রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার
এক ভালো রাজার গল্প শোনাই। গল্প নয়, সত্যিকথা। কথা ও কাহিনিতে ছড়িয়ে আছে। গল্পের মতোই স্বাদু। রাজার নাম গোপালসিংহদেব। বিষ্ণুপুরের রাজা। মল্ল রাজবংশের —রাজা। ভারি ভালোমানুষ। ধার্মিক, সৎ, উদার, হৃদয়বান। এবার গল্পটা শুরু করি। বোঝা যাবে, মানুষটা কেমন। কতটা ভালো।
কোতুলপুর থানার একটি গ্রাম। নাম অনন্তপুর। সে-গ্রামে বাস করত এক বুড়ি। সবাই ডাকত ঠানদি। ভীষণ অভাবী। বাড়িঘরদোর দেখলে তা বুঝবার অবশ্য জো নেই। একসময় অবস্থা বেশ ভালোই ছিল। কিন্তু স্বামী-পুত্র অকালে কলেরায় মারা গেল। অসৎ লোকেরা তার সব কিছু লুটেপুটে নিল। সেনি:স্ব হয়ে গেল। ভিক্ষে করে খেত। একসময় ভিক্ষে করারও ক্ষমতা রইল না। তখন কেউ দয়া করে কিছু খাবার দিলে খেত। না পেলে উপবাসে দিনটা কাটাত। একদিন সেচিৎকার করে বলল: ‘তোমরা শোনো গো বাছাধনেরা, আমি মরে গেলে শ্রীপতিরায়ের ব্যাটা নারান এই বাড়ি পাবে। নারানকে এই বাড়ি দান করলাম। তোমরা সাক্ষী রইলে কিন্তু।’ গ্রামের পাঁচজনা শুনল। ঠোঁটকাটা লোকের তো অভাব নেই। কেউ একজন বলল, ‘কেন ঠানদি, আমরা কী দোষ করলাম?’ বুড়ি তখন গাল পাড়ত, ‘মুখপোড়া, নারান রোজ খবর নেয়। তোরা তো কেউ আসিস না। খবর নিস না! খাবারের কথাও জিজ্ঞেস করিস না। মর মর।’
এরপর বুড়ি বঁাচল না বেশিদিন। নারান সে-বাড়ির দখল নিল। ঘরের মধ্যে পেল একটি কাঠের সিন্দুক, তাতে ছিল সত্তরটি টাকা। নারান সেই টাকা দিয়ে বুড়ির শ্রাদ্ধশান্তি করাল। এর কিছুদিন পর নারান বাড়িটা মেরামতি করাতে গিয়ে মাটির নীচে পেল টাকার কলসি। নারান ভাবল, ঠানদি বাড়িটা দান করেছে। এই টাকা তো দান করেনি। এটা তার প্রাপ্য হতে পারে না। এই সম্পত্তি রাজার হওয়া উচিত। রাজাকেই দিতে হবে। এমন ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে কলসি থেকে আওয়াজ শোনা গেল:
রাজা বড়ো ভালো
কথা বলে দ্যাখ
মনে পাবি আলো।
পরদিন নারান টাকার কলসি নিয়ে রাজদরবারে পৌঁছুল। দুপুর দুপুর।
রাজা সব বৃত্তান্ত শুনলেন। তারপর বললেন, ‘তবে দাও।’ পরক্ষণেই রাজা কলসিটি ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এবার নাও। এ অর্থ তোমায় দান করলাম।’

পরদিন নারান টাকার কলসি নিয়ে রাজদরবারে পৌঁছুল। দুপুর দুপুর।
নারান খুব খুশি হল। সেরাজাকে ভূমি প্রণাম করল। তারপর ফিরে চলল গ্রামের দিকে। কাঁধে তার কলসি। কলসি বলে উঠল। কী বলেছিলাম?
সৎ রাজা, ধন্য দেশ—
এখন কলসি তোর।
কেউ ছোঁবে না,
কোনো দস্যু তস্কর।
এবার কলসির কথা থাক। পরে হবে। গল্পের অন্য সূত্র ধরি। এক দুই তিন।
মল্লরাজ গোপাল সিংহের ধর্মকর্মে খুব মতি। সকাল-সন্ধেতে হরিনাম জপ করেন। মুখে সদা হরিনাম। হরিনামে রাজকার্য, চালনা। একদিন তাঁর মনে হল হরিনামই সার। সারা রাজ্যে সকলে যদি হরিনাম করে, তবে রাজ্যের মঙ্গল হবে—হবেই হবে। রাজা মন্ত্রীকে ডেকে বললেন, রাজ্যে সর্বদা ঈশ্বর নাম হওয়া উচিত। মানুষ সুখে থাকবে। আনন্দে থাকবে। কেবল আমি আপনি ঈশ্বর নাম করলে তো হবে না। সকলকে করতে হবে। তাই রাজ-আদেশ জারি করুন। ঢোল বাজিয়ে গ্রাম-জনপদে প্রচার করানোর ব্যবস্থা করুন। প্রচার হবে, এইভাবে— মল্লরাজার রাজ্যে, আঠারো বছর উত্তীর্ণ নারী-পুরুষ সকলকে, সকাল-সন্ধ্যায় অন্তত এক বার হরিনাম জপ করতে হবে। নতুবা শাস্তি—কঠিন শাস্তি।’
এরপর রাজা মন্ত্রীমশায়ের দিকে নরম করে তাকালেন। তারপর বললেন: ‘দেখুন, ইচ্ছেয় হোক, আর অনিচ্ছেয় হোক হরিনাম জপ করলে মনে শান্তি; প্রাণে আরাম মিলবে।’

তাঁতির এই চিৎকার রাজার গুপ্তচর ঘরের পেছনে দাঁড়িয়ে শুনল।
মন্ত্রীমশায় নিজে ধর্মভীরু কিন্তু রাজার কথা ঠিক মনেপ্রাণে মানতে পারলেন না। তবে রাজার কথা বলে কথা! রাজ আদেশ মানতেই হয়। তিনি বললেন, ‘যথা আজ্ঞা মহারাজ!’
হরিনাম আদেশ প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মল্লরাজ্যে শোরগোল শুরু হল। বিরূপ প্রতিক্রিয়া। খুব অল্পদিনের মধ্যে রাজ আদেশ ‘গোপালের বেগার’ নামে রঙ্গব্যঙ্গ শুরু হল। এই কথা অবশ্য রাজার কানেও উঠল। রাজা আরও কড়া হলেন। রাজ্যের চারদিকেই গুপ্তচর পাঠালেন। তাদের প্রত্যহ কাজ হল, ঘর ঘর খোঁজ নিয়ে জানতে হবে। সেখানে হরিনাম চলছে কি না। কেউ যদি হরিনাম না করে, রাজসভায় তার ডাক পড়ত ঠিক পরের দিন। এমন কাহিনি অনেক। দুই একটি শোনাই।
ধর্মপুরে বাস করত এক তাঁতি। নাম ছিল তার সন্তোষ। দিনরাত পরিশ্রম করেও দু-মুঠো ভাতের ব্যবস্থা করতে পারত না। পরের তাঁতেই সেকাজ করত। একদিন ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরে এল। স্ত্রীকে সেবলল, ‘দুটি খেতে দাও। সারাদিন কিছু খাইনি।’ তাঁতির স্ত্রী বলল, ‘এখুনি দিচ্ছি। তার আগে হরিনাম সেরে নাও।’
তাঁতি রাগে চিৎকার করে উঠল—‘রোজ রোজ’ ‘‘গোপালের বেগার’’ খাটতে ভালো লাগে না। ছেড়ে দাও। আমি এখন খাব।’
তাঁতির এই চিৎকার রাজার গুপ্তচর ঘরের পেছনে দাঁড়িয়ে শুনল। সেবাড়িটা চিনে রাখল।
পরদিনই রাজসভায় তাঁতির ডাক পড়ল।
মল্লরাজ গোপাল সিংহ জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি গতকাল সন্ধ্যায় হরিনাম করনি কেন? গোপালের বেগার বলেছ কেন? সত্যি কথা বলো।’
সন্তোষ তাঁতি বলল, ‘মহারাজ, আমি খুব গরিব। পরের তাঁতে কাজ করেও সংসার চালাতে পারছি না। গতকাল আমার মাথার ঠিক ছিল না। তাই বলেছি, বেগার অর্থাৎ বিনা পারিশ্রমিকে খাটতে পারব না। আপনি আমায় মার্জনা করুন। এমন অন্যায় আর হবে না।’
রাজা সব শুনে বললেন, ‘হুম।’
তারপর বললেন, ‘তোমার অভাব দূর হবে শীঘ্রই। তোমাকে পঁচিশ বিঘা নিষ্কর জমি দেওয়া হবে। আর নিজের ঘরে তাঁত বসাও।’ রাজা ধনাধ্যক্ষকে (খাজাঞ্চি) ডেকে তাঁতিকে নগদ টাকা যা লাগে দিতে বললেন।
সন্তোষ তাঁতি আহ্লাদে আটখানা। সেহরিনাম করতে করতে বাড়ি ফিরল।
বাড়ি এসে সেদেখল ঘরের দোরে রাজকর্মচারী ‘মহাদানী’ মর্যাদাভুক্ত গৌর হাজরা জমির পাট্টা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি ‘পাট্টা’ দিয়েই ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন রাজপথে।
মল্লভূমের এই গ্রামটির নাম ওন্দা। অজু কামার সারাদিন আগুনের পাশে বসে হাপর টানে। কামারশালার কাজ ভারি। পয়সা কম। তবুও তাকে সেটাই করতে হয়। কারণ, সেকাজ বাবার কাছে শিখেছে। তো একদিন সন্ধ্যায় সেবাড়ি ফিরে এসে শুয়ে পড়ল।
স্ত্রী তাকে বলল, ‘তুমি গোপালের বেগার খাটলে না, শুয়ে পড়লে যে!’
অজু কামার বলল,—‘দুর পাগলি। একমন আর আধ সের না হলে কি আর হরিনাম হয়?
অজু কামারের ঘরে পাশে দাঁড়িয়ে ছিল রাজার চর। কথা ক-টি শুনতে পেল। চর সে-বাড়িটি চিনে রাখল। পরদিন রাজসভায় তার ডাক পড়ল।
রাজা অজু কামারকে শুধোলেন, ‘তুমি কাল হরিনাম করনি কেন?’ অজু কামার কাঁপতে লাগল। সেহাতজোড় করে সবিনয়ে বলল, ‘প্রভু আমার কষ্টে দিন কাটে। কামারশালার আগুনে তেতে পুড়ে থাকি। কী বলতে কী বলে ফেলেছি। ক্ষমা করে দিন প্রভু।’
রাজা আবার শুধোলেন ‘হরিনামে আবার এক মন আধসের কী?’
অজু কামার বলল, ‘বেগার’ অর্থ বিনে পয়সায় হরিনাম করা। আর ‘একমন’ অর্থ একাগ্র মনে, ‘আধ সের’ অর্থাৎ সকাল সন্ধ্যা দু-বেলায় এক পোয়া করে আধ সের চালের ব্যবস্থা না হলে তো খাবার জোটে না। পেটে খিদে থাকলে আর কি হরিনাম হয়? তাই এমন উক্তি করেছিলাম মহারাজ।’ রাজা অজু কামারের মুখে সত্যিকথা শুনে সন্তুষ্ট হলেন। তিনি অজু কামারকে নিষ্কর জমি দিয়ে তার পরিবারের দুঃখ দূর করলেন।
বাহাদুরগঞ্জে বাস করে গোবিন্দ সূত্রধর। বাহারি কাজের জন্য তার সুনাম খুব। শারীরিক অসুস্থতার কারণে এখন ঘরবন্দি সে। কাজে বেরুতে পারছে না। দিন আনে দিন খায়। কাজ না হলে উপোস দেয়। তার একটা অভ্যেস ছিল। প্রত্যহ সন্ধ্যায় হরিনাম করবেই। পুরো পরিবারটিকে নিয়ে হরিনাম জপ-ই তার নিত্যদিনের রুটিন। কিন্তু আজ কদিন ধরে সেসব একদম বন্ধ।
তো রাজ অনুচর গোবিন্দ সূত্রধরের ঘরে ঢুকে বলল, ‘কী হল গোবিন্দ, তুমি হরিনাম করছ না কেন?’
গোবিন্দ বলল, ‘আর ভাল্লাগে না গোপালের বেগার খাটতে রোজ রোজ।’
রাজ অনুচর গিয়ে রাজার কাছে নালিশ জানাল।
রাজামশায় হুঙ্কার ছেড়ে বললেন, ‘ধরে নিয়ে এসো গোবিন্দকে।’
কথামতোই কাজ। কাজ অবশ্য একটু বেশিই হল। ধরে আনতে বলেছেন তো গোবিন্দকে বেঁধে আনা হল।
পরের দিন রাজসভায় গোবিন্দকে হাজির করানো হল।
রাজামশায় রেগেমেগে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হরিনাম করতেই সব কষ্ট?’
গোবিন্দ করুণ কন্ঠে বলল, ‘আমি ছুতোর কাজ করি। বর্ষাকালে কাজ কম। তা ছাড়া আমি অসুস্থ। আজ তিন দিন পরিবারের চার জন লোক অনাহারে আছি। অন্নচিন্তা ছাড়া মনে আর কিছু আসে না প্রভু।’
‘প্রভু’ উচ্চারণ করায় রাজার মন গলে গেল। খুশি হলেন। বললেন, ‘তোমার সমস্যা দূর হবে গোবিন্দ। আজ থেকে রাজমহলে ছুতোর কাজ করবে। তোমাকে অন্যত্র যেতে হবে না। কিন্তু প্রত্যহ হরিনাম করতে হবে-হবেই।’
গোবিন্দ আনন্দে আপ্লুত। দন্ডি কাটার মতো করেই রাজার পায়ের কাছে উপুড় হয়ে গড় প্রণাম জানাল।
নারানের এখন অনেক সমস্যা। টাকার কলসি যখন-তখন নড়ে ওঠে। কথা বলে। ঘরের এক কোণে যত্ন করে তুলে রাখা হয়েছে। সেকেবলই বলে,—
খরচ কর, খরচ কর
টান পড়লে কলসি ধর।
অভাব হবে না কলসি দেবে টাকা।
হবে না কখনো হবে না ফাঁকা।
ভক্তিচিত্তে তপ
নাম হরিনাম জপ
গোপালে রাখ মন
মনে রেখ নারায়ণ।
নারান অবশ্য ঠিক করল ভালো ভালো কাজে টাকা খরচ করবে। মানুষের উপকার হবে তাতে। তবে সেমনে মনে বলল, গোপালের বেগার সম্পর্কে অনেক শুনেছে। এবার সেনিজেও পরখ করে দেখবে। প্রতিজ্ঞা করল। গোপালের বেগার খাটার।
শারদীয় আলপথ, ১৪১৩
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন