পাহাড় পুরুষ

রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার

ভঞ্জরাজ নীলাম্বরের দুই পুত্র। কিশোর ভঞ্জ ও লক্ষ্মণরাজ ভঞ্জ। রাজা নীলাম্বরের অবর্তমানে জ্যেষ্ঠতম গদিতে বসবেন। সেটাই তো নিয়ম। রাজবিধি। কিন্তু কিশোর ভঞ্জ মানুষ হিসেবে অন্যরকম। ধর্মকর্ম, তীর্থ পরিক্রমায় তিনি ব্যস্ত। এক্ষেত্রে তিনি প্রপিতামহ জয় সিংহের উত্তরসাধক।

জয় সিংহ একদিন জয়পুর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন। তীর্থভ্রমণে। এই ভ্রমণে তাঁর অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। একদিন ঘুরতে ঘুরতে পুরী এসে পৌঁছোলেন। প্রভু জগন্নাথ দর্শন। তারপরের ইতিহাস দীর্ঘ। পুরীরাজ গজপতি ‘হরিহরপুর’ নামক বিশাল ভূখন্ডটি তাঁকে দান করলেন। বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে। জয় সিংহ বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। বঁাধলেন তাঁকে আত্মীয়তার বন্ধনে। জ্যেষ্ঠপুত্র আদি সিংহের বিবাহ দেন। পুরীরাজ গজপতির দুহিতার সঙ্গে।

ঘটনা এই মাত্র। কিন্তু বহু শাখা পল্লবে ছিল তার বিস্তার। কারণ বলছি। জয় সিংহ হরিহরপুর ভেঙে দুটি রাজ্য সৃষ্টি করলেন। ময়ূরভঞ্জ ও কেওয়নঝাড়। ‘ভাঙন’ অর্থ ‘ভঞ্জ’। ময়ূরভঞ্জের গদিতে বসলেন আদি সিংহ। আর, কেওয়নঝাড়ে যতি সিংহ। জয় সিংহের পুত্ররা পিতার উজ্জ্বলতম কীর্তি স্মরণ করে রেখেছেন। নামের পদবীতে ‘সিংহ’ বদলে ‘ভঞ্জ’ শব্দটি জুড়ে দেন। আদি ভঞ্জের পুত্র নীলাম্বর। নীলাম্বর ভঞ্জের পুত্রদের নিয়েই আমাদের কথা ও কাহিনি।

কিশোর ভঞ্জ চলেছেন। তীর্থভ্রমণে। পথের সঙ্গে তাঁর সন্ধি। রাজবেশ নেই। ঈশ্বর নামই কেবল নিমগ্ন উচ্চারণ। সদ্য তনি বিহার থেকে ফিরেছেন। বৌদ্ধ বিহার, স্তূপ দেখেছেন। ‘নালম’ অর্থ পদ্ম। জ্ঞানের প্রতীক। জ্ঞান বিতরণের বিশ্ববিদ্যার প্রাচীনতম মহান প্রতিষ্ঠান নালন্দা দেখেছেন। অবাক বিস্ময়ে দেখেছেন। কৌতূহল বা আশ কিছুতেই মেটেনি। আরও একবার যাবেন। এমনটাই ভেবে রেখেছেন। এবার তিনি বঙ্গদেশে যাবেন। কালীঘাট দর্শন করেই তিনি যাত্রা শুরু করবেন। নতুনভাবে।

স্থলপথ দুর্গম। জলপথেও দস্যু তঞ্চকের অভাব নেই। তবে তাঁর আর ভয় কীসের! তাই, আত্মীয়, বন্ধুজনের নিষেধ না মেনেই চলেছেন। বঙ্গদেশের অভিমুখে। দীর্ঘ দশ মাস পরে আবার ফিরেও এলেন। এসেই মর্মান্তিক কথাটি শুনলেন। পিতা আর নেই। গত হয়েছেন, তাও তিন মাসের অধিক। ঘটনা ঘটেছে, আরও। কনিষ্ঠ ভ্রাতা লক্ষ্মণরাজ ভঞ্জ গদিতে বসেছেন। যাঁরা কিশোর ভঞ্জকে পছন্দ করেন, তাঁরা বিদ্রোহ করছেন। বিশেষ করে, পরগনাদার সরবরাকারেরা। বিদ্রোহ ধিকিধিকি আগুনের মতো কিছুতেই নিভতে চায় না। বাধ্য হয়েই কিশোর ভঞ্জ পিতামহ আদি ভঞ্জের তৈরি দুর্গপ্রাকারের ওপর উঠে দাঁড়ালেন। বিদ্রোহক্ষুব্ধ মানুষদের প্রতি বললেন: ‘আমি রাজভিখিরি। আপনাদের মনের সিংহাসনে বসে আছি। সেটাই তো ঢের। আর, কিছু চাই না।’ অন্তরতম নিবেদন।

এরপর লক্ষ্মণরাজের দিকে ফিরে বললেন; ‘তুমিই গদি সামলাও। ওসবে আমার লোভ নেই। তুমি তো জান, আমি নির্বিবাদী। ঝঞ্ঝাট-ঝামেলা আমার একদম ভালো লাগে না। পছন্দ নয়। মনে পড়ে? একবার মেঘাসনি পাহাড়ের সেই অদ্ভুত কান্ডটির কথা?’ লক্ষ্মণরাজ সেই কান্ডটি মনে করবার চেষ্টা করলেন। মনে পড়েও গেল সেই অলৌকিক কাহিনি। দুই ভাই ছুটতে ছুটতে পর্বতের গভীর খাদে পৌঁছে দেখলেন। এক দিব্যকান্তি পুরুষ। অনাবিল হাসি, অনর্গল। চকিতে আঙুল তুলে বললেন: ‘আর এগিয়ে এসো না। সামনে বিপদ।’

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তুমি কে?’

তুমিও জিজ্ঞেস করেছিলে, ‘তুমি কে?’

সেই অলৌকিক মানুষটি হাসলেন। হাসিতে অমলবিভা। বললেন, ‘পাহাড়পুরুষ।’ তোমাদের পূর্বপুরুষ।

আরও বললেন, ‘এই বনজসম্পদ আমার। ওই যে দেখছ, শুভ্র প্রস্তররাশি চিকচিক করছে। আসলে অভ্রখনি। মহামূল্যবান। কে নেবে, তোমাদের মধ্যে একজন?’

আমি বলেছিলাম, ‘আমার চাই না।’

তুমি বলেছিলেন, ‘আমি নেব। আমাকে দাও।’

পাহাড়পুরুষ হাসলেন। পুনর্বার। বললেন, ‘তাই হবে!’

এরপর তিনি মিলিয়ে গেলেন। অন্তর্হিত।

আসলে সাহসের ব্যাপার। ঝুঁকির। সে-সাহস আমার নেই। ছিল না কোনো দিন। তোমার আছে। তুমিই ভঞ্জ রাজ্যের যথার্থ প্রতিনিধি।’ কিশোর ভঞ্জ কোমল কন্ঠে কথা ক-টি বললেন।

আর এগিয়ে এসো না। সামনে বিপদ।

দাসপুরের সরবরাকর প্রভঞ্জন পরিদা। কিশোর ভঞ্জের সুমিষ্ট বাক্যে সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। ভেবেছেন, কিশোরভঞ্জ নিরুপায় হয়েই ছোটোভাইকে গদি ছেড়ে দিয়েছেন। এমন অন্যায় কাজ তিনি কিছুতেই হতে দিতে পারেন না। বাল্য ও কৈশোর একসঙ্গে কাটিয়েছেন। গুরুগৃহে পাঠ নিয়েছেন। একবার ভয়ানক অসুখ করেছিল, কিশোরের। এই খবর জানতে পেরে, প্রভঞ্জন দয়ানদীর কাছে, মৌনীবাবার আশ্রমে গেলেন। আরোগ্য কামনায় প্রার্থনা জানালেন। তিন দিন, অহোরাত্র। সত্যি ফলও ফলেছিল। কিশোর দ্রুত আরোগ্য লাভ করলেন।

এমন ঘটনা কতই ঘটেছে! একবার দুই বন্ধুতে মিলে ঘোড়ায় চড়ে জঙ্গলমহলে যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু সে-যাত্রায় দুর্যোগ ঘটে। সূর্য তখন মধ্যগগনে। হঠাৎ প্রভঞ্জন ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যান। ঘোড়ার পা-পিছলে যাওয়ায় এই বিপত্তি। এতে প্রভঞ্জনের হাঁটুতে ভীষণ চোট লাগে। কিশোরের উদবেগ, আশঙ্কা জেগেছিল খুব। বন্ধুর সেবাতে সদাতৎপর ছিলেন।

শিলাবতী নদীর ধারে পর্ণকুটিরে সিধাই মা থাকেন। তিনি বললেন, ‘তোমরা এখানে থাকো। এমন অবস্থায় কোথাও নড়াচড়া ঠিক হবে না। সিধাই মা বনজ লতাপাতা বেটে প্রভঞ্জনের হাঁটুতে প্রলেপ দিলেন। দিনে তিন বার। সিধাই মা মন্ত্র জানেন। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় প্রভঞ্জন ভালো হয়ে গেলেন। কিশোর বললেন: সিধাই মা, তুমি এখানে একা। চলো-না, ভঞ্জভূমে। সেখানে আমরা তোমাকে দেখব। যত্নআত্তি করব। মনে করো না, আমরা তোমার দুই পুত্র। আমার পিতা নীলাম্বর ভঞ্জ। তিনি খুব খুশি হবেন। সিধাই মায়ের কপালে ভাঁজ। চোখে বিস্ময়।’ ‘ভঞ্জরাজের বংশধর তুমি?’ কিশোর খুব জোরে মাথা নাড়লেন। বুঝিবা একটু সকৌতুক অবলোকন।

সিধাই মায়ের চোখে ভাসে ছবি। সুখ-দুঃখ, তাপ-দহন। বললেন: বোলাঙ্গির থেকে বধূ হয়ে এসেছিলাম দাসপুরে। আদিভঞ্জ আমার শ্বশুরকে জমি দেন। বাস্তুজমি। সেখানে তিনি বাস করতে লাগলেন। তিনি রাজকর্মচারী। খাজনা আদায় করে সরাসরি ভঞ্জরাজের কাছে পাঠাতেন। খুব সৎমানুষ হিসেবেই ছিল তাঁর পরিচয়। একদিন দাসপুর স্বতন্ত্র পরগনায় অন্তর্ভুক্ত হল। সেখানে যিনি সরবরাকার নিযুক্ত হলেন। তিনি কেওয়নঝাড়ের আর এক ভঞ্জ রাজার নিকট আত্মীয়, অত্যাচারী।’

কিশোরভঞ্জ কথার পিঠে কথা বললেন। ‘রাজা জয়সিংহ আমার প্রপিতামহ। তিনি হরিহরপুর ভেঙে ময়ূরভঞ্জ ও কেওয়নঝাড় সৃষ্টি করেছেন। আমি ময়ূর ভঞ্জরাজ আদি ভঞ্জের নাতি।’

আদি ভঞ্জের নাতি শুনে সিধাই মা খুশিতে ভরে উঠলেন। মুখমন্ডলটি তাঁর কুঞ্চিত। কিন্তু হঠাৎই প্রসন্ন দীপ্তিতে ভরে উঠলেন। এক অন্যতমা মানবী মনে হল। তিনি শীর্ণ আঙুল দিয়ে কিশোরের থুতনি ছুঁলেন। চুম্বন রেখা এঁকে দিলেন। কিশোরের শরীর আন্দোলিত হল। স্নেহমাখা হাতের স্পর্শ কত গভীর! কত মধুর! টের পেলেন কিশোর। অন্তরতম অনুভূতি। কিশোর ফিরে এলেন। কথার বঁাকে। শব্দ চমকে।

‘অত্যাচারী’! কী বলছিলে

সিধাই মা?’ সিধাই মা আবার অতীতে ফিরে গেলেন: তখন শ্বশুর আর বেঁচে নেই। আমার ছেলে সুকর্ণ তাঁর কাজ করত। একদিন দাসপুরের সরবরাকার বললেন, ‘খাজনা আদায়কারী বংশানুক্রমিক হতে পারে না। এই কাজের দায়িত্ব অন্যের হাতে দিতে চাই। তোমাকে নয়।’

সুকর্ণ জানতে চেয়েছিল তার অপরাধ! বলেছিল, ‘সততা দিয়েই তো দায়িত্ব পালন করছি।’ সরবরাকার চাবুক মেরে বলেছিল, ‘কোনো প্রশ্ন শুনতে চাই না।’ সেরাতেই সুকর্ণ ভঞ্জরাজের কাছে নালিশ জানিয়েছিল। সেই অপরাধে, বাছাকে আমার গনগনির বনে হত্যা করে শিলাবতীর নদীর জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। আমি আর কী নিয়ে থাকি, বলো? এই বন, নদী আমার এখন নিত্যসঙ্গী। এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে নদীর জলের ওপর হাওয়ার শিরশিরানি। স্নিগ্ধ বাতাস বয়ে গেল। বৃক্ষলতার ঝাঁকুনি-কাঁপুনি বোঝা গেল। একদল পাখি ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল। নীল নিলয় খোঁজে। সুবৃদ্ধা সিধাই মা, চোখ ওপরে তোলেন। গাঢ় ছায়া ঘনায়। বললেন, ‘এদের নিয়েই থাকি, বঁাচি।’

কিশোর ও প্রভঞ্জনের মধ্যে সদ্ভাব, প্রীতি, বন্ধুত্ব লক্ষ করেই প্রভঞ্জন পরিদাকে দাসপুরের সরবরাকার হিসেবে নিযুক্ত করলেন। রাজা নীলাম্বর ভঞ্জ। কিশোর পিতার এই কাজে তো ভীষণ খুশি। প্রভঞ্জন অবশ্য রাজার পছন্দকে মর্যাদা দিলেন খুব। শ্রম, সততা দিয়ে দাসপুর পরগনাটি নতুন করে গড়ে তোলেন। রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়েছে ঢের। কিন্তু কোনোভাবেই মানুষকে পীড়ন করেননি। পূর্বতন সরবরাকারের কৃতকর্মের কথা তাঁর জানা আছে। জানা আছে সিধাই মায়ের দুঃখের কথা। তাই নিজেকে গড়তে চেয়েছেন। এক অনন্য রাজকর্মী হিসেবে। সুনামও কুড়িয়েছেন খুব। মানুষের ভালোবাসা আর বন্ধন তাঁকে আরও দায়িত্বশীল করে তুলেছিল।

আবার, এই মানুষের মধ্যে মন্দ মানুষের অভাব নেই। থাকেও না কোনো কালে। মন্দমানুষ স্বার্থের অন্ধিসন্ধিতে ঘোরাফেরা করে। এমন এক মানুষের নাম বিশ্বমহারানা। একদিন সকালে, সরবরাকার প্রভঞ্জনকে এসে বললেন: ‘হুজুর, আমাদের চাষ এবার ভালো হয়নি। গ্রামের অবস্থা করুণ। খাজনা মকুব করে দিন।’ সরবরাকার বললেন, ‘বিষয়টি আমি বিবেচনা করব। তার আগে আমি জেনে নিতে চাই প্রকৃত তথ্য। অপেক্ষা করুন। দু-তিন দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাব।’ সেই মানুষটির কথার সূত্র ধরে সরবরাকার গ্রামটি ঘুরলেন। প্রবীণ মানুষের মতামত নিলেন। চাষ সকলের ভালো হয়নি। কথাটি একেবারেই ঠিক নয়। তিনটি পরিবার মরশুমি চাষের সুবিধে নিতে পারেনি। তারা ক্ষতিগ্রস্ত। তাদের খাজনা মকুব করে দিলেন। কিন্তু বিশ্বমহারানার পরিস্থিতি অন্যরকম। সম্পন্ন চাষি। এবং কৃপণ ও ধুরন্ধর ব্যক্তি হিসেবেই তার পরিচয়।

প্রভঞ্জন পরিদা রাজা নীলাম্বরকে অভিবাদন জানিয়ে বললেন: ‘রাজামশাই, সুখদাভূম গ্রামের তিনটি পরিবারের দুর্দশা দেখে খাজনা মকুব করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের অবস্থা এমনই ভয়ানক। এই মুহূর্তে ফসল ও অর্থসাহায্য না করলে তাদের রক্ষা করা যাবে না। তাই, বাৎসরিক ব্যয় সংকুলানের জন্য সরবরাকারের তহবিল থেকে অর্থ দেওয়া হোক। অনুমতি প্রার্থনা করি।’ রাজা পারিষদবর্গ নিয়েই বসেছেন। রাজসভায় অন্য দিনের তুলনায় পাত্রমিত্র একটু বেশিই মনে হল। আজ রাজার মন মেজাজ শরিফ বলে মনে হচ্ছে না। প্রভঞ্জন একটু চিন্তিত হয়ে পড়লেন। রাজার ভাবগতিক বুঝতে পারছেন না। এমনদিনে, আর্জি জানিয়ে রাজার বিরাগভাজন হলেন কি না; ভাবতে লাগলেন। রাজার চোখ দুটি স্থির। মুখটি থমথমে। অন্যসব দিনে তাঁর কৌতুক চোখ, হাসিমুখ দেখে সকলে খুশি হয়। প্রাণের কথা বলেন। রাজা মন দিয়ে সকলের কথা শোনেন। কেউ কোনো আর্জি জানিয়ে বিফল হয় না। আজ কী হল! প্রভঞ্জনের মনে শঙ্কা জাগছে। এমন সময় তিনি ডাকলেন। স্বরে গাম্ভীর্য। ‘প্রভঞ্জন, এসব কী শুনছি? তুমি নাকি তিনটি পরিবারের কাছ থেকে মোহর নিয়ে খাজনা মকুব করেছ। সত্যি?’

প্রভঞ্জন বসে পড়লেন। বজ্রাহতর মতোই। অনেকক্ষণ কথা বলতে পারলেন না। সভাসদগণ কার্যত দুটি ভাগে বিভক্ত হলেন। একদল বললেন: ‘রাজামশাই, এমন লোভী মানুষকে শূলে চড়ান। জ্যান্ত পুঁতে ফেলুন।’ একজন বললেন: ‘লঘু পাপে গুরুদন্ড নয়। ময়ূরভঞ্জ রাজ্য থেকে বিতাড়ন করা হোক।’ মন্ত্রী ধীরা মহান্তি বললেন: ‘এই মোহর নেওয়ার অভিযোগ কে করেছে, তাকে সভায় আনা হোক।’

সভাকক্ষে নানা গুঞ্জন। সরগরম। মন্ত্রীর আদেশে অভিযোগকারীকে সভায় আনা হল। রাজামশায় জিজ্ঞেস করলেন: ‘তোমার অভিযোগ সত্য?’ বিশ্বমহারানা মাথা নাড়েন; ‘একবর্ণও মিথ্যে নয় রাজামশায়।’ ‘প্রমাণ দিতে পারবে?’ রাজামশায় জলদগম্ভীর স্বরে বললেন। মন্ত্রীমশায় বলে উঠলেন: ‘বেয়াদপি মাফ করবেন। এই মুহূর্তে তার প্রয়োজন নেই।’ এরপর তিনি সভাসদগণের দিকে বললেন: ‘আগামী সাত দিনের মধ্যে প্রকৃত সত্য আপনাদের জানানো হবে। এখন দ্বি-প্রাহরিক বিশ্রামের সময়। রাজামশাই প্রস্থান করবেন। আপনারা মহামান্য রাজার অতিথি। আপনাদের অভ্যর্থনা জানাই। আহার সমাধার জন্য। আহ্লাদের একটা ভাষা আছে। সেটা চুপিসারে হয় না। সেই আহ্লাদ এখন তুঙ্গে। কারণ, ভূরিভোজন।

পরদিন প্রত্যুষে রাজা ও মন্ত্রী ছদ্মবেশে বের হলেন। সুখদাভূমের উদ্দেশ্যে। প্রথমে ঘোড়ায় চড়ে। পরে পায়ে হেঁটে। তিনটি পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। প্রশ্ন করলেন অনেক। গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বললেন। সর্বত্রই প্রভঞ্জন পরিদার সুখ্যাতি শুনলেন। রাজা ও মন্ত্রী ধীরগতিতে হাঁটছেন। দুজনেই মগ্ন, কথোপকথনে।

রাজা। ‘মনে হয় সরবরাকার প্রভঞ্জন নির্দোষ।’

মন্ত্রী। ‘আমারও তাই মনে হয়।’

রাজা। ‘পঞ্চজনের সভায় জিজ্ঞেস করে জানা গেল। অনেক কিছু।’

মন্ত্রী। ‘এটা বড়ো ভালো হল। মহামান্য রাজা গণমনের মত যাচাই করলেন।’

রাজা। ‘মোহর যে দিতে পারে, সেখাজনা দিতে পারে না?’

মন্ত্রী। ‘তাইতো!’ এরপর তিনি বললেন; ‘শাস্তিও পুরস্কার দুই-ই দিতে হবে।’

রাজা। ‘সেটা কেমন শুনি?’

মন্ত্রী। বিশ্বমহারানার অভিযোগ মিথ্যে প্রমাণিত হলে, কী শাস্তি দেবেন, রাজামশাই?’

রাজা। ‘মৃত্যুদন্ড। নাহ মৃত্যুদন্ড নয়। যাবজ্জীবন কারাদন্ড।’

মন্ত্রী। ‘আর পুরস্কার?’

রাজা। ‘প্রভঞ্জনকে সুখদাভূম গ্রামখানি দান করা হবে।’

মন্ত্রী। ‘এইটুকু?’

রাজা। ‘দাসপুর পরগনার নাম পালটে রাখা হবে, যশপুর। প্রভঞ্জনের যশখ্যাতি স্মরণ করবে সকলে। মান্যতা দেবে।’

মন্ত্রী। ‘ধন্য রাজা, ধন্য!’

ঠিক সাত দিনের দিন। রাজসভাতে মন্ত্রীমশায় ঘোষণা করলেন। ‘মহামান্য রাজা বিষয়টি তদন্ত করিয়েছেন। প্রভঞ্জন পরিদা নির্দোষ। বিশ্বমহারানা সরবরাকারের বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ এনে রাজসভাকে বিভ্রান্ত করেছে। এরজন্য তাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হল।

সরবরাকার প্রভঞ্জন পরিদার সততায় খুশি হয়েছেন, রাজামশায়। তিনি সানন্দচিত্তে সুখদাভূম গ্রামখানি তাঁকে দান করলেন। আর, দাসপুরের নাম পরিবর্তন করে যশপুর রাখার আদেশও দিলেন।’

এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে একদল বাদক বোতলাকৃতি একমুখি ঢোল গলায় ঝুলিয়ে বাজাতে লাগল। ‘দুলদুলি বাজা’। সেইসঙ্গে রাজ-আদেশ জানাতে শুরু করল। এখন থেকে ‘দাসপুর’ ‘যশপুর’ নামে পরিবর্তিত হল। ‘যশপুর...রাজার আদেশ...’। প্রভঞ্জন পরিদার যশোগাথা প্রচারিত হল। ধন্যরাজা, ধন্যকীর্তি।

আমরা সেই কাহিনিতে ফিরে আসি। কিশোর ভঞ্জ তীর্থভ্রমণে বেরিয়েছেন। ফিরেও এলেন। ইতিমধ্যে পিতার দেহান্ত হয়েছে। কনিষ্ঠ ভ্রাতা লক্ষ্মণরাজ গদিতে বসেছেন। গদিতে বসাটা দোষের নয়। রাজার আসন শূন্য রাখা নিয়ম নয়। কিন্তু জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কিশোর ভঞ্জ যখন ফিরে এলেন। তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হল না, রাজপ্রতীক। তাই যশপুরের সরবরাকার কিশোর ভঞ্জের বাল্যবন্ধু প্রভঞ্জন পরিদা বিষয়টি মেনে নিতে পারলেন না। তিনি বিশাল বাহিনী নিয়ে এলেন। লক্ষ্মণরাজকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে। যুদ্ধ বেঁধে গেল, তুমুল। কিশোর ভঞ্জ যুদ্ধস্থলে উপস্থিত হয়ে বন্ধুকে নিরস্ত করলেন। বললেন; ‘লক্ষ্মণরাজ রাজপ্রতিভূ হওয়ার যোগ্য। আমার তাতে সায় আছে। ওঁর কোনো দোষ নেই।’

প্রভঞ্জন বললেন: ‘এটা অন্যায়।’ কিশোর বন্ধুর হাতখানি ধরে বললেন, ‘চলো, পাহাড়পুরুষের কাছে।’ প্রভঞ্জন অবাকবিস্ময়ে তাকান। ‘পাহাড়পুরুষ!’ ‘কথা নয়। চলোই না।’ কিশোরভঞ্জ বন্ধুকে আকর্ষণ করলেন। দুজনে ঘোড়া ছুটিয়ে এলেন। মেঘাসনি পর্বতে। এসে প্রাণপণে চিৎকার করলেন; ‘পাহাড়পুরুষ! পাহাড়পুরুষ! পাহাড়পুরুষ!’ দুই বন্ধু লক্ষ করলেন। অন্ধকার হয়ে গেল পাহাড়, বনস্থলী। নি:সীম অন্ধকার। হঠাৎ জ্যোতির্ময় আলোকে দেখা গেল এক দিব্যপুরুষকে। দীর্ঘ বাহু, পা পর্যন্ত লম্বা জটা। কপালে তিলক, চন্দনচর্চিত। আয়ত দুটি চোখ, উজ্জ্বল হাসি, উজ্জ্বলতর তাঁর দেহকান্তি। তিনি বললেন: ‘সেই তো ভালো। রাজকার্য তোমার নয়, কিশোর। সেবা করো। সেবাই মানুষের ধর্ম। মানুষের হৃদয় আঁকড়ে থাকো। সেই পথের যাত্রী তুমি। তাতেই মঙ্গল।’

এরপর প্রভঞ্জন ও কিশোর দেখলেন, সেই দিব্যপুরুষ মিলিয়ে গেলেন। আবার দিনের আলো ফুটল। বড়ো আশ্চর্য, অলৌকিক ঘটনা ঘটল। এক পলকে। তারপরের কাহিনি এইরকম। কিশোরভঞ্জ তো বটেই। তাঁর বংশধরেরা রাজপাটের মধ্যে যাননি। আদিপুরের নিষ্কর জমিতে বসবাস করেছেন। সেবাধর্ম দিয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন পেতেছেন। আর, কিশোর ভঞ্জ পান্থধর্মী আবেগে ঘুরে ফিরে বেড়িয়েছেন। পরম সত্যের সন্ধানে। সেবা যার আর এক নাম।

আলোর ফুলকি, অক্টোবর, ২০০২

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%