গৌরব মাল্য

রঞ্জিত কুমার সমাদ্দার

রোদের তেজ মানেননি। দুপুর দুপুর বের হয়েছেন। হঠাৎ তিনি ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলেন। এই ‘তিনি’ আওরঙ্গজেবের পুত্র শাহজাদা আকবর। তাঁকে থামতে দেখে উজির আসাদ খান পেছনে আগত দু-শত ঘোড়সওয়ারিকে বঁা-হাত তুলে ইঙ্গিত করলেন। বোঝাতে চাইলেন। থেমে যাও। গোল কোরো না। কিছুমাত্র শব্দ হলে শাহজাদা বিরক্ত হবেন।

উজির ভাবতে লাগলেন। শাহজাদার হলটা কী? সিদ্ধান্ত হয়েই আছে। রাঠোর বীর দুর্গাদাস যখন তাঁর সহায়। তিনি এই এলেন বলে!

শাহজাদা ঘোড়ার পিঠ থেকে নামলেন। ইতস্তত পায়চারি করলেন, কিছুক্ষণ। চিন্তিত মুখ। মনে মনে ভাবলেন। তিনি কি ঠিক করছেন? কেন ঠিক নয়? কথায় বলে: আগের আলো যেদিকে যায়, পেছনের আলোও সেদিকে। তাঁর পিতা আওরঙ্গজেব মসনদ প্রাপ্তির জন্য লড়াই করেননি? বিদ্রোহী হননি পিতা শাহজাহানের বিরুদ্ধে? রক্তপাত ঘটাননি? তাঁরও তো সিংহাসন পাওয়ার কথা ছিল না। অথচ তিনি বিদ্রোহী হয়ে মসনদের জন্য লড়াই করেছেন। সেটা যদি অন্যায় না হয়। তবে তিনিও অন্যায় করছেন না। বাদশা বনে যেতে পারেন, একদিন। তামাম ভারতের বাদশা!

রাজস্থান ঊষর উর্বরভূমি। সেখানে স্বর্ণকমল ফোটে। সম্পদে ভরপুর। বীরভূমি। মারওয়াড়রাজ যশবন্ত বেশ ভয়ানক। সিংহরাজা। তাঁকে দমন করা সহজ ছিল না। যদি-না সীমান্ত যুদ্ধে জামরুদে তাঁর মৃত্যু হত। যাই হোক, সম্রাটের আদেশে তড়িঘড়ি যশবন্ত সিংহের স্ত্রী-পুত্রকে দিল্লিতে আনা হল। সম্রাটের ইচ্ছে। মারওয়াড়ের ভবিষ্যৎ রাজা অজিত সিংহকে মুঘল অন্তঃপুরে প্রতিপালন ও মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত করার। তা আর হয়ে ওঠেনি। রাঠোর বীর দুর্গাদাস মুঘল বাহিনীকে পরাস্ত করে মাতা পুত্রকে উদ্ধার করে নিয়ে এলেন। যোধপুরে।

শাহজাদা ঘোড়ার পিঠ থেকে নামলেন।

সম্রাট ক্রুদ্ধ। মারওয়াড় দখল চাই। রাজপুতদের কঠিন শাস্তি দিতে হবে। সম্রাট তিন পুত্র মুয়াজ্জেম, আজম ও আকবরকে নিয়ে হাজির হলেন। মারওয়াড়ে। সঙ্গে প্রচুর সৈন্য। ঢের গোলাবারুদ। বাতাসে ওঠে বারুদের গন্ধ। রক্তবন্যা বইল। মারওয়াড়, চিতোর, মেবার সবই দখল হল। ভয়ানক যুদ্ধে সম্রাটের কঠিন হৃদয় বুঝি বা কেঁপে ওঠে। এরপর তিন পুত্রকে রাজস্থানের ভার দিয়ে আজমের চললেন। তাঁর গন্তব্য স্থল অবশ্য দক্ষিণ দেশ, দক্ষিণ বিজয়। মাঝখানে একটু যা বিরতি। ধম্মকম্ম সারবেন।

শাহজাদারা ঘাম ঝরালেন খুব। রাজস্থানের বেশ কিছুটা দখলেও আনলেন। মুঘল ঘাঁটি স্থাপিত হল। থানা গড়ে উঠল। অন্যদিকে, রাজপুতরা সহজে ছেড়ে দিল না। মারওয়াড়ে মুঘল শিবির বিধ্বস্ত করল। সেটা সাময়িক। মুঘলরা আবার দখল করে নিল। মেবার। দুর্মুখরা বলেন। আকবর নাকি স্বেচ্ছায় চিতোর ছেড়ে দেন। কথাটা সত্যি হলেও হতে পারে। সেযা-ই হোক। শাহজাদা আজম বেজায় চটলেন। ভাইয়ের ওপর। আকবরকে দুষলেন। কর্তব্যকর্ম ভুলে গেছেন। রাজপুতদের সঙ্গে মাখামাখি শুরু করেছেন। বিশেষ করে রাঠোরবীর দুর্গাদাসের সঙ্গে। কোথায় তিনি মন দিয়ে যুদ্ধ করবেন, প্রতিরোধশিবির গড়ে তুলবেন! তা না করে বাদশার আদেশ উপেক্ষা করে রাজস্থানি নৃত্যগীতে মশগুল হয়েছেন। শাহজাদা আজম বাদশাকে নালিশ জানালেন। সত্য মিথ্যার সাতকাহন।

কিন্তু এই অভিযোগ সম্পর্কে বাদশার কোনো নির্দেশ এসেছিল কি না, জানা যায়নি। তবে শাহজাদা আজম মেবারের দায়িত্ব থেকে শাহজাদা আকবরকে সরিয়ে দিলেন। অজুহাতে বললেন—‘বাদশার আদেশ অমান্য করার অধিকার আমাদের নেই। তুমি আদেশ মানছ না। কর্তব্যকর্মে অমনোযোগী। আমাদের বড়ো শত্রু রাজপুতদের সঙ্গে তোমার অধিক মেলামেশা। তুমি পুত্র কন্যাকে নিয়ে স্বদেশে ফিরে যাও। কী করবে? আগামীকালের মধ্যে জবাব চাই। সন্ধে পর্যন্ত সময়। নতুবা শাস্তি তোমাকে পেতে হবে।

শাহজাদা আকবরের মনে ক্রোধ হলে বা দুঃখ! তিনি নির্জন স্থানে ছুটে যান। সেখানে কোনও বড়ো বৃক্ষ থাকলে তো কথা নেই! চিৎকার করে বললেন। আমি কী করব! কী করা উচিত? একটানা চিৎকার করতে থাকেন। অন্তত, হালকা বোধ করেন। মনটা শান্ত হয় তাঁর।

এরপর দিন। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হল। আকবরের দেখা নেই। উজির আসাদ খান আজমের কানভারী করলেন। ‘শাহজাদা আসবেন কী করে? তিনি তেরাতালি নৃত্য-গীত শুনছেন। উদয়পুর থেকে আসা এই দলটিতে পুরুষ ও মহিলারা আছেন। কামড় সম্প্রদায় মহিলারা সুন্দর সুন্দর বস্ত্র অলংকার পরে এসেছেন। নৃত্যাঙ্গনারা সারা অঙ্গে তেরোটি মঞ্জিরা বেঁধে নিয়েছেন। তাঁদের মাথায় থালি ও ঘট। ফুলমালা। তারা ভজন গাইছেন। লোকদেবতা রামদেবের নামে ভজনগীত। আর, কখনো বা তাঁরা ভূমির ওপর শুইয়ে বসে নৃত্যমুদ্রা দেখান। মঞ্জীরায় মঞ্জীরায় শব্দঘর্ষণে ঠুং ঠাং শব্দ ওঠে। সেই সঙ্গে বাদক বাজান। ঢোল ও তানপুরা। নৃত্য নয়ন সুখের। গীত মধুর, মধুর। শাহজাদা ভজনগীত শুনে তালি বাজাচ্ছেন। আশরফি বিলোচ্ছেন।’

শাহজাদা হুংকার দিলেন। ‘তালি বাজাচ্ছেন। আশরফি বিলোচ্ছেন?’

আসাদ খান মাথা নাড়লেন। ‘জি হুজুর!’

শাহজাদা আজম হুকুম দিলেন। ‘বন্দি করে নিয়ে এসো। আকবরকে।’

আসাদ খান ইতস্তত করতে লাগলেন। শাহজাদা আজম রুষ্ট হলেন। বললেন, ‘পিতার ফতোয়াই কি আলমগিরি’ আইনে নাচ-গানে অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ। এটা তোমার জানা নেই?

আসাদ খান বুদ্ধিমান। আর কথা বাড়ালেন না। তিনি জনা কয়েক সৈন্য নিয়ে ছুটে গেলেন। শাহজাদা আকবরকে সেলাম জানালেন। তারপর সবিনয়ে বললেন। ‘হুকুম হয়েছে। আপনাকে বন্দি করার’। শুধু এমন কথা বললেন না। একজন সৈনিককে ইঙ্গিতও করলেন। সৈনিকটি এগিয়ে গেল। শাহজাদা তরবারি উত্তোলন করলেন। আসাদ খানও তরবারি নিয়ে ছুটে এলেন। শাহজাদার সঙ্গে গুটি কয়েক সৈন্য ছিল। তারা খানিক দূরে বসে খোশগল্প করছিল। তারাও ছুটে এল। কয়েক মুহূর্তে, নৃত্যগীতের স্থানটি রণাঙ্গনের চেহারা নিল। শাহজাদার তরবারির আঘাতে আসাদ খান ঘায়েল হলেন। ডান হাঁটুতে চোট পেলেন। সে-চোট আর সারেনি। যতদিন বেঁচে ছিলেন। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতেন। রাজপুত গ্রাম বালকরা তাঁকে দেখে আড়ালে ছড়া কাটত।

আসাদ খান অ্যাইসা খোঁড়া

যুদ্ধ করেন থোড়া থোড়া।...

যা-ই হোক। যুদ্ধ একসময় থেমে গেল। হঠাৎ দুর্গাদাস রাঠোর উপস্থিত হয়েছেন বলে। শাহজাদা আকবর খুব অপমানিত বোধ করলেন। শাহজাদা আজম তাঁকে মেবারের দায়িত্ব থেকে হটিয়ে দিয়েছেন। বন্দি করার হুকুমও দিয়েছেন। এর বদলা তিনি নেবেন। জেহাদ। তিনিও একদিন বাদশা বনে যেতে পারেন। শুরু হল বিদ্রোহ। আর অভিযান।

একটি পত্র। খুবই ছোটো। কিন্তু বক্তব্য ভারী। পত্রটি লিখেছেন শাহজাদা আকবর। প্রাপক, শিবাজির বড়োপুত্র শম্ভাজি। কী লিখেছিলেন আকবর?

প্রথমে রাজস্তুতি। তারপর মূলকথা। বয়ান এরূপ: আপনি বীর, শৌর্যশালী উচ্চ আদর্শ সম্পন্ন রাজা। আপনার মহত্ত্বপূর্ণ সহযোগ পাব। সেই ভরসায় আপনার রাজ্য অভিমুখে যাত্রা করেছি। নর্মদা নদী পেরিয়ে নিরাপদে পৌঁছে গেছি। মহেশ্বরে। আমার সঙ্গে আছেন, রাঠোর বীর দুর্গাদাস। পত্রটি লেখা হয়েছিল, ১৬৮১ সালে ৯ মে, তারিখে।

এ পত্রের উত্তর অবশ্য মেলেনি। তাঁদের অপেক্ষারও সময় ছিল না। এগিয়ে যেতেই হল। বিজাগড়ের গভীর অরণ্য, সাতপুরা পর্বতমালা পেরিয়ে তাপ্তী নদীর তীরে এসে থামলেন। লক্ষ করলেন, মুঘল চৌকির সতর্ক প্রহরা। তাদের চোখ এড়িয়ে আবার শুরু হল পশ্চিমে যাত্রা। অরণ্য, পর্বত পেরিয়ে এসে পৌঁছোলেন, বগলনায়। সেখান থেকে আরও একটি পত্র লিখলেন, শম্ভাজিকে। তারও উত্তর মেলেনি। তবুও তাঁরা এগোলেন। থামার উপায় ছিল না। পথের ক্লান্তি ভুলে, নাসিক-কোঙ্কন হয়ে অবশেষে পৌঁছলেন, মারাঠা রাজ্যে।

ইতিমধ্যে খবর রটল। দক্ষিণ দেশ থেকে। আওরঙ্গজেব শুনলেন। আকবর ছদ্মবেশে ঘুরছেন। মুখে দাঁড়ি-গোঁফ নেই। মাথায় পাগড়ি। কানে মুক্তোর দুল। রাজপুত বনে গেছেন। পারিপাট্যে সম্ভ্রান্ত রাজপুত যেমন!

এবার এক বাদশার গল্প বলি। ঠিক বাদশা নয়। কল্পনা আর ঠাট-ঠমকে তাই!

জায়গাটার নাম পাদিশাপুর। না এমন নাম কেউ কখনো শোনেনি। হঠাৎ হয়ে ওঠে। পালি হয়ে উঠল পাদিশাপুর। কেমন করে হল, সেটাই বলি। শাহজাদা আকবর মারাঠা রাজ্য ধন্ধসা গ্রামে এসে থামলেন। সঙ্গে চার শত ঘোড়সওয়ার, কতিপয় পদাতিক এবং পঞ্চাশটি উট, মালপত্র বইবার জন্য। ওই গ্রামের দক্ষিণ দিকে ছিল একটি দুর্গ। দুর্গের নীচের দিকে পালিগ্রাম। সেই গ্রামে বেশ একটা বড়ো বাড়ি। ওপরে খড়ের চাল। তা হোক বাড়িটা তো বড়ো। তাতে বাদশা থাকবেন। বাড়িটির ভেতরে আদ্যন্ত নতুন সাদা কাপড়ে মুড়ে দেওয়া হল। খুব ভাল কার্পেট পাওয়া গেল না। চলনসই। তা-ই মেঝেতে পেতে দেওয়া হল। সৈন্য বাহিনীর থাকার ব্যবস্থা হল। কাছেই। দুর্গাদাস রইলেন আরও কাছে। তো সেই গ্রাম সেজে উঠল। নাম হল পাদিশাপুর।

পাদিশাপুরে রাস্তা তৈরি হল। তৈরি হল ঘরবাড়ি, জলাশয়। আর বাগিচা। বাদশার দরবারও বাদ গেল না। বাদশা দর্শন দেবেন। কথা বলবেন, আমজনতার সঙ্গে। এমন সব ব্যবস্থা শম্ভাজি করে দিলেন। কাজের তদারকি করলেন রাজার বন্ধু, ডান হাত কবি কুলেশ। নিন্দুকেরা বলত, কলুনিষ কবি। সেযাইহোক। তিনি শম্ভাজির পরামর্শে, বাদশার জন্য ঢের সৈন্য পাঠালেন। তাঁকে এক হাজার মুদ্রা ‘হুন’ পাঠানো হল। আর, উপঢৌকন হিসেবে একগাছি বড়ো মোতির মালা হীরের লকেটযুক্ত। মূল্যবান বস্ত্র সামগ্রী তো ছিলই। শম্ভাজির বিশেষ দূত নেতাজি পালকর সবসময়ই হাজির থাকতেন, ‘জো হুজুর’। মারাঠারাজের নির্দেশে, জেলা থেকে সুবেদারেরা বাদশার দরবারে হাজির হতেন। মূল্যবান বস্ত্র অলংকার নিয়ে।

আর, বাদশা নিযুক্ত করলেন দেওয়ান ও নানাবিধ কর্মচারী। রাজকীয় আদবে সন তারিখ ‘জুলুসি’ বর্ষ গণনা করে পত্র লিখতে শুরু করলেন। দু-হাজার অশ্বারোহী সৈনিক নিয়ে বাহিনী গড়ে উঠল। পাদিশাপুর জমজমাট।

শম্ভাজি এবার রাশ টানলেন। একটি কড়া চিঠি লিখলেন। ১৬৮১ সালের জুলাই মাসের শেষ দিকে। ‘যদি এভাবে সৈন্য বাড়িয়ে চলেন, তবে অন্য রাজ্যে চলে যান। আমার রাজ্যে থাকতে হলে, যে-অবস্থায় এসেছিলেন; সে-অবস্থায় থাকুন।’ শাহজাদার জন্য আর কোনো বাড়তি লোক দিলেন না। প্রতিদিনের খরচ বাবদ বরাদ্দ করলেন, ৬০ হুন (৩০০ টাকা)। হঠাৎ বাদশা বনে যাওয়া মানুষটির পক্ষে কিল হজম করা একটু শক্ত হল। তা হোক। প্রকৃত বাদশা হতে গেলে স্বপ্নের ঢেউ ভাঙতে হয়। ধৈর্য ধরতে হয।

রাঠোরজী বললেন: আকাঙ্ক্ষা বাস্তব করে তুলতে কঠিন শপথ নিতে হয়।

প্রকৃত বন্ধু, একান্ত সহচর বিচক্ষণ পরামর্শদাতা বীর যোদ্ধা তো বটেই। তিনি দুর্গাদাস রাঠোর। সকলে তাঁকে ভালোবাসেন। শ্রদ্ধা করেন। রাঠোরজী বললেন: আকাঙ্ক্ষা বাস্তব করে তুলতে কঠিন শপথ নিতে হয়। ডিঙোতে হয় সমস্যার পাহাড়। দুস্তর পথ! মনে বল, শক্তি, স্থৈর্য, সবই চাই।’ শাহজাদা আকবর সেকথা মানেন। তবু-ও উত্তেজনা ও ভয়, দুটোই সাংঘাতিক।

খবর ছড়াল। রাজা শম্ভাজি আসছেন। এরজন্য তিনি নাকি পাঁজি পুঁথি দেখছেন। শুভদিন খুঁজছেন। জ্যোতিষীর সঙ্গে এ নিয়ে কথাও হয়েছে তাঁর। বাদশাকে যথাবিহিত সম্মান জানানোর জন্য সাক্ষাৎ জরুরি। কিন্তু বাদ সাধলেন সেই জ্যোতিষী। বললেন, ‘উপযুক্ত সময় এখনও হয়নি। সম্রাট আওরঙ্গজেবের বিদ্রোহী পুত্রকে আরও একটু পরখ করা দরকার। ভেবে চিন্তেই এগোতে হবে।’

নিকোলাও মানুচি পর্যটক। আওরঙ্গজেব সময়কালের গল্প শুনিয়েছেন। শম্ভাজির কিছু বিরোধী মানুষজন, এর মধ্যে বৈমাত্রেয় ভাই রাজারাম ও তাঁর মা মীরাবাইও ছিলেন। ষড়যন্ত্র করে শম্ভাজিকে হত্যা করতে চাইলেন। উদ্দেশ্য, মারাঠা রাজসিংহাসনে রাজারাম বসবেন। এই ষড়যন্ত্রে, শাহজাদা আকবরের সাহায্য চাইলেন। রাজারাম সিংহাসনে বসলে শাহজাদাকে দিল্লির মসনদ প্রাপ্তিতে তাঁরাও সাহায্য করবেন। আকবর নেচে উঠলেন। সুযোগ বোধ হয় নাগালের মধ্যে এল! দিল্লির মসনদ তাঁর হাতের মুঠোয় পেতে আর দেরি হবে না। ভাবলেন অনেক কিছু। তবুও দুর্গাদাস রাঠোরের পরামর্শ না নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। তা-ই হল। দুর্গাদাস বললেন, ‘শাহজাদা ভুল করবেন না। এটা হয়তো রাজা শম্ভাজির একটা চাল। আপনাকে পরীক্ষা করার জন্য ষড়যন্ত্রের জাল নিজেই বুনেছেন। তার চেয়ে আপনি এই ষড়যন্ত্রের কথা পত্র লিখে রাজাকে জানিয়ে দিন।’

আকবর সেটাই করলেন। অপ্রত্যাশিত ফল হাতে হাতে পেলেন। এতে শম্ভাজি খুব খুশি হলেন। আকবরের সরলতার তারিফ করলেন। তিনি জানালেন, শীঘ্রই পাদিশাপুরে যাবেন। মৈত্রীর বন্ধন অটুট রাখবেন। দিন স্থির হল। তিনি যাবেন, ১৬৮১ সালের ১৩ নভেম্বর তারিখে। এরপর শুরু হবে, দিল্লির বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান।

শাহজাদা আকবরের খুশি খুশি ভাব। সম্রাট হওয়ার অধরা স্বপ্ন হয়তো সত্যি হতে চলেছে। ভীষণ যুদ্ধ হবে। তা হোক। তিনি রাঠোর বীর দুর্গাদাসের সঙ্গে সহর্ষে করমর্দন করলেন। কৃতজ্ঞচিত্তে বললেন, ‘আমি বাদশা হই বা না হই, গৌরবমাল্য কিন্তু আপনার!’ দুর্গাদাস শির উন্নত রেখেই হাসলেন। দুর্বোধ্য হাসি।

শারদীয়া প্রান্তর, ত্রিপুরা, ২০০৯

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%