দুই রানির গল্প

রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার

তিন ঘোড়সওয়ার সূর্যতাপ মাথায় করে চলেছেন। খুব ভোর সকালে তাঁরা পুরী থেকে বের হয়েছেন। দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে তাঁরা ক্লান্ত। হয়তো-বা একটু বিশ্রাম প্রয়োজন। তিন জনের মধ্যে একজন মাঝবয়েসি। অপর দুজন সদ্যযুবক। কুড়ি-একুশের মধ্যে।

বিস্তীর্ণ জঙ্গল। বনপথ রেখা সরু। ক্ষীণ নদীধারার মতোই। এ পথে পথিক হাঁটেন। বেশি না হলেও হাঁটেন। তীর্থযাত্রীরা চলেন কখনো-সখনো। সওদাগরদের চেনাপথ এটি। এবং একমাত্র। এই পথ ধরেই ঘোড়সওয়াররা চলেছেন। নির্জন পথে যেতে যেতে বয়স্ক সওয়ারি বললেন: ‘এসো, বসা যাক।’ তারপর তদগত চিত্তে বললেন: ‘তোমরা কি লক্ষ করেছ? অপূর্ব নিসর্গ শোভা?’ অপর দুজনের মধ্যে অপেক্ষাকৃত যে বড়ো, সেবলল: ‘তুলনা হয় না!’ অন্যজন শুধু মাথা নাড়ল না। একটু কাব্য করে বলল: ‘গভীর গম্ভীর পরিবেশ। পাহাড়ি লতাগুল্ম, ব্রজমল্লি (সুগন্ধি ফুল) আর কীটপতঙ্গের শব্দচমকে এক অপার্থিব অনুভূতির জন্ম হচ্ছে।’

সওয়ারি তিন জনের একটু পরিচয় আবশ্যক। এঁরা পুণ্যার্থী। সুদূর রাজস্থান থেকে এসেছেন। জগন্নাথ দর্শনে। বয়স্ক সওয়ারির নাম জয়সিংহ। ইনি জয়পুরের মহারাজার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। তো জয়সিংহ দুই পুত্র—আদিসিংহ ও যতিসিংহকে নিয়ে ওড়িশায় এসেছেন। পুরীর গজপতিরাজের সঙ্গে হঠাৎ আলাপ। এক প্রসন্ন সকালে।

সূর্য ওঠা ভোরের জগন্নাথ দর্শনের তৃপ্তি আলাদা। একথা পুরীতে এসে শুনেছেন জয়সিংহ। কিন্তু পুরীর রাজার দর্শনের আগে কেউ মন্দিরে প্রবেশ করতে পারেন না। বিদেশি তো নয়ই। একথা তিনি হয়তো শোনেননি। বা শুনলেও তেমন গুরুত্ব দেননি। তাই মন্দিরের প্রবেশের মুখে পান্ডারা তাঁর পথ অবরোধ করে দাঁড়ালেন। ইতিমধ্যে পুরীরাজ এসে পড়েছেন। তিনি লক্ষ করলেন, একটা ছোটোখাটো জটলা। ভিনদেশি তিন অচেনা তীর্থযাত্রী। যাত্রীদের পোশাক সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের পরনে কুর্তা ও চোস্ত পাজামা। কুর্তা ঝলমলে। তাদের মাথায় পাগড়ি। রঙিন। বয়স্ক ব্যক্তিটির পাগড়ি বেশ মোটা। অপর দুজনের পাগড়ি মাথার সঙ্গে টান টান করে বঁাধা। মোটা নয়। আসলে রাজস্থানিদের পাগড়ি দেখে বুঝে নিতে হয়, ব্যক্তির সম্মান, মর্যাদা। যাই হোক, রাজা অপরিচিত তীর্থযাত্রীদের সম্মান সহকারে সঙ্গে নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করলেন। অতিথি হতে আহ্বান জানালেন। জয়সিংহ পুত্রদের নিয়ে রাজার অতিথি হলেন। থাকলেন প্রায় মাসখানেক।

একদিন কথায় কথায় গজপতিরাজ তাঁর একটি বাসনার কথা জানালেন। জয়সিংহ অবাক বিস্ময়ে তাকালেন। মনে যে আনন্দ হয়নি তা নয়। তবে প্রকাশ করলেন না। শুধু বললেন: ‘অতি শীঘ্র পুত্রদের নিয়ে ফিরে আসছি। আসবই।’

গজপতিরাজ হাসলেন। সেহাসি যেন শরীরজুড়ে। তিনি উত্তর পেয়ে গেছেন। জানালেন, বিদায় সম্ভাষণ। বিনীত নমস্কারে। প্রত্যুত্তরে জয়সিংহ আনতভঙ্গিতে বললেন: ‘নমস্কার।’ পুত্ররা সমস্বরে বলল: ‘প্রণাম।’

জয়সিংহ কথা রেখেছেন। শীঘ্রই ফিরে এলেন। পুত্রদের নিয়ে। এক শুভদিনে, গজপতিরাজের কন্যার সঙ্গে আদিসিংহের বিয়ে হল। সেবিয়েতে ধুম হল খুব। ওড়িশার ছোটো-বড়ো রাজারা এলেন। সেবিয়ের জাঁকে সবাই অংশ নিলেন। উপটৌকন দিলেন। গজপতিরাজ বিয়েতে যৌতুক দিলেন হরিহরপুর। বিশাল জমিদারি। বললেন: ‘প্রিয় মহাশয়, বিস্তীর্ণ জমিদারি পরিচালনার ভার আপনাকে দিলাম। পুত্ররা অভিজ্ঞ হলে তাদের হাতে নিয়ন্ত্রণভার দিতে পারেন।’

গজপতিরাজ তো জমিদারি দান করলেন। কিন্তু করায়ত্ত করা সহজ হয়নি। সেই ভূখন্ডের শাসক ছিলেন ময়ূরধ্বজ। তিনি হরিহরপুর আঁকড়ে ধরে আছেন। বিনা যুদ্ধে ছাড়বেন না, একমুঠোও মাটি। শুরু হল যুদ্ধ। গজপতিরাজ অসন্তুষ্ট। তিনি ময়ুরধ্বজকে অন্য এক স্থানে জমিদারি দিতে চাইলেন। ময়ূরধ্বজ সম্মত হলেন না। যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠল। জয়সিংহ বললেন: ‘অযথা রক্তক্ষয় না করে মল্লযুদ্ধে ফয়সালা হতে পারে।’

ময়ূরধ্বজ বললেন। ‘তাই হোক। তবে...’

জয়সিংহ জিজ্ঞেস করলেন: ‘তবে?’

‘গজপতিরাজকে সাক্ষী থাকতে হবে।’

ময়ূরধ্বজ ক্রোধের সঙ্গে বললেন। গজপতিরাজ বললেন: ‘তা তো মানছি। কিন্তু একটা কথা। মল্লযুদ্ধে আপনি হারলে অন্য একটি জমিদারি দিতে চেয়েছি, সেটা অবশ্য হারাবেন।’

গজপতিরাজের শর্ত শুনে ময়ূরধ্বজের চিন্তার ছাপ পড়ল চোখে-মুখে। কোনো কথা বললেন না। সেই মুহূর্তে তিনি ঘোড়ার পিঠে উঠলেন। রাগ গিয়ে পড়ল ঘোড়ার ওপর। আন্দোলিত হল চাবুক।

নতুন রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠা হল। রাজ্যের নাম হল ময়ূরভঞ্জ। সিংহাসনে প্রতীক হয়ে উঠল ময়ূর। রাজপুতদের কাছে ময়ূর পবিত্র প্রাণী। মযূরভঞ্জেও তাই। ময়ূর রাজমর্যাদার প্রতীক। জয়সিংহ ময়ূরভঞ্জে প্রায় একুশ বছর শাসন করলেন। তিনি হরিহরপুরকে দুটি সমান ভাগে ভাগ করলেন। ময়ূরভঞ্জ ও কেওনঝাড়। আদিসিংহ পেলেন ময়ূরভঞ্জ এবং যতিসিংহ কেওনঝাড়।

আদিসিংহ রাজধানীর নাম রাখলেন আদিপুর। দুর্গও তৈরি হল। যতিসিংহ শাসনক্ষেত্রভূমির নাম রেখেছেন, যতিপুর। বৈতরণী নদীর তীরে। সুখেই চলছিল তাঁদের দিন। রাজকার্য। প্রজামঙ্গল। ‘ভঞ্জ’ অর্থ ভাঙা। কী ভেঙেছেন? ভেঙেছেন রীতি-নীতি, স্থানীয় সংস্কৃতি। ওড়িয়া ও রাজস্থানি সংস্কৃতি মিলিয়ে তৈরি হয়েছে ময়ূরভঞ্জ। এক জবরদস্ত রাজ্য।

সুবর্ণরেখা ও বৈতরণী নদী বয়ে যায় আপনবেগে। কিন্তু দুই নদী সাক্ষী থাকে ময়ূরভঞ্জ ও কেওনঝাড় রাজাদের অগ্রগতি ও পতনের। দুই রাজাদের রক্তসম্পর্কের মধ্যে কখনো চিড় ধরেনি। সহস্র বৎসরেও। এমনও হয়েছে ময়ূরভঞ্জের অপুত্রক রাজা কেওনঝাড়ের রাজপুত্রকে গদিতে বসিয়েছেন। আবার, কেওনঝাড়ের শূন্য গদিতে ময়ূরভঞ্জের রাজপুত্র সসম্মানে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। এরকম ঘটনা অনেক। দুই-একটা গল্প শোনাই—

তখন ময়ূরভঞ্জের রাজা রঘুনাথ ভঞ্জ। তাঁর শাসনকালে ১৭২৮-১৭৫০ সাল। তাঁর কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। মনে ভারী দুঃখ। ধর্মপ্রাণ রাজার ঠিক রাজকার্যে মন নেই। তীর্থে তীর্থে ঘুরে বেড়াবেন ঠিক করলেন। কিন্তু রাজ্যে সংকট দেখা দিল। আলিবর্দি খাঁ ওড়িশা আক্রমণ করলেন। এক বার নয়, দু-বার। এমনিতে তিনি ময়ূরভঞ্জের রাজার ওপর ক্রুদ্ধ। কারণ স্পষ্ট। মুর্শিদকুলি খাঁকে তিনি ধাওয়া করেছেন। সুবর্ণরেখা নদীর তীরে রাজঘাটে ময়ূরভঞ্জরাজ আলিবর্দি খাঁকে বাধা দিলেন। ফল বিষম হল। আলিবর্দি খাঁ রাগে, ক্ষোভে ময়ূরভঞ্জের ওপরে বোমা বিস্ফোরণ ঘটালেন। বিপর্যস্ত হল ময়ূরভঞ্জ। মুর্শিদকুলিকে পরাজিত করলেন অবশ্য বালেশ্বরে। তারপর ওড়িশায় নিজের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে বাংলায় ফিরে গেলেন। এই ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা ছিল অতি সাময়িক। সেগল্প ভিন্ন। যাই হোক, রানি সুলোচনার পরামর্শে রাজা রঘুনাথ ভঞ্জ কেওনঝাড় রাজার দ্বিতীয় পুত্র চক্রধরকে দত্তক নিলেন, মনের শান্তি ও রাজ্যের নিরাপত্তার কথা ভেবেই।

তাঁর ছিল দুই রানি। সুমিত্রা দেবী ও যমুনা দেবী।

চক্রধর ভঞ্জ মাত্র এগারো বৎসর রাজত্ব করেন। রাজ্যের অভ্যন্তরে কত কী না ঘটল! আফগান ও মারাঠাদের সঙ্গে অনবরত লড়াই। দেশীয় রাজাদের সঙ্গে বিবাদ তাঁকে সামলাতে হয়েছে। তাঁর পুত্র দামোদর ভঞ্জ অবশ্য সময় পেয়েছিলেন রাজ্যশাসনের। সুদৃঢ় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর ছিল দুই রানি। সুমিত্রা দেবী ও যমুনা দেবী। এই গল্প তাঁদের নিয়ে। রাজা দামোদর ভঞ্জও অপুত্রক ছিলেন। তিনি কেওনঝাড়ের রাজা বলভদ্র ভঞ্জের পুত্র ত্রিবিক্রম দেবকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করলেন। মনোনয়নপর্ব শেষ। রাজা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা গেলেন। গল্পের বঁাক এখান থেকে শুরু।

কেওনঝাড়-রাজ বলভদ্র কণিকা, নীলগিরি ও খুরদারাজকে নিয়ে শক্তিসংগঠন তৈরি করেন। উদ্দেশ্য সাফ। ওড়িশার অভ্যন্তরে আফগান, মারাঠা ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আনাগোনা চলছে। প্রায়শই দুর্বার আক্রমণে অতিষ্ঠ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলি। তাই কেওনঝাড়রাজ বলভদ্র ত্রিশক্তির মিলন ঘটালেন। তিনি এই শক্তিসংগঠনের সেনাপতি। পুরীরাজ তাঁকে শিরোপা দিয়েছেন ত্রিবিক্রমপতি। এই শিরোপা তাঁর মনে ধরেছে। পরবর্তীকালে তিনি তাঁর পুত্রের নামও রেখেছেন ত্রিবিক্রম। একটু পরিবর্তন করেছেন। অর্থাৎ ত্রিবিক্রমদেব। সেই ত্রিবিক্রমদেবকে দত্তক নিয়েছেন ময়ূরভঞ্জরাজ দামোদর ভঞ্জ। রাজার মৃত্যুর পর তাঁরই রাজদায়িত্ব পাওয়ার কথা। কিন্তু তা হয়নি।

কথায় বলে না, মনের স্বাস্থ্য! সেই মনের স্বাস্থ্য বয়েসের সঙ্গে বাড়েনি। যুবক ত্রিবিক্রমদেব কিশোরের মতোই সহজ, সরল। সেবন্ধুদের সঙ্গে খেলে বেড়ায়। নদীর তীর বরাবর ঘোড়া ছুটিয়ে বেড়ায়। বনের গাছপালা, লতাগুল্ম, পশুপাখি তার খুব পছন্দ। সেবলে তার মনের কথা গহীন অরণ্যে, চন্দন গাছকে। রোজ নাকি কথা হয় তার। এমন কথা কেউ শুনেছে নাকি? রানি সুমিত্রা দেবী যমুনা দেবীকে বলেন: ‘নির্ঘাত পাগল।’ তবে দুই রানির একটি বিষয়ে খুব পছন্দ। ত্রিবিক্রমদেব ভালো অসিচালনা করতে পারে। সমবয়েসিদের নিয়ে শস্ত্রবাহিনী তৈরি করেছে। খেলার ছলে যুদ্ধভঙ্গি, নৃত্যের তালে তালে অঙ্গভঙ্গি বড়োই ছন্দমধুর। সঙ্গে বাজে ঢাক, ঢোল, ডুগডুগি। সমবেত সঙ্গতে এক সুর ওঠে। সৃষ্টি হয়, অভিনব সৃজন মুদ্রা।

দুই রানি মিলে শলা করলেন। রানি সুমিত্রা (১৭৯৬-১৮০৫) রাজ্যশাসন শুরু করলেন। রাজা দামোদর ভঞ্জ ইতিপূর্বে ইংরেজ সরকারকে ৩২০ পাউণ্ড বাৎসরিক আদায় দিতে সম্মত হয়েছিলেন। কিন্তু রানি সুমিত্রা দেবী সেই অর্থ দিতে অস্বীকার করলেন। ফলে সংঘাত শুরু হল।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮০৩ সালে ওড়িশা দখল করে নিল। কিন্তু রানি ময়ূরভঞ্জে ইংরেজদের ঢুকতে দিলেন না। সৈন্যদের সতর্ক হতে বললেন।

সেদিন ছিল চৈত্র পূর্ণিমা, চৈতি উৎসব। নববর্ষের আবাহন। অতর্কিত আক্রমণ করল কোম্পানি। মি. গ্রান্টের নেতৃত্বে কয়েক শত ইংরেজ সৈন্য ময়ূরভঞ্জে ধ্বংসলীলা চালাতে লাগল। রানির সৈন্যরা পালটা আক্রমণ করল। যুদ্ধ হল ভয়ানক। কিন্তু হঠাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে এক বীরাঙ্গনার আবির্ভাব। তাঁর হাতে ভল্ল। তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। রণাঙ্গনে। হঠাৎ তাঁর ভল্লের আঘাতে ইংরেজ সেনাধ্যক্ষ মি. গ্রান্ট ঘায়েল হলেন। ইতিমধ্যে রানির সৈন্যরা সেনাধ্যক্ষকে বন্দি করল। ইংরেজ সৈন্যদের বাধ্য হয়ে সরে যেতে হল। ইংরেজ সেনাধ্যক্ষ অবশ্য রানির সৌজন্যপূর্ণ ব্যবহারে মুগ্ধ হলেন। কথা দিলেন, তিনি যতদিন সেনাধ্যক্ষ থাকবেন, ময়ূরভঞ্জ আর আক্রান্ত হবে না। কোনো অর্থ আদায়ও নয়। রানি সুমিত্রা দেবী প্রায় ন-বছর শাসন করেছিলেন। এমন যুদ্ধ আর হয়নি। গ্রান্ট সাহেবও কথার খেলাপ করেননি।

যুদ্ধক্ষেত্রে এক বীরাঙ্গনার আবির্ভাব।

তবে যুদ্ধ হয়েছিল। রানি যমুনা দেবীর স্বল্পকালীন রাজ্যশাসনে। তখন অবশ্য গ্রান্ট সাহেব ছিলেন না। ছিলেন ম্যাকেঞ্জি সাহেব। এবং ইংরেজরাও বেশ গুছিয়ে বসেছে ওড়িশায়। তারা প্রায় সব রাজার কাছ থেকে কর আদায় শুরু করেছে। ময়ূরভঞ্জই বা বাদ যাবে কেন? বার কয়েক ইংরেজ সেপাই এসে সমন ধরিয়েছে। কর জমা দেবার ফিরিস্তি দিয়েছে। আরও বলেছে: ‘রানি যে তীর্থকর আদায় করেন জগন্নাথ দর্শনার্থীর কাছ থেকে, সেই করের অর্ধেক দিতে হবে।’

রানি যমুনা দেবী সেসব তোয়াক্কা করেননি। রানি একবার কড়া ভাষায় ইংরেজ প্রতিনিধিদের পত্র লিখে প্রতিবাদ জানালেন। ফল বিষম হল। ইংরেজ সৈন্যরা সমগ্র ময়ূরভঞ্জ ঘিরে ধরল। লুন্ঠন, অত্যাচার চালাল। আগুন ধরাল। এই অত্যাচার চলল তিন দিন ধরে। চতুর্থ দিনে, ত্রিবিক্রমদেবের নেতৃত্বে একদল যুবক ঝাঁপিয়ে পড়ল ইংরেজ সৈন্যদের ওপর। তারা দেখল, যুবকদের হাতে অস্তরশস্তর নেই। কেবলই লম্ফঝম্ফ দিচ্ছে। পায়ে ঘুঙুর বঁাধা। তাদের লম্ফঝম্ফ যেন চকিত চমক। ইংরেজ সৈন্য বিপরীত পক্ষকে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। কিছু একটা অনুমান করার আগেই যুবকদের হাত ও পায়ের কুশলী প্রয়োগে ইংরেজ সৈন্যরা কুপোকাত হতে লাগল। ইতিমধ্যে ত্রিবিক্রমদেবের শস্ত্রধারী যুবকরাও এসে পড়ল। ঢাক, ঢোল, ডুগডুগি বাজল। ইংরেজ সৈন্যরা ভয়ে পিছু হটল। এটা তাদের বিচিত্র অভিজ্ঞতা।

এই সংবাদ রাজ্য-অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়ল বায়ুবেগে। অসুস্থ রানি সুমিত্রা দেবী বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। জিজ্ঞেস করলেন: ‘কেমন করে এমনটি সম্ভব হল?’ ত্রিবিক্রমদেব বলল: ‘ময়ূরভঞ্জের ছৌশিল্পীদের নিয়ে এই অসাধ্যসাধন করেছি।’

রানি যমুনা দেবী আনন্দ আবেগে পুত্র ত্রিবিক্রমদেবকে জড়িয়ে ধরলেন। রানি সুমিত্রা দেবী রাজমুকুট এনে ত্রিবিক্রমদেবের মাথায় পরিয়ে দিলেন। বললেন: ‘পুত্র, তুমি যোগ্য হয়েছ। তোমার রাজ্য তুমি শাসন করো। প্রজাপালনই তোমার ধর্ম হোক।’

শুকতারা, ফাল্গুন, ১৪১২


Join পুস্তকালয় , Where books meets it's readers.

অধ্যায় ১ / ২৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%