রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার
শীতের বিকেল। ঠিক বিকেল নয়, আবার দুপুরও নয়। রোদ আছে। তবে সিঙ্গারবিল অঞ্চলে আলো মরে আসছে। ত্রিপুররাজ ঈশানচন্দ্র এবং প্রাক্তন উজির দুর্গামণির পুত্র সুমঙ্গল ঘোড়া থেকে নেমে এলাকাটি ভালো করে দেখতে লাগলেন। এমন করেই দেখছেন, আজ নিয়ে চার দিন। নকশা ধরেই দেখছেন বটে। তবে কিনারা কিছু হল না। ত্রিপুররাজ ক্লান্ত। হতাশ হয়ে শুধোলেন: উজির কাকা কোনো তথ্য রেখে যাননি? রেখেছেন বই কী,—এই নকশা! সুমঙ্গল বললেন। ত্রিপুররাজ আরও এক বার নকশাটির দিকে বড়ো বড়ো চোখে তাকালেন। লক্ষ করলেন, নকশাটি ত্রিভুজাকৃতি। তিনটি গোল চিহ্নের সঙ্গে লম্বা রেখায় যুক্ত করা হয়েছে। রাজা সেটি সোজা-উলটো ধরে কিছু একটা বুঝবার চেষ্টা করছেন। একসময় বললেন,—সুমঙ্গল রেখে দাও।
সুমঙ্গল সেটি গায়ের আচকান তুলে নিমার পকেটে রাখলেন।
রাজার হঠাৎই কী খেয়াল হল। বললেন, আরও এক বার বার করো তো দেখি!
সুমঙ্গল কিছুটা-বা বিস্মিত। বললেন,—এই নাও।
ত্রিপুররাজ চোখ বিস্ফারিত করে দেখতে লাগলেন। বললেন, দেখ দেখ সুমঙ্গল, তিনটি কৌণিক বিন্দু সমান নয়। উপরেরটা একটু বড়ো। ত্রিভুজের চারিদিকে ঝোপঝাড় অঙ্কিত হয়েছে। কিন্তু বড়ো বিন্দুটার কাছে একটা বড়ো গাছ, লক্ষ করছ?
সুমঙ্গল অবাক চোখে বললেন, হ্যাঁ, তাইতো!
আজ থাক। কাল দুপুর দুপুর আসব। এখন সন্ধ্যা হয়ে এল। ফিরে চলো। রাজা ঈশানচন্দ্র এবং সুমঙ্গল ঘোড়ায় চেপে বসলেন। দুই বন্ধু পাশাপাশি চলতে লাগলেন নীরবে।
একসময় সুমঙ্গল নীরবতা ভেঙে বললেন: বাবার মৃত্যুর আগে ক-টি শব্দ কখনো সখনো মাকে বলতে শুনেছি, সিঙ্গারবিল। কলসি। সোনার কলসি।
ঠিক পরদিন দুপুর দুপুর দুই বন্ধু সিঙ্গারবিলে গিয়ে হাজির হলেন। একটা শোরগোল শুনলেন। তাঁরা বিলের পাশে ঘন জঙ্গলে গা-ঢাকা দিলেন। দেখলেন, সিপাহীদের একটা বড়োসড়ো দল সংখ্যায় প্রায় তিন শত; কম নয়। তারা ধেয়ে আসছে। বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে, ইংরেজের বিরুদ্ধে। তাদের কথোপকথন থেকে জানা গেল, চট্টগ্রামে ৩৪নং রেজিমেন্টের পদাতিক বাহিনী। ইতিমধ্যেই তারা কারাগার ভেঙে বন্দি মুক্ত করেছে। তাই উল্লাস। তরবারি উঁচিয়ে বলছে, ‘ইংরেজ দূর হটো’, কেউ-বা বলছে ‘দেশ ছাড়ো’ কেউ-বা বলছে ‘জবাই করবো’, মার কাট কাট রব। চারিদিকেই উৎকট কোলাহল।
এক সৈনিক, ছিপছিপে লম্বা। গোঁফ জোড়া বিশাল আকৃতির। দুটি প্রান্ত যেন মনে হয়, প্রজাপতির ডানা। তার ধুতি মালকোঁচা দিয়ে পরা। গায়ে জলপাই রঙের উর্দি। সামরিক পোশাক। বয়েস পঞ্চাশের নীচেই হবে।
তো সেআর এক সৈনিককে জিজ্ঞেস করল,—তোমার মনে পড়ে, সেদিন তারিখটা কী ছিল?
—তুমি কোন তারিখটার কথা বলছ, পাণ্ডেজি?
—আরে বুদ্ধু, যেদিন আমরা চট্টগ্রামের কারাগার ভাঙলাম। ট্রেজারি লুঠ করলাম! — সেই তারিখটা জানতে চাইছি।
সেই সৈনিকটি একটু নীরব থেকে কিছু একটা চিন্তা করল। তারপর বলল, ১৮ নভেম্বর, ১৮৫৭।
পাণ্ডেজির ধন্দ কাটল না। বলল, ১৮ না ১৯?
সৈনিকটি জোর গলায় বলল, আজ ২২ তারিখ। ফেনি নদী পেরিয়ে আমরা আগরতলায় ঢুকছি। ঘটনাটি চার দিন আগে ঘটিয়েছি। তোমার মনে পড়ছে না?
পাণ্ডেজি এবার সরবে মাথা নাড়ল। —হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক বলেছ, হরি! এরপর তারা দুজনে ফিসফিসিয়ে কথা বলল।
এই সৈনিকদ্বয়ের মধ্যে বয়সে বড়ো সৈনিকের নাম সুরজ পাণ্ডে এবং কনিষ্ঠ সৈনিকের নাম হরপ্রিয় সিদ্ধান্ত। সুরজ পাণ্ডে ৩৪নং পদাতিক বাহিনীর হাবিলদার। রাশভারী। যখন তখন হুকুম দেন। তবে সৈনিকরা সবাই তাকে মান্য করে। অবশ্য পাণ্ডেজী হরপ্রিয়কে স্নেহ করেন। একটু প্রশ্রয় দেন। মজা করে হরপ্রিয়কে বলতেন, হরি ডাকা হয় তোমাকে। আসলে ‘হরি’ ‘হরি’ উচ্চারণে ঈশ্বরনাম হয় কি না, বল!
হরপ্রিয় একগাল হেসে বলত, তা হুজুর, হয় বই কী! যাই হোক, সুরজ পাণ্ডে হুকুম দিলেন: আজ এখানে বিশ্রাম। আগরতলায় কাল সকালে প্রবেশ করা যাবে। তবে রাজা ঈশানচন্দ্র মাণিক্যকে খবর পাঠাতে হবে। ইংরেজ হটাতে তিনি নিশ্চয়ই সাহায্য করবেন। হরপ্রিয় ঠোঁট উলটিয়ে বলল, কী জানি!

হরপ্রিয় একগাল হেসে বলত, তা হুজুর, হয় বই কী!
পরদিন, বিদ্রোহীদের জনাপঞ্চাশের একটি ছোটো দল আগরতলায় এসে রাজা ঈশানচন্দ্র মাণিক্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করল। নিবেদন জানাল,—মহারাজ, আমাদের সাহায্য করুন। আমরা ইংরেজ শাসন উৎখাত করব। তাদের তাড়াতে চাই, এদেশ থেকে। রাজা নরম সুরে বললেন, তাদের সঙ্গে পেরে ওঠা কি সম্ভব?
—সম্ভব! হাবিলদার পাণ্ডেজি দৃঢ় কন্ঠে বললেন। রাজা বললেন—আপনাদের লোকবল নেই। অর্থবল নেই।
পাণ্ডেজি বললেন, সেইজন্যই তো সাহায্য চাইছি। রাজা এবার বিনীত বললেন; — ছোট এই পার্বত্য রাজ্যে বিশৃঙ্খলা ঘটাবেন না। ত্রিপুরা স্বাধীন বটে। নামেই স্বাধীন। কোম্পানির দৃষ্টি রয়েছে। খবরদারিও করে। এখানে কুকি সম্প্রদায় বিদ্রোহ করে নানা অছিলায়। কোম্পানির শাসকরা আমাদের ওপর চাপ দেয়। আমি আপনাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারব না। আশ্রয় তো নয়ই। তবে আমি আপনাদের প্রতি সহানুভূতিশীল।
এতক্ষণ হরপ্রিয় চুপচাপ ছিল। এবার সেবলল, তবে অর্থ দিন। আমাদের বিদ্রোহী দল মজবুত হোক। রাজা সে-প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করলেন। কারণ, তিনি ইংরেজের রোষ দৃষ্টিতে পড়তে চান না। তখন বাধ্য হয়েই বিদ্রোহীরা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়ল। একদল মণিপুর ও কাছাড়ে প্রবেশ করল। আর একটি দল ত্রিপুরি আদিবাসী সম্প্রদায়ের সাহায্যে আত্মগোপন করল। সেবড়ো কঠিন সময়।
রাজার মনে সুখ নেই। কেন যে নেই, সেকথা জানে একজন। সুমঙ্গল। সেরাজা কৃষ্ণকিশোর মাণিক্যের উজির দুর্গামণির পুত্র। রাজা কৃষ্ণকিশোর মাণিক্যেরই পুত্র বর্তমান রাজা ঈশানচন্দ্র মাণিক্য।
সুমঙ্গলও শুনেছে, সিঙ্গারবিল, কলসি। সোনার কলসি, ইত্যাদি। মনে মনে প্রশ্নের ঢেউ উঠেছে। কিনারা হয়নি।
একদিন সুমঙ্গল মাকে জিজ্ঞেস করল, সত্যি করে বলো তো মা, সিঙ্গারবিল, কলসি, সোনার কলসি; এসব কথার মানে কী?
মা এসব কথা শুনে অবাক হয়। ছেলের মুখে এসব প্রশ্ন কেন? কিছু একটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তারপর আকাশপানে মুখ তুলে বলল, কী জানি! সুমঙ্গলের সন্দেহ হয়। মা বুঝি কিছু একটা লুকোচ্ছে। আর একদিন। সুমঙ্গল মাকে অনুনয় বিনয় করে জানতে চাইল; সেকথা।
মা শুধু বলল, একটা গভীর কথা আছে। ছেলে বলল, সেটাই তো জানতে চাইছি! মা শেষে রুষ্ট হয়ে বলল, পীড়াপীড়ি কোরো না। দিব্যি আছে। সুমঙ্গলের মনে হল। মা ছাড়া এই গভীর কথা নিশ্চয়ই আর কেউ জানে।
শেষে সেএকদিন ঠাকুমাকে গিয়ে ধরল। অশীতিপর বৃদ্ধা ফিক ফিক করে হাসল। কিছু বলতে চাইল না। সুমঙ্গলও ছাড়ল না। ঠাকুমার গায়ে হাত বুলাল। কুঁচকানো চামড়া ধরে খানিকটা টানল। ঠাকুমা বেশ মজা পেল। সুখ স্পর্শ। ঠাকুমা জিজ্ঞেস করল,—আজ এত খাতির কেন; বল তো দাদুভাই?
নাতি হাসল। ওহ ঠাকুমা, তোমার মনে নেই। আজ তোমার জন্মদিন। তোমাকে সোনার কলসি দেব। —অ্যাঁ বলিস কীরে! তুই সেকলসির খোঁজ কোথায় পেলি? সেই কলসি পেয়েছিস?
সুমঙ্গল বুঝল, হদিস মিলতে আর দেরি নেই। সেশুধু বলল,—ওহ ঠাকুমা, সেই কলসির কথা তুমি কী জান! একটু বলো, বলো না?
ঠাকুমা বলল চুপিচুপি। দাদুভাই, কাউকে আবার বোলো না। তোমার বাবা সৎ মানুষ ছিল। উজির হিসেবে নামডাক ছিল খুব। রাজার ধনদৌলত বৃদ্ধিতে তার বুদ্ধি ও শ্রম ছিল ঢের। তো সেই ধনদৌলত মহারাজ কৃষ্ণকিশোর মাণিক্য হেলায় ওড়াতে লাগলেন। রাজ্যের প্রজামঙ্গলের কথা একদম চিন্তা করতেন না। সুখ বিলাসে মত্ত থাকতেন।

এর পরদিন, ভোরসকালে প্রভাতসূর্যকে সাক্ষী রেখে দুই রাজপুরুষ যাত্রা করলেন সিঙ্গারবিল অভিমুখে।
প্রজার সুখের কথা চিন্তা করেই তোর বাবা দুর্গামণি একদিন রাতে দুটি সোনার কলসি ভরে সোনাদানা, হিরে জহরত, মোহর নিয়ে সিঙ্গারবিলে রেখে এল।
ঠাকুমার কথা শুনে নাতি আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না। শুধোয় রেখে এল, মানে?
ঠাকুমা তখন খোলসা করে বলল, সিঙ্গারবিলের ধারে বটবৃক্ষের নীচে পুঁতে দিল। কাক-পক্ষীতেও টের পায়নি। অবশ্য, রাজার মনে একটা সন্দেহ হয়েছিল। তবে রাজার ধন যে তোর বাবা আত্মসাৎ করতে পারেই না। সে-বিশ্বাস রাজারও ছিল।
সে-রাতে সুমঙ্গল রাজার কানে কথাটি তুলে বলল, একটা শর্ত তোমাকে মানতে হবে রাজা। আমার বাবা তোমাদের বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। আমিও করব না।—বলো, শর্ত মানবে?
রাজা ঈশানচন্দ্র বললেন, হেঁয়ালি রাখো। বলো, তোমার কী শর্ত।
সুমঙ্গল বলল, কলসি দুটির হদিস মিলেছে। নকশাও ঠিক।
একটি কলসি রাজ্যের মঙ্গলের জন্য। আর একটি কলসি দেশের মঙ্গলের জন্য।
রাজা কৌতূহল চেপে রাখতে পারলেন না। বললেন,—সুমঙ্গল, আবার হেঁয়ালি? সুমঙ্গল এবার খোলসা করে বলল। আমার বাবা উজির দুর্গামণি তোমার বাবা মহারাজ কৃষ্ণকিশোর মাণিক্যের দেদার খরচ, অপচয় পছন্দ করতেন না। বিলাস ব্যয়, রোধ করার খুবই চেষ্টা করতেন; এই রাজ্যের স্বার্থে। মহারাজ নিষেধ শুনতেন না। শেষে একদিন, দুটি কলস ভরতি সম্পদ লুকিয়ে রাখলেন।
সেই সম্পদ এখন তোমার। তবে আমার অনুরোধ, ওই দুটি রত্নভান্ডারের একটি রাজ্যের স্বার্থে ব্যয় হবে। আর একটি ভাণ্ডার দেশের স্বার্থে সিপাহীদের হাতে তুলে দেওয়া হোক। তারা দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে।
ত্রিপুরারাজ সানন্দচিত্তে সম্মত হলেন। বললেন, তুমি তো জান, দেশের মঙ্গলের কথা আমিও ভাবি। কোম্পানির শাসকরা আমাকে সন্দেহ করে। এই সন্দেহের জেরে ইংরেজ কতৃপক্ষ আগরতলায় কয়েক বার ফৌজ পাঠিয়েছে। আমাকে সিংহাসনচ্যুত করার চেষ্টা হয়েছে। তাদের বিশ্বাস, বিদ্রোহী বাহিনীকে গোপনে মদত দিচ্ছি। যাইহোক, তুমি যা চাইছো, তা-ই হবে।
এর পরদিন, ভোরসকালে প্রভাতসূর্যকে সাক্ষী রেখে দুই রাজপুরুষ যাত্রা করলেন সিঙ্গারবিল অভিমুখে। রত্নসন্ধানে। তাঁরা পুলকিত, রোমাঞ্চিত। ...পরের ঘটনা পারি তো আর একদিন বলব।
অজগর উৎসব সংখ্যা, ২০০৯
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন