শতরূপা সেনগুপ্ত
আমি বলছি আমারই এক বন্ধুর কথা, যার কথা বলে সত্যিই আর ফুরোনো যায় না; তবে তার কিম্ভূতপনা আর অদ্ভুতপনা আমাদের বন্ধুদের মনে বিরাট মজার খোরাকও যে জমাত এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। সেইরকম একটা মজার ঘটনাই এখন আমি তোমাদের বলছি। বন্ধুটির নাম হল বটুক সোম, কিন্তু আমাদের কাছে সেবিটলে সোম বলেই পরিচিত। কেন জিজ্ঞেস করছ? সেকাজও করে সব অদ্ভুত অদ্ভুত আর তার সঙ্গে ঘটেও সব বিটকেল বিটকেল কান্ড, তাই তার নামই হয়ে গেছে ‘বিটলে’।
খিদিরপুরে থাকতে আমরা যখন সবাই স্কুলে পড়তাম তখন বিটলে, সুনীল, কৌস্তভ, অভিরূপ আর আমাকে নিয়ে পাঁচ জনের একটি দল ছিল। তাই বটুক বা বিটলের সঙ্গে আমাদের পরিচয় বহুদিনের। তখন সবাই আমরা হাফ প্যান্ট পরতাম, ক্রিকেট খেলতাম, ঘুড়ি ওড়াতাম ও আড্ডা মারতাম। আমাদের পাঁচ জনকে সকলেই তাই পঞ্চমানিক বলে ডাকত। সত্যি বলছি তোমাদের, আমাদের তখনকার জীবনটা এতই সুখের ছিল যে আমরা যে একে অপরকে ছেড়ে অন্য জায়গায় কোনোদিন চলে যেতে পারি তা ভাবতেও পারতাম না। কিন্তু সব ভাবা কি ঠিক ঠিক হয় সবসময়? হয় না; এক্ষেত্রেও হল না। ক্রমশ সব বড়ো হয়ে গেলাম, হাফ প্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্ট ধরলাম, পড়াশুনার চাপে আড্ডা, খেলা এমনকী বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎটাও কমে যেতে লাগল।
আমরা পরে চলে গিয়েছিলাম কসবায়, কেউ ভবানীপুরে; কিন্তু বিটলেরা যে কোথায় গিয়েছিল তার কিছু জানি না। কারণ আমরা চলে আসবার পরও তারা খিদিরপুরেই ছিল। তারপরে শুনেছিলাম সেনাকি খুব হোমরাচোমরা এক দাঁতের ডাক্তার হয়েছে। সাধে কি বলি বিটলের সবই বিটকেলপনা! তাকে বলেওছিলাম, ‘ডাক্তার হওয়ারই যদি ইচ্ছে ছিল তো ভদ্রস্থ একটা কিছু হ, দাঁতের ডাক্তার হয়ে সকলের মুখের ভেতরের নোংরামি ঘাঁটবার দরকার কী?’ কিন্তু সেবলেছিল, না ভাই, দাঁতের যন্ত্রণা বিষম যন্ত্রণা, সবাই যদি অন্য অন্য ডাক্তার হয় তবে দাঁতের ডাক্তার হবে কে? যে-লোকগুলো দাঁত নিয়ে কাতরাচ্ছে, তাদের তবে কী গতি হবে? এরপর থেকে তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ নেই, যে যার নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত।
একদিন রবিবার সকাল বেলায় মা-র অর্ডার তামিল করতে মুদির দোকানে গিয়েছি আটা, ময়দা আর কিছু মশলাপাতি কিনতে। লিস্ট ধরে মেলাচ্ছি, হঠাৎই অনুভব করলাম ঘাড়ের কাছে একটা যেন কী সুড়সুড় করছে। ভাবলাম নিশ্চয় কোনো পোকামাকড় হবে। চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে পেলাম আর এক চমক! দেখি কোথা থেকে উদয় হয়ে বিটলে সোম ডট কম পেনের নিব দিয়ে সুড়সুড়ি দিয়ে আমায় ডাকছে। তোমরাই বলো বন্ধুকে ডাকতে হলে কি পেনের খোঁচা দিতে হয়, নাম ধরে ডাকা যায় না? যাইহোক কিছুটা অবাক হয়ে বললাম, ‘একী, তুই কোত্থেকে?’ এক মুখ হেসে বিটলে বলল, ‘আমরা গড়িয়াহাটে বাড়ি বদল করে চলে এসেছি কিছুদিন হল। এদিকে এসেছিলাম এমনি, তা তোর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কোথায় আছিস এখন?’
‘যেখানেই থাকি ভাই, আজ আর কোনো কথা শুনছি না, আমাদের বাড়ি যেতেই হবে, একেবারে লাঞ্চ করে বিকেলে চা খেয়ে বাড়ি যাবি।’
‘না রে, মাকে তো বলা নেই।’
‘না না, কোনো অজুহাত শুনব না; তুই বাড়ির ফোন নম্বর দে, মা ফোন করে দেবে কাকিমাকে।’ এরপর বিটলেকে নিয়ে চললাম আমাদের বাড়ির দিকে। মা রান্নাই করছিলেন। বিটলেকে দেখে মা খুব খুশি, খাওয়াদাওয়া করে বিকেলে যাবে শুনে আরও খুশি। কুশলবার্তা ও একথা-সেকথার পর আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোর দাঁতের ডাক্তারি কেমন চলছে?’
‘ভালোই তো চলছে, তবে জানিস ভাই সেদিন একটা খুব অদ্ভুত কান্ড ঘটে গেছে।’
‘তোর নামই তো বিটলে তোর সঙ্গে অদ্ভুত কান্ড ঘটবে না তো কী? তবে কান্ডটা কী একটু খুলে বলবি?’
‘নিশ্চয়ই, সে এক রীতিমতো গল্প। তবে শোন—’
বিটলে আরম্ভ করল: আমার ডিসপেন্সারি হল গোলপার্কে সিটি কলেজের কাছে। সেদিন দোকান বন্ধ করে রাত ন-টার সময় বাড়ি ফেরবার প্রস্তুতি নিচ্ছি, এমনসময় এক মাঝবয়সি ভদ্রলোক খুব হন্তদন্ত হয়ে এসে বললেন, ‘আমার নাম অরুণ ধর। আমার ডান দিকের কশের দাঁত নিয়ে আমি খুব যন্ত্রণা পাচ্ছি কিছুদিন ধরে। কিছু খেতে পারি না, রাতে ভালো ঘুমও হয় না ঠিকমতো, প্যারাসিটামল খেয়ে কোনোরকমে আছি তা ডাক্তারবাবু। আপনি এই দাঁত যদি কালই তুলে দেন তো খুব ভালো হয়।’
সব শুনে আমি ভাবলাম এত রাত্তিরে কষ্ট করে যখন এসেছে বেচারি, তখন তাকে তো আর ফিরিয়ে দিতে পারি না, তাই তাঁর দাঁতটাতগুলো একটু দেখে বললাম, ‘দাঁত তো এক্ষুনি এক্ষুনি তোলা যাবে না, তার আগে কিছু ওষুধ খেতে হবে।’
‘ডাক্তারবাবু আপনার ফিস কত?’

C-প্যারাসিটামল খেয়ে কোনোরকমে আছি তা ডাক্তারবাবু
‘আমার ফিস তিনশো টাকা, তবে দাঁত তোলার ব্যাপার থাকলে সব মিলিয়ে পাঁচশো টাকা মতো লাগে।’
এবার লোকটা মনে মনে কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল তারপর বলল, ‘ডাক্তারবাবু আমার তো খুব-একটা সামর্থ্য নেই, তবে দাঁত তোলবার দরকার হলে কি পাঁচশো টাকার কমে কোনোমতেই হয় না?’ একটু ভেবে তাকে বললাম, ‘দেখুন দাঁত তুলতে গেলে তো অ্যানিস্থিসিয়া করতে হবে, তার একটা খরচা আছে, সেটা প্রায় তিনশো টাকা; আর তোলার জন্য দুশো টাকা।’
‘তাহলে, পাঁচশো টাকার কমে কিছু হবে না কেমন?’
‘দেখুন, একটি উপায় আছে, আপনি যদি অ্যানিস্থিসিয়া না করে দাঁত তোলান, তবে আপনার সেই খরচটা হয়তো বেঁচে যাবে কিন্তু তাতে আপনার এতই প্রচন্ড ব্যথা লাগবে যে সেটা হয়তো আপনি সহ্য না-ও করতে পারেন।’
একথা শুনে আবার লোকটা কীসব ভাবতে লাগল। কিন্তু কী আশ্চর্য, ডাক্তারের কাছ থেকে লাগার কথা শুনেও সে বিন্দুমাত্র বিচলিত হল না! বরং বলল, ঠিক আছে, আপনি আমায় ওষুধ লিখে দিন, পাঁচ দিন পরে এসে বিনা অ্যানিস্থিসিয়াতেই আমি দাঁত তুলব।
আমিও তাকে ওষুধ লিখে দিলাম, তবে তার হাত-কচলানো দেখে দয়াপরবশ হয়ে আমার ভিজিটটা আর নিইনি। ভেবেছিলাম সে ভয় পেয়ে বোধ হয় আর আসবে না। ও মা! দেখি ঠিক পাঁচ দিন পরে সে এসে হাজির হয়েছে দাঁত তুলতে। যাইহোক তাকে বসালাম সিটে। জানিস ভাই, আমারই কেমন ভয় ভয় করছিল ওইরকম বিনা অ্যানিস্থিসিয়ায় দাঁত তুলতে। কিন্তু কী আশ্চর্য জানিস? লোকটা একটুও ট্যাঁ-ফোঁ করল না, কাতরাল না, বাবা গো মা গো করল না, দিব্যি স্বাভাবিকভাবে অবলীলায় ওই অমানুষিক কষ্টকে জয় করে নিল। আমি তো দেখে যারপরনাই অবাক; ভাবলাম এটা কী করে সম্ভব হল! ইঞ্জেকশন দিয়ে দাঁত তুলতেই মানুষ হিমশিম খায়, আর এ কিনা বিনা ইঞ্জেকশনেই দাঁত তুলল! তারপর তো জানিসই আমার শরীরে দয়ামায়া একটু বেশি। ভাবলাম লোকটার যে এত প্রচন্ড সহ্যশক্তি, এত যে কষ্ট জয় করবার ক্ষমতা, তারজন্য এর একটা কিছু পুরস্কার প্রাপ্য। তাই শেষে আমি তাকে সত্যিই পাঁচশো টাকা তার পকেটে গুঁজে দিয়ে বললাম, ‘মশাই, আমি আপনার দাঁত তুলেছি ঠিকই কিন্তু আপনি যে অসীম সহ্যশক্তি ও সাহস দেখালেন তার পুরস্কার স্বরূপ এটা রাখুন।’ লোকটা খুশি হয়ে চলে গেল। সে-ই সে দিনকার মতো শেষ রুগি ছিল তাই সে যাবার পর দোকান বন্ধ করে বাড়ি এলাম। এসে স্নান করতে যাব এমন সময় আমার আর এক ডাক্তার বন্ধু অমলের ফোন এল।
‘ড. সোম, আজ একটা অভাবিত কান্ড ঘটেছে আমার এখানে। কথাটা বলতে গিয়ে প্রথমে তোমার মুখটাই মনে পড়ল তাই ...’
‘কী হয়েছে?’
‘একটি লোক আমার কাছে দাঁত তোলবার জন্য এসেছিল। সে বলল যে তার এত যন্ত্রণা হচ্ছে যে সে ওষুধ না খেয়েই দাঁত তুলতে চায়। তাকে ইঞ্জেকশন দিয়ে বসিয়ে রেখেছিলাম কিন্তু আশ্চর্য যে দাঁত তোলবার সময় তাকে আর কোথাও খুঁজে পেলাম না, কর্পূরের মতোই যেন উবে গেল; অথচ যন্ত্রণায় সেনাকি এক মিনিটও দাঁড়াতে পারছিল না।’
কথাটা শুনে আমার যেন কেমন একটা খটকা লাগল। মনে হল আমারও এই অদ্ভুত কেসটার সঙ্গে যেন অমলের এই ব্যাপারটার কোনো যোগাযোগ আছে। তাই জিজ্ঞেস করলাম, ‘তার নাম কী?’
‘অরুণ ধর।’
শুনে আমার বাক্যি হরে গেল, মাথা বনবন করতে লাগল। তারপর জলের মতো অঙ্ক মিলিয়ে ফেললাম। তার মানে লোকটা অমলের কাছ থেকে ইঞ্জেকশন নিয়ে আমার কাছে এসে দাঁত তুলিয়ে গেল, তাই কোনো কাতরোক্তি করল না। আর আমি কিনা ভাবলাম তার অসামান্য সহ্য ক্ষমতা! তারজন্য আবার আমি তাকে পাঁচশো টাকাও দিলাম, আর ওষুধ লেখার দিন ফিসটাও নিইনি। এখন ভাবছি লোকটার অসামান্য সহ্যক্ষমতা না অসামান্য বুদ্ধি? দু-দুটো ডাক্তারের মাথায় টুপি পরিয়ে সে দিব্যি চলে গেল নিজের কাজ সেরে। শত কাজের মধ্যেও তার বুদ্ধির নমুনা দেখে সত্যি তাকে স্যালুট করতে ইচ্ছে হল। ধুরন্ধর বুদ্ধি বটে!
আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে বিটলে বলল, ‘কী রে অদ্ভুত গল্প না? বুঝলি তো সবটা?’
মুখটা আমার সত্যি হাঁ হয়ে গিয়েছিল কোনোরকমে হাঁ-টা বন্ধ করে বললাম, ‘তোর সঙ্গে তো এই বিটকেল ব্যাপার হবেই, তুই যে আমাদের চিরকালের বিটলে।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন