যে বললেন, ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন তো রাজারই কর্তব্য।’

রাজা টিপ্পনী কাটলেন, ‘তাহলে এসবের তুমিই পান্ডা?’

ব্রজমোহন ঠাকুর গভীর করে হাসলেন—‘মূলে পান্ডা আমাদের রাজা। প্রিয় রাজা। ঈশান রাজা।’

রঙবেরঙ, শারদসংখ্যা, ১৪১০

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%