লাল সিং

রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার

গ্রামের নাম শারিগ্রাম। সেখানে আছে পাহাড় ছোটো ছোটো পাহাড়। আর আছে বন, বন বেশ ঘন, গভীর। বাঘ, ভাল্লুক আছে। হাতিও আছে। ময়ূরেরা নাচানাচি করে। পাখিরা গান গায়। বনের গাছ পাতা হেসে ওঠে। দোল খায়। সকালে সোনারোদ ঝরে পড়ে। চিকচিক করে পাহাড়চূড়া।

এসব দেখতো ছোট্ট শিশু লাল। অবাক চোখে দেখতো। আর হাসত। সেখানে আছে এক শিশুগাছ। তার ডালে বসে থাকে শুক ও শারি। তারা প্রায়শই ঝগড়া করে।

লালের ঝগড়া ভালো লাগে না। একদিন লাল রেগে গেল। বলল, তোমরা কেন ঝগড়া কর?

শারি মিষ্টি হাসে। সেবলল, আমার নামেই তো এই গাঁ।

শুক বলল, মিথ্যুক। লালের বাবা রেখেছে, এই গাঁয়ের নাম।

লাল বলল, শারি, নাহয় হলই বা তোমার নামে গ্রামের নাম। তাতে কী?

শারি হাসল। না, এমনি বলছিলাম। তোমার বাবা রেখেছেন আমার নামে নাম।’

শুক বলল,ফের মিথ্যে কথা?

শারি আবার হাসল, বড়ো করে। আসলে কী জান, ত্রিভনের বেটা! এখানে বড়ো সুখ। তাই ঝগড়া করি দুজনে মনের আনন্দে।

এরপর শারি বলল সুর করে—

বড়ো হও, বড়ো হও

চটপট

বদলা নাও, বদলা নাও

ঝটপট।

ছোট্ট লাল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কিছু বুঝতে পারে না। সেবন-কুটিরে গিয়ে মাকে শুধোল, বদলা কী মা?

মা বলল, যারা আমাদের মেরে তাড়িয়েছে। তাদেরও মারতে বলেছে।

সেআবার শুধোল, কেন মেরেছে আমাদের?

মা বলল, সেজন্যই তো বাবা বড়ো হতে হবে চটপট।

ছোট্ট লাল একদিন সত্যি বড়ো হয়ে গেল। সেরাখাল বালকদের নিয়ে দল গড়েছে। সেতাদের সর্দার। সারাদিন খেলে বেড়াত। কখনো যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা করত। শিকার করত। বনের জন্তুজানোয়ার ও পশুপাখিদের সঙ্গে তার খুব ভাব। বিশেষ ভাব হাতির সঙ্গে। এইভাবে তার দিন কাটে। তার বয়েস এখন উনিশ।

একদিন সেবুঝতে পারল বনে এমনভাবে কষ্টে তাদের দিন কাটাবার কথা নয়। তার পিতা বীর যোদ্ধা ছিলেন। পিতা ত্রিভন সিং মুণ্ডাদের সর্দার ছিলেন। সকলে মান্য করত। ভয়ও করত। তিনি বরাহভূম রাজার অধীনে তরফ অর্থাৎ অঞ্চল সর্দার ছিলেন। মর্যাদা ছিল, জমিদারের মর্যাদা। কিতাডুংরি ও কাটারঞ্জা পাহাড়ের মাঝখানে তাঁর বাটালুকা গ্রাম বা সতেরখানি তরফ। স্বাধীন রাজার মতোই ছিল তাঁর ভাবসাব। বাটালুকাতে এক বিশাল দুর্গ ছিল। কিতাডুংরি পাহাড়ে কিতাপাট নামে এক দেবতা আছেন। সেখানেই তাঁদের আদিবাস। অতীত গৌরবের সাক্ষী।

বরাহভূমের রাজা বিবেকনারায়ণ যুদ্ধপ্রিয়। ধলভূম, অম্বিকানগর, সুপুর ও শ্যামসুন্দরপুরের রাজাদের সঙ্গে মিলিত হলেন। ষড়যন্ত্র করে ত্রিভন সিংহকে আক্রমণ করলেন। একা কী সকলের সঙ্গে লড়াই করা যায়! তো ত্রিভন সিংহ পরাজিত ও নিহত হলেন। তাঁর ধনদৌলত রাজারা লুন্ঠন করে ভাগ করে নিলেন। এমনকী দেবতা কালাচাঁদের বিগ্রহটি পর্যন্ত সুপুরের রাজা নিয়ে গেলেন।

রাজারা খুঁজলেন ঢের। ত্রিভন সিংহের পত্নী ও শিশুপুত্র লালকে। পাবে কী করে! রাতের অন্ধকারে, শিশুপুত্রকে কোলে নিয়ে হতভাগ্য জননী এসে পৌঁছোলেন, শারিগ্রামে। এই শারিগ্রাম ত্রিভন সিংহের পছন্দের বন, মৃগয়াভূমি। তিনি এই বনের নাম রেখেছেন।

যাই হোক, ত্রিভন সিংহের পরিবারের কেউ খোঁজ পেল না। কারণ, বন তাদের সহায়। পশুপাখি, জীবজন্তু তাদের সহায়। এসব কথা লাল শুনল বড়ো হয়ে, মায়ের কাছে। এখন শারির কথার অর্থ স্পষ্ট।

বড়ো হও, বড়ো হও

চটপট

বদলা নাও, বদলা নাও

ঝটপট

ভাবছে আর ভাবছে। লাল সিংয়ের এখন নিত্য খেলা ঘোড়া নিয়ে। ঘোড়ার নাম কিতাই— কিতাডুংরি পাহাড়ের কথা মনে রেখে। আবার, হতেও পারে—কিতাপাট দেবতার কথা মনে রেখে। তবে একটা কথা, ঘোড়ায় চড়ার সময় কার উদ্দেশ্যে লাল সিং যেন প্রণাম করে।

তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী ভুবনপাথর জিজ্ঞেস করল, কাকে প্রণাম কর তুমি?

লালসিং হাসল, অনর্গল হাসি। ভুবন ঠিক বুঝতে পারে না। অথচ এই ঘোড়াটি ভুবনই সংগ্রহ করে দিয়েছে। কেমন করে ঘোড়াটি সংগ্রহ করেছে, তা বলছি।

শারিগ্রামের এক প্রান্তে, পূর্ব দিকে একটি খাদ আছে। সেটা নাকি রুপোর খনি। রোদ পড়লে ঝিকিমিকি করে। কথাটি রটে গেল। দলে দলে মানুষ সেখানে ছুটতে লাগল। সবাই তাল তাল রুপো তুলবে। তো খবর গেল বরাহভূমের এক রাজকুমারের কানে। তিনিও ছুটে এলেন ঘোড়ায় চড়ে দিশেহারা। গাছের গুঁড়ি ডিঙোতে গেল ঘোড়া। ঘোড়ার পিঠ থেকে রাজকুমার ছিটকে পড়লেন। তিনি পড়লেন আর মরলেন।

‘হায় বেচারা!’ এই বলে ভুবন ঘোড়াটি নিয়ে এল। লালসিংকে উপহার দিল।

মজার কথা। সেদিন ভোর সকালে, লাল সিং স্নানের পর কিতাপাঠ দেবতার পুজো করল। শুধু পুজো নয়, প্রার্থনার পর পিতৃহত্যাকারীদের বদলা নেবার শপথ নিল। ঠিক সেই মুহূর্তে ভুবন ঘোড়াটিকে বন্ধু লাল সিংয়ের হাতে সমর্পণ করল।

একদিন অবশ্য লাল সিং ভুবনকে বলল। সেদিন তুমি শুধিয়েছিলে না কার উদ্দেশ্যে, প্রণাম করি?

ঘোড়াটিকে। ঘোড়াটি আমার কাছে দেবদূত। এরপর খুশিমনে লাল সিং আরও বলল, দ্যাখো, এখন আমাদের কত অনুগামী। অস্তরশস্তর হয়েছে ঢের। মানভূমের লোকশিল্পীরা আমাদের শেখাচ্ছে কসরত ভঙ্গি, লম্ফঝম্ফ। ছৌ শিল্পীরা আমাদের ভূমিজ সৈন্যদের আনন্দ দিচ্ছে খুব। তারা শেখাচ্ছে ধামসা ও মাদলের বোল তুলতে হয় কেমন করে। কেমন করেই-বা মুখোশের আড়ালে লুকোতে হয়। তা ছাড়া লড়াই করতে গেলে যে দম লাগে, সে-দমের অনুশীলন করতে পারছি। সেটাই-বা কম কীসে!

খরবেগে বায়ু বইছে। শন শন শব্দ। গাছগাছালির পাতা ঝরছে। লালসিং ঘোড়ায় চেপে চলেছে। এখুনি শারিগ্রাম ছেড়ে শ্যামসুন্দরপুরের দিকে যাবে। সঙ্গে ভুবনও আছে। আজ কদিন ধরে এইভাবে ঘুরে দেখছে। ধলভূমি, অম্বিকাপুর, সুপুর প্রভৃতি স্থানের অবস্থান। বদলা নিতে হবে। এইসব জায়গার রাজারা বরাহভূম রাজার সঙ্গে মিলিত হয়ে তার পিতাকে হত্যা করেছে।

হঠাৎ সেই শিশুগাছটির নীচে এল, ওরা দুজন। ঘোড়া যেন একটু থমকে দাঁড়াল। গাছটির উপর থেকে পড়ল একটা তির, আর সেইসঙ্গে ভেসে এল স্বর।...

এই দিলাম তির—

করো গো লড়াই

হবে শত্রু নিধন

ফুৎকারে উড়ে যাবে

তুমি বড়ো বীর।

স্বরটি তার চেনা চেনা লাগল। অনেক অনেক দিন আগের শোনা শারির গলা মনে হল। সকালটা প্রসন্ন হয়ে গেল তার। গলা তুলে লাল সিং জিজ্ঞেস করল: ভালো আছ, শুক-শারি? শারি বিষণ্ণ গলায় বলল, বড্ড দুকখু গো আমার! শুকটা মরে গেল।

কথাটা শুনে লাল সিংয়ের খুব খারাপ লাগল।

আবার শারি বলল, বেঁচে আছি তোমাকে জয়ী দেখব বলে। যুদ্ধ হবে শীঘ্রই। গলা তুলে সুর করে বলল—

তিরটা সঙ্গে রেখো,

হাসি খুশি মনে

ভুলে যেয়ো না কভু

জয়ী হবে জেনো।

হঠাৎ সেই শিশু গাছটির নীচে এল, ওরা দুজন।

এরপর লাল সিং বলল:

ভালো থেকো শারি

চলি।

যাব অনেক দূরে,

এখুনি।

অনেকটা বন-পথ,

দিতে হবে পাড়ি।

বদলা নেওয়ার পালা শুরু হয়েছে। লাল সিংকে এখন সবাই মানেন। ভয়ও করেন। সকল রাজা, জমিদার তাঁর কাছে পরাস্ত হয়েছেন। প্রায় প্রতিদিনই এক-একটি রাজ্য জয় ও লুন্ঠন করে চিরকূট পাঠাতেন। ‘বদলা নিল। ত্রিভন সিংহের বেটা।’ লাল সিংয়ের আক্রমণ ও লুন্ঠনে রাজারা ভয় পেলেন খুব। মনোবল টুটে গেল।

এরপর লাল সিং আদেশ করলেন। পরাজিত রাজাদের প্রজারা সরাসরি কর দেবে লাল সিংকে। এবং তাদের রক্ষার দায়িত্ব লাল সিংয়ের। এই করের নাম ‘সুখনিধি’। অর্থাৎ প্রজারা নিশ্চিন্তে সুখে নিদ্রা যেতে পারবে। সবাই তো কর দিতে শুরু করল। রক্ষাকর্তা, প্রাণের রাজা লাল সিংকে।

বরাহভূম, ধলভূম, সুপুর, অম্বিকাপুর, শ্যামসুন্দরপুরের রাজারা নালিশ জানালেন সদ্য জাঁকিয়ে বসা ইংরেজ সরকারে কাছে। ইংরেজ প্রতিনিধিরা এলেন গেলেন। ফল হল না কিছুই তারা বাগে আনতে পারল না লাল সিংকে। তাদের কুঠিও ধ্বংস হতে লাগল।

অবশেষে ইংরেজ প্রতিনিধিরাও লাল সিংয়ের সঙ্গে রফা করতে চাইল। শান্তি চুক্তি করল। কেননা, তারাও আপাতত সুখে নিদ্রা যেতে চায়।

এখন আর তাঁকে কেউ লাল সিংহ বলে না। বলছে, সর্দার রাজা। তো সর্দার রাজার মনে পড়ল শারির কথা। তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে শিশু গাছটির নীচে এলেন। কোথায় শারি? হাওয়ায় ভাসল বিষাদের সুর। সেকিছুদিন হল মরে গেছে। সর্দার রাজার চোখ ছলছল করল। কানে বাজল আবার—

এই দিলাম তির

করো গো লড়াই

হবে শত্রু নিধন

ফুৎকারে উড়ে যাবে

তুমি বড়ো বীর।

কচিপাতা, শারদীয়া, ১৪১৩

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%