রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার
১. ভাগরাজা
অসম রাজার নাম বুড়া রাজা। আসল নাম বুদ্ধি স্বর্গ নারায়ণ। বেশ প্রতাপশালী রাজা ছিলেন। আমাদের গল্প তাঁর পুত্র সুরাম্ফাকে নিয়ে। ইতিহাসে ওই নামে তাঁকে বড়ো একটা চেনেন না কেউ। কিন্তু ‘ভাগ রাজা’ বললে প্রায় সবাই বলবেন, চিনি বই কী! চিনব না কেন? এ রাজার কান্ড ভারি। তো সে-কান্ডটাই শোনাই।
রাজার খুব যে সুনাম ছিল, তা নয়! তার ওপর খ্যাপাটে। হঠাৎ হঠাৎ কান্ড করে বসেন। তাঁর কান্ডের সংখ্যা নাকি শতেক ছাড়িয়ে গেছে। রাজার কলমচি লিখেছেন। লিখেছেন মানে কী? গোপনে পঞ্জি লিখেছেন। এমনই;
অসম রাজার
মতিভ্রম
বদখেয়ালি, বদমেজাজি
কাজের কথায়
পন্ডশ্রম
যখন-তখন ডাকেন কাজি
এমন ঘটনা কেউ শোনেনি,
ঘটল সেটা আজি।
তাঁর বিচার কে করবে!
অসম রাজা পাজি।
কথাটা রাজার কানে গেল। কলমচি পঞ্জি লিখেছেন। রাজার বিরুদ্ধে। উস্কানিমূলক। রাজা তো শুনে অগ্নিশর্মা। হুকুম দিলেন। কলমচি গোসাঁইয়ের গর্দান নেবার। কলমচি গোসাঁই ক্ষমা চাইলেন। প্রাণভিক্ষা চাইলেন। রাজা বললেন— তা হবার নয়।
কলমচি এবার পা জড়িয়ে ধরলেন। রাজার তখন দয়া হল। পুরোনো লোক। নাহয়, আজেবাজে লিখেই ফেলেছে! ভুল করে। রাজা মত বদলালেন।

কলমচি এবার পা জড়িয়ে ধরলেন।
বললেন, গর্দান নয়। নির্বাসন।
তবুতো প্রাণ বঁাচল। কলমচি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।
কিন্তু এত যে কান্ড! কী লিখেছিলেন, কেনই বা লিখেছিলেন, কলমচি? সেকথাটাই এখন বলি। রাজা আবার একটা বিয়ে করলেন। এক আদিবাসী রমণীকে। নাম অরণ্যা। বিয়ে করেই রাজা হুকুম দিলেন। অরণ্যা হবেন পাটরানি। প্রধানা মহিষী। অন্য রানিরা বেজায় চটে গেলেন। কিন্তু রাজার হুকুম বলে কথা। তার নড়চড় হবে না। হলও না। ঢেঁড়া পিটিয়ে এ খবর রাজ্যবাসীকে জানানো হল। রাজার দিন সুখেই কাটছিল। কিন্তু সুখ ঠুনকো চুড়ির মতো। যতক্ষণ হাতে থাকে রিনিরিনি আওয়াজ তোলে। যখন ভাঙে পট পট আওয়াজ ওঠে।
যাইহোক, বিপত্তি এল। অন্যরূপে। রানি অরণ্যা রাজগৃহে এলেন। সঙ্গে নিয়ে এলেন আদরের ভাইপোকে। তার নাম হিরণ। হিরণের অবশ্য রাজবাড়ির যত্ন আত্তি সহ্য হল না। সাংঘাতিক ব্যামো হল। রাজবদ্যি চেষ্টা করলেন খুব। বিফল চিকিৎসা, শুশ্রূষা। হিরণ মারা গেল। রানি কেঁদে আকুল। রানি বললেন,— হিরণ চিতায় একা যাবে না। অন্য রাজকুমারদের সঙ্গী হতে হবে। শুধু তাই নয়। মান্যগণ্যদের মধ্যে কয়েক জনের পুত্রদেরও চিতায় তুলতে হবে।

রাজা দরবার বসালেন। জরুরী অধিবেশন।
রাজা দরবার বসালেন। জরুরী অধিবেশন। রাজা অমাত্যদের হীরণের মৃত্যু-খবর দিলেন।
অমাত্যরা শুনে খুব দুঃখিত হলেন। কেউ গালে হাত দিয়ে বসে রইলেন। শোকে নিথর। কেউ-বা অঝোরে কাঁদলেন। কান্না নদী হল। কেউ-বা আপন পুত্রশোকের মতোই হায়, হায় করতে লাগলেন! যেন পৃথিবী অন্ধকার। রাজা এবার বললেন। হীরণকে চিতায় তুলতে হবে। আপনাদের একটি করে পুত্রসন্তান দিতে হবে। চিতায় তোলা হবে। সহমৃত্যু। রানির বাসনা হয়েছে।
অমাত্যবর্গ হতবাক। এমন কথা কেউ শুনেছে, না দেখেছে? পাগলা রাজার কান্ড দেখে সবাই ক্ষেপে গেলেন। এক জোট হলেন। সরবে বললেন, এমন রাজা দূর হটাও। প্রায় সকলে সিংহাসনের দিকে ছুটে গেলেন। হ্যাঁচকা টানে সিংহাসন থেকে নামিয়ে দিলেন। ভাগুন রাজা, ভাগুন! রাজা দৌড়াতে লাগলেন। অমাত্যবর্গের পেছনে রাজনাগরিকবৃন্দও দৌড়াতে লাগল। রব উঠল, রাজা ভাগাও। ভাগ রাজা!
২. নাড়িয় রাজা
...নাড়িয় রাজা ...
রাজা আছেন
রাজা নড়েন,
রাজা চড়েন,
রাজা পড়েন।
কেমন করে পড়েন?
রাজা দাঁড়ালে পড়েন,
বসলেও নড়েন।
রাজা পড়েন,
কখন পড়েন?
তিনি উঠলেই নড়েন,
পড়েন।
তবু রাজা সিংহাসনে
চড়েন।
তো এমন এক রাজা ছিলেন। অসমে। নাম, সুতিম্ফা। ইনিও বুড়া রাজার পুত্র। রাজা সুরাম্ফাকে জনগণ ভাগিয়ে দিলেন। তাঁর কৃতকর্মের জন্য। সিংহাসন ফাঁকা। সিংহাসন তো আর ফাঁকা রাখা যায় না। তাই, বুড়া রাজার দ্বিতীয় পুত্র রাজা হলেন।
‘নাড়িয়’ শব্দের অর্থ হল, যার অসুখ হয়েছে, অসুস্থ। কী আর করা যায়! রাজবংশ। সেই রাজবংশের অসুস্থ ব্যক্তিটিকে রাজ্যের কিছু মানুষ মিলে রাজা বানালেন। রোজ ভোগেন তিনি। দুর্বল। সিংহাসনে ঠিক বসতেও পারেন না। নড়েন। পড়েন। সিংহাসন বলে কথা! আবার, চড়ে বসেন।
ব্যারামটি সাংঘাতিক। অসুস্থ বলে রাজ্যের কিছু মানুষ বাধাও দিয়েছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল। অসম রাজ্যে নাকি নিয়ম আছে। অসুস্থ ব্যক্তি, শারীরিক প্রতিবন্ধী সিংহাসনে বসতে পারবেন না।
সেযা-ই হোক, বেশ ধুমধাম, জাঁকজমকের মধ্যে অসমে রাজা হলেন সুতিম্ফা। কেউ আর তাঁকে ওই নামে বলেন না। বলেন, ‘নাড়িয় রাজা’।
নাড়িয় রাজার তেজ খুব। তাঁর তিন মন্ত্রী। বুড়া গোঁহাই, বড়ো গোঁহাই এবং বরপাত্র গোঁহাই। তাঁরা রাজার সঙ্গী। সর্বদা পাশে পাশে থাকেন। তিনি মন্ত্রীদের আদেশ করলেন। যাঁরা তাঁর রাজা হওয়ার বিপক্ষে ছিলেন। বাধা দিয়েছেন। তাঁদের তালিকা তৈরি করতে।

তিন জনকে নারীর সাজে সাজিয়ে রাজধানী থেকে বের করে দেওয়া হল।
বুড়া গোঁহাই মাথা নাড়লেন। তাই হবে, রাজা হুজুর। রাজা আবার বললেন। তালিকা দ্রুত তৈরি করুন। তাঁদের শীঘ্রই মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে।
রানি আইমণি আড়াল থেকে বললেন। কোনো কারণেই যেন দেরি না হয়। একদম, না।
মন্ত্রীরা সমস্বরে বললেন, তাই হবে, রানিমা, দেরি হবে না।
কিন্তু এই সময়ে অন্য বিপত্তি দেখা দিল। দাফলা পাহাড়ি সৈন্যরা ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে এল সমতল ভূমিতে। এমন মাঝে মাঝেই আসে। এবার একটু বেশি। রাজার মাথাব্যথা শুরু হল। যেমন করেই হোক। দাফলাদের শায়েস্তা করতে হবে। — রাজা হুকুম দিলেন। পিলপিল করে সৈন্য ছুটল। দাফলাদের সঙ্গে ভীষণ যুদ্ধ হল। দাফলারা অবশ্য পিছু হটল। কিন্তু দাফলাদের বিষাক্ত, প্রাণঘাতী তিরে অসম রাজার সৈন্য মরল; কয়েক শত।
রাজা তিন মন্ত্রীকে কৈফিয়ত তলব করলেন। তিন মন্ত্রী যুক্তি দিলেন তিনরকম।
একজন বললেন,— ওদের তির বিষাক্ত। তা ছাড়া আমাদের সৈন্যরা অলস।
দ্বিতীয়জন বললেন, —ঝোপের আড়াল থেকে যুদ্ধ করেছে তারা।
তৃতীয় জন বললেন, — ওদের সংখ্যা ও শক্তি আমরা আন্দাজ করতে পারিনি, রাজা হুজুর! রানি আইমণি চিকের আড়াল থেকে সব শুনলেন। তিনি বলে উঠলেন। ওদের বিদেয় করো। অযোগ্য।
রাজা আদেশ করলেন। শাঁখা-চুড়ি, শাড়ি-ব্লাউজ আনো। সেসবই এল। তিন জনকে নারীর সাজে সাজিয়ে রাজধানী থেকে বের করে দেওয়া হল।
রাজপথে এক পাগল চলেছে। মন্ত্রীদের হাল দেখে হি হি করে হাসতে লাগল। সেআপন মনেই বলল—
পাগলা রাজার কান্ড দ্যাখো
রাজা পড়েন, নড়েন
কী বোকামি করেন!
এঁরাই ধরেন,
তবেই বসেন
সিংহাসনে চড়েন।
পাগল রাজার কান্ড দ্যাখো
এখন কে বসাবেন,
কে চড়াবেন, সিংহাসনে?
আমি?
হি হি হি!...
৩. ভাগনিয়া রাজা
রাজার নাম সুতমল। নাড়িয় রাজার পুত্র। রাজা সুতমল কিছুটা-বা সতর্ক। পিতা ও পিতামহের পরিণতির কথা জানেন। তিনি অভিষেকের সময় ব্রাহ্মণদের ডেকে যজ্ঞ করালেন। আচার-আচরণ পালন করলেন। নাম নিলেন জয়ধ্বংজ সিংহ। কিন্তু ইতিহাসে তাঁর নাম হল ‘ভাগনিয়া রাজা’। সে-গল্পটাই বলি:
গোলমাল যা-কিছু শুরু, সেই অভিষেক পর্বেই। তাঁর অভিষেকের সময় ঘটাপটা, জাঁকজমক হল ঢের। নৃত্যগীতের আসর বসল। কুচকাওয়াজ হল। পশু-যুদ্ধ, খেল হল ঢের। কাছারি রাজা, দাফলারা, জয়ন্তিয়া রাজা যশোমন্ত রায় উপটৌকন দিলেন অনেক। রাজা অভিনন্দিত হলেন খুব। জয়ন্তিয়া রাজা এক আর্জি পেশ করলেন, ওই দিনই। দিমারু ও কুফানালি (গ্রাম নাম, নেলি ও খালা) স্থান দুটি অসম রাজার দখলে। সে- দুটি স্থান ফেরত চাইলেন। সবিনয়েই চাইলেন।
অসম রাজা বললেন, হবে না। কিছুতেই না!
জয়ন্তিয়া রাজা খুব আহত হলেন। মনে মনে বললেন, টের পাবেন রাজা।
জয়ন্তিয়ারাজ অসমের দুই বণিককে আটক করলেন। খবর গেল রাজার কাছে! রাজা বিস্মিত হলেন। এমন কাণ্ড? ঠিক আছে। বাণিজ্য পথ বন্ধ করো। অসম ও জয়ন্তিয়ার মাঝখানে সোনাতপুর। সোনাতপুর, বাণিজ্যদ্বার রুদ্ধ হল। জয়ন্তিয়া রাজা বুঝলেন। এভাবে পারা যাবে না। মাথা নত করলেন। ক্ষমা চাইলেন। রুদ্ধদ্বার আবার খুলে গেল। কিন্তু জয়ন্তিয়া রাজা প্রতিশোধ নিতে চাইলেন। তিনি মিরি, কাছারি ও দাফলাদের নিয়ে সংঘবদ্ধ হলেন।
মুঘল সুবাদার মিরজুমলা বাংলা থেকে ছুটে আসছেন। খবর পেয়ে জয়ন্তিয়ারাজ ঘোঁট পাকালেন। মিরজুমলা আক্রমণ করলেন। অসমরাজধানী গড়গাঁও। পেছনে জয়ন্তিয়া রাজের সংঘবদ্ধ শক্তি।
অসম রাজা সুতমলের করার কিছু ছিল না। পালিয়ে গেলেন। সেই থেকে তাঁর নাম হয়ে গেল; — ‘ভাগনিয়া রাজা’। গড়গাঁওতে শিশুরা এখনও ছড়া বলে;—
রাজা ভাগেন কোথায়?
কে জানে, কোন খানে?
ওই ফালে, সেই ফালে
ভেগে রাজা হলেন, ভাগনিয়া
কাঁথামুড়ি দিয়া।...
কিশোর দুনিয়া, শারদসংখ্যা, ২০০৭
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন