রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার
রাজার নাম একটা অবশ্যই আছে। কিন্তু সবাই তাঁকে বলেন খোঁড়া রাজা। সে-নামেই তাঁর খ্যাতি। তাঁর রাজনাম সুখাম্ফা। অহম অর্থাৎ অসম রাজাদের যেরকমটি হয়, আর কি!
তো রাজা কিশোর বয়সে ছিলেন খুব দুরন্ত। দামাল ছেলেরা যেমন করে। কখনো গাছ থেকে ঝাঁপ দেয়। কখনো বা জল পেলে বেপরোয়া খেলা করে। একবার তো গোটা রাজ্য রাজপুত্রকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ল। তখন তার বয়স কত হবে! তেরো কী চৌদ্দ। সেসঙ্গীদের নিয়ে নাকি হাতি শিকারে গেছে। হাতি নিয়ে তার কৌতূহল ছিল ভীষণ। পরে হাতি শিকার করা তার নেশা হয়ে গেল। ওই নেশাটা যুবক বয়সে আরও বেড়ে গেল। তাঁর এক মাহুত বন্ধু ছিল। নাম মোহন। মোহন বনে সবসময় রাজকুমার সুখাম্ফার সঙ্গী হত। মোহন তাঁকে শিখিয়েছে অনেক কিছু। হাতি কেমন করে ধীরপায়ে চলে, গজগমন। হাতির স্বভাব। হাতি যে অহরহ পথ পালটায়, বা সোজাসুজি দেখতে পায় না, সে-খবরটুকু মোহন জানিয়েছে। আরও বলেছে। হাতি পাগল হয়েছে কেমন করে বুঝতে হয়, বা দলছুট হাতি যে মারাত্মক, সেকথাও। একদিন এমনই এক দলছুট হাতির পায়ের সামান্য দলনে কুমারের বঁা-পাটি জখম হয়। রাজবৈদ্য দীর্ঘদিন শুশ্রূষা করলেন। ভালো হলেন বটে। তবে সবটুকু নয়, খুড়িয়ে চলতেন। সেই থেকে তাঁর নামের সঙ্গে খোঁড়া শব্দটি জুড়ে গেল। তাতে তাঁর যে খুব হেলদোল ছিল, তা নয়। একেবারেই নয়।
রাজা আবার যেমন-তেমন রাজা নন। বেশ বীর রাজা ছিলেন। রাজ্য সুরক্ষার জন্য তিনি ব্যতিব্যস্ত থাকতেন। তাঁকে প্রায়শই যুদ্ধে যেতে হত। কোচ রাজা নরনারায়ণও খুব শক্তিশালী রাজা ছিলেন। কোচ এবং অসম রাজার মধ্যে প্রীতির সম্পর্ক ছিল। একসময় সেই সম্পর্কের চিড় ধরল। একটা বড়ো যুদ্ধ হল দুই রাজার মধ্যে। সে-যুদ্ধের কারণ ছিল হাতি। এবার সে-গল্পটাই বলি।
সুখাম্ফার পিতা মহারাজ শুকলেন মুঙ্গ ছিলেন বেশ তেজি ও যুদ্ধবাজ রাজা। তিনি অসম নৃপতি হয়েই জবরদস্ত রাজধানী বানালেন। গরগাঁওতে। সেই থেকে তাঁর নাম হয়ে গেল গড়গয়া রাজা। গড়গয়া রাজাকে বাধ্য হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়েছে কোচ রাজার সঙ্গে। অসম ও কোচ রাজাদের মধ্যে প্রায়শই যুদ্ধবিগ্রহ লেগে থাকত। সীমান্ত সমস্যা নিয়ে। কোচ রাজা নরনারায়ণ সবসময় ব্রহ্মপুত্র নদের উত্তর দিক দখল রাখতে চাইতেন। সীমান্ত সমস্যা নিয়ে একবার প্রবল যুদ্ধ বেঁধে গেল দুই রাজার মধ্যে। তির-ধনুক, অস্তর-শস্তর নিয়ে দুই পক্ষ ঝাঁপিয়ে পড়লেন। গড়গয়া রাজা প্রথমে সুবিধা করতে না পারলেও পরে অবশ্য জয়লাভ করলেন। কোচ রাজা গড়গয়া রাজা বা শুকলেন মুঙ্গের সঙ্গে সন্ধি করলেন। সন্ধির শর্তে কোচ রাজাকে অনেক ধনরত্ন ও পাঁচটি হাতি উপটৌকন দিতে হয়েছিল।
অসমরাজ গড়গয়ার সঙ্গে কোচ রাজার যখন শেষ যুদ্ধ হয় তখন রাজকুমার সুখাম্ফা সদ্য যুবক। মস্ত শিকারি। পিতার উপটৌকন পাওয়া পাঁচটি হাতি ছিল তাঁর খেলার সঙ্গী। অনুক্ষণ। মাহুত বন্ধু মোহন তো ছিলই। আমাদের গল্পের বিষয় দুই রাজার মধ্যে বিরোধ এবং হাতি নিয়ে।
গড়গয়া রাজার মৃত্যুর পর সুখাম্ফা রাজ্যভার নিলেন। রাজার অভিষেকপর্বে ধুমধাম হল খুব। রাজার অভিষেক উপলক্ষ্যে ভূমস্বামীগণ অভিনন্দন জানালেন। উপঢৌকন দিলেন ঢের। পার্শ্ববর্তী রাজারাও উপঢৌকন পাঠালেন। কোচ রাজার দূত ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে রাজগৃহে প্রবেশ করলেন। সুদৃশ্য পেটিকা খুলে উপঢৌকনগুলি রাজার অনুচরের হাতে দিলেন। এরপর কিংখাবে মোড়া একখানি পত্র দিলেন।
দূত রাজাকে অভিবাদন জানিয়ে বিদায় নিলেন। রাজা বুড়োগোঁহাই-কে ইঙ্গিতে পত্রখানি পড়তে বললেন। তিনি পড়লেন:
শ্রীশ্রী রাজাধিরাজ সুখাম্ফা, অহমপতি আজ শুক্লপক্ষের নবম দিন। আপনার অভিষেক ক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। প্রার্থনা করি, আপনার শুভ হোক। কিন্তু আপনার পিতার সঙ্গে যে বিরোধ ছিল, তার অবসান হবে আপনাকে পরাজিত করতে পারলে। তৈরি থাকুন।
ইতি
মহারাজাধিরাজ নরনারায়ণ
কোচ অধিপতি
পত্রটির পাঠ শুনে রাজার মনটি খারাপ হল। বুড়োগোঁহাই রাজাকে পরামর্শ দিলেন। মন প্রসন্ন রাখুন। প্রত্যেক রাজার জীবনে যুদ্ধ আসে, যুদ্ধ থাকে। আমরা আগে ভেবে করব কী? রাজা ম্লান হাসলেন। সেটাই হয়তো ঠিক।

সৈন্যরা ছুটল দিকে দিকে, ব্রহ্মার খোঁজে।
বুড়োগোঁহাই বললেন: ‘সন্ধে হতে আর দেরি নেই। পিলখানায় (হাতিশাল) চলুন। হাতি দর্শন শুভ। শাস্ত্রে বলে।’ রাজা সায় দিলেন: ‘হ্যাঁ, তাই চলুন।’
হাতিশালে এলেন রাজা। খুব খুঁটিয়ে দেখলেন, পিতার পাওয়া পাঁচটি হাতিকে।
বুড়োগোঁহাই একেকটি হাতির কাছে গিয়ে বলতে লাগলেন, ‘এটি উত্তরা, ওইটি দক্ষিণা, ওইতো ঘণ্টামাদল’...
‘থাক থাক বলতে হবে না। এসব তো আমারই দেওয়া নাম।’
রাজা মৃদু হাসলেন।
রাজার চোখ ঘুরতে লাগল। একসময় প্রায় চিৎকার করে উঠলেন। ‘আমার ব্রহ্মা কই?’
ব্রহ্মা হল কুনকি হাতি। যে-হাতিটি সংগ্রহ করতে গিয়ে এক দলছুট হাতির পায়ের চাপে রাজার বঁা-পাটি জখম হয়। তবে তাঁর মনে সন্ত্বনা হল এই ব্রহ্মা তাঁর যন্ত্রণা ভুলিয়েছে। সেই ব্রহ্মাকে যথোপযুক্ত শিক্ষা দিয়েছে মোহন। সেএখন হাতির পালের নেতা। সেই কুনকি হাতি ব্রহ্মা-কে পাওয়া গেল না। ঢেঁড়া পেটানো হল। যে পারো ব্রহ্মাকে এনে দাও। রাজার মনে ভারি দুঃখ। রাজ্যবাসী বিমূঢ় হল। সৈন্যরা ছুটল দিকে দিকে, ব্রহ্মার খোঁজে। রাজার প্রিয় হাতির খোঁজ যে দিতে পারবে, তাকে পাঁচ সহস্র স্বর্ণমুদ্রা দেওয়া হবে। ঘোষিত হল। অধিকন্তু গুপ্তচর বাহিনীকে কাজে লাগানো হল।
অসম রাজ্যে হইহই কান্ড। রাজ্যের ভূস্বামীরা তাঁদের পাইক বরকন্দাজ ছোটালেন চারিদিকে। চড়াইদেও নাগরিক ভুঁইয়া প্রধানের নিত্যসহচর ভীমকল্প সেই কুনকি হাতিটির খবর সংগ্রহ করলেন। কিন্তু তিনি খবরটি তাঁর মনিব গোবিন্দরামকে দিলেন। গোবিন্দরাম বললেন: ‘তুই সত্যি হাঁদা। বিষয়টি গোপন রাখ। পুরস্কার তোর ভাগ্যেই আছে।’
‘তবে ঠিক খবর জেনেছিস তো?’ গোবিন্দরাম জানতে চাইলেন।
ভীমকল্প, তাঁর বিরাট বপু দুলিয়ে বললেন: ‘একদম সঠিক।’ এই মুহূর্তে, গোবিন্দরাম ও ভীমকল্প গভীরভাবে ভাবতে লাগলেন। সংবাদটি কীভাবে রাজার কানে পৌঁছে দেওয়া যায়? যাই হোক, দু-একটি কথার পর দুজনে চলে গেলেন যে যার দিকে।
পরদিন, গোবিন্দরাম ও ভীমকল্প শোণিতপুর নাড়োলি গ্রামের বৈষ্ণব আটচালায় বসে ভারলি নদী বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। নদী স্রোতের তীব্রতা নিয়েই আলোচনা। এমন সময় সেই নদীতে ডিঙি বেয়ে অসম রাজার জনা কয়েক সৈনিক এসে হাজির। তাদের মধ্যে যে বয়স্ক সেজিজ্ঞেস করল: ‘আপনারা অসম রাজার হাতি ব্রহ্মার চুরি যাওয়ার সংবাদ জানেন কি?
ভীমকল্প কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। গোবিন্দরাম ইশারা করলেন, কিছু না বলতে।
সৈনিকদের সন্দেহ হল। তারা ভীমকল্পের দিকে আঙুল তুলে বলল, ‘উঠুন। আমাদের সঙ্গে চলুন।’ ভীমকল্প ও গোবিন্দরাম প্রবল প্রতিবাদ করলেন। সৈনিকরা তরবারি উত্তোলন করে বলল: ‘অহেতুক ঝামেলা বাড়াবেন না। আপনাদের ক্ষতি চাই না। যা বলার রাজার কাছে বলবেন। এখন চলুন। আপনার ভয়ের আশঙ্কা দেখি না।’
ভীমকল্প নির্ভীক। তিনি বললেন, ‘বেশ চলুন।’
ভারলি নদীতে ডিঙির কাছে এসে ভীমকল্প বললেন: ‘আপনার আগে উঠুন। আমি আগে উঠলে ডিঙির অবস্থা কী হবে, বুঝতে পারছেন! সৈন্যরা বিনা বাক্যব্যয়ে ডিঙিতে উঠল। ভীমকল্প শেষে উঠলেন। ভীমকল্পের ভারে ডিঙি টলমল হল। সৈনিকদের মধ্যে দুজন চিৎকার করে বলল: ‘তবে কি নদীর জলে প্রাণ যাবে?’ সেই বয়স্ক সৈনিকটি বলল, ‘কিছু হবে না। তোরা চুপ করে বস। গান শোন।’ সেগান ধরল:
গোসাঁই ... ও গোসাঁই
প্রাণ সুখে বহিয়া চলিলুঁ
পথ বাহিয়া..
একজন টিপ্পনী কাটল। ‘পথ কোথা? এ তো জল। গভীর জল? আর একজন জিজ্ঞেস করল: ‘কতটা জল হবে?’ কেউ একজন উত্তর করল: ‘যা না তুই মেপে আয়!’ সেবলল—‘না ভাই, আমি সাঁতার জানি না। সৈনিকদের যেন কথায় পেয়েছে। তারা মশগুল।
এই সময় যে-কান্ড ঘটল। ভীমকল্প ডিঙি থেকে লাফ দিলেন জলে। ডুবসাঁতারে ডিঙির নীচে গিয়ে ডিঙ্গিটি উলটিয়ে দিলেন। সৈনিকরা জলে পড়ে হাবুডুবু খেতে লাগল। ভীমকল্প অবশ্য ডিঙিটি প্রাণান্ত চেষ্টায় সোজা করে দিলেন। এরপর ডুবসাঁতার দিলেন। সৈনিকরা ডিঙিতে ওঠবার চেষ্টা করল। একমাত্র বয়স্ক সৈনিকটি ভীমকল্পের পেছু ধাওয়া করল বটে। তবে ধরতে পারল না।
ভীমকল্প সাঁতরে ভারলির পশ্চিম তীরে এসে উঠলেন। ইতিমধ্যে গোবিন্দরাম অনেক সশস্ত্র লোকজন নিয়ে হাজির। লড়াই করবেন। তার দরকার হল না।
ভীমকল্পের মনে যে ইচ্ছে ছিল, ব্রহ্মার খোঁজটি রাজাকে জানিয়ে দেওয়ার। সে-ইচ্ছাটি উবে গেল। মন খচখচ করতে লাগল। পুরস্কারের লোভটা যে ছিল না, তা নয়। সে-রাতে ভীমকল্প স্ত্রীর সঙ্গে বসে যুক্তি করলেন। শেষে ঠিক করলেন, ছদ্মবেশে রাজদরবারে যাবেন। সঙ্গে একটি বাচ্চা হাতিও নেবেন।
এর দিন কয়েক পর। ভীমকল্প কুর্তা-ধুতি পরে অহম দেশীয় প্রথায় গলায় গামোছা (অঙ্গবস্ত্র) জড়ালেন। কোমরে পরলেন কোমরবন্ধ। কাঁধে নিলেন ঝোলা ব্যাগ। হাঁ-হাতে লম্বা লাঠি এবং ডান হাতে বাচ্চা হাতিটি নিয়ে খোঁড়া রাজার দরবার উদ্দেশে রওনা হলেন। ইতিমধ্যে এক গুপ্তচর রাজাকে শুনিয়ে এল। শোণিতপুরের এক বণিক রাজার কাছে আসছেন।
রাজা জিজ্ঞেস করলেন: ‘কেন? কেন আসছেন বণিক?’ গুপ্তচরটি বলল: ‘উপলক্ষ্য হাতি বেচা। তবে ব্রহ্মার বিষয়ে কিছু খবর দিলেও দিতে পারে।’
রাজামশাই ব্রহ্মার নাম শুনে নড়েচড়ে বসলেন। বললেন: ‘ঠিক আছে। সেএলেই সরাসরি নিয়ে আসবে।’
এই কথোপকথন আড়াল থেকে আর এক গুপ্তচর শুনে নিল। সেও ওত পেতে বসে রইল। কখন সেই বণিক আসেন। বণিক আগমনের খবর আর গোপন রইল না। চাউর হয়ে গেল। গুপ্তচরেরা পথিক মাত্রেই বণিক ঠাওরাতে লাগল। যাকে দেখে তাকেই জিজ্ঞেস করে ‘আপনি শোণিতপুর থেকে আসছেন?’
কেউ-বা জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কি শোণিতপুরের বণিক? গুপ্তচরদের ঘুম ছুটে গেল। যাইহোক প্রথম গুপ্তচর যে রাজাকে বণিকের সংবাদ দিল তার নাম রামপ্রকাশ। আর যে আড়াল থেকে বণিকের আগমন বিষয়ে শুনল, তার নাম অবতার। আরও একজন বিশিষ্ট গুপ্তচর, ত্রিভুবন সিংহ। তার দুর্নাম খুব। গন্ধবাতিক। গন্ধ বিচার করে পথিকের গতিবিধি, এমনকী খুনির রকমসকম বলতে পারে।
রাজসভার মূল ফটকে খুব গোলমাল, নানা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, ভোর সকাল থেকেই। রামপ্রকাশ নামে এক রাজকর্মচারী নিহত হয়েছে, গুপ্তঘাতকের হাতে। কে বা কারা হত্যা করেছে, তাই নিয়ে ভীষণ জল্পনা চলছে। গতকাল দুপুরের পর থেকে তাকে আর দেখা যায়নি। গত সন্ধ্যায় নাকি এমন কান্ড ঘটেছে। বুড়োগোঁহাই গভীর রাতেই এই সংবাদ জেনে গুপ্তচর প্রধান রঘু ডেকার উপর তদন্তের ভার তুলে দিয়েছেন। তিনি আজ ভোর থেকে কাজ শুরু করেছেন। কিছু উড়ো খবর তাঁর হাতে এসে গেছে। আপাতত তিনি যাচাই করে দেখছেন সব।
তদন্তের তৃতীয় দিনে, একটি সূত্র পাওয়া গেছে। রক্ষীবাহিনী প্রধান মাজুলি থেকে রক্তমাখা একটি খঞ্জর পেয়েছেন। সেটি গুপ্তচর প্রধানের হাতে তুলে দিয়েছেন। সেটি যে রামপ্রকাশের খঞ্জর, সে-সম্পর্কে তিনি নি:সন্দেহ হলেন। তার খঞ্জর দিয়েই হত্যা করা হয়েছে। তবে উদ্দেশ্য স্পষ্ট হচ্ছে না। তিনি ভাবতে লাগলেন। প্রতিপক্ষের লড়াই সম্পর্কে। এমন সময় অবতার এসে গুপ্তচর প্রধানকে সেলাম ঠুকে জিজ্ঞেস করল, ‘হুজুরকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে! কেন চিন্তা, জানতে পারি কি?’ এমন আচমকা প্রশ্নে তিনি অবাক হলেন। তিনি অবতারের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করলেন। দেখলেন, তার গালে সদ্য কাটা দাগ। তিনি অবতারকে পোশাকটি খুলে ফেলতে আদেশ করলেন। অবতার রাজি হল না। এই সময় ত্রিভুবন সেখানে এসে হাজির হল। সেঅবতারের কাছে এসে গন্ধ শুঁকে বলল, ‘ওর গায়ে রক্তের গন্ধ।’ গুপ্তচর প্রধান কথাটি গুরুত্ব দিলেন না।
গুপ্তচর প্রধানের কর্কশ কন্ঠ শুনে অবতার বাধ্য হল গায়ের জামাটি খুলে ফেলতে।
তিনি লক্ষ করলেন। অবতারের হাতে, বুকে, পিঠে ক্ষতচিহ্ন। এবার তিনি সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সঙ্গে রামপ্রকাশের বিরোধ হয়েছিল কী নিয়ে?’
অবতার এমনই ভান করল যে, সেকিছুই জানে না। আকাশ থেকে পড়ল।
গুপ্তচর প্রধান হঠাৎ একটা ঘুসি চালালেন অবতারের নাকে মুখে। এবং বললেন: ‘সত্য স্বীকার করলে অন্তত শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ড হবে না।’
অবতার ধরা পড়ে গেছে। চোখে তার ভয় ও কান্না। সেগুপ্তচর প্রধানের পা জড়িয়ে ধরে বলল; ‘সেরামপ্রকাশকে খুন করেছে।’
‘খুন করার কারণ কী?’
‘লোভ!’
‘কীসের লোভ?’
‘পাঁচ সহস্র স্বর্ণমুদ্রার!’ অবতার করুণ কন্ঠে বলল।
গুপ্তচর প্রধান রঘু ডেকা খুবই অভিজ্ঞ। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন। দীর্ঘকাল অহম রাজ্যে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। রাজা সুখাম্ফার অভিষেকের এক বছর আগে, রঘু ডেকাকে গড়গয়া রাজা তাঁর কাজের স্বীকৃতি দিয়েছেন; ‘সন্ধানাচার্য’ শিরোপা দিয়ে। প্রচুর জমি দান করা হয়েছে তাঁকে। রাজকর্মচারীদের মধ্যে তিনি বিশেষ সুবিধাভোগী।
সেযা-ই হোক, সন্ধানাচার্যের জেরার মুখে অবতার সত্য ফাঁস করল। সেসব তথ্য উঠে এল। তা এমনই, রামপ্রকাশ, ত্রিভুবন এবং সেনিজে শোণিতপুরের বণিককে বন্দি করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। তাদের মধ্যে গোপন বৈঠকে স্থির হয়েছিল বণিককে বন্দি করে জেনে নিতে হবে, হাতি ব্রহ্মাকে কে বা কারা চুরি করেছে! এবং কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে? বণিকের কাছ থেকে সেই সংবাদ জেনে রাজার কানে পৌঁছোতে পারলেই পাঁচ সহস্র স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার পাওয়া যাবে। ওই মুদ্রা তিন জনের মধ্যে ভাগ হবে। তবে যে আগে তাকে বন্দি করবে, তার ভাগ অবশ্যই বেশি হবে।
অবতার জানিয়েছে। তিন জনের মধ্যে এমন হলেও তাকে অন্ধকারে রেখে রামপ্রকাশ ও ত্রিভুবন সেই বণিককে গোপন ডেরায় লুকিয়ে রেখেছে। কোথায় লুকিয়ে রেখেছে এবং তার কাছ থেকে কিছু জানা গেল কি না; সেকথা জিজ্ঞেস করতেই রামপ্রকাশের গৃহে মাজুলিতে অবতার গিয়েছিল। রামপ্রকাশের সঙ্গে দেখা হতেই সেঅবতারকে নিয়ে এল এক ভাঙা মন্দিরের পেছনে। এক-কথা, দু-কথায় বচসা হয়। রামপ্রকাশ হঠাৎ খঞ্জর তুলে আক্রমণ চালায়। তাতেই রামপ্রকাশ নিহত হন। অবতারের নাকি রামপ্রকাশকে হত্যা করার কোনো ইচ্ছাই ছিল না।
সন্ধানাচার্য এসব কথা শুনে স্তম্ভিত হলেন। রক্ষীদের আদেশ করলেন, অবতার ও ত্রিভুবনকে শৃঙ্খলিত করার। ক্ষোভ-রোষ-তেজ সংবরণ করে সন্ধানাচার্য রঘু ডেকা ত্রিভুবনের দিকে ফিরে বললেন, ‘বণিককে সসম্মানে রাজ অতিথিশালায় নিয়ে এসো। সঙ্গে এই সশস্ত্রবাহিনী থাকছে।’
এমন আদেশ করেও স্বস্তি পেলেন না। বললেন, ‘চলো আমিও যাই তোমাদের সঙ্গে।’
শৃঙ্খলিত দুই রাজকর্মচারী, বড়ো এক সশস্ত্র বাহিনী তার পুরোভাগে চলেছেন সন্ধানাচার্য। আরও একজন আছেন, স্থূলকায় এক বণিক আর তার সঙ্গে বাচ্চা হাতি। প্রায় সন্ধ্যাকালের মানুষজন এসব প্রত্যক্ষ করলেন কৌতূহলের সঙ্গে।
বণিককে রাজ-অতিথিশালায় রেখে, গুপচর প্রধান গৃহে ফিরছেন। বড়ো ক্লান্ত তিনি। অবাক-বিস্ময়ে আকাশপানে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। এক ঝাঁক পাখি দ্রুত ছুটে গেল। আরও লক্ষ করলেন, গাছের পাতা দুরন্ত হাওয়ায় খসখস করল। তাঁর মনে হল। এই গাছ-পাতা, পাখিসব কান্ডর মধ্যেই হিংসা নেই। কী সুখ! যাদের নিয়ে কাজ করছেন, তাদের তিনি চেনেন না! মানুষের মধ্যে লোভ, এত ভয়ংকর! এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে গৃহে পৌঁছে গেলেন। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে সস্নেহে হাত বুলোলেন ঘোড়াটির সর্বাঙ্গে। প্রিয় ঘোড়াটির দিকে চেয়ে স্বগতোক্তি করলেন, ‘খাঁটি বন্ধু’।
সেদিন সকাল, সময় আন্দাজ দশটা। রাজসভা সরগরম। রাজসভায় ডাক পড়ল শোণিতপুরের আগন্তুকের। অবতার, ত্রিভুবন এবং গুপ্তচর প্রধান সন্ধানাচার্য রঘুডেকাও হাজির হয়েছেন।
বুড়োগোঁহাই সন্ধানাচার্যকে বললেন—‘আপনার তদন্ত বিষয়ে অহমপতিকে বলুন।’

‘আপনি শোণিতপুরের নাগরিক। এতদূর থেকে ব্রহ্মা হারানোর খবর পেলেন কী করে?’
সন্ধানাচার্য তাঁর তদন্ত বিবরণী পাঠ করলেন। খুব ধীরে ধীরে। ভীমকল্প নামে শোণিতপুরের নাগরিক বিষয়ে বিস্তারিত সংবাদ দিলেন।
রাজা নীরবে সব শুনলেন। তারপর বুড়োগোঁহাইয়ের উদ্দেশ্যে বললেন, এক পক্ষকাল পরে অবতার ও ত্রিভুবনের বিচার হবে। এখন কয়েদ রাখার আদেশ দিন।’
এরপর রাজা ভীমকল্পের দিকে নিবিষ্ট চিত্তে তাকালেন। বললেন,—‘আপনি শোণিতপুরের নাগরিক। এতদূর থেকে ব্রহ্মা হারানোর খবর পেলেন কী করে?’ ভীমকল্প একবার গুপ্তচর প্রধান ও বুড়োগোঁহাইয়ের দিকে কাতর চোখে তাকালেন। তাঁরা কিছু বুঝলেন: ‘মহারাজ আমার নিবেদন শুধু আপনার কাছে এবং গোপনীয়।’ রাজা বিষয়টি অনুধাবন করলেন। রাজসভায় সভাসদগণের দিকে ফিরে অনুরোধের সুরে বললেন: ‘আজ সভা বিশেষ কারণে স্থগিত রাখা হল। আগামীকাল নির্দিষ্ট সময়ে আমরা মিলিত হব।’
রাজার এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে নিমেষের মধ্যে রাজসভা শূন্য হয়ে গেল। কেবলমাত্র রাজার সামনে বুড়োগোঁহাই ও ভীমকল্প রইলেন। বুড়োগোঁহাই চলে যেতে চাইলেন। ‘রাজমন্ত্রী না থাকলে কি চলে?’—রাজামশাই মুচকি হাসলেন এবং বললেন, ‘আপনি প্রশ্ন করুন। যা জানতে চান।’ বুড়োগোঁহাই বুঝলেন, কঠিন কাজ। মুখে শুধু বললেন,—‘যেমন আজ্ঞা!’
তারপর তিনি ভীমকল্পকে শুধোলেন, ‘পুরো নাম কী?’
—‘হুজুর, ভীমকল্প বণিক।’
আপনার নিবাস?
‘শোণিতপুর, নাড়োলি গ্রাম।’
‘ব্রহ্মার সম্বন্ধে কী জানেন, বলুন! আর জানলেন কোত্থেকে? আর যদি-বা জানলেন, সে-খবর দিতে এলেন কেন? পুরস্কারের লোভে?’
এতগুলো তীক্ষ্ম প্রশ্নের উত্তর ভীমকল্প দিলেন খুব স্বাভাবিক সরসতায়। বললেন,—‘পুরস্কারের লোভ যা বলেন। তাও আছে। আরও কারণ আছে। প্রিয় জিনিস হারালে কতটা বেদনা হয়, তা আমি জানি।’
বুড়োগোঁহাই জিজ্ঞেস করলেন—‘আপনার কী হারিয়েছে? ‘হুজুর সেঅন্তত দশ বছর আগের কথা। আমি এক শিকারির কাছ থেকে এক হরিণশিশু কিনেছিলাম। চার বছর যত্ন করে পালনও করেছিলাম। একদিন রাতে সেটি চুরি হয়ে যায়। তার শোক আমি এখনও ভুলতে পারিনি। তাই যখন ব্রহ্মা হারানোর ঘটনা শুনলাম। তখন থেকেই মনে হয়েছে, রাজামশাইয়ের কত-না কষ্ট! আর যখন জানতেই পেরে গেছি, ব্রহ্মার সংবাদ। তা আমার জানানোর কর্তব্য মনে করি।’ কথা কটি শুনে রাজামশাই বেজায় খুশি হলেন। তাঁর তর সইছে না। জিজ্ঞেস করলেন ‘ব্রহ্মা কোথায়?’ ভীমকল্প বললেন, ‘কোচ রাজা নরনারায়ণের পিলখানায় (হাতিশাল)। রাজামশাই, মনে করে দেখুন। আপনার অভিষেকের দিন, কোচ রাজার দূত উপঢৌকন ও স্মারকপত্র নিয়ে এসেছিল।’
অসমরাজ বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক’।
‘ওই দিন দূত একা আসেনি। অন্তত দশ জন সৈনিকও সঙ্গে ছিল। তারা আপনার গুপ্তচর ত্রিভুবনকে মোটা অর্থের বিনিময়ে হাত করে। গভীর রাতে ব্রহ্মাকে চুরি করে নিয়ে যায়’।’—ভীমকল্প গড়গড় করে বলে গেলেন। বুড়োগোঁহাই অবাকবিস্ময়ে জানতে চাইলেন: ‘আপনি কী করে এসব জানলেন?
ভীমকল্প বিষয়টি স্পষ্ট করলেন। সদাশিব আমার বাল্যবন্ধু। আমাদের পাশের বাড়িতে থাকে। ত্রিভুবন সদাশিবের কন্যাকে বিবাহ করেছে। ব্রহ্মাহরণ, কোচ রাজার সৈন্যদের সঙ্গে যোগসাজশ কাহিনি শ্বশুরবাড়িতে ত্রিভুবন গল্প করেছে। সদাশিব জামাইয়ের অপকর্মের কথা আমাকে গোপনে বলেছে। আরও বলেছে, ‘এরজন্য জামাইয়ের শাস্তি হওয়া উচিত।’ তারপর বুড়োগোঁহাই জিজ্ঞাসা করলেন—‘আপনার প্রাণে ভয়ডর নেই? বিশেষত, স্ব-ভূম ও কোচ রাজার বিপক্ষে গেলেন!’ ‘তা তো আছেই। সেকারণেই মহারাজকে গোপনে বলতে চেয়েছি। এখানেও গুপ্তঘাতকের হাত থেকে কপালজোরে বেঁচে গেলাম।’
ভীমকল্প আরও স্বগতোক্তি করলেন, ‘অবশ্য এখনও যে নিরাপদ, তা মনে হচ্ছে না।’
খোঁড়া রাজা আশ্বস্ত করলেন: ‘আপনার কোনো ভয় নেই। নিরাপত্তার দায়িত্ব রাজার।’
খোঁড়া রাজা সুখাম্ফা কোচ নৃপতি নরনারায়ণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। বিশ হাজার পদাতিক ও পাঁচ হাজার নৌবাহিনী প্রেরণ করলেন। তিন-ধনুক, কামান ও অস্ত্রের ঝনঝনানি শুরু হল।
কোচ নৃপতি হঠাৎ এমন আক্রমণের জন্য তৈরি হতে পারেননি। এবং বোকা ও সালা নামক স্থানে দুর্গ তৈরি করেছেন। অসম নৃপতির; সেকথাও জানা ছিল না। যাই হোক, তিনিও যুদ্ধে নেমে পড়লেন। অসম রাজার সেনাপতি আইখেক বোকা ও সালা দুর্গের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁকে উৎকোচ দিলেন কোচ রাজার ভাই ও সেনাপতি চিলা রায়। আইখেক অসুস্থতার ভান করে সরে পড়লেন। তিনি মন্ত্রীকে একটা পত্র লিখলেন বটে। তবে অনুমতি বা আদেশের জন্য অপেক্ষা করলেন না। ফলে কোচ সৈন্য ওই দুটি দুর্গ আক্রমণ করল। অন্যদিকে, অসম রাজা একটি বড়ো সৈন্যদল হান্ডি নদী তটে পাঠিয়ে দিলেন। আরও একটি বড়ো সৈন্যদলকে কোচ রাজ্যের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়তে আদেশ দিলেন। চিলা রায়ের অনুপস্থিতিতে কোচ রাজ্য সুরক্ষিত ছিল না। অসম রাজার জয় ঘোষিত হল। কোচ নৃপতি বন্দি হলেন। কোচ রাজার পিলখানা থেকে খোঁড়া রাজার প্রিয় হাতি ব্রহ্মাকে বের করে আনা হল। প্রায় বিনা বাধায়।
কোচ রাজা নরনারায়ণ অসম রাজা সুখাম্ফার সঙ্গে সন্ধি করলেন। আমাদের গল্প হয়তো এখানেই থামতে পারত। কিন্তু থামবে কী করে! রেশটুকু থেকে গেল। ব্রহ্মা তার নিষ্পত্তি ঘটাবে।
কিছুদিনের মধ্যে নরনারায়ণ পূর্ণ উদ্যমে সৈন্য সংগ্রহ করে যুদ্ধের জন্য তৈরি হলেন। মূলত দুটি বাহিনী তৈরি হল। প্রথম বাহিনী কোচ রাজার ভাই চিলা রায়ের নেতৃত্বে গঠিত হল। তিনি চল্লিশ হাজার সৈন্য নিয়ে জলপথ ও স্থলপথে রওনা হলেন। দ্বিতীয় বাহিনী রাজা ও রানির নেতৃত্ব গঠিত হল। তাঁরা বিশ হাজার সৈন্য নিয়ে আক্রমণ চালাতে উদ্যত হলেন।
চিলা রায় অহম রাজ্যের নারায়ণপুর দখল করে নিলেন, বিনা বাধায়। রাজা ও রানি দুর্বার বেগে এগুতে থাকেন। পথে ভুঁইয়া, দাফলা ও ভুটিয়া সামন্তরাজারা বশ্যতা স্বীকার করলেন। কোচ রাজার শক্তি বৃদ্ধি হল।
কোচ সৈন্যদের সদম্ভ যাত্রায় হঠাৎ ছেদ পড়ল। তারা দেখল। রাজপথে চলেছেন কয়েক শত ব্রাহ্মণ। তাঁদের কপাল চন্দনচর্চিত। গলায় উত্তরীয়। আদুল গায়ে উপবীত স্পষ্ট। তারা গোরুর দড়ি ধরে হাঁটছেন। পথ জুড়ে চলেছেন, নারায়ণপুরের দিকে। কোচ সৈনিকরা হিন্দু। তাঁরা হিন্দু ব্রাহ্মণের কোনো ক্ষতি চাইলেন না। স্থলপথের সেনাপতি রাজা-রানির কাছে ঘোড়া ছুটিয়ে দ্রুত এলেন। বললেন, ‘পথে ব্রাহ্মণের দল অবস্থান করছেন।’
রাজা নরনারায়ণ বললেন,—‘লাঠিপেটা করে তুলে দাও।’
রানি ইন্দুমতী রাজার হাতখানি ধরে বললেন,—‘না গো না। এমন আদেশ দিয়ো না। এমন কাজ করলে পাপ হবে।’ তারপর তিনি সেনাপতিকে বললেন, —‘কোনো অন্যায় কাজ কোরো না। বরং অপেক্ষা করো। পথ থেকে ব্রাহ্মণেরা সরে গেলে ভালো। তা না হলে, তোমরাই সরে যাও। অন্য পথ ধরো। তার চেয়ে ভালো, পথে যখন বাধা, যুদ্ধ আপাতত স্থগিত রাখো।
সেনাপতি যেভাবে দ্রুত এসেছিলেন, সেভাবেই ফিরে গেলেন। চিলা রায়কে গিয়ে রানিমার ইচ্ছের কথা জানালেন। চিলা রায়ের আদেশে যুদ্ধ স্থগিত হল। ইতিমধ্যে কোচ রাজার গুপ্তচরেরা সেই গূঢ় সংবাদটি সংগ্রহ করে ফেলেছে। ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে অসম সৈন্যরা পথরুদ্ধ করেছিল। এটি খোঁড়া রাজার একটি কৌশল মাত্র। কোচ রাজা নরনারায়ণ প্রচন্ড খেপে গেলেন। তক্ষুনি ভাইকে আদেশ দিলেন, ‘যুদ্ধে নেমে পড়ো। অসম রাজাকে সমুচিত শিক্ষা দিতে হবে। হবেই।’ ‘যে আজ্ঞে।’ চিলা রায় অসম রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করলেন।
অসম রাজা আন্দাজ করতে পারেননি। একপক্ষ কালের মধ্যে কোচ রাজা প্রবল বিক্রমে আবার যুদ্ধে নেমে পড়বেন। সে-যুদ্ধে ভয়ানক পরিণতি হল। খোঁড়া রাজা পরাজিত হলেন। সন্ধি হল দুই রাজার মধ্যে। সন্ধির শর্ত অনুসারে ধন-রত্ন, হাতি, ঘোড়া সব দিতে হল পরাজিত রাজাকে। এমন সময় এক কান্ড ঘটল।
অসম রাজার কুনকি হাতি ব্রহ্মাকে যখন কোচ রাজার অনুচরেরা নিতে এল। তখন ব্রহ্মা ভয়ানক হয়ে উঠল। ব্রহ্মা তার শুঁড়ে পেঁচিয়ে আছাড় মারতে লাগল। তাই-না দেখে চিলা রায় তরবারি বের করে ব্রহ্মার দিকে এগিয়ে গেলেন। ব্রহ্মা তক্ষুনি চিলা রায়কে লাথি মারতে উদ্যত হল।
খোঁড়া রাজা ডান হাতটি তুলে বললেন,—‘ওরে ব্রহ্মা থাম। শান্ত হ।’
ব্রহ্মা শান্ত হল। রাজা তার গায়ে হাত বুলোলেন। পরম মমতায় চোখ দুটি তাঁর ঠিকরে উঠল। ব্রহ্মার চোখেও জল। ব্রহ্মা রাজার হাত দুটি শুঁড়ে জড়িয়ে ধরল। যেন কোথাও যাবে না সে। রাজার ব্রহ্মা, রাজার কাছেই থাকবে। কোচ রাজারাও হাতিকে খুব মান্য করেন। হাতিকে হাতি বলেন না। বলেন মহাকাল। তো মহাকালের প্রতি এত মমতা, ভালোবাসা দেখে চিলা রায় বললেন, ‘অহম রাজা, হাতি, ঘোড়া সব ফিরিয়ে দিলাম। ব্রহ্মা আপনার, আপনারই থাক। ব্রহ্মা হোক দুই রাজার মধ্যে শান্তির দূত। এই কথা বলে, চিলা রায় ব্রহ্মাকে স্পর্শ করলেন। ব্রহ্মা মাতা নীচু করে শুঁড় দোলাল। খোঁড়া রাজা কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকালেন চিলা রায়ের দিকে। আর মুখে বললেন: ‘জয় ব্রহ্মার জয়!’
চিলড্রেন্স ডিটেকটিভ গল্পসংকলন, ২০০৮
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন