ধরিত্রীপুত্র

রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার

প্রায় সাঁজবেলা। সেদিন আর অন্য পাঁচটা দিনের মতো ছিল না। খুব ব্যস্ত থেকেছেন তিনি। সারাদিন মনটাও খুব ভালো নয়। তবুও ভালো রাখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তা হবার জো নেই। চারদিকেই অমঙ্গলের ছায়া। নমাজগৃহের ইমাম বলেছেন: কী দেখলাম। তুমি যখন নমাজ পড়ছিলে, লক্ষ করলাম, তোমার মুণ্ডুটাই নেই। ধড় থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে।

সেকী? আফজল খাঁ আঁতকে উঠলেন।

—হ্যাঁ, আফজল। এমনটাই দেখেছি। এমন অমঙ্গলের ছায়া কেন দেখলাম? আল্লা, ওঁর ভালো করুন। মঙ্গল করুন। এই কামনা করতে করতে ইমামসাহেব চলে গেলেন।

আফজল খাঁ ইমামসাহেবের দিকে অপলকে তাকালেন। পরক্ষণেই ভাবলেন। মনটাকে দুর্বল করবেন না। আগামীকাল বিশাল অভিযানে বেরুবেন। মনটাকে শক্ত রাখতেই হবে। তাঁর মন বলল, তুমি পারবে আফজল। তা না হলে, এমন নারকীয় ঘটনা ঘটালে কী করে। এই ভাবতে ভাবতেই হরীতকী গাছের নীচে এলেন। আরবি ঘোড়ার পিঠে বসেই লাগাম শক্ত করে ধরলেন। আবার তাঁর মন উচাটন হয়ে উঠল। হরীতকী গাছের মগডালে বসে ছিল দুই পাখি—শুক ও শারি। শুক বলল, চেয়ে দেখেছিস শারি।

শারি বলল, কী?

শুক বলল, এই গাছের নীচে এক হিংস্র পশু। শারি বলল, পশু কোথায়? ও তো একটা মানুষ!

শুক বলল, মানুষ না জল্লাদ! আজ দুপুরে, চৌষট্টি জন পত্নীকে হত্যা করেছে, তেষট্টিজনকে জলে ডুবিয়ে, এক জনকে গলা কেটে দিয়ে।

—কেন? কেন? —শারি উৎকন্ঠার সঙ্গে জিগ্যেস করল। শুক বলল, কাল সকালে শিবাজির সঙ্গে ওঁর যুদ্ধ। ওঁর মনে হয়েছে, যুদ্ধে ওঁর প্রাণ যাবে। ফলে বিবিদের দুর্দশা হবে। সেসব কথা শুনে শারি বলে উঠল, সুর করে:

গাছের নীচে ওই জল্লাদটি

মরণ তার নয় দূরে,

সেমরুক, মরুক সে,

লাগুক লাগুক এ অভিশাপটি।

আফজল খাঁ শুক-শারির কথোপকথন শুনে বেজায় চটলেন।

কৃপাণটি ছুড়ে মারলেন। ব্যর্থ চেষ্টা। শারি আবার বলল:

মৃত্যু আসছে ঘনিয়ে

পালিয়ে যা পালা,

পালা প্রাণ নিয়ে।

এবার আফজল খাঁ সত্যি দুঃখী, আরও দুঃখী হলেন। যেন মৃত্যুর ছায়া দেখতে পেলেন। বিবর্ণ, নি:সঙ্গ আফজল খাঁ স্থানটি ত্যাগ করলেন; হাঁফাতে হাঁফাতে।

একটা বড়ো সভা ডেকেছেন। বিজাপুরের রাজমাতা। আমির ওমরাহরা সবাই উপস্থিত। তাঁদের সুমুখে নিজের দুঃখ চেপে রাখতে পারলেন না। বললেন, সুলতান আদিল শাহের মৃত্যুর পর পুত্রকে সিংহাসনে বসালেন আপনারা। সেও মাত্র উনিশ বছর বয়সেই মারা গেল। এখন আমাকে রাজকার্যের দায় সামলাতে হচ্ছে। অবশ্য, আপনারা সকলে সহযোগিতা করছেন। আমি কৃতজ্ঞ।

সেদিন দরবারে, রাজমাতা দেশবাসীর অকুন্ঠ প্রশংসা করলেন। মুঘলদের সঙ্গে দীর্ঘ বিবাদের সময় তাদের সহযোগিতা, সহনশীলতার কথা স্মরণ করলেন। আর বললেন, মুঘলরা বিজাপুর হঠাৎ আক্রমণ করার সময়, আফজল খাঁ দক্ষ সেনাপতির মতো সৈন্য পরিচালনা করেছেন। এমনটি না করলে, বিজাপুরে পতন হত। তা হয়নি। কারণ, এই আফগান আমির কেবল আমার আত্মীয় হিসেবে নয়। কর্তব্যের তাগিদে, জীবনপণ লড়াই করে আওরঙ্গজেবের হাত থেকে রাজ্যটিকে বঁাচিয়েছেন। এই দরবার সেকথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছে।

দরবারের প্রথানুযায়ী সকল আমির ওমরাহরা দাঁড়িয়ে পড়ে আনতভঙ্গিতে সমস্বরে উচ্চারণ করলেন। ‘আফজলজী-র জয় হোক’। লক্ষণীয় বিষয় হল। এ সময় রাজমাতাও একইরূপে, বিনম্র ভঙ্গিতে, আফজল খাঁকে সম্মান প্রদর্শন করলেন।

আফজল খাঁ স্বভাবতই আপ্লুত। দীর্ঘকায়, ভীষণ প্রকৃতির দাম্ভিক মানুষটিও কিছুটা-বা বিচলিত। তাঁর চোখে আনন্দাশ্রু। এমন শ্রদ্ধা ও সম্মানের কথা চিরকাল মনে রাখবেন। কর্তব্যে কখনো অবহেলা করবেন না। রাজ্যের ভারি বিপদের দিনে, তিনি অগ্রণী সেনাপতি হিসেবেই কাজ করবেন। অঙ্গীকার করে বসলেন। এই সাধু অঙ্গীকারে, সবাই করতালি আর হর্ষধ্বনিতে তাঁকে সম্বোধিত করলেন; আবার।

ফলত, তাঁর ওপরই দায়িত্ব পড়ল। অবাধ্য জায়গিরদার শিবাজিকে শায়েস্তা করার। কারণ, শিবাজি বিজাপুরের অন্তর্গত জাগুলি অঞ্চলটি দখল করে নিয়েছেন।

রাজমাতা বললেন: আমরা অনেক বেশি শক্তির জোরে মুঘলদের সঙ্গে লড়াই করতে পারি। পারছি না, কেবল দুই-একটি দুষ্ট মানুষের জন্য। আমি মনে করি। শিবাজি আমাদের কাছে দুষ্টক্ষত। বিষাক্ত অঙ্গ। এই অঙ্গ ছেঁটে ফেলতে পারলে আমাদের সমস্যা দূর হবে। আপনারা বলুন সবাই মন্ত্রী, আমির, ওমরাহরা আপনারা সবাই আছেন। কে এই দুরূহ কর্মটির দায়িত্ব নিতে পারবেন? আফজল খাঁ সভার মধ্যে দাম্ভিকতার সঙ্গে বলে উঠলেন। আমি পারি। সেই ডাকাতটাকে ধরতে। ইঁদুরের মতো যার গতিবিধি। সেই শিবাজিকে আমি খাঁচায় পুরে আনতে পারি। এরজন্য আমাকে ঘোড়ার পিঠ থেকেও নামতে হবে না।

সভার মধ্যে এক কৃশতনু আমির আছেন। ভাঁড় বলে পরিচিত। তাঁর নাম হামিদ মিয়া। কথায় কথায় তাঁর রসালো শব্দ আছড়ে পড়ে। বললেন—আফজল ভাই, খাঁচাটি বড়ো হবে না ছোটো হবে? ঘোড়ার পিঠে বসে ইঁদুর ধরতে গেলে হাত দুটি বড়ো করে নেবেন। খাঁচাটাও বড়ো করবেন।

আফজল খাঁ খোঁচাটা হজম করলেন। চোখে আগুন ঝরল।

অভিযানে নেমেছেন আফজল খাঁ। শিবাজিকে ধরতেই হবে। ছলে বলে কৌশলে। সঙ্গে তাঁর ঢের সৈন্যসামন্ত। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে খোঁজা হচ্ছে। আফজল খাঁর এক সেনানায়ক সোলেমান এসে বললেন: জনাব শিবাজি তো দূরের কথা। পাহাড়িয়া মারাঠা সৈন্যদের এক জনকেও পাওয়া গেল না।

আফজল খাঁ বললেন,—কামান দাগো।

সোলেমান বললেন: তা ঠিক হবে না, জনাব। পাহাড়িয়া সৈন্যরা আরও সতর্ক হয়ে যাবে।

অন্যদিকে, শিবাজিও ভাবতে বসেছেন। কূল কিনারা খুঁজে পেলেন না। শিবাজির মনেও ক্রোধ। আফজল খাঁর সৈন্যরা মন্দির ধ্বংস করছে। মারাঠাদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করছে। বনে পাহাড়ে আগুন জ্বালছে। আফজল খাঁর আস্ফালন ও উন্মত্ততা মারাঠা সৈন্যদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলল। মারাঠা অধিপতি শিবাজি তাদের নিয়ে শলাপরামর্শ করলেন। সারারাত ধরে আলোচনা চলল। সেই আলোচনায় সকলে বলল, আফজল খাঁর সঙ্গে যুদ্ধে পেরে ওঠা যাবে না। তাঁর সৈন্যসংখ্যাও প্রচুর। তোপ বারুদের অভাব নেই। তাই যুদ্ধ রেখে সন্ধি হোক। শিবাজি অনড়। বললেন, তা কী করে হয়? মারাঠারা মাথা নত করতে জানে না। তোমরা কি মনে কর, আমি ধরা দিলে মারাঠা শক্তি ঠিক থাকবে? তা করা ঠিক হবে না। যুদ্ধ করতেই হবে। আর সে-যুদ্ধ হবে কৌশলে। প্রয়োজনে গা-ঢাকা দিয়ে। অরণ্যে-পাহাড়ে লুকিয়ে থেকে। এগিয়ে যাওয়া ও পিছিয়ে আসা পদ্ধতিতে। গেরিলা কৌশলে। আরও বললেন: চাই সাহস, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস। তোমরা এই ভূমিপুত্র, ধরিত্রীপুত্র। এত সহজে ভেঙে পড়বে, হার মানবে? উদ্দীপ্ত হও। শক্তি ধরো। বলো, বীর ভাই সব, পণ কর। লড়াই চাই, জয় আমাদের হবেই, হবে।

অভিযানে নেমেছেন আফজল খাঁ। শিবাজিকে ধরতেই হবে।

শিবাজীর প্রেরণামূলক বাক্যসমষ্টিতে সৈন্যদের মনে জোর এল। তারা সকলেই রাজি হল। প্রাণপণ যুদ্ধের। এমন সময় এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল।

আফজল খাঁর কয়েক জন দূত এসে পৌঁছুল। বেশ লেভানীয় শর্ত নিয়ে। শর্তগুলি হল এমনই। শিবাজি যদি কেবল নামেমাত্র বিজাপুর রাজ্যের বশ্যতা স্বীকার করেন। তা হলেই চলবে। শিবাজি বিজাপুর রাজ্যের যে-অঞ্চল দখল করেছেন। সেসব শিবাজীর অধিকারেই থাকবে। শিবাজি বুঝলেন, এটা আফজল খাঁর কূটকৌশল। তিনি অবশ্য মুখে দূতদের প্রতি সৌজন্য দেখালেন এবং কোনো সন্দেহ প্রকাশ করলেন না। কিছুই তাদের বুঝতে দিলেন না। কিন্তু আফজল খাঁর কেমন জানি মনে সন্দেহ হল। বুঝলেন, নিষ্ফল হয়েছে তাঁর উদ্যোগ। এবার একজন জাতিতে ব্রাহ্মণ দূত কৃষ্ণজী ভাস্করকে পাঠালেন। কৃষ্ণজী ভাস্কর এসে শিবাজিকে বললেন, যুদ্ধ হবে না। যদি তিনি বিজাপুরের বশ্যতা স্বীকার করে নেন। এটা মৌখিক জানালেই হবে।

গভীর রাত। বন-পাহাড় নিস্তব্ধ। শিবাজির অনুচর চুপি চুপি খবর নিয়ে এসেছে। কৃষ্ণজী ভাস্কর কোন তাঁবুতে আছেন। রাত্রি যাপন করছেন। শিবাজী তাঁর সঙ্গে গিয়ে গোপনে দেখা করলেন। বললেন: আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না হিন্দু মারাঠা সৈন্যদের ক্ষতি হোক। আফজল খাঁর নির্দেশে কীভাবে মারাঠাদের সম্পত্তি, ধর্মগৃহাদি, মন্দির ধ্বংস হয়েছে। আপনারা জানা আছে। এটা কোনো সুস্থ মানুষ সমর্থন করবে না। আপনি দয়া করে বলুন। আফজল খাঁর কী অভিপ্রায়? আমার বশ্যতা স্বীকার করা উচিত হবে কি? আমার মনে হয় বশ্যতা স্বীকার করলে মারাঠা রাজ্য বলে তো কিছু থাকবে না। তিলে তিলে গড়ে উঠেছে মারাঠা রাজ্য। তা ধ্বংস হয়ে যাবে? শিবাজি আচমকা কৃষ্ণজী ভাস্করের হাত দুটি জড়িয়ে ধরলেন। কৃষ্ণজী ভাস্কর বিগলিত। বললেন,—আফজল খাঁর মনের অভিপ্রায়টি আমি ঠিক জানি না। তবে শিবাজী মহারাজ, আমার মনে হচ্ছে, আফজল খাঁ নিশ্চয়ই ফন্দি আঁটছেন। ওঁর শিবিরের সৈন্যদের মধ্যে এমনই গোপন আলোচনা শুনেছি। আপনি সতর্ক হন। নিজের বুদ্ধি ও বিবেচনা মতন চলুন।

শিবাজি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। যুক্ত করে তাঁকে নমস্কার জানিয়ে বিদায় নিলেন।

পরের দিন। কৃষ্ণজী ভাস্কর আফজল খাঁকে জানালেন। শিবাজি খুব ভয় পেয়েছেন। তিনি সন্ধিতে রাজি। সাক্ষাতেও রাজি। জনাবের ইচ্ছেমতো স্থানে সাক্ষাৎ হতে পারে। আফজল খাঁ খুব হাসলেন। আত্মতৃপ্তির হাসি। কৃষ্ণজী ভাস্কর প্রস্তাব দিলেন। প্রতাপগড় দুর্গের নীচে একটা পাহাড় আছে। সেই পাহাড়ের শিখর সাক্ষাতের জন্য আদর্শ স্থান।

আফজল খাঁ বললেন: ওখানে তো কোয়ানা উপত্যকা। একটা মালভূমি। জায়গাটা অবশ্য সুন্দর। তা-ই হোক। সেখানে সাক্ষাতের ব্যবস্থা হোক। সাক্ষাতের স্থান ও সময় নির্ধারিত হয়েছে। শিবাজি সেই সংবাদও পেয়ে গেলেন।

কোয়ানা উপত্যকার পেছনে ঘন বন। বনের পাখিরা শিস দেয়। দোল খায়। শব্দ মধুর। তো সেই বনের মধ্যে একটা পথ তৈরি হল। শিবাজির নির্দেশে বলা হল। শিবাজির সৈন্যরা যেখানে লুকিয়ে থাকবে। টের যেন কেউ না পায়।

কিন্তু বনের পাখিরা শিবাজির উদ্দেশ্যে বলল:

ভয় কোরো না তুমি,

নজর রাখি আমরা—

বনের যুদ্ধভূমি!

শিবাজি হতচকিত হলেন বটে। তবে বিপদের সময়, এই ভরসা কম কীসের! যাই হোক। দুটি শিবির তৈরি হয়েছে দু-দিকে। একদিকে আফজল খাঁর শিবির এবং মালভূমির পেছন দিকে, আধ মাইলটাক আন্দাজ দূরে; শিবাজীর শিবির। মাঝখানে কোয়ানা উপত্যকায় সাক্ষাতের স্থান। সেখানে শিবাজি সুদৃশ্য সামিয়ানা, আসবাব ও গালিচা দিয়ে সাজিয়েছেন। পূর্বেই স্থির হয়েছে। উভয়েই সঙ্গে তিন জন করে অনুচর রাখতে পারবেন।

ভোরের আলো ফুটল। আফজল খাঁর শিবিরে তূর্য নিনাদিত হল। যুদ্ধের দামামা ঠিক বেজেও বাজল না। কারণ আফগান সেনাপতি আফজল খাঁর মনে খুব আনন্দ। শিবাজির সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে। সেই সাক্ষাতের সুযোগে শিবাজিকে হয় বন্দি, না হয় হত্যা করা হবে। তো আফগান সেনাপতি চলেছেন। ঘোড়ার পিঠে। সঙ্গে মাত্র তিন জন অনুচর। তার মধ্যে একজন তাঁর দেহরক্ষী। নাম বান্দু। তাকে দৈত্য বললে কম বলা হয়। এমনই বিশাল, বিকট চেহারা।

আফজল খাঁর আগমনবার্তা দূর থেকে শোনা যাচ্ছে। কাড়া-নাকাড়া বাজছে। কিন্তু তাঁর মুখখানি শুকনো। হঠাৎ তিনি যেন দেখছেন। ঘোড়া উলটোমুখে চলেছে। আর একবার দেখলেন। তিনি ঘোড়া নয়, গাধার পিঠে চেপে চলেছেন। একটু মাথা ঝাঁকালেন। নাহ, সব ঠিক আছে। তিনি চলেছেন। এবার সত্যি সত্যি সাহসে ভাটা পড়ল। দেখলেন, চৌষট্টি জন পত্নী তাঁর সুমুখে দাঁড়িয়ে নৃত্য করছে। তাদের মধ্যে প্রথমা পত্নী দেলজান বিবি নাকিসুরে গান ধরেছে—

নরক তোমার আসল ঠাঁই

মরণ আর দেরি নাই

দেরি নাই...

পাতক ওই দ্যাখো চেয়ে,

যমদূত যে আসছে ধেয়ে।

দেরি নাই।...

এসব অলৌকিক কান্ড দেখে, সেনাপতি সাহেব নিথর হয়ে গেলেন। তবুও এগুতে থাকেন। সাহসে ভর করে।

আফগান সেনাপতি এগিয়ে এলেন। কোয়ানা উপত্যকা দিয়ে। সুদৃশ্য তাঁবুর সামনে এসে দাঁড়ালেন। শুধু তাঁবু বললেন ভুল হবে। যেন সুসজ্জিত প্রকোষ্ঠ। আভিজাত্যপূর্ণ। জাঁক খুব। শিবিরের বাইরে দাঁড়িয়ে বাজখাই গলায় জিজ্ঞেস করলেন: বিজাপুররাজের সামান্য জায়গিরদারের এমন জাঁকজমকপূর্ণ শিবির স্থাপনের কারণ কী? এই জাঁকজমক বিজাপুররাজের মহামান্য সেনাপতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য করা হয়েছে। শিবাজী বললেন। আফজল খাঁ খুশি হলেন। আপ্লুত। বললেন, ঠিক আছে। ঠিক আছে।

শিবাজিও জানেন। আফজল খাঁ সহজে ছেড়ে দেবেন না। কিছু একটা বিপত্তি ঘটাতেই এসেছেন। শত্রুকে বাগে পেয়ে সুযোগ নেবেন। অবশ্য, তিনিও তৈরি হয়ে এসেছেন। আজ খুব ভোরে উঠেছেন। সূর্য প্রণাম ও সূর্যস্নান করেছেন। তারপর শুভ্র আচকান পরে নিলেন। মায়ের পদধূলি নিয়েছেন। আশীর্বাদ প্রার্থনা করলেন। মা পুত্রকে স্নেহচুম্বন করে বললেন। জয় তোমার হবেই। শিবাজির মুখমন্ডল আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। এরপর তিনি লৌহনির্মিত বক্ষাবরণী পরে নিলেন। আচকানের নীচে। কোমরে বেঁধে নিলেন বিছুয়া ছুরি। আর বাম হাতের তালুতে পড়লেন বাঘনখ। ক্ষুদ্র, তীক্ষ্ণ লৌহশলাকা যুক্ত বাঘনখ।

আফজল খাঁকে দেখে শিবাজি সৌজন্য প্রকাশ করলেন। বললেন, দুই সৈনিক পুরুষের মাঝখানে দেহরক্ষীর কী প্রয়োজন? শিবাজির কথা শুনে সেনাপতি দেহরক্ষী বান্দুকে সরে যেতে বললেন। তারপর প্রথানুসারে, আফজল খাঁ হাত প্রসারিত করে শিবাজিকে আলিঙ্গন করলেন। চেহারায় শিবাজি বেশ লম্বা প্রকৃতির। তাঁর তুলনায় আফগান সেনাপতি আরও লম্বা। আলিঙ্গন অছিলায় তিনি শিবাজির গলা চেপে ধরলেন। কিছুতেই ছাড়াতে পারছিলেন না। যত তিনি ছাড়াতে চেষ্টা করছেন, ততই সেনাপতি চেপে ধরছেন। মেরেই ফেলবেন। শিবাজি আফগান সেনাপতির মনোভাব বুঝতে পেরে, পিঠে বাঘনখের আঁচড় কাটলেন। সেনাপতি নড়েচড়ে উঠলেন। সেই মুহূর্তে, শিবাজি কোমর থেকে বিছুয়া ছুরি বের করে সেনাপতির পেটের ডান দিকে ঢুকিয়ে দিলেন। আর্তচিৎকারে, আফগান সেনাপতি আফজল খাঁ পড়ে গেলেন। শিবাজির সৈন্যরা বনের আড়াল থেকে ছুটে এল। বান্দুও ছুটে এল। বান্দুকে একা পেয়ে শিবাজির সৈন্যেরা ঝাঁপিয়ে পড়ল। সেনারা বান্দুর মাথাটি কেটে ফেলল। আর একদল আফজল খাঁর শরীরের ওপর আঘাতের ওপর আঘাত করল। তাঁর প্রাণবায়ু বের হল।

আর্তচিৎকারে, আফগান সেনাপতি আফজল খাঁ পড়ে গেলেন।

আফগান সেনাপতির এই অবস্থা দেখে বিজাপুরের সৈন্যরা যে যেদিকে পারল ছুটে পালাল। বন্দি হল অনেকে। নিমেষে মারাঠাদের জয় ধ্বনিত হল। মারাঠা শিবিরে আনন্দ-উল্লাস। চতুর্দিক মুখরিত হল।

বনের পাখিরা বের হয়ে এল। ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে উড়ে চলল। যেন শিবাজির জয়ের খবর পৌঁছে দিতে গেল।

জয় শিবাজির জয় বলে সৈন্যরা ধ্বনি দিল। প্রতাপগড়ে শঙ্খ, ভেরি বেজে উঠল। সবাই উন্মুখ হয়ে রইল। ধরিত্রীপুত্রকে দেখার জন্য।

কিশোর দুনিয়া, শারদীয়া, ২০০৬

অধ্যায় ২৫ / ২৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%