রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার
কথায় বলে ধুলোর ঝড়। সেই ঝড় তুলে ছুটে এলেন খান-ই-দৌড়ান। তেজি, আরবি অশ্বক্ষুরের আওয়াজ তুলে তিনি ওড়িশায় পৌঁছে গেলেন। সঙ্গে আপাতত তিন শত সৈন্য। পশ্চাতে আরও আসছে। আসবে আরও।
স্রোতস্বিনী দয়ানদী। আশমানে চাঁদ। চাঁদভাসি রাত্রে, তাঁর মতো কঠিন মানুষের মনেও বুঝিবা কিঞ্চিৎ আভা লাগে। তিনি সর্বদা নেশার ঘোরে থাকেন। ঝটকা মেরে ঘোড়ার লাগাম টেনে নেমে পড়লেন। প্রভু যখন নেমেই পড়েছেন সৈন্যরাও নেমে পড়ল। মানে, নেমে পড়তে বাধ্য হল। তিনি হাতের নিশানটি অন্যতম সহচরের হাতে দিলেন। সেটি তিনি মাটিতে পুঁতে দিলেন। সৈন্যরা বুঝল, রাত্রিবাস এখানেই—এই দয়ানদীর পাশে, কলিঙ্গাতেই।
দশ দিন ধরে চলছে অবিরাম চলা। সৈন্যরা স্বভাবতই ক্লান্ত। মশালের আলোতে চতুর্দিক আলোকিত। ব্যবস্থা হচ্ছে রন্ধন, পাকান্নের। সুরাভোজ চলবে। অনেকেই দয়ানদীতে স্নান সেরে নিল। সেএক হইহট্টগোল। প্রভু খান-ই-দৌড়ান হট্টগোলের মধ্যেই থাকতে পছন্দ করেন। তবে নিজেকে জড়ান না। আলগা হয়ে নি:সঙ্গ থাকেন। যখন সুরাপান করেন, একাই করেন। প্রিয় সহচরদেরও সঙ্গে নেন না। তবে অন্যদের কোনো স্ফূর্তিতে ব্যাঘাত ঘটান না। এটা তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ। চোখ রক্তজবা হয়ে আছে। পাথর স্তূপটিতে হেলান দিয়ে প্রায় আধশোয়া অবস্থায় ছিলেন। হঠাৎ কী হল! তিনি সোজা টান টান হয়ে বসলেন। নিশম প্রায় ছুটে গিয়ে দূরে আলোর রেখা ফেলে যে ব্যক্তিটি ধীর গতিতে আসছিলেন, তাঁর কাছে গিয়ে বললেন; —‘হুজুর আপনার জন্য উদগ্রীব। সন্ধ্যার আগেই আমরা এই স্থান ত্যাগ করতাম। আপনার অপেক্ষাতেই আমাদের সময় অতিবাহিত করতে হচ্ছে। সমস্ত সংবাদ আপনি নিশ্চয়ই সংগ্রহ করতে পেরেছেন। পেরেছেন কি?’ আগন্তুক দীর্ঘকায়, মজবুত স্বাস্থ্য। নাকের নীচে যত্ন করে ছাঁটা গোঁফ। মুখে কিছু ঘাম। কপালে তিলক। উন্মুক্ত শরীরে উপবীত ও উত্তরীয়। তিনি উত্তরীয়র খুঁটে মুখটি মুছে গম্ভীর মুখে বললেন, —‘সেকথাটাই বলতে এতটা পথ এসেছি।’
‘এতটা পথ?’ নিশমের খুব হাসি পেল, দিল্লি কতদূর! আপনার আন্দাজ আছে? নিশমের শ্লেষবাক্যে আগন্তুকের মুখটি আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। তিনি বিষ্ণুপুরি লণ্ঠনের মতো দেখতে লণ্ঠনটি তুলে তার আলোকে যুবকটিকে এক ঝলক দেখে নিলেন। তারপর শুধু বললেন, ‘যুবক, তর্ক পরিহার করুন। আমি একটা বিপদকে পাশ কাটিয়ে ফিরছি। ময়ূরভঞ্জ রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ভঞ্জ আমাকে গুপ্তচর হিসাবে গণ্য করেছেন। বিপদ সেখানেই।’

আগন্তুক দীর্ঘকায়, মজবুত স্বাস্থ্য।
মারি তো গণ্ডার, লুটি তো ভান্ডার। সেকথা মনে রেখেই বাকির খান ছুটে আসছেন। সম্রাট তাঁকে সুবাদার হিসাবে নিযুক্ত করেছেন। ওড়িশার জমিদারেরা কী যেন মনে করেন তাঁদের! সম্রাটকে উপেক্ষা করছেন! রাজস্ব দেওয়া তো বন্ধ করেছেনই। তার ওপর স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন অনেকেই। খুরদার রাজা নরসিংহদেব (১৬২১-৪৭ খ্রি.) এঁদের মূল পান্ডা। যেন হাতির পাঁচ-পা দেখেছেন। সম্বলপুর রাজাও বিদ্রোহী। রাজস্ব দেওয়া বন্ধ করেছেন।
তাভার্নিয়ে এক বিবরণীতে লিখেছেন: শাহজাহান সৈন্যদের নির্দেশ দিয়েছেন, সম্বলপুর রাজার কাছ থেকে সোনাদানা, অর্থকড়ি সংগ্রহ করতে হবে। বিশেষ করে সংগ্রহ করতে হবে হিরে। সংবাদ ছিল, রাজার কাছে আছে প্রভূত হিরে। কিন্তু রাজা সম্রাটের উপর বেজায় চটেই ছিলেন। আগেই সতর্ক হয়েছেন। যে কোনো সময়ে, সম্রাটের ফৌজ হানা দিতে পারে। তাই সেসব লুকিয়ে ফেলেছেন। হীরে, জহরত কিছুরই সন্ধান মেলেনি। উপরন্তু, শস্যদানাও পুড়িয়ে দিলেন। রোষে সম্বলপুরের রাজা সম্রাটের ফৌজদের বললেন, ‘কন নবু নে!’ অর্থাৎ কী নিবি নে!
সম্রাটের ফৌজ ক্রোধে ফুঁসল। রাজার সৈন্যদের যাদের পেল, ধরল। গলা কাটল। একরকম ধ্বংসলীলায় মেতে গেল। ভয়ানক পৈশাচিক কান্ড বাধাল। এসব কাহিনি যখনকার, তখনও বাকির খান সুবাদার হননি।
সম্রাট তাঁর সৈন্যদের শুকনো মুখে ফিরতে দেখে বললেন ; ‘মুষল ভারী হওয়ার দরকার।’ তাই এক আদেশক্রমে বাকির খান হলেন ওড়িশার মুঘল সুবাদার (৪ ফেব্রুয়ারি, ১৬২৮ খ্রি.)। বলাবাহুল্য, ইনি হলেন সেই ভয়ানক মুষল। ক্রূর, নিষ্ঠুর অত্যাচারী হিসাবে অল্পদিনেই পরিচিত হলেন। ওড়িশায় তিনি পা রেখেই প্রধান প্রধান রাজন্যবর্গকে আদেশ করলেন সাক্ষাতের। সম্পন্ন রাজারা কেন শুনবেন তাঁর কথা। সুতরাং বাকির খান গেলেন খেপে। কয়েদ করলেন। শুধু কী তাই! কয়েদে ভরা, তাঁর আদেশে সাত শত বন্দি হত্যার ব্যবস্থা হল। এর মধ্যে, এক চতুর বন্দি মুঘল সৈন্যদের চোখে ধুলো দিয়ে কোনো ক্রমে পালিয়ে হাজির হলেন সম্রাটের দরবারে। বললেন, ‘জনাব, এই দেখুন, খাজনা বহি। তাতে লক্ষ লক্ষ টাকা আদায়ের হদিস আছে। আর নজরানা আদায়ের কথা কী বলব, ঢের ঢের!’ সম্রাট হুঙ্কার দিয়ে বললেন, ‘তাইতো! খাজাঞ্চিখানায় জমা পড়ছে কই!’ এরপর ওয়াজির-কে (প্রধানমন্ত্রী) বললেন, ‘ডাকুন, বাকির খানকে। কোতল করব।’ তো বাকির খান ওড়িশা থেকে ফিরে এলেন। কপালে অশেষ দুর্গতি বহন করে।
আমরা সেই আগন্তুকের পরিচয় দিইনি। ইনি হলেন, বারিপদার মানুষ। তাঁর নাম অনন্ত মহাপাত্র। ময়ূরভঞ্জ রাজার দেওয়ান ছিলেন। তিনি সদ্য বিতাড়িত। এর একটু মূল আছে। একসময় তিনি ময়ূরভঞ্জ রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ভঞ্জের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি রাজার অগোচরে পাঁচটি গ্রামের বিলিব্যবস্থা করে অনেক অর্থকড়ি সংগ্রহ করেছিলেন। তার হদিস তিনি রাজাকে দেননি। কিন্তু রাজার এক মন্ত্রী বিষয়টি সংগোপনে, রাজার কানে তুলে দেন। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র একদিন দেওয়ানের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলেন। ‘ব্যাপারটি কি সত্যি? এমন বিষয় পরামর্শ করলেন না কেন?’
দেওয়ান বললেন, ‘মহারাজ, অপরাধ নেবেন না। সেই সমুদয় অর্থ একটি সৎকার্যে ব্যয় হয়েছে। বিষয়টি জরুরি ছিল। ভালো কাজ আপনি সর্বদা সমর্থন করে থাকেন। তাই, আশু সমস্যা মেটাতেই এমন উদ্যোগ নিয়েছিলাম। মহারাজ, মনে করে দেখুন, কিছুদিন আপনি ভিন রাজ্যে ভ্রমণ করছিলেন।’
‘কিন্তু কী সেই সৎকার্য? এখনও আপনি খোলসা করে বলেননি!’—রাজার কন্ঠ কর্কশ, রূঢ় শোনাল।
দেওয়ান খুবই আহত হলেন। গভীর আবেগে, মলিন মুখে জিজ্ঞেস করলেন; ‘আপনি, আমাকে সন্দেহ করছেন?’ রাজা জলদগম্ভীর স্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ, করছি।’ দেওয়ান বিষণ্ণ, বিমর্ষ মুখে বললেন, ‘এই মুহূর্তে, আমি আপনার দেওয়ান পদ ত্যাগ করছি।’ রাজা খুব অপমানিত বোধ করলেন। হুকুম করলেন তাঁকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করার। রাজ অনুচর তাঁকে বন্দি করলেন। তাঁর চোখ থেকে বারিধারা নামল। নির্বাধ। অনুশোচনার ধারা। রাজা অন্দরমহলের দিকে পা-বাড়ালেন। যেতে যেতে শুনতে পেলেন দেওয়ান গলা তুলে বলছেন:
‘ময়ূরভঞ্জের নিরাপত্তার স্বার্থে, অর্থ বাকির খানকে দিয়েছি।’ এই অভাবিত সংবাদে রাজা একটু থমকে গেলেন। কিন্তু কোনো কথা বললেন না। যাই হোক, হতভাগ্য দেওয়ানের ঠাঁই হল বন্দিশালায়। এই ঘটনার দিনকুড়ি বাদে তাঁর মুক্তি হল রাজমাতার হস্তক্ষেপে। তিনি মুক্তি পেলে কী হবে গুপ্তচর হিসেবে গণ্য হয়েছেন। এবং ময়ূরভঞ্জ থেকে তাঁকে বিতাড়িত করা হল।
অনন্ত মহাপাত্র নিজেকে আর রাজ দেওয়ান হিসেবে পরিচয় দেন না। সংস্রব যখন নেই, পরিচয়েরও কোনো অর্থ হয় না। তবে রাশভারী, কর্ম তৎপর মানুষটি এমন হেনস্থা কিছুতেই মানতে পারছেন না। মনটি তাঁর বিক্ষুব্ধ। মিথ্যে অপবাদের জন্য মনটি প্রতিশোধাত্মক হয়ে উঠেছে।
সুবাদার খান-ই-দৌড়ান আসছে শুনে অনন্ত মহাপাত্র বিশ্বস্ত অনুচরের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছেন। পূর্ব নাম তোষালি নগর। তারই এক ছোট্ট গ্রাম কলিঙ্গা। তো কলিঙ্গাতে সেই রাত্রে, সুবাদারের সঙ্গে দেখা করবেন এবং রাজাদের হাঁড়ির খবর দেবেন। সেসব ঠিক হয়েই ছিল। এখন কথামতো কাজ। প্রত্যক্ষ সাক্ষাতের জন্যই দুজনাই ছটফট করছেন। নিশমের শ্লেষ বাক্যে, আগন্তুক অর্থাৎ অনন্ত মহাপাত্র চটে গেলেও সামলে নিয়েছেন। ক্ষণিক ক্রোধ। অনেক সামলে সুমলে সুবাদারেরও প্রশ্নের উত্তর দিলেন। সুবাদার কিঞ্চিৎ রসঘন। জিজ্ঞেস করলেন; ‘মহাশয়, আপনি আমাকে দেশীয় রাজাদের গোপন খবর জানাতে আগ্রহী কেন? আপনার স্বার্থ কী?’
অনন্ত মহাপাত্রের মুখটা ভাবলেশহীন। চোখ উপরে তুলে বললেন: ‘স্বার্থ আছে বই কী। একসময় ভেবেছি....ভাবনা অমূলকও ছিল না...ময়ূরভঞ্জ আমার স্বদেশ, আমার রাজার রাজধানী। এখানে আমি রাজসম্মান পেয়েছি। দেওয়ানগিরি করেছি। অত্যাচারী বাকির খান যাতে স্পর্শ করতে না পারে। আমার জন্মভূমি, পুণ্যভূমি তার জন্য পাঁচ গ্রামের বিলিব্যবস্থা করে সমগ্র অর্থ বাকির খানকে তুলে দিয়েছিলাম। এতে রাজধানী বঁাচল। দুর্বল রাজা বঁাচলেন। রাজার সম্মান, মর্যাদার কথা ভেবে বিষয়টি গোপন রেখেছিলাম। কিন্তু কী পেলাম? শুধু অপবাদ। কেবল ময়ূরভঞ্জ রাজা নন। খুরদা, কেওনঝাড় ও কণিকার রাজারাও আমাকে ভুল বুঝলেন। গুপ্তচর আখ্যা দিলেন। বিতাড়নের পরামর্শ দিলেন। এখন আমার প্রাণসংশয়। আমি এঁদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই বিদ্রোহী। কোনো অন্যায় না করেই যখন অন্যায়ের অপবাদ, এবার প্রকৃত অন্যায় করেই প্রতিশোধ নিতে চাই। তাঁদের সর্বনাশ চাইছি।’
খান-ই-দৌড়ান দু-বাহু প্রসারিত করে বললেন, ‘সাচচা আদমি। সাচচা দিল।’ শুধু বলাই তো নয়। আহ্লাদে হল্লা শুরু করলেন।
মুঘল সম্রাট শাহজাহানের অসুস্থতার সংবাদ (৬ সেপ্টেম্বর, ১৬৫৭ খ্রি.) প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় উত্তরাধিকার নিয়ে বিবাদ। সেবিবাদের ঢেউ সারা ভারতে আছড়ে পড়ল। সম্রাটের পুত্ররা সবাই রাজধানী অভিমুখে ছুটে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত। দিল্লি ছাড়া অন্য কোনো রাজ্য তাঁদের কাম্য নয়, দায়িত্বও নয়। সম্রাটের দ্বিতীয় পুত্র সুজার ওপর ভার ছিল ওড়িশা দেখভালের। কী দেখতেন? দেখতেন, দেশীয় রাজারা যাতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারেন। আর রাজস্ব, সম্পদ মিলিয়ে আয়ের প্রবাহ যাতে ঠিক থাকে। কিন্তু সুজা তাঁর ফৌজ এবং আমলাদের তুলে নিয়ে দিল্লি রওনা হলেন। সেই যুযোগে ওড়িশার রাজারা যে যাঁর স্বাধীন হয়ে উঠলেন। খাজনা দেওয়াও বন্ধ করলেন। এই সংকট মুহূর্তে খান-ই-দৌড়ান ওড়িশার সুবাদারের দায়িত্বভার পেলেন (১৬৬০-৬৭ খ্রি.) তিনি সব দেখেশুনে একটি প্রতিবেদন লিখলেন। বহুমান্য রাজা বলতে আছেন ময়ূরভঞ্জ, খুরদা, কেওনঝাড়, নীলগিরি ও কণিকা। এঁরা প্রতাপশালী। বশে আনা খুব মুশকিল। খাজনা দেওয়া বন্ধ করেছেন। স্বাধীন ভাবে চলছেন। অস্ত্রধারী সৈন্য সংখ্যা অনেক। আবার, কাটঝিরির দিকে জমিদারেরাও বিদ্রোহী। এঁদের শক্তির দম্ভ বিঘোষণ সম্ভব হয়েছে, আমার পূর্ববর্তী সুবাদারের শাসন-শিথিলতার কারণেই। এখন আমার গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হল, সমগ্র ওড়িশাকে পুনর্দখল ও শাসনের আওতায় এনে করায়ত্ত করা।
বলাবাহুল্য, শাসনের নামে তিনি বাড়াবাড়ি শুরু করলেন। ঢেঁড়া পিটিয়ে আদেশ করলেন, দেশীয় রাজাদের সাক্ষাৎ ও নজরানা প্রদানের। সুবাদারের প্রথমেই নজর পড়ল ময়ূরভঞ্জের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ভঞ্জের ওপর। সর্বজনমান্য রাজাকে এত্তেলা পাঠালেন। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ভঞ্জ তো এলেন। প্রথম সাক্ষাৎকার। রাজাও শুনতে চান কী বক্তব্য সুবাদারের। কিন্তু সুবাদার পারিষদবর্গ নিয়ে বসে আছেন। রাজাকে দেখে স্বাভাবিক সৌজন্য পর্যন্ত প্রকাশ করলেন না। রাজা ক্রুদ্ধ হলেন। তিনি তাঁর অনুচরদের নিয়ে ফিরে গেলেন। শুধু আহত রাজা অস্ফুটে বললেন, ‘অভদ্র’।
এই নিটোল শব্দটি খান-ই-দৌড়ান যে বুঝেছেন, তা নয়। অন্তত সেই মুহূর্তে বোঝেননি। যদি বুঝতেন, তবে প্রতিক্রিয়া অন্যরকম, হয়তো বা অসম্ভব রকমের হতে পারত। অনন্ত মহাপাত্রের কাছে পরে জেনেছিলেন, শব্দটির গূঢ় তাৎপর্য। জানার পর থেকেই তরবারি শানাতে লাগলেন।
একদিন সকাল আন্দাজ দশটা। সেদিন ছিল সূর্যের গোমড়া মুখ ভারী। আকাশে মেঘপুঞ্জ। ঝিরঝিরে বৃষ্টি আর বাদলা-হাওয়া। জলেশ্বরের কাছে তাঁবু পড়ল। সুবাদারের ফৌজ রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ভঞ্জকে বাধ্য করল সুবাদারের কাছে হাজির হতে। রাজা দেখলেন, অহেতুক রক্তপাত হবে, তার চেয়ে যাওয়াই ভালো। তিনি সৈন্যদের সঙ্গে নিতে চাইলেন না। কিন্তু রাজার সেনাপতি কিছুতেই ছাড়বেন না। শেষে স্থির হল কতিপয় অনুচর রাজার সঙ্গে যাবে। আর যাবে, জনা কুড়ি আশাবরদার (দন্ডধারী ভৃত্য) এবং জনা কুড়ি রুকমার। ‘রুক’ অর্থ প্রতিরোধ, ‘মার’ অর্থ আঘাত করা। এরা রাজার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাবাহিনী। এরা যুদ্ধও করে। আবার নৃত্যও করে। লোকনৃত্য শিল্পী। এখন রাজা নেই বটে তবে ‘রুকমার’ নাচটি বেঁচে আছে লোকপরম্পরায়। যাই হোক, রাজা এসে তাঁবুর মধ্যে প্রবেশ করেননি। তিনি বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন। রাজা দেখলেন, খুরদা, কেওয়নঝাড় ও নীলগিরি থেকে তাঁর অনুগত রাজারা এসেছেন। মনটি তাঁর প্রসন্ন হল। কারণ, তিনি আর একা নন। হঠাৎ-ই তাঁর চিন্তার ছেদ পড়ল। সুবাদার বাইরে বেরিয়ে এলেন এবং কর্কশ গলায় হুকুম করলেন ‘কুর্শি লাও।’ কুর্শি এল। তবে একটি। তিনি তাতে বসলেন। কিন্তু রাজারা দাঁড়িয়ে রইলেন। রোষ-তেজে তাঁদের চোখের বিনিময় ঘটল। রাজাদের অপর তিনজন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ভঞ্জের মুখের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তো ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। বললেন, ‘অসভ্য’।
সুবাদার তাতে কর্ণপাত করলেন না। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকলেন মাত্র। তারপর জিজ্ঞেস করলেন—‘আপনারা খাজনা দেওয়া বন্ধ করেছেন কেন? আপনারা কি মুঘল শাসনের অধীনস্থ নন?’ সুবাদার উত্তরের প্রত্যাশা না করেই আবার বললেন, ‘এরজন্য, আপনাদের শাস্তি ভোগ করতে হবে। তৈরি থাকুন।’

আপনারা কি মুঘল শাসনের অধীনস্থ নন?
রাজা কৃষ্ণচন্দ্র গম্ভীর মুখে বললেন, ‘আমরা এই বিষয়ে আলোচনার জন্য বাদশাহের দরবারে দূত পাঠাব। আপনার কতৃত্ব মানছি না।’ ‘বেয়াদপ।’ বলে সুবাদার হুঙ্কার দিলেন। তরবারি উত্তোলন করলেন। অনন্ত মহামাত্র এতক্ষণ অন্তরালে থেকে রাজাদের হেনস্থা হওয়া লক্ষ করছিলেন। বেশ মজাও পাচ্ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ তাঁর মনে অনুশোচনা জাগল। মানবিকতাবোধে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। মনে মনে বললেন, বড়ো ভুল হয়ে গেছে। দেশীয় রাজাদের বিপক্ষে দাঁড়ানো।
তিনি হঠাৎই ভয়ানক কান্ড করলেন। তাঁবুর ভেতরে প্রহরারত সিপাহীর কোমর থেকে তরবারি ছিনিয়ে খান-ই-দৌড়ানের দিকে ছুটে এলেন। চোখে আগুন জ্বলে উঠল। বললেন, ‘আগে, রাজাদের যোগ্য-সম্মান দিন। অশোভন আচরণ বন্ধ করুন। আপনার ‘শরম’ থাকা উচিত।’
সুবাদার কঠিন তেজে, বজ্রগম্ভীর কন্ঠে বললেন, ‘স্থানচ্যুত মূষিকের কাছে রাজনীতি শিখতে হবে?’
‘মূষিক বটে। তবে পার্বত্য মূষিক। আর আপনার মতো হীন কীটের সঙ্গে কথা চলে না। সামনে দন্ডায়মান রাজাদের জাঁক আর ঐশ্বর্যের তুলনায় আপনি অতি তুচ্ছ।’
মেদিনী কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলেন সুবাদার এবং কোষমুক্ত তরবারি দিয়ে অনন্ত মহাপাত্রকে আঘাত করতে উদ্যত হলেন। অনন্ত মহাপাত্র পালটা আঘাত করলেন। সুবাদারের দক্ষিণ বাহুতে আঘাত লাগল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুল। ক্রুদ্ধ বাঘ যেমন শিকার ধরে তেমন করেই সুবাদার অনন্ত মহাপাত্রের বুকে তরবারিটি আমূল বিঁধিয়ে দিলেন। আবার পিছন ফিরেই ময়ূরভঞ্জ রাজাকে সেই তরবারি দিয়েই ঘাড়ে আঘাত করলেন। নিমেষে স্থানটি রক্তাক্ত হয়ে উঠল।
এই ভয়ানক কান্ড করে কী বোঝাতে চাইলেন সুবাদার? একদল ক্ষমতার দম্ভে, শীর্ষে অবস্থান করবে, প্রভূত্ব করবে। আর একদল পদানত হবে। তাই, যেনতেন প্রকারেণ দখল চাই। দখল। সেকারণেই শক্তিপ্রদর্শনের নানা ক্রিয়াকান্ড। হিংস্র, নিষ্ঠুরতা। লোহা সেতো লোহাই। এতে কোনো প্রলেপ বেশিদিন ধরে রাখতে পারে না। আসলটা বেরিয়েই পড়ে। তেমনি, ক্রূর, লোভী মানুষের রূপটির প্রকাশ ঘটে। আসলে ঘটে যায়।
সুবাদার এই নিষ্ঠুর কান্ডের একটি যুতসই ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। এক প্রতিবেদনে লিখলেন; — আমি জলেশ্বরে পৌঁছে ময়ূরভঞ্জের রাজার সঙ্গে খাজনা প্রসঙ্গে কথাবার্তা বলছিলাম। কিন্তু কী হল কে জানে, হঠাৎ রাজা ধারালো অস্ত্র নিয়ে আমার দিকে ধেয়ে এলেন। মহান সম্রাটের কৃপায় বেঁচে গেলাম। রাজা নিহত হয়েছেন। অন্যদের বন্দি করা গেছে। ময়ূরভঞ্জ রাজার সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিলেন। নীলগিরির হরিচন্দন প্রমুখ অস্ত্র ফেলে দিয়ে বন্দি হতে চাইলেন।
মনে হবে, নিরীহ ভালো মানুষ। ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানতেন না। কিন্তু সমসাময়িক লেখক জর্জ ফস্টার লিখেছেন;—সুবাদার সাহেবের প্রতিবেদনটি মনগড়া। আসলে, ময়ূরভঞ্জ রাজা-সহ আরও তিন জন এসেছিলেন সুবাদার সাহেবকে সম্মান প্রদর্শনের জন্যই। কিন্তু রাজাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতেই এমন ভয়ানক কান্ড করে বসলেন সুবাদার সাহেব। দোষস্খালনের উপায় হিসেবেই খান-ই-দৌড়ান মিথ্যে প্রতিবেদন খাড়া করেছিলেন।
এতকান্ড ঘটল জলেশ্বরে। সব স্থানে যেমন, সেখানেও মাটির সাঁেদাগন্ধ—লতাপাতা, ফুল, বর্ণসমারোহ। সকাল সন্ধ্যায় নারীপুরুষের বহমান জীবন। সকালে সূর্য-কিরণমালা, দিনশেষে অস্তগামী সূর্যের আলো-আভা। কখনো মেঘদল খেলা করে। বৃষ্টি নামে। জোরে বা ঝিরঝিরে। ইতিহাস কি কারও মনে পড়ে? পড়ে, আবার পড়েও না।

শহিদ স্তম্ভ
ওড়িশার মান্যবর রাজারা মিলে জলেশ্বরে যেখানে খান-ই-দৌড়ানের তাঁবু পড়েছিল এবং ময়ূরভঞ্জ রাজাকে হত্যা করা হয়েছিল; হয়েছিল হত্যা, আরও কতশত,—সেখানে তৈরি করিয়েছিলেন শহিদস্তম্ভ। প্রচার করা হয়েছিল স্তম্ভের কাছে যিনি আসবেন, একমুঠো ধুলো ছড়িয়ে যেন দেন; শহিদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে।
সেই স্তম্ভ আর নেই। কালের কবলে হারিয়ে গেছে। আজ আর ধুলো ছড়িয়ে স্মৃতি তর্পণ হয় না ঠিকই তবু কথা উঠলে, ‘মুঘলকলঙ্ক’ বলে অনেকেই ঘৃণায় মুখ বঁাকান। এটা নেহাতই হালের কথা।
রঙবেরঙ, শারদসংখ্যা, ১৪০৪
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন