রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার
এক প্রতাপ, প্রতাপ সিংহ অসমরাজ। হরেক নাম। বুড়া রাজা। খুব তাঁর বুদ্ধি। তাই তাঁর নাম বুদ্ধি স্বর্গনারায়ণ। শখ ছিল বটে এক। সময় পেলেই হাতি ধরতেন। হাতির সঙ্গে ভাব-সাব। তাঁর হেপাজতে ছিল অনেক হাতি। রাজার ঘোড়াশালে ঘোড়া। হাতিশালে হাতি, থাকতেই পারে। কিন্তু অসম রাজার অনেক অনেক হাতি। এ নিয়ে কী কম ছড়া! একটা শোনাই:
রাজার হাতি, কই হাতি
হাতি কোথা?
ওই ফালে (দিকে),
বঁা হাতে—
হাতিশালে।
কোথা সেই হাতিশাল?
ওই ফালে
ডান দিকে—
কত আছে! কে জানে?
জানে তা মিরমদন।
আর জানে, সংখ্যাবাচক
বংশীবদন।
বংশী বলে,—
এত গুনে কাজ কী!
হাতির মালিক বুড়া রাজা
গজপতি—
বুদ্ধি ঢের স্বর্গনারায়ণ।

তাঁর ঘোড়াশালে ছিল অনেক ঘোড়া। প্রতিটি ঘোড়ার একেকটি নাম ছিল।
আর এক প্রতাপের কথা বলি। কাছারিরাজ। সাধাসিধে! তাঁর আবার ঘোড়া বাতিক। ঘুমুতে গেলেই নাকি স্বপ্ন দেখেন। ঘোড়া ছোটে। টগবগিয়ে। তাঁর ঘোড়াশালে ছিল অনেক ঘোড়া। প্রতিটি ঘোড়ার একেকটি নাম ছিল। তবে তাঁর তিনটি ঘোড়া ছিল খুব প্রিয়। তাদের নাম হান্ডি, মান্ডি ও শান্ডি। তিনটি ঘোড়াকে কাছারিরাজ যশোনারায়ণ বীরবাহাদুর বলে ডাকতেন। সেটা অবশ্য পরের ঘটনা। প্রথমে তিনটি ঘোড়াকে ওই নামে ডাকা হত। রাজামশাইয়ের কোনো অসুবিধা ছিল না। কারণ হান্ডির রঙ সর্বৈব সাদা। মান্ডির রঙ কালো। শান্ডির রঙ বাদামি। ঘোড়াগুলো রাজার ডাক চিনত। রাজার হেঁড়ে গলা শুনত হান্ডি, সুরেলা গলা শুনত মান্ডি এবং বড়োগলা অর্থাৎ উচ্চ রব শুনত শান্ডি।
কিন্তু অসুবিধায় পড়তেন, রানি চন্দ্রকলা। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারতেন না। হ্রেষাধ্বনি বা রাজা কোন ঘোড়ায় চড়বেন, কাকে ডাকছেন। এ নিয়ে অন্তঃপুরে কম হাসাহাসি হত না। যাইহোক, শেষে রাজা স্থির করলেন, রানির সুবিধের জন্য বললেন—বীরবাহাদুর এক, বলে যখন ডাকা হবে, তখন বুঝতে হবে; সাদা ঘোড়া হান্ডি। বীরবাহাদুর দুই, অর্থে কালোঘোড়া মান্ডি এবং বীরবাহাদুর তিন, বললে চিনতে হবে শান্ডিকে। রানি কৌতুকে হাসতেন।
রাজার পোশাকি নাম যশোনারায়ণ। তবে প্রজারা দিয়েছিল নাম,—শত্রুদমন। ওই নাম এমনি এমনি আসেনি। জয়ন্তিয়া রাজা ধনমানিক। তাঁকে পরাজিত করে এমন নতুন নাম পেলেন। জয়ন্তিয়া রাজা কাছারিরাজ যশোনারায়ণের সঙ্গে সন্ধি করলেন। সন্ধি শর্তে ওই তিনটি ঘোড়া হান্ডি, মান্ডি ও শান্ডিকে পেয়েছিলেন।
কাছারিরাজ ঘোড়া মান্ডিতে চেপে যুদ্ধ করেছেন ঢের। হান্ডির পিঠে চেপে বিয়ে করতে গিয়েছিলেন। রাজপুরীতে এলেন রানি চন্দ্রকলা। আর শান্ডি ঘোড়ায় চেপে একটি বড়ো অভিযানে বেরিয়েছিলেন। এবার সেই গল্পটা বলি।
জয়ন্তিয়ারাজ ধনমানিকের পুত্রসন্তান ছিল না। তাঁর মৃত্যুর পর কাছারিরাজ যশোনারায়ণ ওরফে শত্রুদমন একটা কাজ করলেন। কর্তব্য মনে করেই করলেন। ধনমানিকের ভ্রাতুষ্পুত্র যশোমাণিককে সিংহাসনে বসালেন। বেশ ধুমধামের সঙ্গে।
কাছারিরাজ বললেন: যশোমাণিক, তোমাকে আমি সাহায্য করব। তোমার কোনো চিন্তা নেই। প্রজাকল্যাণে মন দাও। রাজধর্ম, বড়ো ধর্ম। তোমার এখন সেটাই দেখার। যশোমানিক নতশিরে বললেন—আমার চেষ্টায় ত্রুটি হবে না। যশোমানিক মুখে বললেন বটে, চেষ্টায় ত্রুটি হবে না। কিন্তু তিনি হাঁটলেন ভিন্ন পথে। বিপরীত দিকে। দুষ্টু লোকের পাল্লায় পড়লেন। তাই কাছারিরাজের ছত্রছায়া বড়ো অসহ্য ঠেকল। তিনি অসম রাজার আশ্রয়ে গেলেন। অসমরাজ এমন একটি সুযোগ খুঁজছিলেন। কাছারি রাজাকে বিপাকে ফেলতে চাইলেন।
কাছারি রাজ যশোনারায়ণ জয়ন্তিয়ারাজ যশোমানিকের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরলেন। বাধ্য হয়েই ধরলেন। তিনি শান্ডি ঘোড়ায় চেপে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। যদিও জয়লাভ সহজে ঘটেনি। ঘটেছিল অবশ্য অল্প সময়ের জন্য।
এখন কাছারি রাজার কথা থাক। তার চেয়ে গল্প শোনাই দুই প্রতাপের কান্ড।
অসম বা অহম রাজা প্রতাপ সিংহ, বুড়া রাজা, বুদ্ধি স্বর্গনারায়ণ। তাঁর প্রতাপ খুব বেশি। তিনি দু-বাহ প্রসারিত করে জয়ন্তিয়া রাজা যশোমানিককে ডাকলেন। —এসো, স্বয়ং অসম রাজা তোমার সহায়। তোমার নিরাপত্তা নিয়ে ভাবনা কীসের? এগিয়ে চলো। উন্নত শিরে চল। তোপবারুদের অভাব নেই। অসম রাজা অভয় দিয়েছেন। কথা ক-টি রাষ্ট্র হল। রাস্তায় দুই পাগলের চিৎকার শোনা গেল। তারা অবশ্য বলে, গান গাইছি। কখনও বলে ছড়া শুনবে নাকি! পান্থজন কৌতুকে মজে ওঠে। কখনো-বা তারা দু-একটি কথা বলে উসকিয়ে দেয়। সেখোঁচায় রস ঝরে। আমোদ হয় তাদের। এখন অবশ্য তারা ছড়া বলছে। একজন বলে তো অন্যজনে ধুয়ো দেয় যেমন:
তোপ বারুদের অভাব নেই
লোক লশকরের খামতি নেই।
রাজার বড়ো মুখ হাঁ,
চাইবি তো সুযোগ বুঝে চা
তবে বুঝেসুঝে যা।
আমজনতার মধ্যে কেউ কেউ মুখ টিপে হাসল। কেউ বা বলল, তোমরা কাদের পাগল বল? এর থেকে সত্যকথা, খাঁটি কথা আর কী আছে! তো এমন ছড়ার কথা জয়ন্তিয়া রাজার কানে গেল। কিছু করার অবশ্য ছিল না। কিছুটা সতর্ক হবার কথা চিন্তা করলেন। তবে ওই পর্যন্তই। তিনি একটি সমস্যায় পড়েছেন। কথা দিয়ে ফেলেছেন। তাঁর কন্যা রূপমতিকে রাজা প্রতাপ সিংহের সঙ্গে বিয়ে দেবেন।
অসম রাজাও রাজি। তবে জয়ন্তিয়ারাজ একটা শর্তের কথা বলেছেন।
অসমরাজ জিগ্যেস করলেন; —কী সেই শর্ত?
জয়ন্তিয়া রাজা বললেন: আমার কন্যা রূপমতিকে বিয়ের পরে, কাছারি রাজ্যের রাজপথ দিয়ে নিয়ে যেতে হবে; অসম রাজ্যে।
অসম রাজা একটু ভেবে নিয়ে মনে মনে বললেন, যুদ্ধ এড়ানো সহজ নয়। এখন সেটাই করতে হবে। শেষে অসম রাজা বললেন: তাই হবে।
গ্রীষ্মের দিন দুপুর। মাথার ওপর গনগনে সূর্যের আঁচ। দূত একটু পথ ঘুরেই এল। ঘর্মাক্ত। ক্লান্তও বটে। অদূরে রাজবাড়ি। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে একটি গাছের নীচে বসল। জায়গাটি নির্জন। পাতা খস খস শব্দ। অনেক শাল গাছ সোজা দাঁড়িয়ে। সেসবের ফাঁক গলে রাঙা সূর্য দেখা যায় বটে। তবে তাপ নেই। একেবারেই নেই। দূত একটুখানি বসল। বিশ্রামের জন্য। নামেই বিশ্রাম। উঠে পড়ল দ্রুত। কাছারি রাজসভায় হাজির হল। দূত কেবলই পত্রবাহক। কাছারি রাজসভায় এসে নতশিরে রাজাকে অভিবাদন জানাল। কাছারিরাজ যশোনারায়ণ বিস্ময়ে আগন্তুককে দেখলেন। আন্দাজ করলেন অসম নিবাসী। কারণ তার মাথায় সুদৃশ্য টোকা। এমন টোকা রঙালি বিহুর দিনে অসমের যুবক-যুবতীরা মাথায় দিয়ে নাচ করে। রোদ তেজ থেকে বঁাচার জন্যও ব্যবহার করে সৌখিন যুবক-যুবতী।

কাছারিরাজ যশোনারায়ণ বিস্ময়ে আগন্তুককে দেখলেন। আন্দাজ করলেন অসম নিবাসী।
কাছারিরাজ দূতের দিকে নরমদৃষ্টিতে চাইলেন। জিজ্ঞেস করলেন,—বলুন, আপনি কী বলবেন?
দূত কোমরবন্ধ থেকে সুদৃশ্য নকশাকারি পাটনপত্র (সূক্ষ্ম দুই পাটার মধ্যে বাহিত পত্র) বের করে রাজার কর্মচারীর হাতে দিলেন। রাজা সেটি নিয়ে বেশ মন দিয়ে পড়লেন। পড়েই ভীষণ খেপে গেলেন। অবহেলাভরে সেটি দলা পাকিয়ে নিক্ষেপ করলেন। অসম রাজাকে কটুকাটব্য করলেন। — এ হবার নয় ভীরু রাজার প্রস্তাব ঘৃণা করি। আমার রাজ্যের ভেতর থেকে অসম রাজার রানি কেন, একটি প্রাণীও গলতে পারবে না! যুদ্ধ হোক, যুদ্ধ!
সেই যুদ্ধ শুরু হল। অসম রাজা ঢের সৈন্য পাঠালেন। কাছারি রাজাও পিছিয়ে রইলেন না। ভয়াবহ যুদ্ধ হল। নিষ্পত্তি হল না। পরদিন সকালের জন্য অপেক্ষা। ব্রহ্মপুত্র নদ উপত্যকায় দুই পক্ষের দীর্ঘ যুদ্ধ হল বেশ। কিন্তু কাছারিদের কৌশলের সঙ্গে অসম রাজা পেরে উঠলেন না। কাছারি সৈন্য পথ পালটিয়ে গেল উত্তরে। ধানসিড়ি উপত্যকায় এবং উত্তর কাছারের পাহাড়ের গায়ে লুকিয়ে রইল। জায়গাটির নাম হিড়িম্বাপুর। হিড়িম্বাপুরে হঠাৎ বৃষ্টি এবং হঠাৎ রোদে দিনটি যুদ্ধের অনুকূল ছিল না।
সন্ধ্যায় শিবির পড়ল। আহার বিশ্রামের তোড়জোড় চলছে। সেনাপতি ভীমদর্প কিছু একটা ভাবছেন। এমন সময় রাজার বিদূষক এসে উপস্থিত হলেন। হাতে বঁাশি। একটু আগে বঁাশিতে সুর ধরেছিলেন। ভীমদর্প উঠে দাঁড়ালেন।
বিদূষক হাসলেন। উঠলেন কেন?
—বা: উঠব না? একে তো বয়স্ক, বহু মান্য মানুষ। তাই রাজার প্রিয় সহচর, বিদূষক। — ভীমদর্প মৃদু হেসে হেসে বললেন। বিদূষক এবার হো-হো করে হাসলেন। তারপর, ভিজে, নরম ঘাসের উপর বসে পড়লেন। বঁাশিতে সুর তোলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু ভাব এল না। কথা বলতেই তাঁর ভালো লাগছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন; —সেনাপতি মশাই, এ জায়গার অদ্ভুত নাম। হিড়িম্বাপুর। কেন? ভীমদর্প বললেন, একটা প্রবাদ আছে। কাছারিরা মনে করেন, তারা ঘটোৎকচের বংশধর। কথিত হয়। ঘটোৎকচ হিড়িম্বা রাক্ষসী ও ভীমের সন্তান। মহাভারতের এ কাহিনি নিশ্চয়ই জানেন। পান্ডু রাজার মধ্যম পুত্র ভীম যুদ্ধের উদ্দেশ্যে অসমে আসেন এবং হিড়িম্বাকে বিয়ে করেন। তাঁদেরই সন্তান ঘটোৎকচ।
পরবর্তীকালে কাছারিদের রাজধানী হয় এই হিড়িম্বাপুর, এবং রাজার নামের আগে শিরোপা দেওয়া হয় ‘হিড়িম্বেশ্বর’। থাক এসব কথা থাক। আপনি এখন বিশ্রাম করুন। মশাল জ্বলছে বটে। তবে বৃষ্টি এলে নিভে যেতে পারে। —ভীমদর্প বললেন।
—ঠিক বলেছেন! সেনাপতি মশাই, আপনিও উঠুন। আহারাদি সারুন। রন্ধনশালার কর্ম শেষ হয়েছে এতক্ষণে। এখন উঠলেই হয়। বিদূষক শিবিরের দিকে পা বাড়ালেন। যেতে যেতে বললেন,—আপনার নামের সঙ্গে এ জায়গারও একটা মিল আছে। ভীমদর্প চোখে চোখে শুধু হাসলেন। কিছু বললেন না।
পরদিন আকাশের মুখভার। ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি। মেঘ ও রৌদ্রের খেলা চলছে। যুদ্ধও থামল না। অসম রাজার সৈন্যরা তীব্র বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ল কাছারি সৈন্যের ওপর। এই যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন সুন্দর গোঁহাই ও তাঁর পুত্র আখেক।
যুদ্ধ নিষ্পত্তি হল দুপুর দুপুর। শোচনীয় পরাজয় হল কাছারি রাজার। অসম রাজা বললেন,—যশোনারায়ণ, দু-বার সুযোগ পেয়েও আপনার সিংহাসন রক্ষা করেছি। এবারও ক্ষতি করব না। আপনার এক জন সৈনিককেও বন্দি করব না।
— তবে কী চান আপনি? যশোনারায়ণ অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন।
অসমরাজের মুখটি কঠিন হল। বললেন,—চাই শুধু একটা জিনিস। জয়ন্তিয়া রাজকন্যা আপনার রাজ্যের ভেতর দিয়ে অসম রাজ্যে প্রবেশ করবেন। এবং আপনার রাজপথ জয়ন্তিয়া ও অসম রাজার প্রয়োজনে উন্মুক্ত রাখতে হবে। রাজপথ খোলা থাকবে না বন্ধ হবে। এখুনি আদেশ শুধু নয়, সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করুন। কাছারি রাজা যশোনারায়ণ সবিনয়ে অসমরাজার আরোপিত শর্ত মেনে নিলেন। না মেনে উপায় ছিল না।
১৬০৬ সালের নভেম্বর মাসের এক শীতসকালে রাজকীয় শোভাযাত্রা সহকারে জয়ন্তিয়া রাজকন্যা রূপমতিকে নিয়ে যাওয়া হল অসম রাজ্যে। এত বড়ো শোভাযাত্রা দুই রাজ্যের নাগরিকরা নাকি দেখেননি। দেখেননি, সহস্র বিহু ঢোলের বাদ্য, একসাথে।
পাঠকদের দুই পাগলের কথা মনে থাকতে পারে। তো সেদুই পাগল একে অপরকে বলছে:—
কেমন ঘটা, বর্ণছটা
ঘটা পটা, রাস্তা জুড়ে
রাজার বিলাস
আমরা জানি অন্তঃপুরে
দাঁড়িয়ে থাকি ভাই
শীতসকালে...
রাজপথ নিয়ে কান্ড আপাতত মিটে গেছে। মেটেনি শুধু দুই রাজার বিবাদ। কাছারি রাজা গোপনে যুদ্ধের আয়োজন করছিলেন। যুদ্ধে জয়ী হতে হবে। হতেই হবে, ছলে বলে কৌশলে। কথায় বলে না, লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। অঢেল অর্থের লোভে অসম রাজার সীমান্ত সৈনিক সুন্দর গোঁহাই অসম রাজার রণনীতি ফাঁস করে দিলেন। সুন্দর গোঁহাই মানুষটি হয়তো খারাপ ছিলেন না। তাঁর পুত্র আখেক পিতার সঙ্গেই কাজ করতেন। মর্যাদা ছিল সেনানায়কের। তো আখেক পিতাকে প্ররোচিত করেছেন। মনটিকে প্রলুব্ধ করেছেন। অথচ এই দুটি মানুষ অসম রাজার পক্ষে যুদ্ধ করেছেন ঢের। অসম রাজার বিশ্বাসী এই দুই সৈনিক রাজাকে ঠকালেন।
অসমরাজ মনে করলেন। যুদ্ধের পরিস্থিতি নেই। নওগাঁও-তে বিশাল সৈন্য চৌকি ছিল। কেবল রাহা বলে যে স্থানটি ছিল, সেখানে সৈন্য রইল সুন্দর গোঁহাই-এর নেতৃত্বে তুলে নিলেন। অসম রাজা সরে যেতেই পিতাপুত্র দুজনাই পালিয়ে গেলেন অন্যত্র। সীমান্ত চৌকি পড়ে রইল অরক্ষিত। এই সুযোগে কাছারিরাজ সেনাপতি ভীমদর্প রাতের অন্ধকারে অসম রাজ্য আক্রমণ করলেন।
ইতিমধ্যে অসম রাজার গুপ্তচরেরা তথ্য দিল রাজাকে। অর্থ উপটৌকন পেয়ে সরে পড়েছেন পিতা-পুত্র। অসমরাজা হুকুম দিলেন পিতা ও পুত্রের মৃত্যুদন্ডের।
কিন্তু বড়ো দেরি হয়ে গেছে। কাছারি রাজা যশোনারায়ণ অসম রাজ্যে ঢুকে পড়লেন বীরদর্পে। যুদ্ধে জয়ী রাজা নিজেকে সদর্পে ঘোষণা করলেন রাজাধিরাজ প্রতাপ নারায়ণ। বাহুবলের প্রতাপ কিছু কি কম! ঘোষণা করলেন, তাঁর রাজধানী মাইবুং-এর পরিবর্তে হবে কিরীটপুর।
অসম রাজা প্রতাপ সিংহ পরাজয় মেনে নিয়েছেন। না মেনে উপায় নেই। নিথর দাঁড়িয়ে রইলেন।
কাছারি রাজা প্রতাপনারায়ণ সহর্ষে লম্ফ দিতে লাগলেন। দুই প্রতাপের কান্ড দেখতে পুরনাগরিকগণ ভিড় জমিয়েছেন। পুরনারীরা পুষ্প ছড়াচ্ছেন। প্রতাপনারায়ণের সারা শরীরে পুষ্পছটা লক্ষ করা যাচ্ছে।
কাছারি রাজার অবশ্য এমন কান্ড ভালো লাগছিল না। তিনি হঠাৎ এক পুরবালিকার পুষ্প থালি থেকে একমুঠো পুষ্প তুলে নিয়ে অসম রাজা প্রতাপ সিংহের দিকে ছড়িয়ে দিতে দিতে বললেন;—মান্যরাজার মান এভাবেই রাখতে হয়। অসম রাজার চোখে-মুখে ঝিলিক। স্মিতহাস্যে অভিবাদন জানালেন গর্বিত রাজা প্রতাপনারায়ণকে।
অজগর, ছড়া উৎসব সংখ্যা, ২০০৮
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন