রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার
মানুষের প্রকৃতি দু-প্রকার। ভালো ও মন্দ।
নায়েব নাজিমও মানুষ। সেমানুষও হতে পারে, ভালো ও মন্দ। আমরা মন্দ ও ভালো মানুষ, নায়েব নাজিমের গল্প শোনাব।
সেই ভীষণ সংবাদটা ওড়িশার মাটিতে আছড়ে পড়ল। সম্রাট ঔরঙ্গজেব আর নেই। তাঁর মৃত্যুসংবাদে অবশ্য ওড়িশার রাজারা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। যেন বন্দিমুক্তির আস্বাদ পেলেন। অনেক উল্লেখপঞ্জিতে লক্ষ করা যায়। সুবাদার খান-ই-দৌড়ান ওড়িশার বুকে অত্যাচার চালিয়েছেন ঢের, ঢের। তা আর কহতব্য নয়। তাই, সম্রাটের মৃত্যু (৩ মার্চ, ১৭০৭ খ্রি.) সংবাদে, স্বভাবতই রাজারা খুশি। অনেককাল পরে, তাঁরা মুক্ত বিহঙ্গের মতোই হয়ে উঠলেন। স্নিগ্ধ বাতাস বুক ভরে টেনে নিলেন। স্বচ্ছন্দে, মুক্তপ্রাণে স্বাধীন হয়ে উঠলেন।
ময়ূরভঞ্জ, খুরদা, নীলগিরি ও কণিকার রাজারা যদি একত্রে মিলতেন, বা শক্তির সমবায় গড়ে তুলতেন তাহলে মুঘল সম্রাট প্রতিনিধি, সুবাদারের পক্ষে সম্ভব হত না; তাঁদের করায়ত্ত করা বা শাসন প্রতিষ্ঠা করার। রাজারা অবশ্য অনেক বারই শক্তিসংঘ গড়ে তোলার কথা ভেবেছিলেন। সেভাবনার সারবত্তা ছিল না। কিছুই গড়তে পারেননি। এমনকী, এমন সুযোগ পেয়েও পারলেন না। উপরন্তু, একে তো সুবাদার। তার ওপর সৃষ্টি হয়েছে আরও একটি পদ। নায়েব নাজিম। গোদের ওপর বিষফোঁড়া। তো ওড়িশার প্রথম নায়েব নাজিম হলেন তকিখান। (১৭২৭-১৭৩৪ খ্রি.)।
তকি খানের মনটি খুশি খুশি হয়ে আছে। গতরাত্রে, তিনি পুত্রের জনক হয়েছেন। আজকের সকালটি মনোরম। পাত্রমিত্র পরিবৃত হয়ে তামাকু সেবন করছেন। তাঁর মজলিশে একদল বাদ্যশিল্পী আছে। ওড়িশার দূরপ্রান্ত কালাহান্ডি থেকে এসেছে তারা। এসেছে মানে, তাদের জোর করে ধরে আনা হয়েছে। বড়ো মানুষগুলির বাজনা ভীষণ ছোটো। বাজনা ঘটের মতো দেখতে। তবে নানা রঙে চিত্রিত। শিল্পীদের পোশাকও নানা বর্ণের। বাদ্যটিকে ‘ঘুমুরা’ বলে। শিল্পীরা সম্মিলিতভাবে বাজনাটি বাজায়। শব্দ-সংগতি মধুর, মধুর। কিন্তু আনন্দলহরি তুলতে শিল্পীদল আসেনি। শিল্পীরা খুরদার রাজা মুকুন্দদেবের রাজসভায় আসছিল। তকি খানের শ্যালক মোহাব্বত খাঁ ধরে এনেছিলেন। এমন মানুষজন আর বাদ্য বাজনা দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কারা?’

শিল্পীরাও খুশিতে বাজনা বাজাতে লাগল স্থান-কাল-পাত্র ভুলে।
দলপতি রমেশ বেহেরা বললেন: ‘আমরা ঘুমুরা শিল্পী’। ‘সেটা আবার কী বস্তু?’ কর্কশ কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন মোহাব্বত খাঁ। রমেশ সঙ্গীদের ইঙ্গিতে বাজাতে বললেন। সবাই একসঙ্গে বাজনায় তাল দিল। মোহাব্বত খাঁ এতক্ষণ ঘোড়ার ওপর বসেই ‘বাতচিত’ করছিলেন। বাজনার মধুর আওয়াজ শুনে এক লাফে নেমে পড়লেন। এবং নৃত্য করতে লাগলেন। তাঁকে দেখে অনুচরেরাও নৃত্য করতে লাগল। শিল্পীরাও খুশিতে বাজনা বাজাতে লাগল স্থান-কাল-পাত্র ভুলে। কিছুক্ষণের মধ্যে অবশ্য মোহাব্বত খাঁ সংবিত ফিরে পেলেন। এরপর বললেন, ‘চলো, তকি খান সাহেবের কাছে।’
রমেশ বেহেরা আপত্তি জানালেন। ‘সেটা তো সম্ভব নয়। আমরা খুরদারাজের আমন্ত্রণে এসেছি। অন্যথা হলে রাজা গর্দান নেবেন।’ মোহাব্বত খাঁ ক্রুদ্ধ হয়ে সঙ্গীদের নির্দেশ দিলেন; ‘বন্দি করে নিয়ে চলো। না গেলে সকলের গর্দান এখনই যাবে।’
খুরদার রাজা মুকুন্দদেব বিষয়টি জানতে পেরে তকি খাঁ-র বিরুদ্ধে একদল সৈন্য পাঠালেন। তারা ঘুমুরা দলটিকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে গেল। নায়েব নাজিম ভীষণ অপমানিত বোধ করলেন। ক্রোধে ফুঁসতে লাগলেন। তক্কে তক্কে থাকলেন। খুরদার রাজার প্রতি নায়েব নাজিমের এই অশোভন আচরণটিকে রাজার দেওয়ান লঘু করে দেখলেন না। তিনি রাজাকে প্ররোচিত করতে লাগলেন নাজিমকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার। রাজার অবশ্য নরম সুর। বললেন, ‘ঘুমুরা দলটিকে যখন ছিনিয়ে আনতে পেরেছি; সেটাই যথেষ্ট। মুঘল প্রতিনিধি এই নাজিমের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি আমাদের কোথায়! তবুও পারা যেত, যদি অন্য রাজারা শক্তি জোগাতেন।
দেওয়ান এই জবাবে সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি পাইকদের দুর্বল রাজার বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তুললেন। পাইকরা বেশ কিছুদিন ধরে রাজার ওপর ক্ষুব্ধ। বিশেষ করে, তাদের পাইকান জমির পরিবর্তে যে বেতনকাঠামো, মুঘল নীতি চালু হয়েছে। তার পুনর্বিন্যাস চাইছে। কিন্তু কিছুতেই তার সমাধান হচ্ছে না। ফলে এদের অনেকেই বিদ্রোহী।
এমন সমস্যাসংকুল দিনে, তকি খান খুরদার রাজপ্রাসাদে হানা দিলেন। রাজা তাঁর যথার্থ মর্যাদা রক্ষা করতে পারলেন না। পালিয়ে গেলেন। আবার, ধরাও পড়লেন। কটকে তাঁকে কয়েদ করে রাখা হল। এরপর, তকি খান ওড়িশার বুকে জ্বেলে দিলেন আগুন। সে-আগুনের জ্বলন্ত শিখায় রাজাদের সম্ভ্রম পুড়ল। ঐশ্বর্য পুড়ল। তকি খান শাসনের নামে কালিমা লেপন করলেন। সাত বছরে, (১৭২৭-৩৪ খ্রি.) শুধু শোষণ ও নিষ্পেষণের ইতিহাস গড়লেন।
কথায় বলে, মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠের তফাত অনেক। তকি খানের মতো অত্যাচারী নায়েব নাজিম যেমন আছেন। আবার, ভালোও আছেন। তকি খানের মৃত্যুর পরবর্তী মুঘল নাজিম হলেন দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খান। তাঁর প্রতিনিধি মির হাবিব ওড়িশায় দেওয়ান হলেন। আরবদেশীয় এই মানুষটি ওড়িশায় এসে বুঝলেন, দেশটি প্রাকৃতিক সম্পদ আর ঐশ্বর্যে ভরপুর। সাগরের মতো বিশাল প্রায় সব মানুষের হৃদয়। তিনি রাজাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতেন। প্রথমে দায়িত্বভার পেয়ে ওড়িশার মাটি ছুঁয়ে ছেনে দেখবেন বলে বেরিয়ে পড়েছেন। একদিন খুরদার রাজপ্রাসাদের অতিথি হয়েছেন। কিন্তু হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়লেন। অসুখের দিনে, অসুস্থব্যক্তি আত্মীয় পরিজন আবৃত হয়ে থাকতে চান। কিন্তু তাঁর মনে কষ্ট ছিল না, এতটুকু! কিশোরী রাজকন্যা সুভদ্রা সেবা যত্ন দিয়ে তাঁকে সারিয়ে তুলেছে। রাজবৈদ্য মির সাহেবকে একদিন সকালে ঔষধি-নিদান দিতে এসে বললেন: ‘মা সুভদ্রার সেবার কাছে আমার ঔষধি নিষ্ফল।’ মির সাহেব খুব হাসলেন, তা সত্য, বৈদ্যমশাই। আমার মায়ের সেবাযত্নে প্রাণ ফিরে পেয়েছি।’ মির সাহেব হাসতে হাসতে বিগলিত। এরপর সুভদ্রাকে কাছে বসিয়ে বললেন: ‘সুভদ্রা, তুমি হচ্ছ আমার আগের জন্মের মা।’
সুভদ্রা খুব লজ্জা পেল। ছুটে পালিয়ে গেল। মিরসাহেব দেখলেন, রাজকন্যে শ্বেত পায়রার মতোই উড়ে গেল। সুখী পায়রা, শান্তির পায়রা এমনই ওড়া-উড়ি করে। এমনই বুঝি উড়ে চলে!
অনেক ঘটনা মন থেকে হারিয়ে যায়। কিছু ঘটনা জেগে থাকে মনের পটে। এই ঘটনাটি তাঁর মনে গেঁথেই ছিল। ভোলেননি, কিশোরীর সেবাযত্ন। নরম নরম আঙুলের ছোঁয়া। যে বোঝেনি আপন-পর। ভোলেননি আরও। দেশীয় রাজাদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব। তাই তিনি দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খানকে উদবুদ্ধ করলেন। আলিবর্দি খানের আক্রমণের সমুচিত জবাব দিতে। ১৭৪১ সালে, আলিবর্দি খান বাংলার দায়িত্বভার পেলেন। সেই সুবাদে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার নাজিম হলেন। কিন্তু দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খান এই নিযুক্তি মানতে পারলেন না। দেশীয় রাজারা দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খানকে ভরসা দিলেন; ‘নায়েব নাজিম সাহেব, আমরা আপনার সঙ্গে আছি।’ দেওয়ান মির হাবিবও ম্লান হাসলেন। ‘এই দেশকে আমরা ভালোবেসেছি। মুঘল স্বার্থরক্ষার নিমিত্তে আমরা এখানে এসেছিলাম। কিন্তু সবার ঊর্ধ্বে মানুষ। সেই মানুষকে নির্জিত করে অর্থকড়ি, সম্পদ, আহরণ কারুরই কাম্য হওয়া উচিত নয়। একটি প্রদেশ ঐশ্বর্য সম্পন্ন হলেই সম্রাটের পক্ষে লাভ। আমরা সম্রাটের কর্মচারীগণ এই বড়ো সত্যটা ভুলে যাই। এবং বর্বরোচিত কাজ করি। আল্লা! আমাদের জ্ঞান প্রজ্বলিত করুন!’
রাজঘাট ফেরির কাছে পৌঁছে সেদিন আলিবর্দি খানও আল্লার কাছে দোয়া মানলেন। শক্তির দোয়া। রাজাদের দম্ভ যাতে ভাঙতে পারেন। এমন দোয়া।
ওড়িশায় আলিবর্দি খানের কতৃত্ব অস্বীকার করলেন, দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খান। তিনি দেশীয় রাজাদের সঙ্গে নিয়ে আলিবর্দি খানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শিবির গড়ে তুললেন। ময়ূরভঞ্জ রাজা দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খান ও মির হাবিবের প্রতি বিশ্বস্ত ও মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ। তাই, আলিবর্দি খানের আগমন সংবাদ পেয়েই রাজঘাটে আক্রমণ করে বসলেন। রাজা মনে করলেন দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খান ও মির হাবিবের শাসনে তাঁরা সুখেই আছেন। এই ক-বছর। সুতরাং তাঁদের বিরুদ্ধে দিল্লীশ্বরের এই ষড়যন্ত্র কেন!
সেযাই হোক, আলিবর্দি খান এলেন। যুদ্ধ করলেন। পরাজিত করলেন ময়ূরভঞ্জ রাজাকে। তবে, রাজা রঘুনাথ ভঞ্জ ছাড়ার পাত্র নন। পরাজিত হয়ে অরণ্যে আশ্রয় নিলেন বটে। সাময়িক। আবার, শক্তিসঞ্চয় করে সুবর্ণরেখা নদীতটে বিশাল বাহিনী উপস্থাপন করে প্রতিরোধের শক্ত ঘাঁটি তৈরি করলেন। কিন্তু বোমাবর্ষণ করে রাজার শক্তিকে নিষ্ক্রিয় করলেন আলবর্দি খান। এই নতুন বিস্ফোরকে ঘায়েল হলেন রাজা। ফলে আলিবর্দি খান জয়ী হন। সাফল্য এল, দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খান ও মির হাবিবকে পরাস্ত করার ক্ষেত্রেও। কিন্তু তাঁরা অবশ্য গা-ঢাকা দিতে পারলেন। আলিবর্দি খানের আহ্লাদ ও হট্টগোলের মধ্যে।
এক জায়গায় পড়ে থাকলে তো চলে না। একদিকে ভোল পাল্টাতে গেলে আর একদিকে গোল বঁাধে। তিনি যখন ওড়িশায়, শুনতে পেলেন মারাঠা শক্তির পদসঞ্চার। দ্রুততার সঙ্গে বাংলায় ফিরে গেলেন। দায়িত্ব দিয়ে গেলেন। মির্জাবাকিরকে।
কথা উঠেছে। মির হাবিব নাকি, আলিবর্দি খানের উপর বদলা নিতেই মারাঠা রাজ রঘুজি ভোঁসলেকে ফুসলিয়ে বাংলা ও ওড়িশায় এনে হাজির করেছিলেন! রঘুজি ভোঁসলে প্রধানমন্ত্রী ভাস্কর পন্ডিতকে প্রেরণ করেছিলেন। এরপরের ঘটনা বিচিত্র। তবে মির হাবিবের ভূমিকা সত্য হতে পারে, মিথ্যেও হতে পারে। মির্জা বাকির মানুষটি খুবই বুদ্ধিমান। সার বুঝেছিলেন। রাজাদের সঙ্গে পায়ে-পা লাগিয়ে বিবাদ করলে কপালে অশেষ দুঃখ তাঁর-ই হবে। মিত্রতাই সব থেকে নিরাপদ। সেপথেই তিনি চললেন। ময়ূরভঞ্জ রাজা তাঁকে সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দিলেন। আরও বললেন: ‘মির্জা বাকির সাহেব, যদি স্বাধীন হয়ে আলিবর্দি খানের বিরুদ্ধাচরণ করেন; তবে তিনি তো বটেই, অন্য রাজারাও সহযোগ দেবেন।’ বাকির সাহেবের শরীরে শিরশিরানি শুরু হয়। বুক দুরু দুরু করে কাঁপে। লোভ আকাঙ্ক্ষা যেন দীর্ঘতর হয়। মনে হল, আশমানি চাঁদ টুক করে তাঁর হাতে নেমে এল।
তো মির্জা বাকির আলিবর্দি খানকে সরাসরি অস্বীকার করে বসলেন। সেই সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণাও। আলিবর্দি খান সাহেবের কাছে সংবাদ ছিল। মির্জা বাকিরকে মদত দিচ্ছেন ময়ূরভঞ্জ রাজা। তিনি ছুটে এলেন। সঙ্গে নিয়ে এলেন বিশাল বাহিনী। মির্জা বাকিরের বাহিনী খুব সহজে পরাজয় মানল। কিন্তু মির্জা বাকিরের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। দুর্মুখেরা বলেন, আলিবর্দি খান খুন করিয়েছেন। তবে সত্য মিথ্যা নির্ণীত হয়নি।

মির হাবিব সাহেব শকট থেকে নানান সম্ভার ও একটি বাক্স তুলে বললেন, ‘বিবাহের যৌতুক’।
এবার, আলিবর্দি খান ওড়িশায় শক্তপোক্ত ঘাঁটি তৈরি করলেন। স্থানে স্থানে সামরিক চৌকি বসালেন। ফিরে যাচ্ছেন, কিন্তু হঠাৎ রাজঘাটে এসে ক্ষণিক থামলেন। ক্রোধে ফুঁসলেন। কোথায় ময়ূরভঞ্জ রাজা? রাজা অবশ্য মেঘাসানি পর্বতে লুকিয়ে পড়লেন। আলিবর্দি খান ধ্বংস লীলায় মেতে উঠলেন। আগুন আর অস্ত্রের ঝনঝনানিতে ময়ূরভঞ্জের মাটি কেঁপে উঠল। নিষ্ঠুর সংহারে লীলাচঞ্চল মানুষটি অবশ্য চলে গেলেন। পেছনে ফেলে গেলেন মন্দকীর্তির স্তূপ।
খুরদার রাজবাড়িতে উৎসব। বিবাহ উৎসব। সুভদ্রার বয়েস এখন উনিশ। তাঁরই বিয়ে। বর এক রাজকুমার। তিনি আসবেন আগামীকাল। চারিদিকে আলোর রোশনাই। সাজ সাজ রব, নহবত খানায় সানাই বাজছে। বিষণ্ণ সুরে। আমাদের প্রাজ্ঞ মানুষটি একবার ধমকের স্বরে বললেন: ‘সুরে চমক আন। দুখু দুখু ভাব কেন? বাহাঘর (বিয়ে বাড়ি) আনন্দ উৎসব অছি।’
হঠাৎ অদূরে দেখা গেল অশ্ব-যান শকট। তাতে বোঝাই রাজকীয় সম্ভার। কে আসছেন? চিনতে পারলেন না, ঐ প্রাজ্ঞব্যক্তিটি-ও। কিন্তু খুব কাছে আসতে বোঝা গেল। তিনি আর কেউ নন। মির হাবিব সাহেব।
মির হাবিব সাহেব অভিবাদন জানিয়ে মলিন মুখে বললেন: ‘ওড়িশা ছেড়ে যেতে মন চায়নি। তাই আলিবর্দি খানের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে ছিলাম। নগরে এসে শুনলাম, আমার সুভদ্রা মায়ের বিয়ে। একবারটি ওকে দেখান রাজা, অনেক দিন দেখিনি।’ রাজা অন্দরমহলে প্রবেশ করে সালংকারা সুভদ্রাকে কাছে এনে দাঁড় করালেন। মির হাবিব সাহেব শকট থেকে নানান সম্ভার ও একটি বাক্স তুলে বললেন, ‘বিবাহের যৌতুক। এতে যা আছে, মা তোমার। আমার সমগ্র সঞ্চয়।’
লজ্জা রাঙা সুভদ্রার চোখে আনন্দাশ্রু। মির হাবিব সাহেবেরও আদ্র চোখ। তিনি কোমল কন্ঠে আশীর্বাদ জানালেন, ‘ভালো থাক, সুখে থাক। জীবন আনন্দে পরিপূর্ণ হোক।’ সুভদ্রা পিতার মুখের দিকে তাকালেন। স্নেহের পুত্রীর ভাষা বুঝে বললেন: ‘হাবিব সাহেব, আমাদের ছেড়ে যাবেন না।’
কথাটা একেবারে সত্যি। তিন সত্যির মতোই। তিনি ওড়িশাকে ভালেবেসেছিলেন। বেঁধেছিলেন এক বন্ধনে। আত্মীয়তার বন্ধন যেমন। খুরদার কাছে হাবিব নগর বলে একটা গ্রাম আছে। সেখানে নতুন মানুষ গেলে এখনও পুরোনো দিনের মানুষরা শোনান গ্রাম-নাম কথা। বলেন, ‘এমন গ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক ভালো মানুষের গল্প।’
আলোর ফুলকি শারদীয়, ২০০১
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন