বকশি জগবন্ধুর ঘোড়া

রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার

নামখানি তাঁর লম্বা চওড়া। জগবন্ধু বিদ্যাধর মহাপাত্র ব্রহ্মবর। রাজার সেনাপতি। নামের মতো পদেও জাঁক। ওড়িশায় খুরদা রাজার সেনাপতি বলে কথা! রাজার পরেই তাঁর স্থান। ধনে মানে ঐশ্বর্যে। ‘বকশি’ অর্থ জেনারেল বা সেনাপতি। রাশভারী মানুষ। কুশলী সেনানায়ক। তাঁর সম্পর্কে একটি টিপ্পনী শোনা যায়।

জগবন্ধু

শত্রুর নয়কো বন্ধু,

ফোঁসে যেন বিষধর

বিপদে তিনি ত্রাতা,

স্মরণে মেলে ব্রহ্মবর।

সেযাই হোক। মানুষটি যেমন-তেমন। কিন্তু তাঁর ঘোড়াটি ছিল সাংঘাতিক। তা নিয়ে অনেক গল্প আছে। দু-একটি শোনাব।

এডওয়ার্ড ইম্পে নামে এক সাহেব কটকে থাকতেন। ম্যাজিস্ট্রেট। কোম্পানির আমলারা তাঁকে মান্য করতেন। খুরদায় তিনি-ই গন্ডগোল পাকালেন। তাঁর নির্দেশে রাজা দ্বিতীয় মুকুন্দদেব বন্দি হয়েছেন। ফলে শুরু হল ভারি অশান্তি। কিন্তু বন্দি রাজা দোষ চাপালেন অন্যের ঘাড়ে। বললেন, ইংরেজের বিরুদ্ধে ঘোঁট পাকাচ্ছেন; আমার মন্ত্রী জয় রাজগুরু। রাজ্যে অশান্তির মূলে আরও একজন আছেন। সেনাপতি বকশি জগবন্ধু। রাজার কথা কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরা বিশ্বাস করলেন। রাজাকে তাঁরা মুক্তি দিলেন। জয় রাজগুরু ধরা পড়লেন। তাঁর ফাঁসি হল। কিন্তু সেনাপতি জগবন্ধুকে খুঁজে পাওয়া গেল না। অন্তত সে মুহূর্তে না।

মানুষটি যেমন-তেমন। কিন্তু তাঁর ঘোড়াটি ছিল সাংঘাতিক।

অবশ্য বিদ্রোহী সেনাপতি জগবন্ধুকে একবার হাতেনাতে ধরেও ফেললেন। লেফটেন্যান্ট কর্নেল ক্যাম্পবেল সাহেব। পিপলি বলে একটা জায়গা আছে। পুরীর কাছাকাছি। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে ক্যাম্ববেল সাহেব হাজির হলেন, পিপলিতে। তাঁর ঘোড়াটিকে একটি কাঠবাদাম গাছে বঁাধলেন। তারপর একটি পরিত্যক্ত দোতলা বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন। ঢুকেই এক বিশাল আকৃতির মানুষের মুখোমুখি হলেন। সাহেব তরবারি উন্মোচন করে জিজ্ঞেস করলেন;

— টুম জগডবণ্ডু? সেই বিশাল আকৃতির মানুষটি কী একটা ইঙ্গিত করলেন। সাহেব বুঝলেন, জগবন্ধু ওপরের কোনো কুঠুরিতে আছে। তো সাহেব সেদিকেই ছুটলেন। সেই ফাঁকে জগবন্ধু সামনের দুই প্রহরীকে ঝটকা মেরে ফেলে দিলেন। এবং ক্ষিপ্রগতিতে বাদাম গাছটির কাছে গিয়ে ঘোড়ার বঁাধন খুলে, ঘোড়া ছোটালেন।

কথায় বলে, ঘোড়া যার কাছে থাকে; তারই হয়। কথাটি অবশ্য সবটুকু সত্য নয়। প্রভুভক্ত হয়। ঠিকই। ক্যাম্পবেল সাহেব দুধসাদা বেশ তেজি ঘোড়াটি এক মারাঠা সৈন্যের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন। ঘোড়াটিও সাহেবের বশে ছিল না। বেয়াড়া ধরনের। সাহেব বলতেন, চাবুকে সব ঠিক হয়ে যাবে। একটু সময় লাগবে, এই যা! মাস দেড়েক আগে ছিনিয়ে নেওয়া ঘোড়াটি যেন মুক্তির স্বাদ পেল। সেনানায়ক জগবন্ধু অবশ্য ঘোড়াটিকে খুব যত্ন করতে লাগলেন। একসময় ঘোড়াটি তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়ে উঠল। তিনি ঘোড়ার একটি নাম রেখেছিলেন। ‘রোরঙ-ঘো’। আসলে, রোরঙ নামে তাঁর নিজস্ব একটি জমিদারি এস্টেট ছিল। এস্টেটখানি কোম্পানি কেড়ে নেয়। সেদুঃখ ভোলার নয়। তাই তাঁর বিদ্রোহ। যা-ই হোক, এস্টেটের নামে ঘোড়ার নাম রাখলেন। সম্ভবত, ঘোড়াটিরও এই নাম পছন্দ হয়েছিল। তাকে ডাকলেই হল। ডাকলেই ঘাড় দোলাত। ঘড়ির পেণ্ডুলামের মতো।

ওড়িশা একসময় মারাঠাদের কবলে, দখলে ছিল। হাতবদল হল। ইংরেজ কোম্পানির হয়ে গেল। এই হয়ে যাওয়া একদিনে হয়নি। সহজেও হয়নি। ইংরেজের শক্ত ঘাঁটি তৈরি হচ্ছিল, ভারতের অন্যত্র। ওড়িশাতে বিশেষ করে কটক ও বালাশোরে ইংরেজের আনাগোনা শুরু হয়েছে আগেই। কেউ কেউ ফ্যাক্টরি তৈরি করছেন, ব্যবসাবাণিজ্য চালাচ্ছেন। লর্ড ওয়েলেসলি তখন গভর্নর জেনারেল। ধুরন্ধর ব্যক্তি। তাঁর অধীনতামূলক নীতি মানতে বাধ্য হয়েছেন অনেকেই। আবার মানতেও চাননি, তার সংখ্যাও নেহাত কম ছিল না।

নাগপুরের ভোঁসলে রাজার অবস্থা তখন শোচনীয়। মারাঠাদের প্রধান হলে কী হবে! ধন-মানে জৌলুস কমে গেছে। কারণ ওড়িশা থেকে তাঁর আয় আর তেমন নেই। আয়ের সিংহভাগ কোম্পানির খাজাঞ্জিখানায় জমা হচ্ছে। এই অবস্থা কেমন করে হল; সেটাই বলছি।

ওড়িশায় মারাঠা শক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ভোঁসলে রাজা ওড়িশার প্রতি তেমন নজর দিতেন না। পর্যাপ্ত সৈন্য নেই। সৈন্যপ্রধানদের দুষ্কৃতির ফলে সাধারণ মানুষ তাদের ভালো চোখে দেখত না। তারা রাজা বা জমিদারদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি বা সাহস! কোম্পানির দৌরাত্ম্য থামাবার মতো লোকবল ছিল না। অথচ মারাঠা সৈন্যরা জোরজুলুম করত ঠিক আগের মতোই।

অন্যদিকে, শোনা গেল লেফটেন্যান্ট হারকোর্ট সাহেব ইংরেজ সৈন্য নিয়ে এগুচ্ছেন পুরীর দিকে। কোম্পানির গোপন নথি নাকি ফাঁস হয়ে যায়! কী ছিল সেই নথিতে? সেই নথিতে ছিল। তিন দিক থেকে আক্রমণ করা হবে ওড়িশায়। তবে সাধারণ মানুষের যেন ক্ষতি না হয়। রাজা বা জমিদারদের এই মুহূর্তে আঘাত নয়। আর, একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিল। পুরীর মন্দির, মন্দিরের রীতিনীতি, সম্পত্তি, পান্ডা ও তীর্থযাত্রীদের প্রতি যেন অমর্যাদা না করা হয়। প্রয়োজন হলে মারাঠা সৈন্যদের ঘুস দিয়ে বশ করতে হবে। রাখতে হবে রসেবশে।

ওড়িশা সম্পর্কে বড়োলাট বিস্তারিত খবর জেনেছেন। নানাসূত্রে। এরপরই তাঁর গোপননির্দেশপত্র। কথামতোই কাজ। সৈন্য প্রবেশ করল ওড়িশার উত্তরে। গঞ্জাম জেলা ছুঁয়ে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল ক্যাম্পবেলের দক্ষিণ দিক অভিযানের কথা ছিল। পারেননি। হঠাৎ অসুস্থ হলেন। অগত্যা হারকোর্ট সাহেবকে সে-দায়িত্ব পালন করতে হল। হারকোর্ট সাহেব অবশ্য পুরী থেকে কটক পর্যন্ত এগুতে পারলেন না। বাধা পেয়েছেন, পদে পদে। আহমদপুর, মুকুন্দপুর, কটকে ছিল মারাঠাদের শক্ত ঘাঁটি। শক্ত ঘাঁটি হলে হবে কী! অসাধু লোকজন যে ছিল। এক মারাঠা আমলা শিবপ্রসাদের লজ্জা বা ভয়ডর বল কিছুই ছিল না। সুর করে বলতেন:

ডান হাতে রেখেছি

তরবারি,

বঁা-হাত রেখেছি

ফাঁকা,

দিলেই দিতে পারো

রত্নকড়ি

টাকা...

তো হারকোর্ট সাহেব চতুর। কে আর অকারণে শক্তিক্ষয় করে। দিলেন ঘুস! সহজ হয়ে গেল। কটকে বরবাটি দুর্গের প্রবেশপথ। ফল যা হওয়ার তা-ই হল। মারাঠাদের দুর্জয় ঘাঁটি দখল হয়ে গেল।

ওড়িশার উত্তর দিকে, যেটুকু বাকি ছিল। বালাশোর, ভদ্রক, সোরো প্রভৃতি ক্যাপ্টেন মরগান সাহেব দখল করে নিলেন। কর্নেল ফাগুসন সাহেব আর কাজ পেলেন না। তিনি একদল সৈন্য নিয়ে জলেশ্বর থেকে কটক পর্যন্ত ছুটলেন। কেন যে ছুটলেন, সেকথা তুলে লাভ নেই। ঠোঁট কাটা লোক যেমন বলে; —লুটের মাল তো আছেই। তবে হ্যাঁ, কর্নেল ফেনউইক সাহেবও কিন্তু এমনি এমনি ছোটেননি। একটি বড়ো কাজ সারলেন। মারাঠাদের পঞ্চরত্নকে ঘায়েল করলেন। একটু খুলে বলি। মারাঠাদের নিজস্ব জমিদারি ছিল। পটাশপুর, কামারদা, ভোগরাই, শা-বান্দর ও জামকুন্দাতে। এই পাঁচ জমিদারদের মধ্যে দোস্তি ছিল খুব। এঁদের নিয়ে নানা কথা কাহিনি আছে। সে-প্রসঙ্গ ভিন্ন। তবে এঁদের পঞ্চ হাতি বলা হত। কিন্তু বিপদের দিনে, হাতির বল (শক্তি) প্রদর্শন করতে পারলেন না। নিন্দুকেরা কটাক্ষ করে বলত, শক্তি দেখাবে কী করে? মাহুতই ছিল না।

সেযা-ই হোক। শাসক মারাঠাদের অবস্থা তখন ভালো নয়। একেবারেই নয়। ইংরেজরা তেড়েফুঁড়ে উঠেছে। অবশেষে নাগপুরের ভোঁসলে রাজা কোম্পানির সঙ্গে সন্ধিপত্র রচনা করলেন ‘দে গাঁও সন্ধি’। এতে বলা হল—সমুদ্র উপকূল অঞ্চল—কটক, বালাশোর ও পুরী নিয়ে তৈরি হবে ‘কটক প্রদেশ’। অর্থাৎ স্বীকৃত হল। শাসনের যাবতীয় দায়িত্ব কোম্পানির। আর, মারাঠাদের নয়। বলা বাহুল্য, সেছিল কোম্পানির গোত্রান্তর। মারাঠাদের অপশাসন থেকে অন্তত এসব অঞ্চলের সাধারণ মানুষ, রাজা, জমিদারেরা মুক্তি পেয়েছিলেন। সত্যি সত্যি মুক্তি যে হয়নি, সেকথা পরে। তবে খুরদার রাজাও মুক্তি চেয়েছিলেন। শোনা যায়, তিনি নাকি এক লক্ষ টাকা পেয়েছিলেন। কোম্পানির ঘর থেকে। ঘুস। পুরীতে ইংরেজশক্তি বিস্তারে সাহায্য করার জন্য। সত্যি-মিথ্যা জানা যায়নি।

একটি গাছ যেমন পল্লবিত হয়। আস্তে আস্তে। তেমনি হল। ইংরেজশক্তিও আস্তে আস্তে জাঁকিয়ে বসল। কিন্তু ওড়িশার খুরদায় প্রাচীন ও শক্তিশালী রাজারা বাস করতেন। পুরীর খুব কাছেইই অরণ্য ও পাহাড় ঘেরা শক্তপোক্ত রাজ্য এই খুরদা। রাজাদের দুর্গের খুব নামডাক। এখন ভগ্নাবশেষ দেখলেও বোঝা যায়। তার পরিধি কত বিশাল ছিল। হাজার হাজার সৈন্য সেখানে থাকত। তাদের পাইক বলত। রাজার পাইক। তারা নিয়মিত শক্তি চর্চা করত। তারজন্য স্থানে স্থানে আখড়া ছিল। বলা হত, ‘পাইকো-আখড়া’। পাইক সৈন্যরা সময় পেলেই লাঠি নিয়ে গা-ছমছম করা খেলা করত।

‘ফরিখন্ড খেল’ ওড়িশার সৈনিকদের একটি প্রিয় খেলা। অর্থাৎ ঢাল-তরোয়াল নিয়ে কসরত দেখাত। ওড়িশার ময়ূরভঞ্জে তার চর্চা সদাই হত। কালক্রমে তা ওড়িশায়, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। খুরদা রাজার কৌলীন্য আর আগের মতো ছিল না। ছিল বটে রাজা দ্বিতীয় রামচন্দ্র দেবের সময়। সেঅন্তত তিনশো বছর আগেকার কথা। মুঘল শাসকরা পর্যন্ত ভয় করত। বুঝে-সুঝে চলত।

খেলার মধ্যে শরীরচর্চা হয়। সেকথা রাজার পাইকরা মনে করত। তাই দল বিভাজন করে নৃত্যের আকারে তারা ছড়িয়ে পড়ত। বৃত্তাকারে, অর্ধবৃত্তাকারে অর্থাৎ গোলাকার, অর্ধগোলাকার। আবার, একজনের ঘাড়ে আর একজন উঠত, এমনিভাবে একের উপর আর একজন। সুউচ্চ স্তম্ভ তৈরি হত। মনে হত যেন পিরামিড। খুরদার রাজা প্রভাতী সূর্যের আলোয় প্রায়শই, কী শীত, কী গ্রীষ্ম উপেক্ষা করে সৈন্যদের যুদ্ধ-নৃত্য দেখতেন। কখনো-বা কৌতূহল ভরে দেখতেন দক্ষ সৈনিকের লম্ফঝম্ফ বা মহড়া। কেমন করে মরু বিজয় করতে হয় বা চোখ বন্ধ করে অস্ত্রফলায় শত্রুকে গেঁথে তুলতে হয়। কেমন করেই-বা নির্ভীক সৈন্য লাঠির ঘায়ে পাথর গুঁড়ো করে চকিত চমকে! অথবা পাইকরা অশ্ব বা হস্তীর আদল নির্মাণ করে নৃত্যকুশলতায়! রাজা করতালি দিয়ে সৈনিকদের উৎসাহিত করেছেন। কখনো-বা বাড়তি জমির বন্দোবস্ত করছেন। রাজচাতুর্য যাকে বলে! সেদিন আর নেই। তখন রাজার মনে অশান্তি ছিল না। প্রজাদেরও দুঃখ ছিল না। ঘরে ফসল ছিল। সৈন্যরা বংশ পরম্পরায় জমি ভোগ করত। কিন্তু ইংরেজরা খুরদায় প্রবেশ করল ১৮০৪ সালে। রাজা দ্বিতীয় মুকুন্দদেব দুর্বল রাজা। মৃদুমন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করলেন ইংরেজের বিরুদ্ধে। কিছুটা-বা বিদ্রোহ। মন্ত্রী জয় রাজগুরু বললেন—

জাগুন রাজা, জাগুন। হাতে অস্ত্র তুলুন।

সেনাপতি জগবন্ধু বিদ্যাধর মহাপাত্র ব্রহ্মবর বললেন—

আপনি মান্য রাজা। আপনার শক্তিশালী পূর্বপুরুষের কথা কি ভুলে গেলেন? প্রতাপশালী মুঘলরা পর্যন্ত সম্মান করতেন। বলতেন, ‘ঠাকুর রাজা’। আপনি নীরবে মেনে নেবেন? ইংরেজ খুরদার সমস্ত জমি কেড়ে নিচ্ছে। হস্তান্তর করছে। পাইক সৈন্যদের জমি কেড়ে নিয়েছে। তারা কাজ হারিয়েছে। তাই বিদ্রোহী। পুরোনো জমিদারেরাও বিদ্রোহী। আপনি এঁদের সঙ্গে থাকুন। শক্তি জোগান। আপনি জেগে উঠলে আমরা সকলে সাহস পাব। যুদ্ধ করুন রাজা। আমরা ভীত নই। শক্তি সহায়সম্বলের কিছুমাত্র খামতি নেই।

সেনাপতির কথাগুলি ভাষণের মতো শোনাল। রাজা সে-মুহূর্তে জ্বলে উঠলেন। বুক চিতিয়ে দাঁড়ালেন। সেআর কতক্ষণ। আবার বসেও পড়লেন। কেন যে বসে পড়লেন, সেটাই বলছি।

প্রতিহারী এসে অন্দরমহলে খবর দিল। মেজর ফ্লেচার নামে এক সাহেব রাজার সাক্ষাৎপ্রার্থী। সঙ্গে জনা পঁচিশেক সেপাই। একথা শুনে সেনাপতি জগবন্ধু বললেন; আদেশ করুন। এদের বন্দি করি। এই তো সুযোগ, উচিত শিক্ষা দেওয়ার।

রাজা নিষেধের অঙ্গুলি সংকেত করলেন। সেনাপতি বিমর্ষ হয়ে চলে গেলেন। আঁচ করলেন, বিষমকান্ড ঘটতে যাচ্ছে। তিনি রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন।

রোরঙ-ঘো কে ডাকলেন। রোরঙ-ঘো ছুটে এল। তিনি খুরদা দুর্গের দিকে ছুটলেন। কিছু পরেই পাইক সৈন্যরা ছুটে এল। সেনাপতি এসে দেখলেন। রাজা বন্দি হয়েছেন। অন্দরমহলের প্রহরীরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছিল। নিষ্ফল চেষ্টা। পথে প্রজারা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছিল। ইংরেজ সৈন্য তৎক্ষণাৎ মেরে ফেলল অন্তত জনা দশেক। জগবন্ধু রোষে ফুঁসতে লাগলেন। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন। কোম্পানির শাসককে উপড়ে ফেলতে হবে।

খুরদা রাজার সেনাপতি ইংরেজদের উপর বেজায় চটেছিলেন। কারণ ছিল ঢের। সেনাপতির খাজনামুক্ত জমিজিরেত কেড়ে নিয়েছে ইংরেজ কোম্পানি। রোরঙ এস্টেটটি তাঁর পুরুষানুক্রমে পাওয়া। সেই ভূ-সম্পত্তি থেকে আয় হত প্রচুর। ১৮০৪ সালে খুরদা কোম্পানির দখলে চলে যায়। কোম্পানি প্রথমে ত্রিবার্ষিক খাজনার ভিত্তিতে স্বত্ব দিল বটে। তবে বকশি জগবন্ধু অনিচ্ছা প্রকাশ করলেও বন্দোবস্ত মেনে নিয়ে খাজনা দিতে লাগলেন। কোম্পানির প্রতিনিধির হাতে। একদিন অকস্মাৎ জানতে পারলেন, কোম্পানির খাজাঞ্চি খাতায় তাঁর প্রদেয় টাকা জমা পড়েনি। তাই, জমিদারি নিলামে উঠল। তিনি প্রতিবাদ জানালেন। তাঁর প্রতিবাদ কোম্পানির কর্তাব্যক্তিদের কানে পৌঁছুল না। তিনি কোনো সহানুভূতিও পেলেন না। তবুও তিনি চেষ্টা ছাড়েননি, উপায় বের করার। কিন্তু স্বয়ং রাজা যেখানে হীনবল, তিনি আর কতটা সুরক্ষিত থাকবেন! নেমে পড়লেন যুদ্ধে। আদিবাসী প্রজা, জমি হারানো পাইক সৈন্য, কন্দচোয়াড়দের সহায়তা পেলেন। শুরু হল প্রত্যক্ষ লড়াই। ইংরেজের বিরুদ্ধে।

সময়টা মার্চের শেষ। ১৮১৭ সাল। হতভাগ্য সেনানায়ক জগবন্ধু তৈরি করলেন সশস্ত্র বাহিনী। ঘুমসুর থেকে চার শত কন্দচোয়াড়, দলবেহারা, পাইকসৈন্য প্রভৃতি নিয়ে কোম্পানির সম্পত্তি লুট, অগ্নিসংযোগ করাতে লাগলেন। খুরদায় কোম্পানির অফিস, বানপুরের থানা পুড়িয়ে দেওয়া হল। ট্রেজারি লুট করা হল। খুরদা রাজার সরবরাকর চরণ পট্টনায়ক ইংরেজের চর হিসেবে কাজ করছিল। তাকে হত্যা করা হল। ১৮১৭ সালের এপ্রিল মাস থেকে বিদ্রোহ চরমে পৌঁছে গেল। এরপরের ঘটনা খুব তাড়াতাড়ি ঘটতে লাগল। চোয়াড় সৈন্যরা পুরী আক্রমণ করল। ইংরেজ সৈন্য ও বিদ্রোহবাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি বিনিময় হল খুব। তবে বিদ্রোহীরা খুব সুবিধে করতে পারল না।

দুষ্টু লোকেরা বলত, স্বার্থের লড়াই। তা বই কী! তবে সেসব লড়াইয়ের পুরো তালিকা দিতে গেলে অনেক জায়গা লাগবে। যা-ই হোক। জগবন্ধু পাঁচ হাজার পাইক, কন্দচোয়াড় নিয়ে পুরীতে প্রবেশ করলেন। পুরীর সাধারণ মানুষ, মন্দিরের পুরোহিতবর্গ, পান্ডারা বিদ্রোহী নায়কের দলে যোগ দিলেন। তাঁদের দমন করতে এলেন ক্যাপ্টেন ওয়ালিংটন সাহেব। তাঁর সঙ্গে অনেক গোলাবারুদ, ১৮০ জন সৈন্য ছিল। ওয়ালিংটন সাহেব নিয়ে একটা গল্প আছে।

ওয়ালিংটন সাহেব নাকি রমণীর বেশে পুরীতে প্রবেশ করেছিলেন। তখন সন্ধ্যারাত। পুরীর রাস্তাঘাট বেশ নির্জন। ক্যাপ্টেন সাহেবের লোকজন অন্ধকারে ঠিক ঠাহর করতে পারল না। আসলে যুদ্ধটা কোথায়! ক্যাপ্টেন সাহেব রমণীর বেশে গা ঢাকা দিয়ে আছেন। তাঁর লোকজনেরা ব্যাপারটা জানে। তারা একটা ঝোপের আড়ালে বসে নির্দেশের অপেক্ষা করতে লাগল। যেদিন সন্ধ্যারাতের কথা বলছি, সেদিন সকাল বেলা সময় আন্দাজ ন-টা। ক্যাপটেন সাহেব এমনই রণকৌশল ঠিক করেন।

বিদ্রোহী দলনায়ক জগবন্ধু এমন ঘটনার আঁচ পেয়েছেন আগে ভাগেই। তো তিনিও রমণীর বেশে ঘোড়ার পিঠে চড়ে পুরীর রাজপথে প্রবেশ করলেন। খুব সন্তর্পণে। ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শুনে গোরা সৈন্যরা বুঝল, ক্যাপটেন সাহেব ওই বুঝি এলেন! তারা ঘোড়াটিকে লক্ষ করে অনুসরণ করতে লাগল। কিছুক্ষণ এইভাবে চলার পর ঘোড়াটি এসে এক জলাশয়ের কাছে থামল। ঘোড়ার পিঠ থেকে রমণী বেশে ঘোড়সওয়ার নামলেন। এবং তিনি উচ্চরবে একটি সংকেত করলেন। অমনি জলাশয়ের পাশে প্রকান্ড, ভাঙাচোরা একটি যাত্রীনিবাস থেকে বিদ্রোহীবাহিনী বেরিয়ে এসে গোরা সৈন্যদের আক্রমণ করল। আক্রমণ মারাত্মক। সৈন্যরা ছত্রাকার হল। প্রায় শতাধিক সৈন্য হতাহত হয়। খুব চেঁচামেচি, হইচই শুনে ক্যাপ্টেন সাহেব এসে হাজির। তাঁর চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল। তাঁকে দেখে রোরঙ-ঘো জোড়া পায়ে লাথি মারল। সাংঘাতিক কান্ড। সাহেব আহত ও চিতপটাং হলেন। এক ঘোড়া কারবারির মন্তব্য;—দেশি ঘোড়ার বিদেশি রমণী পছন্দ হয়নি। তাই এমন বিপত্তি। একথা শুনে এক পাইক সৈন্য বলল, আমাদের ঘোড়াটির সঙ্গে সাহেবের পুরোনো শত্রুতা ছিল। এখন বদলা নিল।

যা-ই হোক, রমণীবেশে দেশি নেতা সাহেবকে মার্জনা করলেন। প্রাণে মারেননি।

আরও শোনা যায়। এরপর ওয়ালিংটন সাহেব নাকি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে দেশে ফিরে গেলেন। কারণ বলেছিলেন, কী সাংঘাতিক দেশ! কী সাংঘাতিক তার ঘোড়া!

ওয়ালিংটন সাহেবের এমন এক আকস্মিক ঘটনায় ইংরেজ কর্তাব্যক্তিরা হতচকিত হয়ে গেলেন। তাঁরা নতুন করে সৈন্য সাজাতে লাগলেন। বাঘা বাঘা সমর নায়কদের ডেকে আনলেন। খুরদা ও পুরীতে। মেদিনীপুর থেকে বিশাল এক পদাতিক বাহিনী এসে হাজির। মেজর জেনারেল মার্টিন ডেল কমিশনার হলেন। মার্শাল ল জারি হল। তবুও বিদ্রোহ স্তিমিত হল না। যাঁরা জমি হারিয়েছেন। যেমন, মরিচপুর, হরিশপুর, কুজং, ঘুমসুর ও নয়াগড়ের জমিদার ও রাজারা বিদ্রোহী নেতা জগবন্ধুকে সর্মথন করলেন। ফলে বিদ্রোহ ভয়ানক হল। কিন্তু সফল হল না। ইংরেজ সমর নায়করা বিদ্রোহ দমন করলেন, নিষ্ঠুর অভিযান চালিয়ে।

বিদ্রোহী নেতা জগবন্ধু একবার শেষ চেষ্টা করলেন। রাজা দ্বিতীয় মুকুন্দদেবকে এসে বললেন— আপনি রাজ্যের পূজ্য রাজা। একবার বিদ্রোহীদের পুরোভাগে দাঁড়ান। তাদের মনোবল বেড়ে যাবে।

রাজা হার মেনেছেন। বললেন,— মু এ বিপ্লবের-অ নেতৃত্ব নেবা পাঁই অসমর্থ। মোতে এতা ঠারু যথেষ্ট দূররে রাখ বকশি।

তারপর তিনি ঘোড়ার পিঠে উঠে বসলেন।—চল রোরঙঘো চল।

এরপর আর কথা চলে না। বিদ্রোহী নায়ক জগবন্ধুর মুখখানি বিকৃত হল। কোনোমতে উচ্চারণ করলেন,— ধিক রাজা ধিক, এই পুণ্যদেশে।

তারপর তিনি ঘোড়ার পিঠে উঠে বসলেন।—চল রোরঙঘো চল। তু আউ মু একলা চল।

বাস্তবিকই বিদ্রোহী নেতার সহসাথীরা সবাই ধরা পড়লেন। বিদ্রোহ দমিত হল, সর্বত্র। তিনি একা হয়েই পড়লেন। কেবল জগন্নাথই ভরসা।

তিনি জগবন্ধু, ভীষণ। দুরন্ত বহ্নি। একলাতেও ভয়ংকর। কোম্পানি তাঁর সঙ্গে পেরে উঠলো না। তাঁকে ধরে দিতে পারলে পুরস্কার দেওয়া হবে। এমন বেমক্কা পুরস্কার লোভেও কেউ এগিয়ে এল না। শেষে সরকার শান্তি প্রস্তাব করলেন। তাঁকে ক্ষমা করা হবে তিনটি শর্তে। বিদ্রোহী নেতাকে রোরঙ এস্টেটের দাবি ছাড়তে হবে। দ্বিতীয়ত, নামের আগে বকশি ব্যবহার করা যাবে না। এবং শেষ শর্ত হল, কোম্পানির মাসিক পেনশন নিয়ে তাঁকে কটকে বসবাস করতে হবে।

অগত্যা বিদ্রোহী নেতাকে মেনে নিতে হয়েছিল শর্তাবলি। উপায় ছিল না। তার মূলেও সেই প্রিয় ঘোড়াটি। সেটাই এবার বলি।

নয়াগড়ে অজ্ঞাতবাসে আছেন। বিদ্রোহী নেতা জগবন্ধু। ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত জগবন্ধু একটি গাছের নীচে শীতল ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। চোখে তন্দ্রা। ঘোড়াটি ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমনসময় বন্দুকের গর্জন শুনে জগবন্ধুর তন্দ্রা ছুটে গেল। চোখ মেলে দেখলেন, ঘোড়াটি মাটিতে পড়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছে। তার ডান পায়ে গুলি লেগেছে। কিন্তু সেএক মুহূর্ত মাত্র। ঘোড়াটি ছুটে গিয়ে বন্দুকধারী সাহেবকে বঁা-পা দিয়ে লাথি মারতে লাগল।

জগবন্ধু সাহেবকে দেখে চিনতে পারলেন। কটকের ম্যাজিস্ট্রেট ওডওয়ার্ড ইম্পে সাহেব। সাহেবের সঙ্গে পাঁচ জন সেপাই। হয়তো খবর ছিল, নয়াগড়ে বিদ্রোহী নেতার অবস্থান সম্পর্কে। তাই সাহেব ছুটে এসেছেন। তারপরই এই কান্ড! জগবন্ধু ক্রোধান্ধ হয়ে হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়লেন ইম্পে সাহেবের ওপর। তরবারির আঘাত বসালেন তাঁর ডান পায়ে। ইম্পে সাহেব কাকুতিমিনতি করলেন— আমাকে প্রাণে মেরো না। আমি তোমাকে সরকারিভাবে মার্জনার সুপারিশ করব।

যুদ্ধক্লান্ত বীর বিদ্রোহী তাঁর প্রিয়বন্ধু ঘোড়াটির দিকে তাকালেন। আহত ঘোড়াটি মাথা নাড়ল। তিন বার।

জগবন্ধু তাঁর নিজের পাগড়ি খুলে ঘোড়ার রক্তাক্ত পা-টি বেঁধে দিলেন। পরম মমতায়।

কিন্তু বিদ্রোহী নেতার দুঃখ ঘোড়াটি বেশিদিন বঁাচল না। আরও একটি খবর। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবও বেশিদিন বঁাচেননি। তবে তিনি কথা রেখেছিলেন। মার্জনা-পত্রে তিনি-ই প্রথম স্বাক্ষর করেন।

শারদীয়া প্রান্তর, ত্রিপুরা ১৪১৪

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%