রাজমুকুট

রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার

রাজার নাম অমরমাণিক্য। ত্রিপুরার রাজা দেবমাণিক্যের ছেলে। অমরমাণিক্য রাজার ছেলে হয়েও তাঁর দুঃখে-কষ্টে ছেলেবেলা কেটেছে। সেযে রাজার ছেলে, সে-পরিচয় গোপনই ছিল। ভিন্ন কারণে। কৈশোরে নাম ছিল রামদাস, যৌবনে অমরদেব এবং রাজা হয়ে হলেন অমরমাণিক্য। তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রই রোমাঞ্চকর। আর গল্পের মতোই।

গোমতী নদীর তীরে ছোট্ট গ্রাম, কচুয়াছড়া। বড়োই শান্ত মনোরম সে-গ্রাম। চারদিকে গাছপালা। ছায়া সুনিবিড়, স্নিগ্ধ, সুশীতল। নদীর কুলু কুলু ধ্বনি। নদীর পাড়েই তাদের ঘর। রামদাস আপন মনে প্রায়শই নদীজলের দিকে চেয়ে চোখ ভাসাত। দাদু, মায়ের বাবা মণিকান্ত হাজরা বলতেন, ‘রামদাস কী করছ? বেলা যে বয়ে যায়। সময় তো নদীর স্রোতের মতোই।’

রামদাস বুঝতে পারে না। দাদু বলেন কী!

এই স্রোত আর সময় দুটোই চলে যায়। পরিবর্তন হয়। তাকে ধরা যায় না। দাদুর কথা হেঁয়ালি বলেই মনে হয় রামদাসের। রামদাস একদিন মাকে জিজ্ঞেস করল, ‘দাদু এরকম বলেন কেন?’

মায়ের চোখে জল। শুধু বলেন, ‘বড়ো হও, বুঝবে।’

প্রকৃতির নানা রং গায়ে মেখে, পাখির নানা কলরব শুনে, প্রভাতসূর্যের সোনারোদ ছুঁয়ে, দুপুর রোদের সূর্য-শাসানি মেনে, সন্ধ্যাতারার আকাশ দেখে, রামদাস একদিন বড়ো হল। এ সবই তার রমণীয় অভিজ্ঞতা। এর মধ্যেই দাদুর কাছে মোক্ষবিদ্যা, অস্ত্রবিদ্যা শিখে নিয়েছে। একদিন দাদু তাকে খুব কাছে ডেকে নিলেন। সস্নেহে বললেন, ‘দাদুভাই, আমি রোগ-ব্যাধিতে পঙ্গু। হয়তো বেশিদিন বঁাচব না। তোমাকে ক-টি কথা না বললেই নয়। তুমি হচ্ছ মহারাজ দেবমাণিক্যের পুত্র। দেবমাণিক্য তোমার মাকে বিয়ে করেন গান্ধর্বমতে। এই বিয়ের খবরটি গোপন আছে। তোমার নিরাপত্তার কারণেই গোপন আছে। তোমাদের বংশের প্রতি সেনাপতি গোপীপ্রসাদ বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। গোপীপ্রসাদই উদয়মাণিক্য নাম নিয়ে কয়েক বছর রাজত্ব করেছেন। তাঁর পুত্র জয়মাণিক্য এখন রাজা। তোমাকে প্রতিশোধ নিতে হবে। এ রাজ্য তোমাকে ছিনিয়ে নিতে হবে।

রামদাস জিজ্ঞেস করলেন, ‘কীভাবে?’

মণিকান্ত কিছুটা নীরব থাকলেন। পরে বললেন, ‘কিছুদিন সৈনিক হিসেবে কাজ করো। নিশ্চয়ই সুযোগ আসবে।’

মণিকান্ত রামদাসের নামটি পরিবর্তন করে অমরদেব রাখলেন। এরপর সেনা বিভাগে তাঁর চাকরির পাকা ব্যবস্থা করে ফেললেন সেনাপতি রণগণনারায়ণকে বলে-কয়ে। সেনাপতি মানুষটি মোটেই সুবিধের ছিলেন না। তবে মণিকান্তকে বিশেষ পছন্দ করতেন। একবার সেনাপতিকে গুপ্তঘাতকের হাত থেকে বঁাচিয়েছিলেন। সেকথা তিনি ভুলে গেলেও মণিকান্তের অনুরোধ তিনি মেনে নেন। অবশ্য, অমরদেবকে নিরীক্ষণ করে বললেন, ‘এর চোখে-মুখে দেখছি অগ্নিদীপ্তি। আবার বিদ্রোহী হয়ে উঠবে না তো?’

মণিকান্ত নীরব থাকেন।

‘মণিকান্ত, তুমি জবাব দিচ্ছ না কেন?’ সেনাপতিমশাই রেগে গেলেন।

‘হুজুর, চিন্তা করবেন না। দেশের মর্যাদা রক্ষায় সদা সচেষ্ট থাকবে।’

‘তা অস্ত্রবিদ্যা কিছু জানে?’ সেনাপতি বঁা-দিকে তাকিয়ে এক সৈনিককে ইঙ্গিত করলেন। সৈনিক এগিয়ে এসে তার তরবারিটা অমরদেবের হাতে দিলেন। সেনাপতি তাঁর নিজের তরবারিটি নিয়ে আক্রমণাত্মক ভঙ্গি করলেন। অমরদেব উচ্চলম্ফ দিয়ে সে-আক্রমণের জবাব দিলেন তরবারির ওপর আঘাত করে। সেনাপতির তরবারিটি গেল পড়ে। অন্যান্য সৈনিকরা তা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। সেনাপতিমশাই অবশ্যই খুশি হলেন। এতটাই খুশি হলেন যে, পদাতিক বাহিনীর দ্বিতীয় প্রধানের পদটি তাঁকে দিলেন।

কথায় বলে, ‘কাদায় পড়লে হাতি, ব্যাঙে মারে লাথি’। তেমনই ঘটনা। খুলে বলি। উদয়মাণিক্যের রাজত্বকাল ছিল ভীষণ স্বল্পস্থায়ী। ছ-সাত বছরের বেশি নয়। নিজে তো অত্যাচারী রাজা ছিলেন। তার ওপর রাজ্যে মোঘলদের অত্যাচার শুরু হল। মোঘলরা ত্রিপুরা-অধিকৃত চট্টগ্রাম ছিনিয়ে নেবার জন্য বিপুল সেনা সমাবেশ ঘটাল। উদয়মাণিক্য এই সংবাদ শুনে সেনাপতির অধীনে বিরাট সেনাবাহিনী পাঠালেন। খণ্ডল পরগনায় তারা গড় নির্মাণ করে মোঘলদের প্রতিরোধ করতে চাইল। কিন্তু মোঘল আক্রমণে ত্রিপুরি সৈন্য খড়কুটোর মতোই ভেসে গেল। সেনাপতি কোনো গতিকে পালিয়ে প্রাণটুকু বঁাচালেন। রাজাও লুকিয়ে থাকেন। দিনে বের হন না। একদিন নাচমহলে গুপ্তঘাতকের হাতে তাঁর মৃত্যু হল। কেউ বলেন, এক দাসীর চক্রান্তে, কেউ-বা বলেন, রাজার মৃত্যুর পেছনে সেনাপতিরই হাত আছে। সঠিক কথা কেউ বলতে পারেনি। এরপর উদয়মাণিক্যের পুত্র জয়মাণিক্য রাজা হলেন। আসলে সেনাপতি রণগণনারায়ণই রাজকার্য পরিচালনা করেন। তিনিই সর্বেসর্বা।

অমরদেব তাঁর বুদ্ধি ও প্রীতিপূর্ণ আচরণের জন্য সেনামহলে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর বীরত্ব ও জনপ্রিয়তায় সেনাপতি ঈর্ষান্বিত হন। তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করতে লাগলেন। এই সময়ে অমরদেব কলমিগড়ের সেনানায়ক। সেনাপতি তাঁকে ডেকে পাঠালেন। দূতকে বলে দিলেন, ‘বলবে আগামী বুধবারে রাজধানীতে হাজির হতে। সীমান্ত প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা হবে দুপুরে। এই উপলক্ষ্যে সেনাপতিমশাই তাঁর সম্মানে ভোজের আয়োজন করছেন। তিনি যেন আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন।’

সেনাপতির তলব, সেইসঙ্গে ভোজের আমন্ত্রণ। উপেক্ষা করবার প্রশ্ন আসে না। অমরদেব রাজধানী উদয়পুরে হাজির হলেন। যথাসময়ে সেনাপতির মহলে প্রবেশ করতে গেলেন। এমন সময় মূল ফটকে ছেলেবেলার বন্ধু দেবভানুর সঙ্গে দেখা হল। মনে পড়ে গেল কৈশোরের এক কাহিনি—হীরাপুরে দেবভানু ও রামদাস দুজনে তরুবৃক্ষ ছায়ায় চক্রব্যূহ খেলা করছিল অন্যান্য সঙ্গীসাথিদের সঙ্গে। এমন সময় ঘোড়া ছুটিয়ে আসছিল পাঁচ আরাকান লুটেরা। প্রায়শই তারা এরকম আসত। রাঙামাটি বা উদয়পুর অঞ্চল লুন্ঠনের উদ্দেশ্যে। একথা তাদের জানাই ছিল। ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনে রামদাস ও দেবভানু গাছের মগডালে উঠে গেল তরতরিয়ে। তারপর তির মেরে একজনকে ঘায়েল করে দিল। তা দেখে আর চার জন পিছু হটে গেল, আহত সৈনিককে কাঁধে তুলে।

দেবভানু বলল, ‘রামদাস, তোমার তিরে ওই লুটেরা জখম হয়েছে। তুমিই আমাদের দলের রাজা। আজ থেকে তোমাকে আমরা রাজারাম বলে ডাকব।’

আজ তাঁর দাদুর কথা মনে পড়ল। সময় স্রোতের মতোই চলে যায়। আজ কথাটার অর্থ স্পষ্ট হল। যা-ই হোক, সেসব কবেকার কথা। আজ ছেলেবেলার বন্ধু দেবভানুকে দেখে চকিত বিস্ময়ে অমরদেব থমকে দাঁড়ান। দেবভানুর চোখে-মুখে প্রসন্ন হাসি। সেনানায়কের দিকে তাকিয়ে আনত ভঙ্গি করলেন দেবভানু। তারপর হাত তুলে নিষেধের অঙ্গুলি সংকেত করলেন। ডান হাতের তর্জনী তুলে বঁা-হাতের মধ্যমাকে কর্তন করার ভঙ্গি করে দেখালেন। অমরদেব বুঝলেন, সেনাপতির আলোচনা ও ভোজের আমন্ত্রণ একটি ছলনা মাত্র। আসলে তাঁকে হত্যা করারই ষড়যন্ত্র করেছেন।

অমরদেব কৌশল করে সেখান থেকে সরে পড়লেন। সেনা শিবিরে ফিরে এসে সিংহাসনের দাবি জানিয়ে রাজা জয়মাণিক্য ও সেনাপতি রণগণনারায়ণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন।

এই সংবাদ শুনে সেনাপতি খেপে গেলেন। উচিত শিক্ষা দেওয়া দরকার। আদেশ দিলেন, ‘অমরদেবকে ধরো, হত্যা কর, তার মুন্ড চাই। কলমিগড়ের কাছাকাছি ছোটোভাই সমরজিৎনারায়ণ থাকতেন। সেনাপতি ভাইকে পত্র লিখলেন, যেনতেন প্রকারে গুপ্তঘাতক লাগিয়ে অমরদেবকে হত্যা করাও।’ দেবভানু বিষয়টি জানতে পেরে পত্রবাহককে হত্যা করেন। তারপর পত্রটি হস্তগত করে অমরদেবের বিশ্বস্ত অনুচরকে পত্রবাহক সাজিয়ে পাঠালেন সমরজিৎনারায়ণের কাছে। সমরজিৎনারায়ণ দাদার হস্তাক্ষর চিনতে পেরে পত্রপাঠে মন দিলেন। সেই সুযোগে পত্রবাহক পেছন থেকে সমরজিৎনারায়ণের শিরচ্ছেদ করল এবং নির্দেশমতোই সেছিন্নমুন্ড রণগণনারায়ণের শয়নকক্ষে সন্তর্পণে রেখে এল।

ইতিমধ্যে ঘটনা ঘটল অনেক। অমরদেব সে-রাতেই রাজধানী আক্রমণ করে বসলেন। ত্রিপুরা রাজ্যের সর্বশক্তিমান সেনাপতি উপায় না দেখে জলাশয়ে ডুবে রইলেন। কিন্তু অমরদেবের অনুচরেরা ভোর বেলা তাঁকে ধরে ফেলল। এবং কালবিলম্ব না করেই হত্যা করল। শুধু সেনাপতি নয়। রাজা জয়মাণিক্যেরও একই হাল হল। এরপর রাজা হলেন অমরদেব। রাজনাম অমরমাণিক্য।

অমরমাণিক্যর চার পুত্র। রাজা দুর্লভনারায়ণ, রাজধরনারায়ণ, অমরদুর্লভনারায়ণ ও যুবকনারায়ণ। অমরমাণিক্যের সঙ্গে ভাটির শাসনকর্তা ইশা খাঁর সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বের। বাংলার বারভুঁইয়াদের সঙ্গে তাঁর সৌহার্দ্যের সম্পর্ক থাকায় মোঘলদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তিনি ইশা খাঁকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করেন। সেই থেকে তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্বের শুরু। অমরমাণিক্য ইশা খাঁকে সৈনাপত্যের দায়িত্ব দেন কয়েকটি যুদ্ধে। রাজকুমারদের অস্ত্রবিদ্যা শেখানোরও দায়িত্ব তুলে দেন তাঁর কাঁধে।

তখন বাংলা নবাব ছিলেন শেখ ইসলাম খাঁ। তিনি রাজ্যস্থাপন করেছিলেন ঢাকা নগরীতে। ত্রিপুরা রাজ্যের দিকে হাত বাড়ান শক্তিবৃদ্ধির জন্য। তাঁর বিশাল সেনাবাহিনীকে নিযুক্ত করেন ত্রিপুরা দখলের উদ্দেশ্যে। এই সংবাদ শুনে ইশা খাঁ ঝাঁপিয়ে পড়েন। নবাব বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য সরাইলের নিকট দুর্গ নির্মাণ করে সুযোগের অপেক্ষায় রইলেন। ইশা খাঁয়ের এই প্রতিরোধ শিবির সম্পর্কে নবাবের কোনো ধারণাই ছিল না। ফলে নবাবের সৈন্যরা বিপর্যস্ত হয়, পরাজিত হয়। ইশা খাঁয়ের এই বিজয়ে ত্রিপুরা রাজ্যে উৎসব আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। সমস্ত রাজ্য দীপালোকে সাজানো হল। রাজা প্রচলন করলেন হোজাগিরি, বিজু প্রভৃতি লোকনাচ। তাতে পার্বত্য উপজাতীর প্রজারা অংশগ্রহণ করলেন সানন্দে।

অমরমাণিক্য এরপর ভুলুয়া রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করলেন। ভুলুয়ারাজ ত্রিপুরার রাজাকে কিছুতেই মান্য করতে চাননি। অমরমাণিক্য যুবরাজ দুর্লভনারায়ণের জন্য ভুলুয়াধিপতির কন্যার সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। ভুলুয়ারাজ এতে অপমানিত বোধ করেন। তিনি অনুচর ডেকে অমরমাণিক্যের কাছে একটা তরোয়ালের খাপ পাঠালেন। এতে কোনো তরোয়াল ছিল না। সঙ্গে ছিল একটি চিঠি। ভাষা তীক্ষ্ণ। কটূক্তি।

‘কে রাজা? ত্রিপুরায় কেউ রাজা আছেন বলে আমি মানি না। তলোয়ার ছাড়া খাপ যেমন শক্তির প্রতীক হতে পারে না। তেমনি দুর্বল মানুষ রাজসিংহাসনের উপযুক্ত হতে পারে না।’ বলা বাহুল্য ভুলুয়ারাজের সঙ্গে ত্রিপুরারাজ উদয়মাণিক্যের পূর্ববিবাদের জের স্বরূপ ভুলুয়ারাজ এমন অপমানজনক চিঠি লিখেছেন। কিন্তু এই চিঠি পেয়ে অমরমাণিক্য ক্রুদ্ধ হন। তিনি পুত্রদের সঙ্গে নিয়ে ভুলুয়ারাজকে সমুচিত শিক্ষা দেবার জন্য যুদ্ধযাত্রা করলেন। এই যুদ্ধে ভুলুয়ারাজের শোচনীয় হার হল। ত্রিপুরারাজ সেখানে স্থায়ী সামরিক শিবির স্থাপন করলেন। এই শিবিরের দায়িত্বে ছিলেন যুবরাজ রাজদুর্লভনারায়ণ। এই সেনাশিবিরের দায়িত্বে থাকার সময় যুবরাজ হঠাৎ মারা যান এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে।

এই মৃত্যুর খবরে রাজা অমরমাণিক্য শোকে দুঃখে প্রায় পাগল হয়ে যান। এই সময় পুত্রদের নিয়ে নানা অশান্তিও শুরু হয়। তিন জনই রাজসিংহাসনের দাবিদার হয়ে ওঠেন। হিংসা ও পারস্পরিক দ্বন্দ্বে রাজ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। অসুস্থ রাজা এর কোনো প্রতিকার খুঁজে পেলেন না। বাধ্য হয়েই রাজধরনারায়ণকে যুবরাজ পদে অভিষিক্ত করলেন। অমরদুর্লভনারায়ণ ভাইয়ের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করলেন। প্রায় গৃহযুদ্ধ শুরু হল। অমরমাণিক্য তখন ইশা খাঁকে ডেকে বললেন, ‘আমার পুত্ররা অবাধ্য বটে। তবে তারা তোমার শিষ্য। এদের সামলাও।’

ইশা খাঁ রাজগৃহ সামলানোর দায়িত্ব নিলেন বটে, কিন্তু তখন তাঁর নিজের অঞ্চলেই শান্তি বিঘ্নিত। মোঘলশক্তির আনাগোনা শুরু হয়েছে, অনেক আগেই। এখন তাদের ভূমিকা আক্রমণাত্মক। তাই ইশা খাঁ সেদিকে নজর রাখছেন। ব্যস্তও বটে। ইতিমধ্যে ত্রিপুরা রাজ্যে ঘটে গেল পট পরিবর্তন। তার মূলে ছিল রাজমুকুট। এ যেন দাবার এক মোক্ষ চাল।

আরাকানের মঘরাজ সিকন্দর শাহ অনেক দিন ধরেই ত্রিপুরা আক্রমণের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। চট্টগ্রামের পোর্তুগিজরা ছড়িয়ে পড়েছে। আরাকানরাজ তাদের সাহায্য চাইলেন। তারা একরকম রাজি হয়ে গেল। ভয়ে। কারণ তারা জানত, সিকন্দর শাহের রুষ্ট দৃষ্টিতে তাদের বাণিজ্যের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হবে।

উদয়পুরের রাজসভায় আরাকানরাজ দূত মারফত একটি খোলা তির পাঠালেন, মহারাজ বুঝলেন, যুদ্ধ আসন্ন। তিনি পুত্রদের ডেকে সস্নেহে বললেন, ‘রাজ্যে সংকট। মঘদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হলে সুদক্ষ সৈন্য পরিচালনা আর কুশলী হতে হবে। সর্বশক্তি নিয়োগ করে যুদ্ধে নামতে হবে। নিজেদের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকলে যুদ্ধে জয় সম্ভব নয়। যে কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক শৃঙ্খলা প্রাথমিক শর্ত। আমার বিশ্বাস সেটা তোমরা রক্ষা করতে পারবে।’ পুত্ররা দেখল পিতা তাদের উপদেশ দিচ্ছেন বটে তবে তাঁর কন্ঠে অনুনয়ের সুর। তারা সকলে নরম দৃষ্টিতে পিতার চোখের দিকে তাকালেন। পিতা যেন ভরসা পেলেন। তাই তাঁর চোখে কিঞ্চিৎ খুশির আভাস লক্ষ করা গেল। মহারাজ এই যুদ্ধে সেনাপতির দায়িত্ব দিলেন যুবরাজ রাজধরনারায়ণকে। যুবরাজ অপর দুই ভাইকে সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রামে উপস্থিত হলেন। কিন্তু মঘরাজ চট্টগ্রামের অভ্যন্তরে পোর্তুগিজদের যে হাত করে রেখেছেন সে-খবর রাজকুমারদের জানাই ছিল না। ফলে তাঁরা অল্পবিস্তর বাধা পেলেন। ইতিমধ্যে আরাকানরাজ সসৈন্যে উপস্থিত হলেন। একটানা যুদ্ধ চলল তিনদিন। চট্টগ্রামে ত্রিপুররাজের পক্ষে সৈন্যশিবির হয়েছে তিনটি। তিনটি শিবিরের দায়িত্বে তিন ভাই। সিকন্দার শাহ, অমরদুর্লভনারায়ণ ও যুবকনারায়ণকে পরাজিত করলেও রাজধরনারায়ণের কাছে পরাস্ত হন। রাজধরনারায়ণ তাঁকে বন্দি করেন। রাজধরনারায়ণ ছিলেন বীর, যোদ্ধা, কুশলী এবং ফন্দি-ফিকিরেও অদ্বিতীয়।

পরাজিত মঘরাজ সন্ধির প্রস্তাব দিলেন। সেই প্রস্তাবে বলা হল, এক বৎসর অন্তত কোনো যুদ্ধ নয়। ইতিমধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্যের বাতাবরণ গড়ে তুলবেন। যুবরাজ দেখলেন সামনে উৎসব, দুর্গা পূজা। অকারণ রক্তক্ষয় এড়াতে যুদ্ধ বিরতির জন্য পিতার সম্মতি প্রার্থনা করলেন। যুবরাজ পিতার সম্মতি পেয়ে ভাইদের নিয়ে রাজধানীতে ফিরে এলেন।

দুর্গোৎসবে রাজ্যবাসী যখন আনন্দে মত্ত, এমন সময় প্রতিহারী এসে খবর দিল সংবাদ এসেছে মঘরাজ সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করে চট্টগ্রাম আক্রমণ করেছেন। মহারাজ অমরমাণিক্য চট্টগ্রামে সৈন্যসমাবেশ ও যুদ্ধের আদেশ দিলেন। রাজধরনারায়ণ ভাইদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ আক্রমণে নেমে পড়লেন। ত্রিপুরার বিশাল বাহিনীর কাছে মঘসৈন্য তুচ্ছ। মঘরাজ বুঝতে পারলেন তাঁর হার নিশ্চিত। তাই কৌশল করলেন। এবার সেই কৌশলের গল্পটাই শোনাই।

একটি উপহার। উপহারটি হল গজদন্ত নির্মিত, বহুমূল্য রত্নখচিত রাজমুকুট। সঙ্গে সন্ধিপত্র। নাহ, রাজাকে নয়। রাজকুমারদের প্রতি: ‘এটি মঘরাজের সন্ধিপত্র। মঘরাজ আর যুদ্ধ, অশান্তি চাইছেন না। গজদন্তের ওপর রত্নখচিত এই মহামূল্য রাজমুকুটটি প্রেরিত হল। কুমারদের মধ্যে যিনি অধিকতর যোগ্য তাঁর মাথায় শোভিত হোক। তাঁকে আমি রাজা বলে মানব। তাঁর প্রতি রইল আমার অভিনন্দন। প্রীতি এবং আনুগত্য।

— মেং ফলুং ওরফে সিকন্দর শা’

হাজার হাজার সৈন্য সমাবেশ করেও যা করতে পারেননি আরাকানরাজ, একটি কৌশলে বাজিমাত করে দিলেন। তিনি জানতেন কুমারদের মধ্যে রাজসিংহাসন নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব, বিরোধ চলছিল। তাই বহুমূল্য রাজমুকুট পাঠিয়ে সেই বিরোধকে তুঙ্গে তুলে দিলেন। রাজমুকুটের অধিকার নিয়ে তিন ভাইয়ের মধ্যে বিবাদ চরমে উঠল। রাজধরনারায়ণ এদের মধ্যে উচ্চাভিলাষী। তিনি মঘ রাজ্যের সঙ্গে গোপন সূত্র রচনা করেছিলেন। কিন্তু সেখানেই তাঁর ভুল হয়েছে। মঘশত্রুকে বিশ্বাস করে ঠকেছিলেন। কেমন করে ঠকেছিলেন, সেটাই গল্পের উপসংহার।

...তিনি সিংহাসনে বসে হয়ে উঠলেন অন্য মানুষ। ভাবের মানুষ হয়ে গেলেন।

রাজমুকুট নিয়ে যখন শোরগোল, অমরমাণিক্য সব শুনে দুঃখে কাতর হলেন। পুত্রদের কিছুতেই বশে রাখতে পারছিলেন না। এমন সময় মঘরাজ আবার চট্টগ্রাম আক্রমণ করলেন। রাজকুমারদের যখন নিজেদের ভুল ভাঙল তখন আর উপায় ছিল না। এই আক্রমণের বিরুদ্ধে ত্রিপুররাজকুমাররা ঝাঁপিয়ে পড়লেন। যুদ্ধ হল ভয়ানক। যুবকনারায়ণ নিহত হন। আহত হলেন রাজধরনারায়ণ। অমরদুর্লভনারায়ণ পরাস্ত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে পড়লেন। তবুও শেষ চেষ্টা করে দেখলেন মহারাজ স্বয়ং। নিষ্ফল হল তাঁর চেষ্টা। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দ। আরাকানরাজ দখল করে নিলেন রাজধানী উদয়পুর। অমরমাণিক্য আত্মগোপন করলেন তেতৈয়া নামে একটি স্থানে। পরে মনু নদীর তীরবর্তী একটি স্থানে সাময়িক রাজ্যপাট স্থাপন করে যুবরাজ রাজধরনারায়ণের অভিষেকক্রিয়া সম্পন্ন করেন। পরবর্তীকালে সেই স্থানটি ‘রাজধরছড়া’ বা ‘রাতাছড়া’ নামে পরিচিত হয়। এখনও আছে সেই গ্রাম। কৈলাশহর মহকুমায়।

মঘরাজের লুন্ঠনক্রিয়া শেষ হলে ফিরে যান স্বদেশে। রাজধরমাণিক্য রাজধানী উদয়পুর সংস্কার করে সিংহাসনে বসলেন। তবে যিনি রাজসিংহাসনের জন্য, এমনকী নকল রাজমুকুটের জন্য লালায়িত হয়েছেন, ভাইদের সঙ্গে বিবাদে নেমেছেন, তিনি সিংহাসনে বসে হয়ে উঠলেন অন্য মানুষ। ভাবের মানুষ হয়ে গেলেন। হরিসংকীর্তন শুনে তাঁর দিন কেটেছে। বলেছেন, ‘কিছুই চাই না, চাই বিষ্ণুনাম।’

সে-প্রসঙ্গ ভিন্ন। অন্য গল্প।

সন্দেশ, চৈত্র, ১৪০৪

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%