রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার
জ্যৈষ্ঠ মাস। প্রায় সন্ধে। ঘন জঙ্গলের মধ্যে সরু একটা পথ আছে বটে, তবে সে-পথে চলা বড়ই মুশকিল। জায়গাটার নাম লাউগ্রাম।
ওই সরু পথ ধরে চলেছেন একদল তীর্থযাত্রী। শ্রীক্ষেত্রে, শ্রীশ্রী জগন্নাথদেব দর্শনে।
সম্ভবত দলটি রাজস্থানের জয়পুর থেকে আসছিল। রাতে পথ চলা দুঃসাধ্য। তাই বিশ্রামের জন্য ওই জায়গাটাকেই ঠিক করা হয়েছে। সেই দলে ছিলেন রাজঘরানার দুজন। তাঁরা স্বামী-স্ত্রী। স্বামীর নাম জয়চন্দ্র। তাঁর কাছে সেই রাতটি বড়োই দুঃসহ। ওই রাতে তাঁর স্ত্রী একটি পুত্রসন্তান প্রসব করে মারা গেলেন।
এই দুঃখের দিনে তাঁর কী করা উচিত জিজ্ঞেস করলেন সঙ্গীদের। বললেন,—ফিরে যাব?
সঙ্গীরা প্রায় সবাই একবাক্যে বললেন,—ঈশ্বর দর্শন থেকে বিরত হওয়া উচিত নয়।
শেষে জয়চন্দ্র সিদ্ধান্তে এলেন যে তিনি পুত্রকে সেখানেই রেখে যাবেন। পরদিন প্রত্যুষে জয়চন্দ্র শিশুটিকে একটি গাছের নীচে শুইয়ে দিলেন। রেখে গেলেন একটি পরিচয়পত্র ও ‘জয়শংকর’ নামে এক তরবারি। তারপর, দলটির সঙ্গে রওনা হলেন শ্রীক্ষেত্রের দিকে।
পরদিন ভোরবেলা, জঙ্গলে কাঠ সংগ্রহ করতে এলেন এক বিধবা বাগদি রমণী। তিনি কুড়িয়ে পেলেন সদ্যোজাত শিশুটিকে। আহা কী নরম, ফুটফুটে। লালনপালন করতে লাগলেন মাতৃস্নেহে। আদরযত্নে। নাম রাখলেন রঘুনাথ।
ক্রমে-ক্রমে রঘুনাথের বয়েস হল সাত। এদিকে দুঃখিনী মা ছেলের অন্ন জোগাড় করতে পারেন না। কী আর করেন, গ্রামের এক নিষ্ঠাবান পূজারি ব্রাহ্মণ—সবাই তাঁকে বলেন সাধকঠাকুর। তাঁর ঘরে রেখে দিয়ে এলেন ছেলেকে দু-মুঠো ভাতের জন্য।
ব্রাহ্মণ রঘুনাথকে খুব ভালোবাসতেন। সেঘরের ছেলের মতো কাজকর্ম করত। তবে রাখালগিরি করা তার খুব পছন্দ। সমবয়সিদের নিয়ে মাঠে মাঠে গরু চরাত। বঁাশি বাজাত। গাছে উঠে দোল খেত। সুর করে ছড়া কাটত। শিস দিয়ে পাখির সঙ্গে খেলা করত। কখনো কুস্তি বা লাঠিখেলা করে দিন পার করত। তার রক্তে ছিল যুদ্ধনেশা। তার নেতৃত্ব সকলেই মেনে নিত। সঙ্গীরা তাকে ‘সর্দার মল্ল’ বলে ডাকত। সন্ধে হলে যে যার ঘরে ফিরে যেত।
একদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। গোরু চরাতে চরাতে রঘুনাথ লক্ষ করল, একটা গোরু কম। অনেক খোঁজাখুঁজি হল। কিন্তু পাওয়া গেল না। মনে তার ভয়। প্রভু কী বলেন, কে জানে! সেআর ঘরে ফিরবে না বলেই ঠিক করল। কিন্তু রঘুনাথের খোঁজে ব্রাহ্মণ পঞ্চানন ঘোষাল গো-চারণভূমিতে এলেন। এসে দেখলেন, রঘুনাথ ঘুমিয়ে রয়েছে। রঘুনাথের মাথায় নাগ ও নাগিনি। ছাতার মতো আড়াল দিয়ে রেখেছে। তিনি রঘুনাথের কাছে যেতেই নাগ ও নাগিনি সরে গেল। ব্রাহ্মণ বুঝলেন, এ ছেলে সামান্য নয়। রঘুনাথের প্রতি তাঁর নজর আরও বেড়ে গেল।
সেরাতেই তিনি এক স্বপ্নাদেশ শুনলেন।

ব্রাহ্মণ রঘুনাথকে খুব ভালোবাসতেন।
এক শুভ মুহূর্ত দেখে তিনি দেবী দন্ডেশ্বরীর আসন পাতলেন। যেখানে রঘুনাথের মাথার ওপর নাগ-নাগিনী ফণা মেলে ছিল, ঠিক সেইখানে।
দেবী প্রতিষ্ঠার পর নিয়মিত পুজো অর্চনা চলতে থাকে। পাশাপাশি রঘুনাথের শিক্ষাদীক্ষাও সমানে চলতে থাকে। একদিন সঙ্গীসাথিরা তাকে ধরে নিয়ে গেল পৈরাগের মোহনায়। পৈরাগ, দ্বারকেশ্বর নদ থেকে বেরিয়ে এসেছে। একটি শাখানদী। বন্ধুরা সকলে নদীতে জাল ফেলে পেল প্রচুর মাছ। কিন্তু রঘুনাথ পেল সোনার ইট আর শালগ্রাম শিলা। ব্রাহ্মণ বুঝলেন, এই যুবক শীঘ্রই রাজা হবে। মুখমন্ডলে সেই চিহ্ন আভাসিত। তিনি তাকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর থেকে রঘুনাথের প্রতি তিনি আরও সতর্ক হয়ে উঠলেন।
আসল নাম প্রদ্যুম্নপুর। লোকমুখে সহজ ডাক পদুমপুর। লাউগ্রাম থেকে প্রদ্যুম্নপুর যে খুব দূরে, তা নয়। সেখানকার রাজার নাম নৃসিংহদেব। রাজা এক ভোজের আয়োজন করেছেন। শ্রাদ্ধবাসরে ভোজ। আমন্ত্রিত হয়েছেন সাধক ঠাকুর। তিনি রঘুনাথকে সঙ্গে নিয়ে এলেন ভোজ খেতে। প্রাসাদ অভ্যন্তরে বসেছেন ব্রাহ্মণরা। রঘুনাথের স্থান হয়েছে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। হঠাৎ শুরু হল ঝড়বৃষ্টি। রঘুনাথ ভিজতে লাগল। রাজার খুব মায়া হল। তিনি ছুটে এসে রঘুনাথের মাথায় ছাতা ধরলেন। রাজা যার মাথায় ছাতা ধরেন, সেনাকি রাজা হয়। দেশ-গাঁয়ে এ হল প্রবাদবাক্য।
বাস্তবিক সেই শুভদিন এসে গেল। দেবী দন্ডেশ্বরীর সামনেই একটা ডাঙা জমি। সেখানে তৈরি হল মন্ডপ। সেখানেই পুজোপাঠের আয়োজন করলেন সাধকঠাকুর। রাজা নৃসিংহদেব রঘুনাথের ললাটে রাজটিকা পরিয়ে দিলেন। ছখানি গ্রামও দান করলেন। রাজা হলেন রঘুনাথ। আর যেখানে তাঁর রাজ্যাভিষেক হয়, সেই জায়গাটার নাম হয়ে গেল রাজডাঙা। তৈরি হল রাজপুরী। সাধকঠাকুর নাম রাখলেন রঘুনাথপুর।
ইন্দাস থানার অন্তর্গত যোতবিহারের এক সামন্ত রাজার নাম প্রতাপনারায়ণ। হঠাৎ প্রতাপনারায়ণ নৃসিংহদেবকে অস্বীকার করে স্বাধীন হয়ে উঠতে চাইলেন। কিছুতেই নৃসিংহদেব তাঁকে শায়েস্তা করতে পারছিলেন না। শেষে তিনি রাজা রঘুনাথকে আহ্বান জানালেন।
রঘুনাথ খুব সহজেই তাঁকে পরাস্ত করলেন এবং বন্দি প্রতাপনারায়ণকে রাজা নৃসিংহদেবের হাতে তুলে দিলেন।
রাজা বললেন,—আমি খুব খুশি হয়েছি রঘুনাথ। তুম বলো, এঁর কী শাস্তি হওয়া উচিত?
রঘুনাথ বললেন, ওঁকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিন মহারাজ।
রাজা জিজ্ঞেস করলেন, সেটা কীরকম?
‘প্রাণদন্ড।’ রঘুনাথ তীক্ষ্ণভাবে উচ্চারণ করলেন।
এরপর যোতবিহার রঘুনাথের হাতে এল। তাঁর রাজ্যসীমা নেহাত আর ছোটো রইল না। বেশ বড়ো হল। প্রতিপত্তিও বাড়ল।
রাজা নৃসিংহদেব মনে শান্তি পাচ্ছিলেন না। মন বিক্ষুব্ধ। অনেক দিন ধরেই ভাবছিলেন, তীর্থ পর্যটনে বেরুবেন। একদিন সকালে রানিকে ডেকে বললেন, চলো, তীর্থে তীর্থে ঘুরে আসি কিছুদিন। অনেক দিনই তো রাজকার্যের কঠিন আবর্তে পড়ে আছি।
রানি বললেন, চলো বেরিয়ে পড়ি। তীর্থও হবে, দেশভ্রমণও হবে।
দেশ ছাড়ার আগে সেনাপতি ইন্দ্রকে ডেকে বললেন, আপনার ওপর রইল রাজ্যের ভার। আপনি হলেন সর্বাধিনায়ক।
সেই মর্মে ঢেঁড়া পেটানো হল।
তো ক্ষমতা হাতে পেলে যা হয়! সেনাপতি ইন্দ্র স্বৈরাচারী হয়ে উঠলেন। একসময় তাঁর ভেতরে অনেক গুণ, সুবুদ্ধি ছিল। সেসব ভেসে গেল খড়কুটোর মতো। প্রথমেই তিনি সমস্ত শক্তি নিয়োজিত করলেন রাজা রঘুনাথের বিরুদ্ধে। কারণ, তিনি মহারাজ নৃসিংহদেবের প্রিয়পাত্র—শক্তিস্তম্ভ। তাই একদিন বর্ষণসিক্ত রাতে, অতর্কিতভাবে রঘুনাথকে বন্দি করলেন এবং কারাগারে নিক্ষেপ করলেন।
রাজা নৃসিংহদেবের রক্ষী ছিলেন তিনু সাঁওতাল। সেসাঁওতাল বাহিনীর সর্দার, বীর। রাজা রঘুনাথ মহারাজের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনুকে মহারাজের সঙ্গে পাঠিয়েছেন। তিনি রঘুনাথের সেনাপতি। যোতবিহারের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাঁর। হঠাৎ তাঁর কী যে হল, তিনি মহারাজ নৃসিংহদেবকে সবিনয়ে বললেন, মার্জনা করবেন মহারাজ। মন চঞ্চল হয়ে উঠেছে রাজা রঘুনাথের জন্য। কেবলই মনে হচ্ছে তাঁর সামনে কোনো বিপদ এসেছে। এই সময় আমার তাঁর কাছে থাকা একান্ত প্রয়োজন। তিনি তো আমার রাজা শুধু নন, বাল্যকালের খেলার সঙ্গী প্রাণের বন্ধু।
‘তা তিনু, তোমার রানিমাও অশান্ত হয়ে উঠেছেন। আমাদের স্নেহের পুত্রী চন্দ্রকুমারীর জন্য। ইদানীং তার শরীর বিশেষ ভালো যাচ্ছে না। জ্বর দেখে এসেছিলাম। দেখা-শোনার জন্য রাজবৈদ্য আছেন বটে, তবে তোমার রানিমার মন যখন উদবিগ্ন, আর তুমিও যখন রঘুনাথের জন্য শঙ্কিত হয়ে উঠেছ, চলো ফিরেই যাই।
মহারাজ নৃসিংহদেব এসে দেখলেন, সেনাপতি প্রায় রাজ্য গ্রাস করে ফেলেছেন। দুষ্ট চক্র থেকে রাজ্যকে বঁাচাবার প্রাণপণ চেষ্টা করলেন মহারাজ। তিনি রঘুনাথকে কারামুক্ত করলেন। সমস্ত প্রজারা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। রাজা রঘুনাথ অপমানের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে দেশান্তরি হলেন।
কিছুদিনের মধ্যেই অবশ্য রাজা রঘুনাথের কাছে খবর এল। মহারাজ নৃসিংহদেবকে উন্মাদ আখ্যা দিয়ে কানাইসায়রের কাছে কারাগারে বন্দি করে রেখেছেন সেনাপতি। এই খবর রাজা রঘুনাথ কেমন করে পেরেছিলেন, তা অজ্ঞাত। তবে তা নিয়ে দুটি গল্প শোনা যায়। প্রথমটি এরূপ—
রাজা রঘুনাথ নিজের রাজভূমি ছেড়ে চলে গেলেন স্থানান্তরে। ঘুরতে ঘুরতে মাস তিনেক পর এলেন কাশীতে। একদিন সেখানে দেখা হল সাধকঠাকুরের এক শিষ্য অঘোরনাথের সঙ্গে। তিনি কাশীতেই থাকেন। যেদিন অঘোরনাথের সঙ্গে দেখা হল, তার আগের দিনই তিনি স্বজনভূম থেকে ফিরেছেন কাশীতে। তিনি রাজা রঘুনাথকে দেখে আহ্লাদিত হলেন। তাঁকে সমাদরে আতিথ্য দিলেন। স্বজনভূমের হালচাল বলতে গিয়ে মহারাজ নৃসিংহদেবের দুর্দশার কাহিনি বললেন। সে-কাহিনি শুনে রাজা রঘুনাথ কালক্ষেপ করেননি। পরমশ্রদ্ধেয় মহারাজের সেনাপতিকে শাস্তি দিতে উদ্যত হলেন।
দ্বিতীয় গল্পটি আরও চমকপ্রদ।
রাজা রঘুনাথ ছদ্মবেশে ঘুরছেন। হরিদ্বারে এসেছেন তিনি। সেখানে আলাপ হয় এক সাধুর সঙ্গে। সাধু তাঁর ললাট দেখে বিড়বিড় করতে লাগলেন। পদ্য করে বলেছেন—
হে রাজন,
জানো কী রাজকাহিনি,
রাজ্যে তোমার বিপদ ভীষণ,
মা কাঁদেন, নৃসিংহদেব ঘরনি।
সাধু যেন চোখ খুলে দিলেন। শঙ্কা বাজল তাঁর মনে। রাজা ছুটে চললেন কর্মভূমে, স্বজনভূমে। এসেই শুনলেন, মহারাজ নৃসিংহদেবের বিপদকাহিনি। তিনি বন্দি, অন্ধ কারাগারে। তিনু সাঁওতালের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। তারপর স্থির হল, রাজা নেতৃত্ব দেবেন যুদ্ধে। তিনি ঘোড়ায় চেপে ভল্ল তুলে নিলেন হাতে। আর তিনু সাঁওতালের নির্দেশে ঢাল তরোয়াল নিয়ে শতেক সৈন্য ছুটে চলল প্রদ্যুম্নপুর। প্রদ্যুম্নপুরের সৈন্যরা মনে জোর পেয়ে গেল। তারা রাজা রঘুনাথকে দেখে মহা উল্লাসে পথ দেখাল, — কোথায় বন্দি মহারাজ! আর কোথায় শয়তান সেনাপতি! তার ফলে রক্তক্ষয় হল না। যুদ্ধ দামামা বাজল না। সেনাপতি ধরা পড়লেন। তাঁকে হত্যা করল প্রদ্যুম্নপুরেরই সৈন্যরা। মহারাজের বন্দিদশা ঘুচল। কিন্তু এরপরের ঘটনা বড়ো দুঃখের, মর্মান্তিক।
মহারাজ নৃসিংহদেবের কারামুক্তি হল বটে, তবে মুক্তির স্বাদ তিনি পেলেন না। এত সুখ, আহ্লাদ অধরাই রয়ে গেল। অনুভবের ক্ষমতা তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। একদিন কানাইসায়রের স্বচ্ছজলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে ঝাঁপ দিলেন।
মহারানি অবশ্য মহারাজের অন্তর-বাসনা পূর্ণ করলেন। রাজা রঘুনাথের হাতে রাজকন্যা চন্দ্রকুমারীকে অর্পণ করলেন। শূন্য সিংহাসনে বসিয়ে রাজমুকুট পরালেন। এরপর, রানি স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নিলেন।
সাধকঠাকুর রাজা ও রানির পারলৌকিক কর্ম করলেন। তাঁর মনে পড়ল, রঘুনাথের সঙ্গীরা ধেনু চরাতে চরাতে রঘুনাথের মল্লবিদ্যা ও নেতৃত্ব মেনে নিয়ে আখ্যায়িত করেছিল, ‘সর্দার মল্ল’। তাই তিনি আশীর্বাদ করে বললেন,— আজ থেকে তোমাকে ‘মল্ল’ উপাধিতে ভূষিত করলাম। তোমার নাম হোক রঘুনাথ মল্ল। তুমিই মল্ল রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তোমার নামের সঙ্গে চালু হোক অব্দ, ‘মল্লাব্দ’।
ইংরেজি ৬৯৪ সাল, বাংলা ১০১ সাল থেকে চালু হল মল্লাব্দ। রাজার প্রতিষ্ঠিত ভূমির নাম হল মল্লভূম। সৃজনভূমি বিষ্ণুপুর।
কিশোরভারতী, নভেম্বর, ২০০৫
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন