রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার
ভাদ্রমাস। ঝিরঝিরে বৃষ্টি। তবে অবিরাম নয়। গরম একটু বেশির দিকেই বলতে হবে। অবশ্য, বৃষ্টির জন্য কিছুটা স্বস্তিও বোধ করছেন মুখসুদাবাদবাসীরা। ব্যারা-উৎসবের দিন দুই বাকি আছে। এবার উৎসবের জাঁক ভারি। মুখসুদাবাদের নতুন নামকরণ হয়েছে মুর্শিদকুলি খাঁ-এর নামে। তিনিই নবরূপায়ণ ঘটিয়েছেন। নাম হয়েছে মুর্শিদাবাদ। তবে নতুন নাম গণমনে স্থায়ী আসন পায়নি। সময় লাগবে। সুবৃদ্ধ মানুষের কাছে পুরোনো নামটিই পছন্দ। তাঁরা বলেন, নামের ঐতিহ্য আছে না! নব্য যুবকরা বলেন, ঐতিহ্য ধুয়ে জল খাব? নতুন নবাব দেশটা কীভাবে গড়ছেন। তার গুরুত্ব নেই? হোক না তাঁর নামে এমন নামকরণ। আমরা সুখে থাকলেই হল!
পুরোনো মানুষজন সায় দেন, তা বটে!
আমরা যে সময়ের কথা বলছি, সেই সময়, মুর্শিদকুলি খাঁ সদ্য নবাব হয়ে এসেছেন। তিনি নতুনভাবে জনপদ গড়ে তুলছেন। সম্রাট ঔরঙ্গজেবের প্রিয়পাত্র মুর্শিদকুলি খাঁ ঢাকা থেকে রাজধানী সরিয়ে এনেছেন। বাংলার রাজধানী গড়ে তোলার জন্য ভাগীরথীর তীরে তাঁর পছন্দ। সহায়ও বটে। তাঁর এই প্রতিষ্ঠাকে একটা উৎসব হিসাবে পালন করতে চান। তাই, পবিত্র ভাগীরথীর বুকে আলোক-উৎসবের আয়োজন। শতশত তরণি ভাসবে। সেসব আলোকমালায় সাজানো হচ্ছে। এই উৎসব দেখার জন্য নানা প্রদেশ থেকে জনসমাগম হবে। ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে পান্থশালা। অতিথিনিবাস। নদীতীর বরাবর কিছু অস্থায়ী আবাস-ও তৈরি হয়েছে। আমজনতার কথা ভেবেই।
নবাবের আলোকযানটি সর্ববৃহৎ। দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে প্রায় একশত হাত। তাতে নানা প্রকোষ্ঠ। পরিপূর্ণ ফলমূল। নানা রঙিন কাপড়, রেশম সিল্কের পতাকা, স্বর্ণবর্ণ চাঁদোয়া ও ঝালর এবং রুপোর হাতলে বহুমূল্য রত্ন দিয়ে সাজানো হয়েছে তরণিখানি। নয়ন-মোহন। বৃহৎ এই তরণির হাতায় শত শত প্রদীপ সাজানো হয়েছে। তেল-কর্পূরের বাতি জ্বলছে। তবে সর্ববৃহৎ সোনার বাতিটি নজর এড়াবার নয়। প্রায় মাসাবধি ভাগীরথীর উপর ভাসছে নবাবের তরণি সহ অজস্র তরণি। মহড়ার জন্য। একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে চলার পর তীরে এসে থামে। তখন তোপধ্বনি হয় মুহুর্মুহু। অবশ্য শুরুর আগেও তোপধ্বনি হয়। তবে সেটা বেশিক্ষণের জন্য নয়। নবাবের আলোকযানটি যখন থামে শুধু তোপধ্বনি হয় না—শুরু হয় অগ্ন্যুৎসব। নানাপ্রকারের আতশবাজি যেন আকাশ ফুঁড়ে বের হয়। বর্ণমালা। আর তার শব্দচমকে চারিদিকে বিদীর্ণ হয়। আতশবাজির ধূম্ররাশি মেঘমালার স্তর ভেদ করে যায়। কখনো বা তোপধ্বনি ও বাজির অদ্ভুত শব্দে পাখিরা ডানা ঝাপটায়। নদীজলের স্রোতে ভাসে শৈবাল। হাওয়া শনশন। গাছের পাতায় কাঁপন লাগে। পাখিদের উড়ুত ফুড়ুত—সেবড়ো দৃশ্যময়। এই সময় নবাবের অলৌকিক জলযানটি স্থির, নিশ্চল থাকে। কৌতূহলী মানুষ চোখ ভরে দেখে নেয় সেই হীরকদ্যুতি।
কিন্তু এহেন উৎসবকে বঁাকা চোখে দেখছেন একজন। তিনি মহম্মদ আজিম। সম্রাট বাংলার সুবাদার নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু অর্থলোভী এই মানুষটি বদনাম কুড়িয়েছেন ঢের। স্বার্থের অন্ধিসন্ধিতে তাঁর ছিল ঘোরাফেরা। সম্রাট এসব জেনে ফেলেছেন। তাই তাঁর মনপসন্দ মুর্শিদকুলি খাঁকে বাংলার দেওয়ান করে পাঠালেন। ইতিপূর্বে তিনি বিশ্বস্ততার জোরে দাক্ষিণাত্যের দেওয়ানগিরি করেছেন। অভিজ্ঞ হয়েছেন। তিনি বাংলার দেওয়ান হয়েই ঢাকা থেকে রাজধানী সরিয়ে আনলেন মুর্শিদাবাদে। সম্রাট তাঁর কর্মদক্ষতায় এতখানি প্রীত হয়েছেন যে, রক্তবন্ধন অস্বীকার করে বাংলার সুবাদারি মুর্শিদকুলি খাঁকেই দিলেন। মহম্মদ আজিমকে সরিয়ে দিলেন। সুতরাং নতুন নবাবের বাড়বাড়ন্তকে মহম্মদ আজিম বিষ নজরে দেখবেন—সেটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে, মুর্শিদকুলি খাঁ মুর্শিদাবাদে গণবন্দনা পেলেন। তাঁর কাছে হিন্দু-মুসলমান সমান সমান। কাজকর্মে দুই ধর্মের মানুষকেই ঠাঁই দিয়েছেন। সেইসব নিয়ে অনেক গল্প আছে। আমাদের গল্প ভিন্ন।
বাংলার অন্দরে, বন্দরে বণিকদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। তাঁরা অবাধে বাণিজ্য করছেন। কিছু বললেই বলেন, সম্রাটের ফরমান আছে না! নবাব বললেন,—
কীসের ফরমান? শুল্ক দাও। বাণিজ্য করো।
সম্রাট তখন ফারুকশিয়র। চিররুগণ। ভয়ানক ব্যাধি। যা-ই হোক, সম্রাটের দরবারে ইংরেজ বণিকরা সারমান ও হ্যামিলটন সাহেবকে পাঠালেন। তাঁরা গেলেন দূত হয়ে। নবাবের বিরুদ্ধে নালিশ জানাবেন। তাঁরা নালিশও জানালেন। তাতে যে খুব ফল হওয়ার কথা, তা নয়। হ্যামিলটন সাহেব একজন সুদক্ষ চিকিৎসক। তিনি সম্রাটের চিকিৎসা করলেন দীর্ঘদিন ধরে। সম্রাট সেরে উঠলেন। সম্রাট তো বেজায় খুশি। হাতের পাঞ্জা দিলেন। ফরমানও দিলেন নতুন করে। বললেন, বাংলায় ব্যাবসা করুন আপনারা। নি:শুল্কে।
বণিকরা যেন চাঁদ হাতে পেলেন। ফলে যত্রতত্র ঘুরে বেড়ান। বাণিজ্য করেন। করের প্রশ্ন ওঠবার কথা নয়। কিন্তু বাধ সাধলেন স্বয়ং নবাব। বললেন, ওটি হবে না। শুল্ক দাও। দিতেই হবে।
পূর্বতন সুবাদার মহম্মদ আজিম এখন মুর্শিদকুলি খাঁ-র শত্রু। ষড়যন্ত্রের জাল বুনছেন। তিনি বণিকদের বললেন,—সম্রাটের কাছে খত (চিঠি) লিখে দিচ্ছি। আপনারা দল বঁাধুন। আর্জি জানান সবাই মিলে। ফল ফলবেই।
কিন্তু রাজার রাজা যিনি, এমন শক্তিমান—তাঁকে নবাবি দিয়েছেন। সেই মানুষটিকে শায়েস্তা করা যে-সেকর্ম নয়। সারমান ও হ্যামিলটন সাহেব সম্রাটকে আরও একবার বললেন—জনাব, বাংলা থেকে মুর্শিদকুলি খাঁকে সরিয়ে দিন। বড়ো জ্বালাচ্ছেন।
সম্রাটের চোখ কপালে উঠে গেল। ‘সেটি পারব না। স্বয়ং ঔরঙ্গজেব তাঁকে নবাবি দিয়েছেন। আমি টলাব সে-সাধ্য নেই।’ সম্রাট ক্ষীণকন্ঠে বললেন।
হ্যামিলটন সাহেব মানুষটি ভালো। মনে মনে ভাবলেন, তিনি চিকিৎসক। সেবাধর্ম মূল কাজ। তাই নিয়ে থাকবেন। সাতে-পাঁচে নয়। কিন্তু সারমান সাহেব সেরকমটি নন। কুটিল। তিনি পূর্বতন সুবাদারের দোস্ত।
প্রাক্তন সুবাদারও নানারকম ফন্দি আঁটেন। নবাবকে জব্দ করার সুযোগ খোঁজেন। স্থির হল, ব্যারা-উৎসবের সময় অতর্কিতভাবে কামান দেগে ব্যারা-উৎসব পন্ড ও নবাবকে হত্যা করা হবে। ব্যারা উৎসবের দিনে, বিশেষ করে সন্ধের সময়, আলোকযানটিতে স্বয়ং নবাব হাজির থাকেন দলবল নিয়ে। অনুষ্ঠানের আগের দিনটিতেও নবাব একবার আসেন তদারকিতে। কিন্তু সঙ্গে থাকে সৈন্যবাহিনী। আর, প্রহরারত রক্ষীর দল। নবাবকে আলাদা করে সহজে চেনা যায় না।
মাসাবধি মহড়ার সময় তরণির উপর এক নবাব থাকেন বটে। নকল নবাব, ডামি।
আজ বুধবার। সন্ধ্যায় নবাব এলেন। আগামীকালের অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা স্বচক্ষে দেখবেন। গায়িকারা গীত পরিবেশন করলেন। নৃত্যাঙ্গনারা নৃত্য। কবিয়াল, স্বভাবকবিরা নবাবের কীর্তিগাথা বর্ণনা করছেন। তোপধ্বনি, আতশবাজির শব্দতরঙ্গ ভাগীরথীর জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে কেমন জানি মিশে গেল। নবাব প্রত্যক্ষ করলেন। নবাবের মুখে প্রসন্নভাব, আলগা হাসি দেখে রাজকর্মচারীরা খুব খুশি। ব্যবস্থাপনায় হয়তো ত্রুটি নেই। তাই আত্মতৃপ্তি। কিন্তু নিরাপত্তারক্ষীরা আগাম সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। উৎসবের দিনে, চক্রান্ত করে কামান দেগে নবাবকে হত্যা করার পরিকল্পনা হচ্ছে। কিন্তু এই তথ্যটি ফাঁস হয়ে গেল। কেমন করে হল? সেটাই বিচিত্র খবর।
আজিম খানের প্রাসাদে এসেছেন সারমান সাহেব। তখন বেলা আন্দাজ দশটা। আজিমগঞ্জে সেদিন হাট বসেছে। সাপ্তাহিকী হাট। ভিড় একটু বেশি। সাহেব ঘোড়ার গাড়িতে বসে তামাকু সেবন করছেন। মজে রয়েছেন। একসময় চটকা ভেঙে বিরক্তি প্রকাশ করলেন। — আর কিতনা টাইম? হম রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে? কোচোয়ান গফর মিয়া আমতা আমতা করে বলল,—একটু দেরি হচ্ছে, পথ চিনতে। হুজুর। এখানে আমার দোস্ত থাকে। তাকে সঙ্গে তুলে নেব?
সাহেব কিছু একটা বুঝলেন। তবে এদেশে এসে দোস্ত শব্দটাকে বুঝে ফেলেছেন। তাই বললেন,—দুস্ত? হ্যাঁ, হ্যাঁ।
গফর মিয়া পথ চলতে চলতে একটি হাড়ি-কলসির দোকানে এসে থামল।—গোপাল ভাই! ডাক দিতেই গোপালভাই একমুখ হাসি নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালেন। এবং গাড়িতে সাহেব দেখে সেলাম দিলেন। গফর মিয়া বলল—উঠে এসো। আজিমগঞ্জে আজিম খান সাহেবের প্রাসাদটি চিনিয়ে দাও। হুজুর সেখানে যাবেন।
গোপালভাই উঠে এসে গফর মিঞার পাশে বসলেন। গোপালভাই পথ চিনিয়ে চললেন। প্রায় আধ ঘণ্টাটাক চলার পর পৌঁছে গেল আজিম খানের প্রাসাদে। সারমান সাহেব এসেছেন। আজিমখান যথার্থ অভ্যর্থনা জানালেন। খানাপিনাও হল। সারাদিন ধরে সাহেব ও আজিম খান শলা করলেন।
এখানে গোপালভাইয়ের একটু পরিচয় আবশ্যক। তিনি স্বভাবকবি।
যত্রতত্র ঘুরে বেড়ান। তাঁর পুরো নাম গোপালকৃষ্ণ রায়। কিন্তু মানুষের ভালোবাসায় কৃষ্ণ ও রায় তিরোহিত। শুধু আদরের নাম গোপালভাই। আবাল-বৃদ্ধ-জনতার কাছে ওই নামেই চেনা। গোপালভাই তদগতচিত্তে গেয়ে চলেন—
ওরে মানুষ সব এক—
হিন্দু মুসলমানে ভেদ কেন,
জাতের বিচার নাই।
হক কথা, আসল জেনো—
কহেন গোপাল ভাই।

উৎসবের সন্ধ্যায় নবাব তাঁর রত্নখচিত বহুমূল্যবান হারটি গোপালভাইকে পরিয়ে দিলেন।
তো সেই গোপালভাই প্রাসাদের অলিন্দে কী সব শলা হয়েছে তা জেনে ফেলেছেন। সেই নিয়ে তাঁর কবিতা।—
কী হল রে জানো—
আজিম খানের প্রাসাদে,
সারমান এসে শলা করেন।
ভাগীরথীর তীরে,
ব্যারা-উৎসব দিনে,
কামান দেগে উড়িয়ে নিশান—
নবাব হারাবেন পরাণ।...
কথাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল, বাতাসে। ভাদ্রমাসের শেষ বৃহস্পতিবারে ব্যারা-উৎসব। স্বয়ং নবাবের আলোকযানটি দিশারি হয়ে ভাগীরথীর বুকে ভাসবে। তার পেছু পেছু চলবে আর সব। শত শত তরণি। সাঁঝপ্রদীপের আলোতে ভাগীরথীর জলে ঝিলিক তুলে। কিন্তু আরও একটা সংবাদ রটে গেল। বুধবারের সন্ধ্যায়। আজিম খান নজরবন্দি হয়েছে। কেউ-বা বললেন, দিল্লিতে পুত্রের কাছে সরে পড়েছেন। আর, সারমান সাহেবকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে গফর মিয়া বলল,—সাহেব ভেগেছে।
সেযা-ই হোক। উৎসবের সন্ধ্যায় নবাব তাঁর রত্নখচিত বহুমূল্যবান হারটি গোপালভাইকে পরিয়ে দিলেন। এবং বললেন,
সত্য বটে গোপালভাই—
তুমি রত্ন, মুর্শিদ-রত্ন।
তোমার তুলনা নাই।
সমবেত জনতা উল্লাসে ফেটে পড়ল।—আমাদের নবাব মহান। রসিকও বটেন। তাঁর জয় হোক। জয়।
কথা ক-টি বাতাসে ভাসল। জলে ভাসল তরণি। তোপধ্বনি মুহুমুহু। আতশবাজি উড়ল, পুড়ল। সেখানে তখন ছিল আনন্দের প্লাবন।
কিশোরভারতী, নভেম্বর, ২০০৩
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন