বীরভূমি বরাহভূম

রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার

বাংলা মুলুকে, তখনও ইংরেজ জাঁকিয়ে বসেনি। সেই সময় জঙ্গলমহল নামে একটি জেলা ছিল বিশাল। মেদিনীপুর, বঁাকুড়া, মানভূম (পুরুলিয়া) ও সিংহভূম প্রভৃতি নিয়ে ছিল এই জেলা। তার সদর ছিল মেদিনীপুর। এসব স্থানে তখন ছোটো বড়ো অনেক রাজা। তাঁরা ছিলেন স্বাধীন। নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ, যুদ্ধ করে এ তাঁর রাজ্য জয় করে খুশি থাকতেন। আবার, কখনো কখনো বা বিবাদ বিসম্বাদ ভুলে ভাব জমাতেন নিজেদের মধ্যে। এমনিতে এসব স্থানের রাজারা খুব ধনী ছিলেন না। একে তো জঙ্গল, পাহাড়, কাঁকুড়ে মাটি। ফসল যে খুব ফলত তা নয়। ফলমূল, বন্য সম্পদ নিয়ে তাঁদের দিনযাপন।

জঙ্গলমহলের যে অংশটির নাম মানভূম, তার অন্য পরিচয় আছে। আরও একটি নাম বরাহভূম। এর দুটি প্রাচীন রাজ্য—পঞ্চকোট ও পাতকুম। তো বরাহভূম নামটি যে হল তা নিয়ে গল্প আছে দুটি। বড়োই চমকপ্রদ, শিহরন জাগায়। প্রথম গল্পটি এরূপ

সে বহুকাল আগের কথা। দুই ক্ষত্রিয় রাজপুত, নাম শ্বেতবরাহ ও নাথবরাহ, দেশভ্রমণে বেরিয়েছেন। পশ্চিম দেশ থেকে ঘোড়ায় চড়ে ছুটে চলেছেন। চিনে নেবেন জগৎটাকে। মনে সাহস চোখে অদম্য কৌতূহল। বনবাদাড় পেরুচ্ছেন, নদী সমুদ্র দেখে পথ পালটিয়ে চলেছেন। এমনিভাবে চলতে চলতে একদিন এসে পড়লেন মানভূমের পাতকুম রাজার রাজ্যে।

রাজার সেপাইরা আগন্তুকদের পথ আগলে দাঁড়াল। সেপাইরা বলল, তোমাদের পরিচয় দাও।

শ্বেতবরাহ বললেন, তোমরা কারা?

একজন সেপাই বলল, পাতকুম রাজার সেপাই আমরা।

নাথবরাহ বললেন, পরিচয় দেব রাজাকে তোমাদের নয়।

তাহলে তোমাদের বন্দি করব। সেপাইরা বলল।

শ্বেতবরাহ বললেন, সেটা তোমাদের ক্ষমতায় কুলোবে না। তার চেয়ে চলো, রাজার কাছেই যাই। তোমাদের এই রাজ্য আমাদের ভালো লেগেছে। ইচ্ছে হচ্ছে থেকে যাই। আমাদের বন্ধু করে নাও না ভাই!

পাতকুমরাজ ভিনদেশি দুই যুবকের সঙ্গে কথা বললেন। বেশ খুশি হলেন। কিন্তু একটা বিষয়ে আশ্চর্য ঠেকল। যুবকদ্বয় রাজামশায়কে ভূমি প্রণাম করলেন না। রাজা ভাবলেন; ওই পর্যন্তই, বিশেষ গুরুত্ব দিলেন না। তিনি অবশ্য শ্বেতবরাহ ও নাথবরাহকে তাঁর সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বললেন। দুজনাই রাজি হলেন। দিন যায়, মাস যায়। তাঁরা মনপ্রাণ ঢেলে কাজ করতে লাগলেন। মন্ত্রীমশায় আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারলেন না। একদিন জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার, বলো তো! তোমাদের সম্ভ্রমবোধ নেই? মহামান্য রাজাকে পর্যন্ত তোমরা সেলাম দাও না!

শ্বেতবরাহ প্রশ্নটি শুনে চমকালেন না একটুও। বললেন, মান্য রাজার প্রতি সম্ভ্রম থাকবে না কেন! অবশ্যই আছে। তবে আমরা রাজপুত, ক্ষত্রিয়; মাথা নত করি না। কারও কাছে নয়, কোনো কারণে নয়। মন্ত্রীমশায় এই খবরটি রাজার কানে তুলে দিলেন।

রাজা মৃদু হাসলেন। কিন্তু রাজার মিত্র ভূষণ মাহাতো রাজার কানে ফিস ফিস করে কী যেন বললেন। রাজা সশব্দে হাসলেন। গোঁফে হাত বুলোতে লাগলেন আর ভাবছেন, কিন্তু চমকে উঠল ভ্রূ।

শুধু কি তাই?

একদিন পাতকুম রাজ্যের রাজপুরোহিত এসে নালিশ জানালেন। বললেন, ব্রাহ্মণেরা সবাই ভিনদেশি সৈনিকদের আচরণে ক্ষুব্ধ।

—কেন, কী হল? রাজা জিজ্ঞেস করলেন।

রাজপুরোহিত বললেন,—ওই দুই যুবক উদ্ধত। আমাকে দেখেও প্রণাম জানায় না। ব্রাহ্মণদের শ্রদ্ধার চোখে দেখে না। তারপর তিনি শুধোলেন, শুনেছি, রাজামশাইকেও নাকি মাথা নুইয়ে নমস্কার করে না। রাজামশায় খুব শান্ত স্বরে জবাব দিলেন। বললেন, সৌজন্য-আচরণে যে যার মতন। তারা মাথা নত করে না। বিনীত নমস্কার জানায় না। এমন কী মহাভারত অশুদ্ধ হল তাতে?

রাজামশায়ের এমন স্পষ্ট জবাবে, রাজপুরোহিত যে খুব খুশি হলেন এমন নয়। তিনি চলে গেলেন।

এই মুহূর্তে, রাজামশায়ের মনে হল ভূষণ মাহাতর কথাটি পরখ করে দেখলে হয়! ওই যুবকরা মাথা নত করে কি না?

তো রাজার আদেশে শ্বেতবরাহ ও নাথবরাহের ডাক পড়ল। রাজসভায়। রাজা বললেন, তোমাদের একটা পরীক্ষা দিতে হবে। তোমরা ঘোড়ায় চড়ে কত দ্রুত ছুটে আসতে পার। রাজাবাড়ির তোরণ পেরিয়ে। আমি একবার দেখতে চাই।

—আমরা রাজি। দুই ভাই সমস্বরে বললেন।

মন্ত্রীমশায় বললেন,—পাতকুম রাজ্যের তিন মাইল পূর্বে সুবর্ণপুর। সুবর্ণপুর প্রান্তে একটা ভাঙা মন্দির আছে। সেখান থেকে কত কম সময়ে, ঘোড়া-ছুটিয়ে, তোরণ পেরিয়ে রাজমহলে প্রবেশ করতে পার। সেটাই তোমাদের পরীক্ষা। আগামীকাল সকালে, মহল-ঘণ্টা সকাল নটায় শুরু হবে। ওই সময়ে শুরু হবে তোমাদের ঘোড়া-ছুট। রাজার সেপাই প্রধান সুবর্ণপুরে বঁাশি বাজিয়ে পর্ব আরম্ভ করবেন। ঠিক আছে? তাই হবে মন্ত্রীমশাই।—শ্বেতবরাহ ও নাথবরাহ বললেন। আলগা হাসির সুরভি ছড়িয়ে।

সময়টা সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি। ছাতা পরবের ধুম লেগেছে। পাতকুম রাজের পৃষ্ঠপোষকতায় পরব জমে ওঠে। এ সময়টা ঝুমুর নৃত্য-গীতের পরবও বটে।

কৃষিখেত, ভূমি, বাস্তুভূমি, ধর্ম নিয়ে লোককবি গান বঁাধেন। প্রাণের গান। হাঁক, ডাক, গান শুরু হয়। এমন একটা দিনে, ঢেঁড়া পেটানো হল। শ্বেতবরাহ ও নাথবরাহ: দুই সৈনিকের পরীক্ষা। কে নেবেন পরীক্ষা? না রাজা নেবেন।

চারদিকে ভিড় উপচে পড়ছে। মানুষের ঢল নেমেছে। সেঢল ছড়িয়ে পড়ল। রাজার মহল ও সুবর্ণপুরের দিকে দিকে।

ফুল পাতা দিয়ে সাজানো হয়েছে মহলের তোরণদ্বার। তোরণদ্বারে নীচু করে ঝোলানো হল বেশ কয়েকটি ধারালো করাত। ভিনদেশি যুবকদ্বয়, ঘোড়া-ছুটে তোরণদ্বার দিয়ে প্রবেশ করার সময়; মাথা নত করে কি না; তীক্ষ্ণ চোখে সেটাই দেখার।

শ্বেত বরাহের মাথা কেটে গেল। রক্তবন্যা বয়ে গেল।

যাই হোক, শুরু হল। দুই ভাইয়ের ঘোড়া-ছুট। রক্তে তাঁদের তেজ। খুব দ্রুত ছুটতে লাগলেন। একসময় তোরণদ্বারে পৌঁছেও গেলেন। প্রথমে শ্বেতবরাহ, পরে নাথবরাহ। শ্বেতবরাহ এসে দেখলেন। মাথার ওপর ঝুলছে করাত। শির উন্নত রেখে প্রবেশ করতে গেলে মৃত্যু অনিবার্য। হবেই, হবে। কিন্তু তিনি যে রাজপুত। শির ঝুঁকে চলেন না। চলবেনও না। তাই নিশ্চিতমৃত্যু জেনে ভেতরে প্রবেশ করতে গেলেন। ফল যা হবার ছিল। তা-ই হল। শ্বেতবরাহের মাথা কেটে গেল। রক্তবন্যা বয়ে গেল। এতক্ষণে হায় হায় রব উঠল!

পাতকুম রাজা ওই বীরযুবক, শ্বেতবরাহের এমন পরিণতি দেখে আত্ম অনুশোচনায় দগ্ধ হলেন। পেছনে ছুটে আসছিলেন, নাথবরাহ। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর গতিরোধ করালেন। রাজা নাথবরাহের কাছে যুক্ত করে মার্জনা চাইলেন। শোকে আকুল তিনি। পরবে আসা জনতার চোখে-মুখে দুঃখ ছড়াল।

পাতকুমরাজ বীর ক্ষত্রিয় রাজপুরুষের সম্মানে স্থানটির নাম রাখলেন। বীরভূমি বরাহভূম এবং নাথবরাহকে সম্মান জানিয়ে রাজ্যের পূর্ব অংশ দানও করলেন। এমনকী রাজকন্যাকেও।

এবার বলি। দ্বিতীয় গল্পটা।

পশ্চিম দেশ থেকে এক ক্ষত্রিয় রাজা সপরিবারে শ্রীক্ষেত্র (পুরী) দর্শনে বেরিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে পথ চলছেন। অবিরাম পথ চলা। ক্লান্ত। একদিন সন্ধ্যায়, মানভূমের সতেরখানি তরফ এলাকায় পৌঁছোলেন। অন্ধকারে পথ চলা সম্ভব নয়। তাই পাহাড়ের কাছে জায়গাটির নাম রূপসান। সেখানেই তাঁবু পড়ল। রাতের বিশ্রাম ও আহারের আয়োজন চলতে থাকল। রাত গভীর। সেই রাতে, রানির যমজ সন্তান হল। কী করেন! তীর্থযাত্রা ভণ্ডুল হবে? দাসী পরামর্শ দিল, বনে রেখে যেতে। তীর্থযাত্রা বাতিল হলে ক্রুদ্ধ হবেন রাজা। তাই, রাজার ভয়ে শিশু দুটিকে বনের পাশে পাহাড়ের কাছে সমতলভূমিতে রেখে এল; দাসী। আর শিয়রে রেখে গেল, ক্ষত্রিয় রাজের-স্মারক।

পরদিনই তাঁরা তীর্থের দিকে যাত্রা করলেন।

শিশু দুটির পাশে বন্যপশুরা জেগে রইল। বন্যবরাহী এসে স্তনদান করতে লাগল। এর দিন দুয়েক বাদে বনে কাঠ কুড়োতে এল এক আদিবাসী রমণী। শিশু দুটিকে দেখে তুলে নিয়ে গেল। ক্ষত্রিয় রাজচিহ্ন দেখে বুঝল। সামান্য নয়। শিশু দুটি রাজ ঘরানারা। পরম যত্নে লালন-পালন করতে লাগল।

শিশু দুটি বরাহদুগ্ধে বেঁচেছিল। তাই তাদের নাম রাখা হল, শ্বেতবরাহ ও নাথবরাহ। আদিবাসী পিতামাতার যত্নে শিশু দুটি ক্রমে ক্রমে পরিণত যুবক হয়ে উঠলেন। ধনুর্বিদ্যা শিখলেন। পাতকুম রাজার সৈন্য বিভাগেও যুক্ত হলেন। বীরযোদ্ধা হিসাবে খাতিরও পেলেন খুব। কিন্তু সবার কাছে মুশকিলের কথা হল এই, তাঁরা শির উঁচু করে চলতেন। মাথা নত করেননি। কারও কাছে করেননি। তাই, শ্বেতবরাহের রাজার কাছে পরীক্ষা দিতে গিয়ে প্রাণ গেল। পূর্ব গল্পের পরিণতি হল, এই আর কি!

কিন্তু নাথবরাহের রাজ্য ও রাজকন্যা প্রাপ্তি; দুই-ই হয়। আর সেই থেকে মানভূম ‘বরাহভূম’ হিসেবে এক ভিন্ন পরগনা হয়ে ওঠে। এই প্রাচীন নামকরণ ইতিহাস হয়ে আছে।

ইংরেজ পন্ডিতগণ এমন এক কাহিনি স্বীকার করেছেন। এবং আর্যসন্তান কেমন করে ভূমিজ সন্তান হয়ে উঠলেন ও অতি ভৈরব গর্বে বীরভূমি বরাহভূম গড়ে তুলেছেন; সেকথাও।

অজগর, রাজ্য ছড়া উৎসব বিশেষ সংখ্যা, ২০০৩

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%