পুরুষসিংহ

রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার

তোমরা কি সেই গানটা শুনেছ? ‘শিং নেই তবু নাম তার সিংহ...’। তো এক পুরুষসিংহের গল্প শোনাই। আসলে, এক বীর রাজার কথা। তাঁর তেজ, বিক্রমের কথাই বলছি। তখন মল্লরাজাদের কাল। বিষ্ণুপুর মল্লরাজাদের রাজধানী। স্বাধীন। দিল্লির দরবারে তখন বাদশা শাহজাহান। মুঘল শাসকরা বিষ্ণুপুরকে মিত্ররাজ্য হিসেবে গণ্য করতেন। তারও কারণ ছিল। বিষ্ণুপুরের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজা ছিলেন তখন বীর হাম্বির। একসময় তিনি মুঘল ও পাঠানদের মধ্যে ভয়ানক লড়াইয়ে মুঘল বাদশাকে সাহায্য করেছিলেন। হাজার হাজার সৈন্য;—

আগাডোম বাগাডোম ঘোড়াডোম সাজে

ঢাকঢোল ঘোঙর বাজে

বাজাতে বাজাতে চলল ঢুলি...

অর্থাৎ আগে ডোমবাহিনী, বাগে মানে পিছে, পাশেও ডোমবাহিনী। ঘোড়াডোম সাজে অর্থাৎ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অশ্ববাহিনী; তারাও চলেছে। ঢাকঢোল, কাড়ানাকাড়া, কাঁসর ঘণ্টা বাজিয়ে এইসব সৈন্যরা এমন লড়াইটা দিয়েছিল যে, পাঠান সৈন্যরা এমন ভয়ানক, অদ্ভুত সৈন্য আর দেখেনি। তো তারা পালিয়ে গেল। হাঁফ ছেড়ে বঁাচল।

বাদশা বললেন: ‘মল্লরাজ বীরহাম্বির আমার বন্ধু হলেন। রাজা আপনাকে কোনো কর দিতে হবে না। আপনারা স্বাধীন।’

তাঁরই উত্তরপুরুষ রঘুনাথ মল্লদেব। বিষ্ণুপুরের রাজা হলেন। আর এক বীররাজা।

মহারাজ বীরহাম্বিরের ছিল ছটি পুত্র। বড়োপুত্রের নাম ধাড়িহাম্বীর। এবং ছোটপুত্রের নাম রঘুনাথ মল্লদেব। মহারাজ বীরহাম্বিরের মৃত্যুর পরতো রাজা হলেন ধাড়ীহাম্বির। তিনি মাত্র ছ-বছর রাজত্ব করলেন। উন্মাদ রোগে আক্রান্ত হয়ে সিংহাসন ত্যাগ করলেন। তাঁর পুত্র কালারাম মল্ল সিংহাসনে বসলেন বটে। তবে তিনি ছিলেন বোবা ও কালা। ফলে এক বছরের মধ্যে সিংহাসন ত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। রাজ্যে তখন ডামাডোল। সিংহাসনের দাবিদার অনেকেই। এমন সময়, বীরহাম্বিরের পত্নী মহারানি রঘুনাথ মল্লদেবকে ডেকে বললেন: এখুনি, রাজ্যের হাল ধরো, শক্ত হাতে। তুমি পারবে।’ এনিয়ে শোরগোল কম হয়নি। রাজ অভিষেকের সময় অপর বড়ো চার ভাই বিদ্রোহী হলেন। কারণ ধাড়ীমল্লের পর বীরমল্লের রাজা হওয়ার কথা। কিন্তু মহারানির ইচ্ছে ও রঘুনাথ মল্লদেব বাহুবলের জোরে রাজা হন, ১৬২৬ সালে। তাঁর চোখে ছিল স্বপ্ন। অনেক স্বপ্ন। তিনি চেয়েছিলেন, বিষ্ণুপুরকে এক সমৃদ্ধ নগরীতে পরিণত করার। কর্মবীর এই রাজা বুদ্ধি, বল, রূপ ঐশ্বর্যে বিষ্ণুপুরকে আশ্চর্য নগরীতে পরিণত করলেন। এই নগর জনপদের এত রূপ, সম্পদ-ঐশ্বর্য, মন্দিরনগরীর কথা রূপকথার মতো ছড়িয়ে পড়ল। চারদিকে, রাজ্য থেকে, রাজ্যান্তরে। ভিনরাজ্যের নাগরিকরা এই পবিত্র মন্দির নগরী, গুপ্তবৃন্দাবনে ভ্রমণে আসতে লাগলেন। রাজা রঘুনাথ মল্লদেব এইসব ভ্রমনার্থীদের অতিথি বলেই মনে করতেন। এবং তাদের জন্য রাজকোষ থেকে দরাজ হাতে খরচ করতেও লাগলেন।

কথাটা যখন উঠল, ‘গুপ্তবৃন্দাবন।’ তবে আর এক কাহিনি বলি। সত্যঘটনা। গল্পের মতোই স্বাদু। রঘুনাথ মল্লদেবের পিতা বীর হাম্বিরের সময়ের ঘটনা। তো রাজজ্যোতিষী বীরহাম্বিরকে একদিন বললেন, ‘মহারাজ, গণনা করে বুঝতে পারছি। গোপালপুর গ্রামের পাশ থেকে মহামূল্যবান রত্নবোঝাই গো-যান আসছে।’ মহারাজ ভাবলেন, রাজজ্যোতিষীর কথা মিথ্যে হবার নয়। সুতরাং সৈন্যসামন্তদের প্রতি রাজহুকুম হল:

সদা জাগ্রত থাক, জাগ্রত

চতুর্দিক গোপালপুর রাখ ঘিরে

তল্লাশ কর, বর্ম চিরে।

বাস্তবিকই, অতন্দ্রপ্রহরীরা একদিন দেখতে পেল। তিনটি গোরুর গাড়ি বোঝাই রত্নপেটিকা। রাতের গভীর অন্ধকারে রাজার সেপাইরা সেই সম্পদ লুঠ করল। পরদিনই সেসব রত্নপেটিকা খুলে দেখল; কোথায় রত্নরাজি! সেসব ছিল হাতে লেখা বৈষ্ণব পুথি। রাজার মনে ভারি দুঃখ হল। অনুশোচনা হতে লাগল। ডাকাতির দায়ে। কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন। এসব পুথি তাঁর কাজে না লাগলেও সত্যি তো অমূল্য বস্তু। যত্ন করে তুলে রাখতে আদেশ দিলেন।

অপরদিকে, পুথির সন্ধানে শ্রীনিবাস আচার্য ও তাঁর সঙ্গী পন্ডিতেরা কাঁদতে লাগলেন। তাঁরা কপাল চাপড়াতে লাগলেন। রাতে কেন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। পালা করে তো জাগতে পারতেন। যাই হোক শ্রীনিবাস আচার্য সঙ্গীসাথিদের নির্দেশ দিলেন বাংলা ও ওড়িশার বিভিন্ন স্থানে পুঁথির সন্ধান করতে। নিজে বিষ্ণুপুরে থেকে গেলেন। প্রতি ঘরে ঘরে গিয়ে অনুসন্ধানকার্য চালাতে লাগলেন: ‘তোমরা কেউ পুথির সন্ধান দিতে পার?’ একদিন পেয়েও গেলেন। পুথির সন্ধান। রাজদরবারে গিয়ে উপস্থিত হলেন। রাজসভায় তখন চলছিল ভাগবত পাঠ। রাজপন্ডিতের ভুল ব্যাখ্যা শুনে শ্রীনিবাস আচার্য বললেন: ‘মার্জনা করবেন। পন্ডিত মশায়, তত্ত্বটিতে ভুল হচ্ছে। এই ব্যাখ্যা হবে।’ এই কথা বলে ভুল শুধরে দিলেন। রাজপন্ডিত ও বীরহাম্বীর শ্রীনিবাস আচার্যের সুললিত কন্ঠ ও মধুর ছন্দ এবং ভাগবতের সরল, শুদ্ধ ব্যাখ্যা শুনে মোহিত হলেন। তাঁরা তাঁকে সাদরে গ্রহণ করলেন। পরে উভয়ে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

শ্রীনিবাস আচার্যের আগমনের কারণটি জেনে রাজা অপরাধ স্বীকার করলেন। আচার্যের পা ধরে ক্ষমা চাইলেন: ‘ডাকাতরাজা হওয়ার কলঙ্ক থেকে মুক্তি দিন প্রভু!’

আচার্যদেব তাঁকে আশীর্বাদ করলেন: ‘তোমার কৃষ্ণপদে মতি হোক।’ রাজা আচার্যদেবের কাছে দীক্ষা নিয়ে অন্য মানুষ হয়ে উঠলেন। রণবীর রাজা ধর্মবীর হয়ে উঠলেন।

‘প্রভু মোর শ্রীনিবাস পুরাইলে মনের আশ

তোয়া বিনে গতি নাহি আর।’

ফলে বীরহাম্বিরের রাজ্যে শুরু হল কৃষ্ণভজনা। দেবসেবা। স্থাপিত হতে লাগল একটার পর একটা মন্দির। দেবমহিমার প্রকাশ আর সংগীতসাধনার জন্য শ্রীনিবাস আচার্য বিষ্ণুপুরকে পবিত্র নগরী ‘গুপ্ত বৃন্দাবন’ আখ্যা দিলেন। এবং নিজেও এই বৃন্দাবনে থেকে গেলেন।

এবার রাজা রঘুনাথ মল্লদেবের কথা। বাদশা শাহজাহান যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন মহারাজ বীরহাম্বিরকে। কিন্তু তাঁর পুত্র শাহজাদা সুজার মধ্যে তেমন কোনো কৃতজ্ঞতা ছিল না। বাংলার সুবাদার হয়েই বললেন, ‘পূর্ব ব্যবস্থা যা ছিল। আমি তা মানি না। রাজা আপনাকে কর দিতে হবে। হবেই হবে। ছাড় নেই।’

রাজা রঘুনাথ মল্লদেব বললেন, ‘তা সম্ভব নয়। মল্লরাজারা স্বাধীন।’

সুবাদার সুজা বললেন, ‘দেখাচ্ছি মজা।’ বিরাট সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে বললেন, ধরে নিয়ে এসো মল্লরাজাকে।’

রাজা রঘুনাথ মল্লদেব আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। সুজার বাহিনী সহজে ছেড়ে দেবে না। ভেতরে ভেতরে তৈরি হতে লাগলেন। এখানে বলে নিই। বিষ্ণুপুর রাজ্যের অভ্যন্তরে রাজারা চতুর্দিকে পরিখা বানিয়ে রেখেছিলেন। সেসব পরিখা জলপূর্ণ থাকত। রাজা রঘুনাথ মল্লদেব সেসব পরিখাগুলি সংস্কার করে আরও মজবুত জলদুর্গ বানালেন। রাজার দুর্গ ও রাজবাড়ি ঘিরে ছিল সাতটি পরিখা। এবং উঁচু টিলা, মুর্চা পাহাড়। শত শত কামান সে-পাহাড় চূড়ায় সাজিয়ে রাখা হত। ফলে সুজার সৈন্যরা যখন সত্যি সত্যি আক্রমণ করে বসল। মল্লরাজার সৈন্যবাহিনী কৌশলে সেসব সৈন্যবাহিনীকে ডুবিয়ে মারল।

যাই হোক, শাহজাদা সুজা আর রাজার সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ে গেলেন না। রাজা রঘুনাথকে শাস্তি দেবার ফন্দিফিকির খুঁজতে লাগলেন। সুযোগও এসে গেল। কেমন করে এল, এবার সেটাই বলব।

শ্রীনিবাস আচার্য গত হয়েছেন অনেক দিন। ধার্মিক রাজার মনে শান্তি নেই। কিছুদিন ধরেই ভাবছিলেন, দীক্ষা নেবেন। দীক্ষা নেবেন। কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠছিল না। শেষে দিনক্ষণ স্থির করে রওনা হলেন যাজিগ্রামে। সেখানে থাকেন কুলগুরু শ্রীনিবাস আচার্যের পুত্র বৃন্দাবন চন্দ্র। তাঁর কাছেই দীক্ষা নেবেন তিনি। কিন্তু রাজার যাত্রা তো নীরবে, নিভৃতে হয় না। রাজ অনুগামী হল অনেকে। সেএক বিশাল শোভাযাত্রা। এই ঘটনা রটনা হয়ে বর্ধমানের শাসক রাজার কানে পৌঁছোল। তিনি শাহজাদা সুজার পছন্দের লোক। শাহজাদা সুজার শত্রুকে কাছে পেয়ে আরও অনুগ্রহ লাভের প্রত্যাশায় রাজা রঘুনাথকে বন্দি করে পাঠিয়ে দিলেন রাজমহলে। সুজার কারাগারে। রাজা তো বন্দি। দিন কাটে তাঁর ঈশ্বর সাধনায়।

একদিন সকালে, সকাল আন্দাজ নটা। একটা চমকপ্রদ দৃশ্য দেখলেন। একটি বেশ বড়োসড়ো আরবি ঘোড়াকে বশে আনতে পারছিল না সতেরোজন রক্ষী। কী প্রাণান্ত চেষ্টাই না তারা করছিল, ঘোড়াটিকে বাগে আনতে। তো রাজা হেসে ফেললেন। বললেন: ‘ওহে বীরপুঙ্গবরা তোমরা ঘোড়াটির রাশ টানতে পারছ না।’ কথা ক-টি ছুড়ে দিয়ে হো হো করে হাসতে লাগলেন।

রাজার এই শ্লেষপূর্ণ কথা তাঁর হাসির দমক দেখে ঘোড়ার রক্ষীরা শাহজাদা সুজার কাছে গিয়ে সাতকাহন করে নালিশ জানাল। সুজা গর্জে উঠলেন: কী, রাজার এত সাহস! চল তো দেখি।’ সুজা এসে রাজাকে কর্কশ কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন: এমন রঙ্গব্যঙ্গের কারণ কী?’ রাজা আবার হাসলেন। ‘হোক-না জবরদস্ত ঘোড়া। তা সামলাতে সতেরোজন রক্ষী লাগে?’ সুজা ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন: ‘পারবেন রাজা, একে সামলাতে?’ যদি পারেন, আপনাকে মুক্তি দেব। আপনার রাজ্য কর মুক্ত হবে। এবং নবাবি উপহার দেব। কী, রাজি? পরীক্ষা হোক!’

রাজার শৃঙ্খল মুক্ত হল। রাজা ছুটে গিয়ে এক লাফে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসলেন। তীব্র বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দৃষ্টির বাইরে চলে গেলেন। সবাই অবাক হয়ে দেখলেন। রাজা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে এলেন সদর্পে। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে ঘোড়াটিকে নিয়ে ধীর গতিতে হাঁটতে লাগলেন।

‘ওহে বীরপুঙ্গবরা তোমরা ঘোড়াটির রাশ টানতে পারছ না।’

শাহজাদার মনটি প্রসন্ন হয়েছে। রাজার প্রতি তাঁর সম্ভ্রমবোধ জেগেছে। তিনি বললেন: ‘ঘোড়া ছাড়ুন রাজা। আপনি বিশ্রাম করুন।’ রাজা বললেন: ‘ঘোড়াটি ভীষণ ক্লান্ত। এভাবে না হাঁটালে, এখুনি মারা যাবে যে! সুজা বললেন: ‘আরে ছাড়ুন তো। মরে মরুক!’ রাজা এবার ঘোড়াটিকে ছেড়ে চলে এলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে অবশ্য সেটি ছটফট করতে করতে মারা গেল।

রাজার সাহস ও দূরদৃষ্টি দেখে সুজা ভীষণ খুশি হলেন। তিনি ঘোষণা করলেন: ‘আপনার বিষ্ণুপুর আর করদ রাজ্য নয়। স্বাধীন। আপনি আমাদের মিত্ররাজ্য। আপনি এই রত্নখচিত সুজার কৃপাণটি সর্বদা সঙ্গে রাখবেন। মুঘল স্মারক। এটি আমার একান্ত উপহার। আর, আপনার বিক্রম, মহাতেজের জন্য ‘সিংহ’ উপাধি দিচ্ছি। আজ থেকে মল্লরাজারা পদবিতে ‘সিংহ’ উপাধি লিখবেন।’ বলা বাহুল্য, সেই থেকে মল্লরাজাদের পদবিতে জুড়ে গেল ‘সিংহ’ উপাধি।

আবার সে-গানের কথাটি স্মরণ করি। রাজার মাথায় শিং ছিল না সত্যি বটে। তবে সাহস, তেজ ও বীরত্বের ঘটনা পটুত্বে, রঘুনাথ মল্ল হয়ে উঠলেন পুরুষসিংহ। রঘুনাথ সিংহ।

কিশোর দুনিয়া, শারদীয়া, ১৪১২

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%