হিতৈষী রাজা

রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার

ত্রিপুররাজ ঈশানচন্দ্র মাণিক্য। সদ্য সদ্য রাজ্যাভিষেক হয়েছে তাঁর। শরীরে অভিষেকের মাঙ্গলিক চিহ্নাদি সব স্পষ্ট। রাজগুরু বিপিনবিহারী নিষেধ করেছেন। একপক্ষকাল প্রাসাদের বাইরে যাওয়া যাবে না। রাজ-উষ্ণীষ, মা ত্রিপুরেশ্বরীর মন্দির থেকে পুজো করে আনা স্বর্ণখচিত রেশমবস্ত্র, মোতির মালা শরীরে ধারণ করতে হবে। এবং সঙ্গে রাখতে হবে শ্বেতছত্র, শ্বেতপতাকা ও শ্বেতচামর। এইসব রাজঅনুষঙ্গ অবশ্য বহন করবে ‘ছত্রতুইয়া’ সম্প্রদায়ভুক্ত লোকেরা। রাজগুরু আরও বলেছেন। চন্দ্রবংশীয় রাজারা কৌলিক নিয়ম মেনে চলতেন। তুমিও মানবে। মেনেই চলবে।

সকালে বেশ বৃষ্টি হল। মেঘেরা আকাশে উড়ে চলে। বৃষ্টিতে ভিজে গাছগুলি আরও চকচকে। একঝাঁক পাখির ওড়াউড়ি। দেখছেন ঈশানচন্দ্র। বেশ ভালো লাগছিল। এমন সময় দেওয়ান বলরাম হাজারি এসে বললেন, একটা কথা ছিল।

—কথাটা কী?

দেওয়ান বললেন, ত্রিপুর গুপ্তচরবাহিনী প্রধান সঙ্গরাই খবর এনেছেন। চট্টগ্রামের সিপাহিরা ইংরেজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। দেশীয় পদাতিক বাহিনীর ৩৪নং রেজিমেন্ট ট্রেজারি লুট করেছে। চট্টগ্রামের কারাগার ভেঙে বন্দিমুক্তি দিয়েছে। তারা নাকি বলছে: ইংরেজ দূর হটো। জয় ভারত!

রাজা গম্ভীর মুখে বললেন, — তাতে কী হল?

বিপদ!

বিপদ, কেন?

রাজার পালটা প্রশ্নে দেওয়ান হকচকিয়ে গেলেন। তিনি আমতা আমতা করে বললেন। সিপাহিরা ত্রিপুরাতে ধেয়ে আসছে। আমাদের সৈন্যদের খেপিয়ে তুলবে। রাজার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করবে। তখন কী করণীয়?

দেওয়ান বললেন, ত্রিপুর গুপ্তচরবাহিনী প্রধান সঙ্গরাই খবর এনেছেন।

অল্পক্ষণ চুপচাপ থেকে রাজা বললেন। আমার কাছে খবর কিন্তু অন্যরকম। কথাটা বললেন বটে। তবে ভাঙলেন না।

দেওয়ান অবাক হওয়ার ভান করলেন। পরক্ষণেই মনে হল রাজা বোধ হয় রসিকতা করছেন। দেওয়ান একটি বড়ো শ্বাস নিলেন। তারপর গভীর করে হাসলেন।

ত্রিপুররাজ প্রাসাদের ফুল বাগিচায় কিছুক্ষণ আপন মনে হাঁটলেন। মনটা বিক্ষিপ্ত। চট্টগ্রামের সিপাহিরা ত্রিপুরায় ছুটে আসছে। এই সংবাদে তিনি বিচলিত ঠিকই। কিন্তু সাতসকালে দেওয়ানের হাসিটা কুটিল বলেই মনে হয়েছে। এই মানুষটির আচরণ তাঁর সুবিধের মনে হয় না। হঠাৎ তাঁর মনে পড়ল। সেই বিশেষ দিনটির কথা। রাজ অভিষেকের দিন। তিনি রাজমুকুট ধারণ করে রাজনিয়ম রক্ষা করতে চেয়েছেন। পুত্র ব্রজেন্দ্রচন্দ্রকে ‘যুবরাজ’ পদে এবং ভাই উপেন্দ্রচন্দ্রকে ‘বড়োঠাকুর’ পদে অধিষ্ঠিত করতে। কিন্তু দেওয়ান বলরাম হাজারি বাধা দিয়েছেন। ভাই উপেন্দ্রচন্দ্রকে প্ররোচিত করেছেন ‘যুবরাজ’ পদের জন্য। সেই মুহূর্তে, উপেন্দ্রচন্দ্রকে যুবরাজ পদে অধিষ্ঠিত না করলে সেবিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করত। তাই তিনি সামাল দিয়েছেন। সেদিনই টের পেয়েছিলেন। মানুষটি জটিল মনের। ওপর ওপর ভালোমানুষটির ভান। ভেতর ভেতর কৌশল করেন, কুচক্রী।

রাজার অনুমান মিথ্যে ছিল না। টের পেলেন খুব শীঘ্রই। রাজদরবার বসেছে। দরবারে ভিড় একটু বেশিই। তখনও দরবার ঠিকমতো জমে ওঠেনি। অমাত্যবর্গ আসতে শুরু করেছেন। দরবার পরিচালনার ভার দেওয়ানকেই দেওয়া হয়েছে। বিষয় গুরুতর।

দেওয়ান বলরাম রাজার অনুমতি নিয়ে সভার কাজ শুরু করলেন। জমিদার, অমাত্য ও পাত্রমিত্রদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন। উপায় বলুন, প্রাক্তন মহারাজার ঋণ নবীন রাজার কাঁধে চেপেছে। পরিমাণ এগারো লক্ষ টাকা। ঋণমুক্তির উপায় বলুন।

চাকলে রোশনাবাদের জমিদার একটু ঠোঁটকাটা। তিনি দেওয়ানকে কটাক্ষ করে বললেন। যদি আমরা উপায় বলে দিই, তাহলে আপনার দেওয়ান পদ আঁকড়ে থাকা কেন?

আবার, অনঙ্গ বিশ্বাস ফৌজের বকশি। তিনি বললেন। হুজুর, দেওয়ানমশাই রাজ্য নিয়ে ভাবেন কম। ভাবেন অন্য কিছু। কে একজন পেছন থেকে ফোড়ন কাটল। স্বজনপোষণ আর বিষয়-আশয়।

দেওয়ান বক্রভাবে তাকালেন। তবে মুখে কিছু বললেন না।

প্রধান সেনাপতি সভাসদদের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। বললেন, কৃষিজাত পণ্য রপ্তানির ওপর শুল্ক বসানো হোক। বিশেষত, তুলো, বস্ত্র, বঁাশের তৈরি দ্রব্যাদি। দেওয়ান আতঙ্কিত হয়ে বললেন। পূর্বতন রাজা এমন একটি কাজ করতে গিয়ে চট্টগ্রামের কমিশনার হার্ভে সাহেবের বিরোধিতায় জেরবার হন। কোম্পানির কর্মচারীরা বাধা দেয়।

ফৌজের বকশি বললেন। পার্বত্য ত্রিপুরা স্বাধীন রাজ্য। আমরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে কর চাইব।

রাজা অস্ফুটে বললেন। সেতো প্রত্যক্ষ সংগ্রাম। রাজা বিমর্ষ হলেন। আলোচনা হল ঢের। সঠিক পথ বের হল না। প্রায় সকলেই মাথা হেঁট করে বসে আছেন।

এমন সময় হঠাৎ রিয়াং সম্প্রদায়ের এক বণিক দাঁড়িয়ে বললেন। রাজামশাই, মার্জনা করবেন। আমার যা ধনরত্ন আছে সেসব রাজ্যের প্রয়োজনে দান করতে চাই। সেসব ধনরত্ন বিক্রি করে রাজঋণ শোধ হতে পারে।

অমাত্য শ্রীহরি ঘোষ জানতে চাইলেন। এই রত্নসম্ভারের বিনিময়ে অর্থ জোগান কে দিতে পারেন?

রাজা শ্রীহরির প্রশ্নটি দীর্ঘ করে জানতে চাইলেন। এই ধনরত্ন সরেজমিনে দেখে কে সঠিক দাম দিতে পারবেন? হ্যাঁ বলুন, কে পারবেন?

তবে রাজা সকৃতজ্ঞ। বললেন, বণিকের এই উদারতা চিরকাল মনে রাখব। আমার এই সমস্যা আগামী দিনে হয়তো থাকবে না। শীঘ্রই ঋণ পরিশোধ করব।

বণিক বিনীতভাবে বললেন। মহারাজ, ঋণ নয়। আমি স্বেচ্ছায় দান করতে চাইছি।

রাজা হাসলেন। সভা কাঁপিয়ে। বললেন, আমি সত্যিই ভাগ্যবান! এরপর আরও একবার, সভার প্রতি গভীর দৃষ্টিনিক্ষেপ করলেন। বলুন, কে কিনতে পারেন, বণিকের ধনরত্ন?

রাজার প্রশ্নটি সভাস্থলে প্রতিবিম্বিত হল। গুঞ্জন ওঠে।

সহসা একটা আবেগে বা এমনও হতে পারে, দর্পভরে দেওয়ান বলে উঠলেন, আমি পারি। বণিকের ধনরত্নের নগদ মূল্য দিতে। সভা স্তম্ভিত। নিস্তব্ধ। বজ্রপাতের প্রচন্ড আওয়াজে সব কথা যেমন ডুবে যায়। রাজা বিস্ময়ে আবিষ্ট। ভাষা হারালেন। অত্যন্ত ধীর পায়ে সভা ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। রাজ-অন্তঃপুরে।

দ্বারপ্রহরী রাজার গমনাগমনের সময় হাঁক পাড়ে। নিত্যদিন হাঁক পাড়ে। আজও হাঁক পাড়ল। রাজার নিষ্ক্রমণের অবশ্য অনেক পরে।

বণিকের নাম মাধব রিয়াং। বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ। বিষয়টি বুঝলেন। রাজার বিপদের দিনে ধনবান দেওয়ান রাজার পাশে দাঁড়াননি। তিনিই তো পারতেন, অর্থের জোগান দিয়ে রাজার সমস্যা মেটাতে। মাধব ভেতরে ভেতরে চমকে ওঠেন। লোকটি বাস্তবিকই ধূর্ত। তিনি লোকমুখে শুনেছেন। রাজার পিতা কৃষ্ণকিশোর মাণিক্য বড়োই আমোদপ্রিয় মানুষ ছিলেন। শিকার ও ক্রীড়ানুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। সেই সুযোগে দেওয়ান বিশাল ধনসম্পত্তির অধিকারী হয়েছেন। কথা ও কাজে তাঁর বিস্তর ফাঁক।

বর্তমান রাজা সেসবের কিছু কিছু জানতেন বটে। তবে পিতার আমলের দেওয়ানকে কখনো অসম্মান করতে চাননি। মর্যাদার সঙ্গে তাঁকে বহাল রেখেছেন। মাধবের মনে হল, এই দুষ্ট লোকটিকে উচিতশিক্ষা দিতে হবে। এইসব ভাবতে ভাবতে অলস পায়ে হাঁটতে লাগলেন। পরক্ষণেই মত বদলালেন। যাক গে, রাজার কাজ রাজা করবেন। আমার কাজ, রাজ্যের মঙ্গলের জন্য কিছু করা। দূরমনস্ক মানুষটি নিজের মনেই হাসলেন।

অনেক চেষ্টা করে শ্রীহট্টের জীবন শেঠের কাছে রত্নসম্ভার বিক্রি করে বারো লক্ষ টাকা সংগ্রহ করলেন মাধব। সেই টাকা রাজার কাছে পৌঁছে দিতে চান। এরজন্য গোপনে রাজার বিশ্বস্ত লোকের সহযোগিতা চেয়েছেন। কারণ, কানাঘুষো শোনা গেছে। বলরাম হাজারির ভাড়া করা কুকি দস্যু তাঁর অর্থ লুঠের মতলবে আছে। তাই বাড়তি সতর্ক হতেই হয়। রাজা ফৌজের বকশিকে প্রাসাদে ডেকে আনিয়েছেন। ফৌজের বকশি দেবরতন মানুষটি সৎ, কর্তব্যপরায়ণ। তিনি রাজাকে ভরসা দিয়ে বলেন, রাজামশায়, এই দাসের প্রাণ থাকতে বণিক মাধব রিয়াং-এর কেউ ক্ষতি করতে পারবে না। আমি তাঁকে নজরে রেখেছি। প্রহরার ব্যবস্থা পাকা।

এসব কথা শুনে রাজা শান্ত হলেন। সকালটি আলোকময় মাধুর্যে ভরে ওঠে। ঝরোকা দিয়ে পায়রাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলেন। পায়রাগুলি বকবকম শব্দরধ্বনি ও হাওয়ার সঙ্গে উড়াল দিয়ে সরে পড়া, ক্ষণিক চমক। ভালো লাগল। ঝরোকার কাছেই কবুতর দানাপাত্র। কিছু গম দানা নিয়ে ছড়িয়ে দিলেন। আবার পায়রাগুলি ঝরোকার কাছাকাছি এল। রাজা প্রত্যহ পায়রাগুলি খুব কাছ থেকেই দেখেন। দুটি পায়রা বেশ বড়ো। আদ্যন্ত সাদা। রাজা নাম রেখেছেন ‘ইটুম’ ‘বিটুম’। অবশ্য এমন নামে ডাকলে সব পায়রা উড়াল দিয়ে কাছে চলে আসে, আসেই। রাজা তখন ঝরোকা দিয়ে আর দেখেন না। নেমে আসেন উঠোনবাড়ির চত্বরে। ভালো লাগার মুহূর্তগুলি এমনভাবেই উপভোগ করেন তিনি।

আজ এমন এক মুহূর্তে, ভাই উপেন্দ্রচন্দ্র পেছন থেকে ডাকলেন, দাদা।

রাজার ভাব-বিভোরতা কেটে গেল। বললেন, এসো উপেন্দ্র। কিছু বলবে?

উপেন্দ্রর চিন্তিত মুখ। বললেন, ভেতরে চলো। কথা আছে। দুই ভাই অন্দরমহলে প্রবেশ করলেন। একটি পালঙ্কের উপর বসলেন। উপেন্দ্র বিনা ভূমিকায় বললেন, তোমার অনুমতি না নিয়ে একটা কাজ করেছি।

রাজা অদ্ভুত চোখে ভাইয়ের দিকে তাকালেন। কী?

ত্রিপুরি দুই শয়তান, কীর্তি ও পরীক্ষিৎ, ত্রিপুরার উপজাতিদের খেপিয়ে তুলছে। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে। রাজাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছে। গতরাতে সেনাপতি আমাকে এই সংবাদ দেন। আমি মধ্যরাতে কীর্তিকে হত্যা করিয়েছি। পরীক্ষিৎকে বন্দি করা হয়েছে।

রাজা ঈশানচন্দ্র বেশ গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করলেন। কেন এই ষড়যন্ত্র?

উপেন্দ্র বললেন, সেটা ঠিক জানি না। তবে আন্দাজ করতে পারি।

উপেন্দ্র বললেন, এর মধ্যে দেওয়ানের যোগসাজশ আছে। আমাদের হত্যা করতে পারলে তাঁর লাভ। ইংরেজদের ‘নজর’ ও চাহিদামতো স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে রাজ্যটি হাতিয়ে নিতে পারে। কোম্পানি তো ন্যায়নীতির ধার ধারে না।

রাজা খেদের সঙ্গে বললেন। বড়ো ভুল হয়ে গেছে। দেওয়ানকে সরানো উচিত ছিল। আর দেরি নয়। রাজ্যের মঙ্গলের জন্য এখনই কুগ্রহটিকে সরানো দরকার। তারপর আরও বললেন, তুমি হয়তো জান না। চট্টগ্রামের সিপাহিদের প্ররোচিত করেছে। এখানে আশ্রয় নেওয়ার জন্য। অর্থাৎ কোম্পানির কাছে আমাকে শত্রু করে তোলা।

কী বলছ! উপেন্দ্র শিউরে উঠল।

—ওহ তা-ই! রাজার কন্ঠে ক্ষোভ।

উপেন্দ্র দাদাকে শুধোলেন। তুমি ভেবেছিলে, কলিকাতা থেকে দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়কে দেওযান করে আনবে। তার কী হল? উচ্চশিক্ষিত, হিসাবশাস্ত্রে পটু দক্ষিণারঞ্জনও আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। কথা কি বেশিদূর এগোয়নি?

হ্যাঁ। তা হয়েছে। তবে তিনি দেওয়ান নয়। মন্ত্রিত্ব চাইছেন। আর, তা ছাড়া! কথাটা রাজা শেষ করলেন না।

উপেন্দ্রও কৌতূহল দমন করতে পারলেন না। তা ছাড়া কী?

রাজা বললেন, রাজগুরু বিরক্ত হয়েছেন। দক্ষিণারঞ্জনের আবেদনপত্র টুকরো টুকরো করে ছিঁড়েও ফেলেছেন।

—ওহ, তবে তো মুশকিল!

হয়তো দুভাই অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় আরও কিছুক্ষণ মগ্ন থাকতেন। অন্তঃপুরিকা এসে জানাল: রানিমা ডাকছেন।

যশোমতী উপেন্দ্রচন্দ্র মাণিক্যের কন্যা। ত্রিপুর রাজপরিবারে একমাত্র স্নেহের দুলালি। যশোমতীর বয়েস আট। ধাইমার সঙ্গ ছাড়ে না। তার একটা কারণ আছে। ধাইমা ছোটোবেলায় গান ও নাচ করত, খুব। সেসব গল্প করত যশোমতীকে। যশোমতী খুব আগ্রহ নিয়ে শুনত। মজা পেত। ধাইমার সেসব গল্প বলতে খুব সুখ হত। এক শৈশব আর এক শৈশবের কাছে ধরা পড়ত। যশোমতীও পীড়াপীড়ি করত—ধাইমা, ওই নাচগুলোর কথা বলো-না।

কোন নাচের কথা শুনবি! মা-মিতা, গড়িয়া, হজাগিরি না বিজু?

‘মা-মিতা নাচের কথা বলো।’

মেঘ ভেঙে যেমন নীল আকাশ বের হয়। তেমনি যশোমতীর হাসিতে ঝিকিমিকি দেখা গেল।

ধাইমা শুরু করল নবান্নের গল্প—মা-মিতা নাচ।

জুমচাষ থেকে ধান ঘরে উঠলে নবান্ন উৎসব শুরু হয়। কার্তিক মাসের প্রথম দিকে পুজো এবং উৎসব শুরু হয়। শস্য দেবীর কাছে বিন্নিধানের—ককবরক ভাষায় ধানের নাম ‘মাইমি’—প্রার্থনা করা হয় আগামী বছরে যেন আরও ধান হয়। আরও আরও!’

যশোমতীর তর সইছে না। বলো-না ধাইমা! কেমন করে নাচে?

ধাইমা বলল, ‘ছেলেমেয়েরা এক হাতে ডালা নিয়ে মুখোমুখি দাঁড়ায়। তারপর চার-পা এগিয়ে যায় তো চার-পা পিছিয়ে আসে। একসময় শুধু এক পায়ে ভর দিয়ে জোরে ডালা ঘোরায়—কখনো সামনাসামনি কখনো পেছন ফিরে। মনে হবে নাচ, যেন পুতুল পুতুল। তুমি যেমন খেল!’

‘কেমন?’ যশোমতী আঁচল দুলিয়ে নাচল, ‘এমন?’

ধাইমার চোখের ইশারায় ঝিলিক। সুখের তারারা ঝলমল করে।

এই হাসিখুশি পরিবেশে বিঘ্ন ঘটল। কোথা থেকে জনা পাঁচেক ষন্ডামার্কা লোক নিয়ে বলরাম হাজারি এলেন। বললেন, বুড়ি, তোমার কি ভীমরতি হয়েছে? রাজবাড়ির কন্যাকে এখানে নিয়ে এসেছ। জান না, সিপাহিরা আগরতলায় পৌঁছে গেছে? এখুনি বিপদ ঘটাবে! যশোমতী, চলো প্রাসাদে চলো।

এই কথা বলে ষন্ডামার্কা একজনকে কী একটা ইঙ্গিত করলেন। সেযশোমতীকে কাঁধে তুলে নিয়ে দৌড়াতে লাগল। আর একজন ধাইমাকে হাত-মুখ বেঁধে নিয়ে চলল। ধাইমার থেকেও যশোমতীর চিৎকার বাতাস ভারী করে তুলল।

এই সংবাদ উজ্জয়ন্ত রাজপ্রাসাদেও পৌঁছোল। তখন বেলা শেষ। সন্ধে হয় হয়। রাজার সৈন্যরা চারিদিকে ছুটল। রাজা ঈশানচন্দ্র ও যুবরাজ উপেন্দ্রচন্দ্র ঘোড়ার পিঠে চেপে খোলা তরোয়াল নিয়ে ছুটলেন। দিগবিদিক ছোটার পর দু-ভাই দু-দিকে গেলেন। রাজা ধর্মনগর, বিশালগড়ের দিকে এবং যুবরাজ নাকবাড়ি, লাউগঙ্গা ও মুহুরি নদীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে। সঙ্গে অবশ্য সৈন্যসামন্ত গেল ঢের।

কথায় বলে খারাপ খবর বাতাসের চেয়ে ভারী ও দ্রুত ছোটে। তো সেই খারাপ খবর রাজগুরুর কানেও পৌঁছোল। রাজগুরু বিপিনবিহারী তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন যশোমতীর খোঁজে। পথে পুরোহিত ‘চন্তাই’ রাজগুরুকে প্রণাম জানিয়ে কানে কানে কিছু-একটা বললেন। রাজগুরু সিঙ্গারবিলে (আগরতলায় এখন যেখানে বিমানবন্দর) এসে হাজির হলেন। রাজগুরু জানতেন, মহারাজ রামগঙ্গামাণিক্য সিঙ্গারবিল অঞ্চলে বনকুটির তৈরি করান। বাসনা ছিল লোকচক্ষুর আড়ালে ধর্মসাধনা করার। তা আর হয়ে ওঠেনি। পরে গুরুর নির্দেশে বৃন্দাবনে কৃষ্ণকুঞ্জ করান। আজও তার পরিচয় ত্রিপুর মহারাজার কুঞ্জ। সেখানে এখনও রাসবিহারীর নিত্যপুজো হয়। যা-ই হোক, সিঙ্গারবিল বনকুটির পরিত্যক্ত-ই ছিল। অন্তত রাজা কাশীচন্দ্র, কৃষ্ণকিশোরচন্দ্র বা ঈশানচন্দ্র কেউ কোনোদিন ব্যবহার করেননি। দেওয়ান বলরাম হাজারি সেটি মাঝেমধ্যে ব্যবহার করতেন।

রাজগুরু বিপিনবিহারী তা জানতেন। তাই রাজগুরুর অনুমান ও চন্তাই পুরোহিতের সূত্র সত্য হয়ে ওঠে। বলরাম হাজারিকে অতর্কিতে আক্রমণ করল রাজগুরুর রক্ষীরা। একটি খন্ডযুদ্ধ হল বটে, তবে বলরাম ও তার সঙ্গীসাথিরা কুপোকাত হল। তাদের বন্দি করে আনা হল আগরতলায়।

রাজগুরু যশোমতীকে কোলে তুলে নিতে গেলেন। যশোমতী মুক্তোর মতো কচি দাঁত বের করে লাজুক হাসল। আমি বড়ো হয়েছি-না!

তড়িঘড়ি রাজসভা বসল। মূলত বিচার সভা। দেওয়ান বলরাম হাজারির শাস্তি নির্ধারণ হবে। তাঁর সঙ্গে পীরক্ষিৎ, সর্দার খাঁ ও অন্যান্যদেরও।

বিচারে এদের প্রাণদন্ড হোক। সকলেই বললেন। রাজা অবশ্য প্রাণদন্ডের বিপক্ষে। বলরাম হাজারি নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। নি:শর্ত ক্ষমা।

সভাসদরা একে একে দেওয়ানের অপরাধের তালিকা দিতে লাগলেন। তার সব কিছু যে রাজা জানেন, তা নয়। এই সভায় সবথেকে সরব হলেন বণিক মাধব রিয়াং। তবুও রাজা সভাসদদের প্রতি সম্ভ্রম জানিয়ে বললেন, অন্য শাস্তি বিবেচনা করুন, প্রাণদন্ড নয়।

সভাসদরা সকলে একমত হতে পারলেন না। তাঁরা তখন রাজার ওপর বিষয়টি ছেড়ে দেন। আস্থা জানালেন।

রাজা একবার রাজগুরুর প্রতি সভয়ে তাকালেন এবং বললেন আদেশ করুন।

রাজগুরু শাস্তির নিদান দিলেন। বললেন, এদের এক বছর সশ্রম কারাদন্ড ভোগের পর নির্বাসন দেওয়া হোক। প্রায় সকলেই বলে উঠলেন, উত্তম প্রস্তাব।

রাজগুরু বললেন, রাজন এই আদেশে মোহর লাগাও। ওই একই দিনে, আরও একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হল। দেওয়ান পদে ব্রজেন্দ্রচন্দ্রকে স্থলাভিষিক্ত করা হয়। সেই আদেশেও মোহর পড়ল।

সভা যখন শেষের দিকে—ঠিক শেষ হয়নি, জলপানের বিরতি। রাজা মন্ত্রণাকক্ষে প্রবেশ করেছেন। বিশ্রাম নেবেন কিছুটা সময়। তা আর হয়ে উঠল না। রাজরক্ষী এসে নতমস্তকে আগন্তুকদের আর্জি পেশ করল। চট্টগ্রামের সিপাহি হাবিলদার সুরজ পাণ্ডের সঙ্গে দেখা করবেন কি না?

রাজা শুধোলেন। সুরজ পাণ্ডে কি একা, না অনেকে?

—হুজুর অনেকেই এসেছেন। তবে আপাতত দুজন রাজামশাইয়ের সাক্ষাৎপ্রার্থী।

রাজামশাই কিছু একটা চিন্তা করলেন। সভায় ডাকা হবে না মন্ত্রণাকক্ষে!

রাজগুরু প্রস্থান করেছেন একটু আগে। থাকলে ভালো হত। শেষে বললেন, যাও, ডেকে নিয়ে এসো এখানেই।

সিপাহিদ্বয় রাজার সুমুখে এসে যুক্ত করে নমস্কার জানালেন। বয়সে বড়ো সৈনিকটির নাম সুরজ পাণ্ডে। তিনি বললেন, আপনি তো শুনেছেন। কোম্পানির শাসনের অবসান চেয়ে চট্টগ্রামের সিপাহিরা বিদ্রোহ শুরু করেছে। আপনি আমাদের সহযোগিতা করুন। অর্থ, আশ্রয় ও সৈন্য দিয়ে সাহায্য করুন।

রাজা নরমভাবে বললেন, আমার ক্ষমতা সীমিত। পার্বত্য ভূমি ত্রিপুরা এখন আর স্বাধীন নয়। ইংরেজ সর্বদা ত্রিপুরার ওপর নজর রাখে। আমাকে সিংহাসনচ্যুত করার চেষ্টা করছে। কেন জানেন?

আমি নাকি বিদ্রোহীদের প্রতি সহানুভূতিশীল। যোগাযোগ রাখি। আসলে কী জানেন! আপনারা চট্টগ্রামের ৩৪নং রেজিমেন্টের পদাতিক বাহিনী। এখানে আত্মগোপন করে আছেন ১৮৫৭ সালের ২২ নভেম্বর তারিখ থেকে। আমার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদত না থাকলে আপনারা থাকেন কী করে? এই সংগত প্রশ্নটার মুখোমুখি হতে হচ্ছে কোম্পানির শাসকদের কাছে।

কোম্পানির শাসকরা আমাকে ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে। আবার আজ, আজই ইংরেজের পোলিটিক্যাল এজেন্ট বলে গেছেন। কর্তৃপক্ষের কাছে খবর আছে। আপনি কোম্পানি শাসনের উৎখাত চাইছেন। আপনি দেশের শত্রু।

রাজা চোয়াল শক্ত করে বললেন, হায়! কার দেশ, কে কার শত্রু? তারপর বললেন, আপনারা দেশের স্বার্থে কাজ করে যান। অর্থ আর রসদের অভাব হবে না।

সৈনিকদ্বয় তদগতচিত্তে বিনম্র নমস্কার জানালেন। তারপর তাঁরা তাদের তরবারি দুটি ভূমিতে রেখে দু-পা পিছিয়ে সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানালেন রাজাকে। আর, অস্ফুটে উচ্চারণ করলেন। আমরা এক হিতৈষী রাজাকে পেলাম।

হাসিমুখ দুটি সরে যেতেই শেষ বিকেলের দমকা হাওয়া এল। শীতের কাঁপন লাগল বড়ো, রাজার গায়ে।

চিরসবুজ লেখা, আগস্ট-অক্টোবর, ২০০৯

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%