রাজমালা

রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার

জয় রাজা বিজয়মাণিক্যের জয়! জয় রাজা বিজয়মাণিক্যের জয়! না, তখনও রাজা হননি বিজয়মাণিক্য! ত্রিপুরাবাসীর আনন্দ উচ্ছ্বাস, আহ্লাদ ও অভিব্যক্তিতে তিনি রাজা। এ যেন এক জয়োল্লাস। সেকথাটাই চমকপ্রদ এক গল্প, কাহিনি। সেটাই বলব।

স্থান লক্ষ্মীপতি। সেএখন অরণ্য, নির্জন। অথচ একদিন ছিল সমৃদ্ধ জনপদ। গড় পরিখা, সুবৃক্ষ, অট্টালিকায় পরিপূর্ণ। এ সবই ছিল উদয়পুরের পূর্ব দিকে, লক্ষ্মীপতিতে। এখন পরিত্যক্ত। রাজ্য, রাজধানীর পত্তন ও পতন অনেকটা নদীর মতন। একূল ভাঙে তো ওকূল গড়ে। রাজা পাল্টান তো রাজধানীও পাল্টে যায়। ব্যাপারস্যাপার রাজার মন ও মর্জির ওপর নির্ভরশীল। তাই, উদয়পুরের জৌলুস যখন ছিল তখন স্থান লক্ষ্মীপতির জৌলুস তো ছিলই; সোনা চকচক।

রাজকুমার বিজয়ের বন্দিদশা ঘুচল। তাঁকে হাতির পিঠে চড়িয়ে ফুলের মালা পরিয়ে কাড়া-নাকাড়া বাজিয়ে বিরাট শোভাযাত্রা সহকারে আনা হচ্ছে আগরতলায়। সুমুখে গীতবাদ্য বাজছে। পার্বত্য প্রজারা নৃত্য করছেন। গীত গাইছেন পুরবাসী। শঙ্খ, উলুধ্বনি স্নিগ্ধ আবেশ সৃষ্টি করেছে। সেনাপতি দৈত্যনারায়ণ তরবারি উঁচিয়ে চলেছেন পুরোভাগে ধীরগতিতে, মৃদুমন্দ ছন্দে। ত্রিপুর অধিপতি যিনি হবেন, তাঁকে পুষ্প ছড়িয়ে মনের অর্ঘ্য নিবেদন করছেন ত্রিপুর নাগরিক। রসরাজ রাজগীত-বন্দনা গাইছেন। তাঁর কাজ, রাজকাহিনি প্রচার করে গণমন যাচাই করার। তো তিনি বলছেন, কাহিনিমালা। অকপটে ভাষ্যরচনা।

বঙ্গেশ্বর হোসেন শাহ বললেন: ‘আমার দখলে চাই ত্রিপুরা। চট্টগ্রামও চাই।’ তো সেনাপতি পরাগল খাঁ ছুটে এলেন। হোসেন শাহর পুত্র নাসিরুদ্দিন নসরত খাঁ-ও এলেন। নসরত খাঁ অবশ্য বন্ধু ছোটি খাঁ-কে সঙ্গে আনলেন। ছোটি খাঁ ভাবলেন, বন্ধুর সঙ্গে থেকে দেশ দেখা হবে। আর, পিতা পরাগল খাঁ-এর যত্ন-আত্তি করতে পারবেন। এ যেন রথ দেখা আর কলাবেচা, দুই-ই হবে। যাই হোক, শুরু হল যুদ্ধ। ভয়ানক সেএক যুদ্ধ। ত্রিপুরা রাজ্য-অভ্যন্তরে তখন চলছিল গোলমাল, ডামাডোল।

রোগগ্রস্ত রাজা ধ্বজমাণিক্য হঠাৎ মারা যান। রানি সুলক্ষ্মণা নাবালক পুত্র ইন্দ্রকে সিংহাসনে বসালেন। সেনাপতি দৈত্যনারায়ণ মানুষটি লোভী, ক্ষমতার অপব্যবহার করতে লাগলেন। রাজ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিল। রাজা ধ্বজমাণিক্যের বাল্যবন্ধু অমাত্য বিজয়দেববর্মন রাজভ্রাতা দেবমাণিক্যকে বললেন, ‘রাজ্যে অরাজক, সিংহাসনে আরোহণ করো।’ দেবমাণিক্য বললেন: ‘তা কী করে হয়? ভ্রাতুষ্পুত্রকে বঞ্চনা করা ঠিক হবে না।’ বিজয় দেববর্মন বললেন: ‘রাজকুমার ইন্দ্র যখন রাজ্যশাসনে উপযুক্ত হবেন তখন না হয় তিনি সিংহাসনে বসবেন। রাজ্য রাজধানী সামলাবেন।’ কিন্তু দেবমাণিক্য বিব্রত হয়ে বললেন: ‘আপনি জ্যেষ্ঠভ্রাতার বন্ধু হিসেবে সৎপরামর্শ দিচ্ছেন বটে। তবে আপনার আত্মীয় দৈত্যনারায়ণ সেনাপতি হিসেবে বিরোধিতা করবেন। মহারানিও ভুল বুঝবেন।’ বিজয়দেববর্মণ তীক্ষ্ণযুক্তি দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করলেন: ‘এই মুহূর্তে, রাজ্যের মঙ্গলের কথা চিন্তা করা তোমার উচিত। পরাগল খাঁ ত্রিপুরার অধীনস্থ চট্টগ্রাম দখল করে নিয়েছেন; ইতিমধ্যেই। সেখানে শাসক এখন তিনি। ত্রিপুরার দিকে ছুটে আসবেন শীঘ্রই। এখুনি সন্ধিপ্রস্তাব করা উচিত বলেই মনে করি। সেনাপতি দৈত্যনারায়ণ চট্টগ্রামে পরাজিত হয়ে বন্দি আছেন। অরক্ষিত রাজধানীতে তোমাকে বাধা দেওয়ার কেউ নেই। আমার সহযোগীরা তোমাকে রাজসিংহাসনে আরোহণে সাহায্য করবে।’

দেবমাণিক্য বিজয়দেববর্মনের সাহায্যে রাজসিংহাসনে বসলেন। মহারানি সুলক্ষ্মণা অনেক বাধাদানের চেষ্টা করলেন বটে। তবে সফল হলেন না। দেবমাণিক্য মহারানিকে বললেন: ‘ক্ষমা করবেন মহারানি। আমার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নেই। এখন রাজ্যে সংকট। সংকট কেটে গেলে এবং রাজকুমার ইন্দ্র যেদিন যোগ্য হয়ে উঠবেন, সেদিন স্বেচ্ছায় এই সিংহাসন আমি ত্যাগ করব। এই ভরসা আপনাকে দিচ্ছি।’ মহারানির পক্ষে বিরোধিতা করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তিনি অবশ্য দিন কয়েক পরে ত্রিপুরা ছাড়লেন। বিশ্বনাথ দর্শনে বারাণসীতে গেলেন।

কাশীর দশাশ্বমেধ ঘাটে বসে আছেন মহারানি। ম্লান মুখ। উদাস দৃষ্টি। সন্ধ্যা আসন্ন। গঙ্গায় আলোকিত প্রদীপ-সহ ‘দোনা’ ভাসান হবে। বসে আছেন অনেকেই। সময়ের অপেক্ষা। এমন সময় আচমকা এক শব্দে পেছনে ফিরে তাকালেন রানি। দেখলেন, দিব্যকান্তি এক সাধু। পরনে রক্তবর্ণ ধুতি। গলায় উত্তরীয়। কপালে তিলক। গাল-ভরতি গোঁফ-দাড়ি। সেই সাধু তাঁর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। রানি ভক্তি-বিনম্রচিত্তে তাঁকে প্রণাম করলেন। সাধু বললেন: ‘মনে খুব দুঃখ। রাজরানি হয়েও প্রাসাদে শান্তি নেই। বৈভব থেকেও ভোগসুখ হচ্ছে না। মনে অশান্তি। তা তুমি কোন দেশের রানি মা?’ রানি বললেন: ‘ছিলাম ত্রিপুরা রাজ্যের রানি। এখন স্বামীহারা। সন্তান রাজসিংহাসনের অধিকারী হয়েও বঞ্চিত।’

সাধু সব শুনে বললেন: ‘রাজ্যে ফিরে যাও মা।’

সাধু সব শুনে বললেন: ‘রাজ্যে ফিরে যাও মা। তন্ত্রমতে পুজো আচ্চা করো। দুঃখ দূর হবে।’

‘তন্ত্রমন্ত্র কিছুই জানিনে বাবা।’—রানি কুন্ঠা প্রকাশ করলেন।

সাধু বললেন: ‘ফিরে যাও। দুজন তান্ত্রিক পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

রানি সাধুর পা চেপে ধরলেন। ‘সঙ্গে আপনিও চলুন। সব আয়োজন আমি করে দেব।’

এক তপ্ত বৈশাখে, পূর্ণ অমাবস্যার দিনে তন্ত্রসাধক লক্ষ্মীনারায়ণ দুজন অনুগামী নিয়ে ত্রিপুরায় হাজির হলেন। রানির আদেশে তাঁদের যত্ন আত্তি হল ঢের। ত্রিপুরা রাজ্যে তন্ত্র সাধনার ধুম পড়ে গেল। রাজা দেবমাণিক্য মহারানিকে খুশি করতে চাইলেন। তিনিও তন্ত্রসাধকের কাছে দীক্ষা নিলেন। রাজ্যের মানুষ প্রমাদ গুনলেন। দেবমাণিক্য রাজকার্য ভুলে তন্ত্রসাধকের পেছু পেছু ঘোরেন। তিনি নাকি গুপ্তবিদ্যা শিখছেন! অমাত্য বিজয়দেববর্মন দেবমাণিক্যকে সতর্ক করে দিলেন বটে। তবে ফল কিছুই হল না। ইতিমধ্যে ভয়ানক ঘটনাটি ঘটল। একদিন শ্মশানে রাজা দেবমাণিক্যের প্রাণহীন দেহ পড়ে রইল। সবাই অনুমান করল, এটা রানির যোগসাজশ। লক্ষ্মীনারায়ণের কাজ। আবার, রানি পুত্র ইন্দ্রকে সিংহাসনে বসানোর কথা ঘোষণা করলেন। বিষয়টি বুঝতে কারও বাকি রইল না। দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার। স্বার্থের অন্ধিসন্ধি।

গোটা ত্রিপুর রাজ্যে বিক্ষোভ। ঝড় বইছে। রাজবাড়ির সামনে বিক্ষোভকারীরা সেনাপতি দৈত্যনারায়ণের কাছে জবাব চাইল: ‘এমন ঘটনা কী করে ঘটল? রাজার নিরাপত্তারক্ষীরা কোথায় ছিল?’ দৈত্যনারায়ণ সমবেত উত্তেজিত জনতাকে আশ্বাস দিলেন: ‘অপেক্ষা করুন। এক পক্ষকালের মধ্যে রাজার হত্যাকারীকে খুঁজে বের করে শাস্তি দেব; দেবই।’ সেই মুহূর্তে উত্তেজিত জনতা শান্ত হল বটে। তবে রোষে ফুঁসতে লাগল।

একদিন গভীর রাত্রে, সেনাপতি দৈত্যনারায়ণ লক্ষ্মীনারায়ণের বাসভবনে গিয়ে বললেন: ‘ঠাকুর, মহারানি অসুস্থ। আপনাকে স্মরণ করেছেন। অসুস্থতা বাড়াবাড়ি রকমের। এখুনি চলুন। পদধূলি প্রার্থনা করেছেন। লক্ষ্মীনারায়ণ একটু ঘাবড়ে গেলেন। মুখে অবশ্য কিছু বললেন না। দিন তিনেক আগেও রানিকে আশীর্বাদী ফুল দিয়ে এসেছেন। রানির শরীর অবশ্য কিছু দিন ধরে ভালো যাচ্ছে না। তা ঠিক। তবে এমন কী হল! যে গভীর রাত্রে সেনাপতি তাঁকে নিয়ে যেতে এসেছেন! সেনাপতি মানুষটি চতুর। সেটা জানেন। কিন্তু কী করবেন, ভেবে উঠতে পারছেন না। বললেন: ‘এত রাত্রে নাই-বা গেলাম। কাল ভোর ভোর আমি পৌঁছে যাব।’

দৈত্যনারায়ণ মনে মনে চটছিলেন। তবুও নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে বললেন: ‘মার্জনা করবেন ঠাকুর। এখুনি যেতেই হবে। মহারানির হুকুম। আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি। হুকুম তো অমান্য করতে পারি না।’ ‘—তা বটে!’ লক্ষ্মীনারায়ণ বেজায় চটে গেলেন। তারপর বললেন: ‘ঠিক আছে। চলুন।’ এই কথা বলে হাতে তালি বাজিয়ে তাঁর রক্ষীদের ডাকলেন। সেনাপতি দৈত্যনারায়ণ আপত্তি জানালেন: ‘ঠাকুর, সেনাপতি স্বয়ং এসেছেন। আপনাকে নিয়ে যেতে। রক্ষীবাহিনীর তো প্রয়োজন দেখি না।’ সেনাপতির খোঁচাটুকু হজম করে তান্ত্রিক গুরু লক্ষ্মীনারায়ণ এগুতে লাগলেন। বিরস বদনে। মনে মনে শাপশাপান্ত করতে লাগলেন রানি ও সেনাপতিকে।

আধ ঘণ্টা আন্দাজ হাঁটলেন। রাজবাড়ির অভ্যন্তরে ঢুকতে যাবেন এমন সময় কান্ডটা ঘটল। হঠাৎ লক্ষ্মীনারায়ণ আক্রান্ত হলেন দুই গুপ্ত ঘাতকের হাতে। রাতের আঁধারে, কেউ টের পেল না, কী ঘটল! পরদিন ভোরের আলো ফুটে ওঠার সাথে সাথে নগর জেগে উঠল। কর্মব্যস্ত মানুষজন দেখল, ঘোড়ার পিঠে তান্ত্রিক লক্ষ্মীনারায়ণের প্রাণহীন দেহখানি। সেনাপতির আদেশে সেই মৃত তান্ত্রিকের দেহখানি নিয়ে নগর পরিক্রমা শুরু হয়েছে। ত্রিপুরবাসী যাতে বুঝতে পারেন; এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।

কিন্তু ত্রিপুর নাগরিক সেনাপতিকে সহজে ছাড়ল না। তারা উত্তেজিত। চিৎকার করে প্রশ্ন করল: ‘রাজা দেবমাণিক্যের পুত্র কুমার বিজয়কে মহারানি কোথায় বন্দি করে রেখেছেন?’

সেনাপতি সবিনয়ে বললেন: ‘আপনারা বিশ্বাস করুন। রাজা দেবমাণিক্যের মৃত্যুর পর মহারানি কার্যত আমার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন।’

মন্ত্রীপরিষদের কয়েক জন ক্ষোভ দেখালেন: ‘এখন তো সন্ধানকার্য চালাতে কোনো অসুবিধে নেই। রাজকুমারকে খুঁজে বের করুন। সেনাপতিমশায় এই মুহূর্তে একটা উঁচু ঢিবির ওপর দাঁড়িয়ে সমবেত জনতার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। তারপর বক্তৃতার ঢঙে বললেন: ‘দু-এক দিনের মধ্যে রাঙামাটি, উদয়পুর, কসবা প্রভৃতি অঞ্চলে ঢেঁড়া পেটানো হবে। আপনারাও বিভিন্ন জায়গা ঢুঁড়ে দেখুন। রাজকুমারের কেউ সন্ধান দিতে পারলে তাঁকে পুরস্কৃত করা হবে। এই সন্ধানের স্বার্থে রক্ষী, অশ্ব, হস্তী, গো-শকট প্রভৃতি প্রয়োজন হলে বলবেন। এরজন্য অর্থের অভাব হবে না। কোনো সংকোচ রাখবেন না।’

সেনাপতি অবিলম্বে সংবাদের সত্যতা যাচাই করে রাজকুমারকে উদ্ধার করে আনলেন; এক প্রকার বিনা বাধাতেই।

এই ঘটনার দিন দশেকের মধ্যে বিজয়দেববর্মন এসে দৈত্যনারায়ণকে জানালেন—‘কুমার বিজয় লক্ষ্মীপতি নামক স্থানে এক গোয়ালার ঘরে বন্দি আছেন। পাঁচ প্রহরীর প্রহরায়।’

সেনাপতি অবিলম্বে সংবাদের সত্যতা যাচাই করে রাজকুমারকে উদ্ধার করে আনলেন; এক প্রকার বিনা বাধাতেই। তারপর শোভাযাত্রা করে তাঁকে নিয়ে এলেন আগরতলায়। সেএক উৎসব।

জনান্তিকে বলতে শোনা গেল। রসরাজের রাজগীত বন্দনা তো শুধু কাহিনি মাত্র নয়। এ তো সত্যকাহিনি ‘রাজমালা’। ইতিহাসের সাক্ষ্যপ্রমাণ।

কিশোরদুনিয়া, অক্টোবর, ২০০৮

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%