গজপতিরাজ রামচন্দ্রদেব

রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার

রাজা গজপতিরাজ রামচন্দ্রদেব ছিলেন সকলের শ্রদ্ধার পাত্র। দেবতুল্য ব্যক্তি। জমিদারেরা বলতেন তাঁকে ‘ঠাকুর রাজা’। এমন যে কঠিন মানুষ মুঘল সুবাদার, তিনিও বলতে দ্বিধা করেননি: ‘ওড়িশার দেশীয় রাজারা তাঁর আদেশ শিরোধার্য করেন। শুধু কি তাই! তাঁর আদেশ না মানাটাও পাপ।’ ওড়িশা তখন আফগানদের দখলে। আফগান শাসক দায়ুদ মুঘল সেনাপতি মুনিম খাঁর হাতে পরাজিত ও নিহত। বাংলা ও ওড়িশা দখল করে নিলেন, কুতলু লোহানি। তারপর নাসির খাঁ। রাজা মানসিংহের কাছে এঁরা পরাজিত। কিন্তু আফগানদের ফোঁস কমল না। রোষ তো নয়ই। তারা আড়ালে আবডালে থেকে যুদ্ধ করে। মুঘলরা তাদের পরম শত্রু। শত্রু দমনে যখন-তখন অস্তর-শস্তর বের হয়।

সময়টা বসন্তকাল। ১৫৯২ সাল। খুরদার রাজা রামচন্দ্রদেব এই সময়ে যেন কল্পতরু হয়ে ওঠেন। যুদ্ধবিদ্রোহ অশান্তি এড়িয়ে চলেন। শত্রুকেও মিত্রতার বন্ধনে আঁকড়ে ধরেন। আর, সেটাই হল বিপদ। আফগান সেনাপতি রাজার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলেন। আফগান ও মুঘল দুই-ই বিদেশি। তাঁর কাছে উভয়েই সংকট স্বরূপ। যাই হোক, উদার রাজা তাই আশ্রয় দিলেন আফগানদের। সারঙ্গাগড়ের দুর্গ উন্মুক্ত করে দিলেন। ভয় পেলেন প্রতিবেশী রাজারা। নীলগিরি, কেওয়নঝাড়, ময়ূরভঞ্জ রাজারা ছুটে এলেন। তাঁরা বললেন, ‘রাজন এ তো ভীষণ বিপদ। কটক থেকে রাজা মানসিংহের তাড়া খেয়ে আফগানরা আপনার আশ্রয়ে। রাজা মানসিংহ ছুটে আসবেই।’ গজপতিরাজ কিঞ্চিৎ চিন্তিত। তবু বললেন: ‘বন্ধু, তোমরা তো সবাই আছ। সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ করব। কি? করবে না?

কেওয়নঝাড়ের রাজা বললেন, ‘ঠাকুররাজা আদেশ করলে, সেতো মানতেই হবে।’ অপর দুই রাজা মাথা নাড়লেন। সম্মতিসূচক। গজপতিরাজ মৃদু হাসলেন। কৃতজ্ঞতার হাসি।

রাজা মানসিংহ রীতিমতো ক্ষুব্ধ, রুষ্ট, উত্তেজিত। ক্রোধে তাঁর অঙ্গ জ্বলে। সমুচিত শিক্ষা দেবেন তিনি। তাই রাজার কাছে মুঘলদূত এসে বলল, ‘সেনাপতি রাজা মানসিংহ তলব করেছেন। ভুবনেশ্বর, শিবির দরবারে। আগামীকাল ভোরে।’ গজপতিরাজ মুঘলদূতের কথা শুনেও শুনলেন না। মুঘলদূতের কথায় কর্ণপাত না করার ফলটি বিষম হল। রাজা মানসিংহ বেজায় চটলেন। খুরদারাজকে শাস্তি দিতে উদ্যত হলেন। পরদিন, ভোর বেলা রাজা মানসিংহ বিশাল সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দিলেন। সেনাবাহিনী প্রথমে খুরদার দুর্গ দখল করল।

রাজা রামচন্দ্রদেব প্রত্যহ ভোর বেলা পুজোপাঠে ব্যস্ত থাকেন। সেদিনও ব্যতিক্রম ছিল না। পুজোআচ্চায় মগ্ন রাজাকে বন্দি করলে রাজা মানসিংহ বিরক্ত হতে পারেন ভেবে সেনাধ্যক্ষ রাজপুত্রকেই বন্দি করে নিয়ে গেলেন।

গজপতিরাজের পদাতিক বাহিনীর প্রধানের নাম ‘বাহিনীপতি’ হরিশ সামন্তরায়। তিনি রাজার অপমান ও হেনস্থা সহ্য করতে পারলেন না। হঠাৎ রাজ্যে খুব শোরগোল শুরু হল। কারণ, বাহিনীপতি নিখোঁজ। নানা গুঞ্জন উঠল। কেউ বলল, মুঘল সেনাপতি তাঁকে হত্যা করেছে। কেউ-বা বলল, বন্দি বা নির্বাসন অসম্ভব নয়। রাজার কৈশোরের দিনগুলির কথা মনে পড়ল। হরিশ অত্যন্ত সাহসী ছিলেন। একবার রাজা মত্ত হস্তীর পদতলে পিষ্ট হওয়ার উপক্রম হল। বেঁচে গেলেন হরিশের বীরত্বপূর্ণ তিরন্দাজিতে। সেসব কথা মনে পড়লে রাজা এখনও শিহরিত হন। এমনিতে জনসমক্ষে, একটু দূরত্ব ও সম্ভ্রম বজায় রেখে চললেও আড়ালে দুই বন্ধু বড়ো খোলামেলা, সরস, সতত স্মৃতি সুখ চর্চা করতেন। তখন হাসির ছটা উঠত। একথা অবশ্য রাজার আসিজন বসিজনেরা বিলক্ষণ জানেন। সেই হরিশের সংবাদ না পেয়ে রাজা ভীষণ মনমরা। এমনকী ছেলে যে বন্দি, তাতেও চিন্তিত নন। কারণ, তাঁর বংশমর্যাদার কথা ভেবে রাজা মানসিংহ অন্তত তাঁর পুত্রের গায়ে আঁচড় কাটবেন না। কিন্তু হরিশের কী হল? রাজার মনে অহোরাত্র সেই চিন্তা। সুখ নেই মনে।

চৈত্রের দাবদাহে দিল্লি বড়ো ভয়ানক। পথিক শ্রান্ত, ক্লান্ত। ভরদুপুরে একটি বিশাল বৃক্ষের স্নিগ্ধ ছায়ায় বসলেন। অবসন্ন দেহে একসময় ঘুমিয়েই পড়লেন। হাওয়ার টানে পাতার খসখসানি, শব্দে চমকে ঘুম ভাঙল তাঁর। তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। উঠে বসলেন। ভাবছেন, রাতটা এখানে কাটাবেন কি না। এমনসময় তিনি অদূরেই দেখলেন তিন অশ্বারোহীকে। অশ্বারোহীদের দেখে উঠে দাঁড়ালেন। ভয়ে ভয়ে একটু এগিয়ে গেলেন। আগন্তুককে দেখে তাদের মধ্যে বয়স্ক অশ্বারোহী বলল, ‘মনে হচ্ছে আপনি ভিনদেশি?’ আগন্তুক মাথা নাড়লেন। অশ্বারোহীদের মনে হল আগন্তুকের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নেই। কনিষ্ঠ অশ্বারোহীটি জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার এখানে আসার উদ্দেশ্য কী?’

আগন্তুক বললেন, ‘সম্রাটের সাক্ষাৎ প্রার্থনা। আপনারা কি এতে সাহায্য করতে পারেন?’

এই কথা শুনে কেমন জানি তাদের অস্থির, উদবেগাকুল চাউনি। তারপর বয়স্ক অশ্বারোহী বলল, ‘চলুন তো বাহাদুরের ডেরায়। হয়তো উপায় বের হতে পারে।’ আগন্তুক ওদের অনুসরণ করতে লাগলেন। কিছুটা চলার পর আগন্তুকের শ্লথ গতি দেখে তিন অশ্বারোহী অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করল।

অশ্বারোহীরা যে ডেরায় গিয়ে পৌঁছাল, সেটা নগরকোটালের কোঠা। তার অদূরেই সম্রাট হুমায়ুনের কবর। এত বিশাল তাঁর মহল, আকার-প্রাকার, উদ্যানের সৌন্দর্য প্রকৃত চোখ টানে। স্থানটির নাম হুমায়ুন নগর। এখন সেজায়গার নাম নিজামউদ্দিন। নগরকোটাল মানুষটির রাশভারী চেহারা, কর্কশ কন্ঠ। কিন্তু মানুষটি মোটেই খারাপ নন। আগন্তুকের ইচ্ছাটির কথা জেনে একটু সময় নিয়ে ভাবলেন। তাঁর স্বরে বিরক্তির লেশমাত্র নেই। বললেন, ‘দিন দুই বিশ্রাম করুন। সুযোগের চেষ্টা করি। আগামী শনিবারে সকালে সম্রাটের দরবারকক্ষে আপনাকে নিয়ে যাব। এখানে আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন।’

নগরকোটাল বাহাদুরের আশ্বাস পেয়ে অশ্বারোহীরা ফিরে গেল। যাবার সময় বয়স্ক অশ্বারোহীটি বলল: ‘কোনো অসুবিধে নেই। ইনিও ভিনদেশি ব্রাহ্মণ। একদিন বাদশার সুনজরে পড়ে আজ তিনি নগরকোটাল। খুব শীঘ্রই তাঁর পদোন্নতি হবে। রাজা মানসিংহ বিদেশবিভুঁই থেকে ফিরে এলেই। মানসিংহের নাম শুনে আগন্তুকের চোখমুখের বিবর্ণ ছাপ। বয়স্ক অশ্বারোহী লক্ষ করল। তবে মুখে কিছু বলল না। তারা ফিরে গেল।

সম্রাট আকবরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে হরিশের মনে হল ‘সম্রাট মহানুভব’। আর, ‘এ আমার পরম সৌভাগ্য।’

সম্রাট হরিশের সব কথা মন দিয়ে শুনলেন। সেদিন দরবার কক্ষে আমির ওমরাহদের ভিড় একটু বেশিই ছিল। বাদশা অন্যান্য কাজ মুলতুবি রেখে ভিন রাজ্যের আগন্তুকদের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনার জন্য হরিশের দিকে নরম ও প্রশ্রয়ের দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘হরিশ, আপনি নির্ভয়ে সব খুলে বলুন। আমার মান্য সভাসদগণ আপনার সমস্যার কথা শুনবেন।’

বাদশার সৌজন্যে হরিশ বিগলিত হলেন। তিনি আরও একবার আভূমি প্রণাম করে তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন। প্রথমে বললেন, সূর্যবংশের গৌরবের কথা। তারপর প্রভু জগন্নাথের কথা। ওড়িশাবাসীর কাছে কেমন করে সুখ ধরা দেয় পবিত্র জগন্নিবাসে! আরও বললেন জৈন, বৌদ্ধ, শৈব, শাক্ত ও বৈষ্ণব ধর্মীয় বাতাবরণে কেমন ছিল দেশকাল! শুরু করেছিলেন কলিঙ্গ যুদ্ধ দিয়ে। কী সেই ভীষণ যুদ্ধ! দয়ানদীতে রক্তগঙ্গা বয়ে গেছিল। সেই রক্ত সম্রাট অশোককে চন্ডাশোক থেকে ধর্মাশোকে রূপান্তরিত করল। এসব কাহিনি বাদশা শুনলেন কৌতূহল ভরে। এর মধ্যে হরিশ বলে ফেলেছেন বাংলা ও ওড়িশায় আফগান নিপীড়নের কাহিনি। পরিশেষে, রাজা মানসিংহের আক্রমণ ও গজপতিরাজের অপমানের কথা। সম্রাট অনুমান করলেন রাজা মানসিংহের কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। যাই হোক, সেদিন সভা মুলতুবি রাখা হল।

এর বিহিত আমি করছি। নিশ্চিন্ত হন এবং ফিরে যান।

পরদিন সম্রাট হরিশকে সমাদরে বললেন, ‘এর বিহিত আমি করছি। নিশ্চিন্ত হন এবং ফিরে যান। আমার ‘আদেশনামা’ নিয়ে দূত কাল প্রভাতে রওনা হবে। সঙ্গে শাহি ফৌজও থাকবে।’ এ কথাটুকু শেষ করে বাদশাহ চোখের ইশারায় মহামন্ত্রীকে কিছু একটা ইঙ্গিত করলেন। মহামন্ত্রী মৃদু স্বরে সেনানায়ককে ডাকলেন। তিনি একটি রুপোর রেকাবিতে স্বর্ণখচিত কৃপাণ ও সনদপত্র নিয়ে এলেন। মহামন্ত্রী সেই রেকাবিটি সম্রাটের কাছে নিয়ে গেলেন। সম্রাট রেকাবি থেকে সনদপত্রটি তুলে বললেন, ‘যদিও আপনি গজপতিরাজের বাহিনীপতি তবুও কিন্তু আমি আপনাকে ওড়িশায় সম্রাটের প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত করলাম। মুঘল ফৌজ ও বার্ষিক আয়ের জমিদারির স্বত্ব রাজা মানসিংহ ব্যবস্থা করবেন। সেসব কথা আমার ‘আদেশনামা’-তে বলেছি। আর, সম্রাটের উপহার স্বরূপ এই স্বর্ণখচিত কৃপাণটি দিলাম। বাদশার প্রীতি স্মারক।’ হরিশের চোখে তখন আনন্দাশ্রু।

একাদিক্রমে কয়েক দিন ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির পরই সেদিন রোদঝলমলে দিনের শুরু। গজপতিরাজ ফুলের বাগিচায় দৃষ্টি মেলে কী যেন দেখছিলেন। এমনসময় বাহিনীপতি হরিশ সামন্তরায়ের সম্ভ্রমপূর্ণ অভিভাদনে গজপতিরাজের চমক ভাঙল। তিনি আনন্দে আপ্লুত। অভিমানের সুরে বললেন, ‘হরিশ কোথায় ছিলে এতদিন? খবর নেই কেন?’ হরিশের চোখে কৌতুক। কিছু একটা বলতে চাইলেন। বলা হল না। রাজা মানসিংহের দূত এসে সেলাম জানিয়েছেন। দুজনেই রাজ-অভ্যর্থনা কক্ষে উপস্থিত হলেন। এসে দেখলেন, শুধুমাত্র দূত নয়। মুঘল সুবাদারও আছেন।

মুঘল সুবাদার গজপতিরাজকে কুর্নিশ জানিয়ে বললেন, ‘খুরদা মুক্ত হয়েছে। রাজপুত্রকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। আজ থেকে মুঘল সৈন্য প্রত্যাহার করে নেওয়া হল। সম্রাটের ‘আদেশনামা’-য় আপনাকে ‘মহারাজ’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। ৩৫০০ সৈন্যের ‘মনসবদার’ (মনসবি সেন হাজার পঞ্চাসাদ) নিযুক্ত করা হয়েছে। মুঘল শাসননীতির সর্বোচ্চ পদমর্যাদা আরোপিত হওয়ার ফলে কোনো রাজা বা মুঘল সুবাদারের অধীনে আর আপনি নন। জমিদারদের কাছ থেকে বার্ষিক খাজনা আদায় এবং সরাসরি দিল্লি রাজকোষে জমা দিতে পারবেন। জগন্নাথমন্দিরের সেবাকায় ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও আপনার।’

সুবাদার এতক্ষণ গড়গড় করে ঘোষণা শুনিয়ে ক্ষণিক নীরব হলেন। আবার, তিনি আর একটা ঘোষণা শোনালেন—‘মিরাজউদ্দিনের নেতৃত্বে একাদশ মুঘল ফৌজ হরিশ সামন্তরায়ের নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কাজ করবে। কণিকায় তাঁকে নিষ্কর জমিদারি দেওয়া হল। এবং তিনি মুঘল সম্রাটের দূত হিসেবে বিবেচিত হবেন।’

গজপতিরাজ তো অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। নিষ্পলক। রাজা হরিশকে সানন্দচিত্তে আলিঙ্গন করলেন। নিজের গলার পাটবস্ত্র খুলে হরিশের মাথায় পরিয়ে বললেন, ‘এ সমস্ত সফলতার-অ শ্রেয় কেবল তুমর-অ’। আনন্দাশ্রু হরিশের চোখে। সেই অশ্রুধারা রাজার চোখেও। পুলকে আবেগে তাঁদের শরীর কম্পমান। শ্রদ্ধায় নমন। অস্ফুটে তাঁদের ঠোঁট নড়ল—‘সম্রাট মহানুভব।’

ফুলঝুরি, সেপ্টেম্বর, ২০০৫

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%