রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার
সেঅনেককাল আগের কথা। তখন হরিহরপুর আকারে প্রকারে বেশ ভারী ছিল। বামনঘাটি ছিল রাজভূমি। রাজাদের আদি বাসস্থান। একদিন সেই আস্ত হরিহরপুরকে ভাঙা হল। দু-টুকরো। যিনি ভঙ্গকারী, তাঁর নাম পরে।
‘ভঙ্গ’, অর্থ ‘ভঞ্জ’। তো তিনি গড়লেন ভঞ্জভূমি। ময়ূরভঞ্জ। স্যার উইলিয়াম হান্টার সাহেবের ধারণা, ময়ূরভঞ্জের সৃষ্টি দু-হাজার বছরের কম নয়। কিন্তু রাজকাহিনি-মালার তথ্য অন্যরকম। ময়ূরভঞ্জ রাজ্যটি গড়ে ওঠে, তেরোশো বছর আগে। ‘রাজ্য’ কথাটা এখনকার মতো সীমানা ব্যাপ্তির নিরিখে নয়। রাজার ভূমি। শাসনে, শৌর্যে যে দিগবলয় গড়ে উঠত, তা-ই রাজ্য।
জয়পুরের মহারাজার এক নিকট আত্মীয়ের নাম জয় সিংহ। তিনি বেরিয়েছেন তীর্থভ্রমণে। ভ্রমণ তাঁর নেশা। তীর্থ হলে তো কথাই নেই। এ ব্যাপারে অবশ্য তাঁর বাছবিচার নেই। তবে তীর্থ পরিক্রমায় এবার তিনি একা নন। সঙ্গে নিয়েছেন দুই পুত্রকে। আদি সিংহ ও যতি সিংহ। তাঁরা বয়সে নবীন। তরতাজা যুবক। জয় সিংহ মনে করতেন, ভ্রমণে নানারকম ভাবে মনের দরজা খুলে যায়। উদারতা বাড়ে। তীর্থ পরিক্রমায় মন পবিত্র হয়। হয়-ই।
জয় সিংহ ঘুরতে ঘুরতে পুরী এলেন। প্রভু জগন্নাথ দর্শনে। পুরীরাজ গজপতির আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। কিছুদিন ওড়িশার নানা স্থান ভ্রমণ করলেন। প্রত্যক্ষ করলেন সাগর, নদী, পর্বত। বন, বনজ সম্পদ। দেখাতেই সুখ। সেই সুখ সর্বক্ষণ। জয় সিংহের চোখে অপার কৌতূহল লক্ষ করলেন পুরীরাজ। তিনি হাসলেন, ‘মিত্র, আপনি ইচ্ছে করলে এখানে বাস করতে পারেন।’
জয় সিংহ চোখ তুলে চাইলেন। ‘কীভাবে?’
‘কেন, জমিদারি দেব! আপনি গ্রহণ করলেই আমার আনন্দ।’ পুরীরাজ স্পষ্ট করলেন।
পুরীরাজের দৃষ্টি অনুসরণ করে জয় সিংহ কিছু একটা বলতে চাইলেন। কিন্তু বলা হল না। দ্বিধা।
হাসলেন পুরীরাজ গজপতি। প্রাণখোলা হাসি। বললেন: ‘আসুন-না, সম্পর্ক গড়ি। আত্মীয়তার বন্ধন।’

জয় সিংহ চমকে উঠলেন। একটু ভেবে নিলেন। কী বলতে চান পুরীরাজ?
জয় সিংহ চমকে উঠলেন। একটু ভেবে নিলেন। কী বলতে চান পুরীরাজ?
পুরীরাজ অবশ্য খোলসা করে বললেন, ‘আমার স্নেহের পুত্রী সুলক্ষণা। আদি সিংহের সঙ্গে তার বিয়ে দিতে চাই। এখন মিত্রের মতামত পেলেই ধন্য হই।’
অবাক বিস্ময় আর মুগ্ধতার চোখে হাসলেন জয় সিংহ। তিনি সম্মত হলেন। এক শুভক্ষণে আদি সিংহের সঙ্গে সুলক্ষণার বিয়ে হয়ে গেল। এই বিয়ের যৌতুক স্বরূপ হরিহরপুর দেওয়া হল জয় সিংহকে।
জয় সিংহ হরিহরপুর গদিতে বসলেন বটে। তবে তাঁর মন পড়ে থাকে আবাল্য স্মৃতিজড়িত জয়পুরে। ফিরে যাবেন, মনস্থ করলেন। পুত্রদের একটা পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করেই যেতে চান তিনি। তাঁর পুত্ররা অভিজ্ঞতায় পুষ্ট নন। ধন মান, ঐশ্বর্য তো এমনিতে হয় না। মূল্যবান হাত দুটি দিয়ে গড়তে হয়। পা-দুটি দিয়ে বাড়তে হয়। মস্তিষ্ক খাটাতে হয়। চোখ ও মন খোলা রাখতে হয়। এবং চলার পথও মসৃণ নয়। হয়ও না। এটা বুঝতে হবে। অল্পে খুশি থাকো। সেটা ভালো। তবে বুদ্ধি আর বল, কর্ম আর পৌরুষধর্মের সহায়ক। পুত্ররা এই বোধ ও বুদ্ধিতে পক্ব হলেই তিনি চলে যাবেন। এরজন্যই অপেক্ষা।
বছর গড়ালো বেশ কয়েক। একদিন জয় সিংহের মনে হল তাঁর অপেক্ষার দিন ফুরিয়ে এসেছে। পুত্ররা গুণবান। যথেষ্ট শিক্ষালাভ করেছেন। গদি সামলাতে পারবেন। তবে ধন্দ জাগে। ময়ূরধ্বজ বামনঘাটি ছেড়ে যাননি। তাঁর অভিপ্রায় বোঝা গেল না। ব্যাপার-স্যাপারও ভালো ঠেকছে না। তিনি এ বিষয়টা নিষ্পত্তি করে যেতে চান। সেই-ই ভালো।
সেদিন সকাল বেলা। সময় আন্দাজ ন-টা। জয় সিংহ দুই পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে বের হলেন। পুত্ররা ভাবলেন, পিতা হরিহরপুরের চৌহদ্দি একবার ভালো করে দেখে নিতে চান। হঠাৎ অশ্বগতি শ্লথ করে নেমে পড়লেন। সামনেই ময়ূরধ্বজ মহল। জয় সিংহ সেই মহলের অন্দরে প্রবেশ করলেন। তিনি জমিদার ময়ূরধ্বজকে দেখে রূঢ় কন্ঠে বললেন: ‘আপনাকে যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়েছে এই তালুক ছেড়ে যেতে। আপনার মতলব বোঝা গেল না। কী করতে চান আপনি?’ ময়ূরধ্বজ বললেন, ‘গজপতিরাজ আপনাকে হরিহরপুর উপহার স্বরূপ দিয়েছেন বটে। তবে আমি বামনঘাটি ছাড়ছি না। বিনা যুদ্ধে তো নয়ই। আমার সঙ্গে শক্তিপরীক্ষায় নামুন। তরবারি যুদ্ধে। যিনি জিতবেন, বামুনঘাটি তাঁর।’
জয় সিংহ ক্রুদ্ধ। কিন্তু রোষ-তেজ চেপে স্বাভাবিক গলায় বললেন: ‘রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে কেন নামছেন? আমি ক্ষত্রিয়। আপনার কথায় আমার শোণিতে তপ্ত প্রবাহ বইছে। আপনি পুরীরাজের আবেদন মান্য করবেন না, বলছেন?’
ময়ূরধ্বজের কঠিন চোয়াল। বিকট হাসি। শত্রু তাঁর কবলে। যেন গুঁড়িয়ে দিতে পারেন সব। সব কিছু। বললেন, ‘তরবারি ধরুন। যিনি জিতবেন, বামনঘাটি তাঁর।’
আদি সিংহ ও যতি সিংহ কোষ থেকে তরবারি নিষ্কাশন করলেন। জয় সিংহ নিষেধের অঙ্গুলি সংকেত করলেন। তারপর ময়ূরধ্বজকে বললেন, ‘তবে আসুন। উন্মুক্ত ময়দানে। লড়াই শুধু আপনার আর আমার মধ্যে। আর কারুর নয়। যাঁর হাত থেকে প্রথম তরবারি পড়ে যাবে বা আঘাত করে একজন আর একজনকে ধরাশায়ী করতে পারবেন তিনিই জয়ী।’
তপ্ত নিশ্বাস বয়ে গেল। হুঙ্কার দিয়ে ময়ূরধ্বজ লম্ফ দিলেন। লম্ফটা দিলেন বটে তবে এই সময় তাঁর স্মৃতি ঝলকে ওঠে। কিশোরকালের মল্লক্রীড়া খেল। ‘ফরিখন্ড’ নাম তার। ‘ফরি’ অর্থ’ ঢাল এবং ‘খন্ড’ অর্থ অস্ত্র, তরবারি। সেসব দিয়ে শারীরিক কসরত, শরীর দুমড়িয়ে মুচড়িয়ে লম্ফ
ছিল প্রকরণ কৌশল। আজ সেই লোক-ক্রিয়া হয়তো কাজে লেগে যেতে পারে। ময়দান রণরণিত হয়ে উঠল। বাহান্ন ঘাটির এক ঘাটি, বামনঘাটি। সেখানের মানুষজনের গা শিউরে উঠল।

হঠাৎ দুই মানুষের লড়াই। কেমন জানি, চমকে দিল সবাইকে।
দুই শক্তিমান পুরুষের তরবারি যুদ্ধ ছিল ভয়ানক। স্থানটির নাম হয়ে গেছে সংগ্রামপুর। এখনও হয়তো আদিপুরের পুরোনো মানুষজনকে জিজ্ঞেস করলে আঙুল তুলবেন। একটা ঢিবি দেখিয়ে বলবেন;—‘এই-ঠি দেখন্তু’।
যাই হোক। সেদিন সকালটা কারও কাছে রমণীয় মনে হয়নি। হঠাৎ দুই মানুষের লড়াই। কেমন জানি, চমকে দিল সবাইকে। সে-লড়াইয়ে ময়ূরধ্বজের হাত থেকে প্রথম তরবারি পড়ে গেল। তাঁর দেহ ক্ষতবিক্ষত হল। এবং সে-লড়াই চলেছিল প্রায় এক বেলা ধরে। সূর্য তখন পাটে বসেছে। অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। ব্যস্ত পথিক ঘরে ফিরছিল। যেসব পাখিরা বৃক্ষশাখায় দোল খাচ্ছিল কিংবা ওড়াউড়ি করছিল তারাও নির্জনতা খুঁজে নিল। বিশ্রাম, শান্তি। কিন্তু রোষানলের চরিত্র ভিন্ন। তপ্ত দহন। সেই দহনে ময়ূরধ্বজের জীবন নির্বাপিত হত। তা হয়নি। কারণ, ময়ূরধ্বজের স্ত্রী এসে কাতর অনুনয়-বিনয় জানালেন। প্রাণভিক্ষা চাইলেন। জয় সিংহের মনটি নরম হল। জয় সিংহ স্থান ত্যাগ করলেন। পিতার গর্বে পুত্ররা গর্বিত। তাঁরা পেছনে পেছনে চললেন। বিজয়ী বীরের মতো। তাঁদের নিষ্ক্রমণ, অশ্বক্ষুরের আওয়াজে মাটি কাঁপে। ধুলো ওঠে, হাওয়া চঞ্চল। এরপর আর ময়ূরধ্বজের কোনো সংবাদ ছিল না। কেউ বলেন, তিনি লজ্জায় দেশান্তরি হয়েছেন। কেউ বলেন, আত্মহত্যা করেছেন। সত্যাসত্য অবশ্য জানা যায়নি।
নাহ! জয় সিংহ সেই মুহূর্তে ফিরে যেতে পারেননি, জয়পুরে। কুড়ি বছর গদি সামলিয়েছেন। মনে মনে ভাবলেন, শাসন হল ঢের। এবার ফিরতেই হবে। তবে ফিরে যাওয়ার আগে হরিহরপুরকে দুটি ভাগে বিভক্ত করলেন। ময়ূরভঞ্জ ও কেওয়নঝাড়ে। আদি সিংহ আদিপুরে দুর্গ গড়ে তুললেন। আর, যতি সিংহ বৈতরণী নদীপাড়ে যতিপুরকে নতুন করে সাজিয়ে নিলেন। জয় সিংহের দুই পুত্র পদবিতে আর সিংহ ব্যবহার করেননি। পিতার দর্পিত কীর্তি ‘ভঞ্জ’ অর্থাৎ বামনঘাটির পাষাণ ভেঙেছেন। ভেঙেছেন অহং। —তাই তাঁরা নামের সঙ্গে পদবি জুড়েছেন ‘ভঞ্জ’। আজও ময়ূরভঞ্জের নাম উঠলে, মনে হবে পশ্চাৎকাহিনি অমলিন। ইতিহাস সাক্ষী। কিন্তু নতুন প্রজন্মের মানুষও বলবেন, তাই নাকি! বড়ো আশ্চর্য তো!
শারদীয়া রঙবেরঙ, ১৪০৯
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন