ভৌতিক বাড়ি

শতরূপা সেনগুপ্ত

সবিতেন্দ্র ওরফে সাবু, সৌমেন্দ্র ওরফে সোমু, তপেন্দ্র ওরফে তপু—এরা তিন ভাই। আপাতত পুজোর মরশুম শেষ, মানে পুজোর আমোদ-আহ্লাদও শেষ, সামনে ক্লাসে ওঠার পরীক্ষা তাই লক্ষ্মীছেলে সোমু সব কিছু অগ্রাহ্য করে খুব মন দিয়ে পড়বার চেষ্টা করছিল। এমন সময় সব সুর কেটে দিয়ে কলিং বেলটা ক্রিং ক্রিং করে জোরে বেজে উঠল। সোমু-ই উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। সাইকেল থেকে নামল একটি লোক।

‘সবিতেন্দ্র চ্যাটার্জি আছেন? কুরিয়ার আছে।’ সোমু চেঁচিয়ে ডাকল, ‘ও দাদাভাই তোমার নামে চিঠি এসেছে।’ সাবু এসে চিঠিটা সই করে নিল।

বছর দুয়েক আগে সাবু ডাক্তারি পাস করেছিল মেডিকেল কলেজ থেকে। কিন্তু ডাক্তারি পাস করে তো আর চুপচাপ বসে থাকা যায় না, তাই নিজের বাড়িতেই সেএক চেম্বার খুলে বসেছিল; রোজগারও হচ্ছিল কিন্তু তবুও পরীক্ষাটরিক্ষাগুলো দেওয়া-টেওয়া সেঠিকই চালিয়ে যাচ্ছিল ভেতর ভেতর। কারণটা বলি শোনো। সবিতেন্দ্রর মনটা ছিল একটু অন্য ধরনের। কলকাতায় নিজের বাড়িতে চেম্বারে বসে চিকিৎসা করলেও তার উজাড়-করা সহানুভূতি পড়ে আছে গ্রামের দুস্থ মানুষগুলির জন্য, যেখানে টাকাপয়সা বা সেবাযত্নের অভাবে সত্যিই বিনা চিকিৎসায় যারা মৃত্যুমুখে চলে যায়। সে চায় গ্রামে এক সুন্দর হাসপাতাল তৈরি করে সেইসব অভাবী মানুষদের মৃত্যুর পথ রোধ করতে। একদিন একটা বিজ্ঞাপন দেখে সরকারের স্বাস্থ্য দপ্তরে একটা লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষাও সে দিয়েছিল, কিন্তু বছর ঘুরে গেল কোনো খবরই বেরোল না, তাই বাড়িতেই চেম্বার খুলতে সেবাধ্য হল।

এবার চিঠিখানা হাতে পেয়ে খামের ওপর সরকারের নাম এবং যেখান থেকে আসছে সেই স্বাস্থ্য দপ্তরের সিলমোহর দেখে তার বুকের মধ্যে ঢিপ ঢিপ দুরুদুরু করতে লাগল, কপালে দেখা গেল ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। ভগবানের নাম নিয়ে চিঠিটা খুলে আনন্দে উত্তেজনায় সে যে কীভাবে কী করবে তা বুঝে উঠতে পারল না— ‘মা শিগগির এসে দেখে যাও কী এসেছে!’

মা মেনকা দেবী হয়তো ঘরের কোনো কাজ করছিলেন, সাবুর অমন অতর্কিত চিৎকার শুনে বাইরে এসে বললেন,

‘কী রে, অমন পাগলের মতো চেঁচাচ্ছিস কেন?’

‘চেঁচাব না? মা তোমার মনে আছে বেশ কয়েক মাস আগে আমি একটা চাকরির পরীক্ষা দিয়েছিলাম? সেই চাকরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আজ এসেছে, মানে চাকরিটা আমার হয়ে গেছে।’

‘ও মা! বলিস কী? জয় মা মঙ্গলময়ী। তা কোথায় হল বাপ?’

‘একটু দূর হয়ে গেল এই যা।’

মা বললেন, ‘কোথায়?’

‘পান্ডবেশ্বর গ্রামের আশেপাশে কোথাও একটা হবে। সপ্তাহে সপ্তাহে সেখান থেকে আসা যাবে কিন্তু রোজ যাতায়াত করা যাবে না।’

এতক্ষণ বড়োদের এই কথাগুলো হাঁ করে গিলছিল সোমু। ওর ছোটো মাথায় ছোটো বুদ্ধিতে যেটুকু বুঝতে পারল, তা-ই তার ভাই তপুকে বলতে গেল।

‘তপু, এই তপু, কোথায় গেলি রে? শিগগির শোন।’ তপুও হয়তো ঘরে কিছু করছিল বেরিয়ে এসে বলল, ‘কী রে কী হয়েছে?’

‘শোন শোন, দাদাভাই একটা চাকরি পেয়েছে, বুঝলি? ক-দিন পরেই আমাদের কাছ থেকে ও চলে যাবে। ওখানে ও একলা একলাই থাকবে।’

‘কিন্তু ও একলা থাকবে কী করে? ভয় করবে না ওর? এখানে কি আর একেবারেই আসবে না?’

সোমু বলল, ‘ও বলছিল এখানে রোজ আসবে না তবে সপ্তাহে সপ্তাহে আসবে।

শুনে তপু একটু মনমরা হয়ে বলল, ‘চাকরি পেতে গেলে অনেক পড়তে হয় না রে? আবার একলাও থাকতে হয়। কেন যে লোকে পড়াশুনো করে!’

‘সেইখানেই তো মুশকিল। তবে দেখিস তপু, আমরাও খুব বড়ো চাকরি করে বাবা-মার মুখ উজ্জ্বল করব।’

এরপর বাবা-মা সকলে খুব স্বাভাবিকভাবেই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন সাবুর যাওয়া নিয়ে। দেখতে দেখতে যাবার দিনও এসে গেল। সকলের আশীর্বাদ, শুভেচ্ছা নিয়ে সাবু চলল নতুন চাকরিতে জয়েন করতে। যাবার সময় সোমু-তপু সাবুকে দিয়ে প্রমিস করিয়ে নিল যে পরের বার এসে অবশ্যই তাদের নিয়ে যেতে হবে।

পান্ডবেশ্বরের কাছে সোনাঝুরি গ্রামটা একেবারে অজ পাড়াগাঁ; পান্ডববর্জিতও বলা যায়। চতুর্দিকে ঝোপঝাড় বঁাশবাগান, আকাশছোঁয়া তাল গাছ, বট গাছ ঘিরে আছে। অশ্বত্থ গাছও কিছু আছে জঙ্গলের আনাচেকানাচে। আর চারিদিকে আছে খানাখন্দ, খালবিল, পুকুর। সোনাঝুরিতে কারেন্ট নেই, ঘরে ঘরে হ্যারিকেন জ্বলে আর জ্বলে কুপি ও মোমবাতি। সব মিলিয়ে পরিবেশটা বেশ ভূতের পক্ষে উপযোগী। তবে সাবুর বাড়িটাতেই একমাত্র আলো আছে। বাড়িটার নাম ‘বনছায়া’। ওইরকম একটা গ্রাম বিভুঁইয়ে যে ‘বনছায়া’র মতো একটা বাড়ি পাওয়া গেছে এটাই যথেষ্ট।

বাড়িটা দোতলা হলেও খুবই পুরোনো ছিল। ভাঙাচোরা নড়বড়ে দরজা-জানলা, কড়িবরগার সিলিং। বাড়ির দেওয়াল ফুঁড়ে বেশ কিছু জঙ্গলের গাছও মাথাচাড়া দিয়ে বেরিয়ে বাড়ির অনেক জায়গাতেই ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে। অত বড়ো বাড়িতে মানুষ বলতে একা সবিতেন্দ্র। প্রথম দিনে সাবু যখন ওই বাড়িতে গেল, সেদিন কেন জানি না ওর সারা শরীরটা একটু ছমছম করে উঠেছিল। দোতলাতেই সারি সারি পাঁচ-ছটা ঘর আর তার সামনে লম্বা একটা করিডোর বা বারান্দা। সাবু যে-ঘরটাতে থাকবে সেটা চার নম্বর ঘর, বেশ ভব্যিযুক্ত। বেশ বড়ো ঘর তাই সেটাকে দু-ভাগে ভাগ করা আছে। একদিকে আছে শোবার ঘর ও বাথরুম আর অন্যদিকে বসবার জায়গা, খাবার জায়গা ও তার সংলগ্ন এক রান্নাঘর। বসবার জায়গায় একটা টিভি-ও লাগানো আছে। রঘু বলেছিল বহু বছর আগে নাকি এই গাঁয়ে এক মস্ত জমিদার ছিলেন। তিনিই নাকি এই বাড়িটা তৈরি করেন। রোজ রাতে তিনি এ বাড়ি আসতেন। নাচ, গান, জলসা হত আবার সকালে বাড়ি ফিরে যেতেন। তখন ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় গোটা বাড়িটা ঝলমল করত ও প্রতিটি ঘর থেকে ভেসে আসত সুমধুর সংগীত।

রঘু সাবুর সুটকেসটা বিছানার ওপর আর জ্বলন্ত হ্যারিকেনটাকে রাখল টেবিলের ওপর। বলল, ‘এটাই আপনার থাকবার ঘর ডাক্তারবাবু। আপনি এখন বিশ্রাম করুন আবার রাতে আপনার খাবার নিয়ে আমি আসব।’ সাবু খুব ক্লান্ত ছিল তাই হ্যারিকেনটা কমিয়ে জামা-প্যান্ট পরেই বিছানায় গা এলিয়ে দিল।

এমনিতে সব ঠিকই ছিল কিন্তু মুশকিল হল রান্নাঘরটা নিয়ে। সেটাকে নিয়ে অনেকই বিদঘুটে ব্যাপার শুরু হল। ওই ঘরে সব পুরোনো প্যাকিং বাক্স আর অপ্রয়োজনীয় কিছু জিনিস রেখে সবসময়ই ঘরে তালাচাবি দেওয়া থাকত, তবুও বহু সময়েই কারণে অকারণে ওই ঘর থেকে ধুপ ধাপ আওয়াজ শোনা যেত, মনে হত দরজা ধাক্কা দিয়ে কেউ যেন বেরিয়ে আসবার চেষ্টা করছে, এমন কী সাবু সে-দরজা কেঁপে উঠতেও দেখেছে। আর একটা ব্যাপারে ভয়ে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠত সাবুর, যখন মাঝরাতে ওই ঘর থেকে কোনো নারীকন্ঠের খিলখিল হাসি, গুনগুন করে গান, গোঙানি বা মড়াকান্নার মতো একটা আওয়াজ শোনা যেত। তখন সাবুর মনে হত ওর সঙ্গে যেন কেউ বসবাস করে ওই বাড়িতে। সেদিন রাতের খাওয়া হয়ে গেছে সাবুর, রাত এগারোটা নাগাদ সদর দরজাটা বন্ধ করতে যাবে এমন সময় করিডোরে দেখল, একটা লম্বাটে লোক সাদা পায়জামা ও সাদা পাঞ্জাবি পরে সামনের রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সাবু চিৎকার করে বলল, ‘কে? কে ওখানে? কে আপনি? কাকে চাই?’ কোনো উত্তর এল না, এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকবার পর লোকটা সিঁড়ি দিয়ে চটি পরে শনশন করে নেমে গেল কিন্তু কোনো আওয়াজ হল না। সাবু খুব ভয় পেয়ে ধড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে ঘরে এসেই বিছানায় বসেই রাতটা কাটিয়ে দিল আর পরিষ্কার বুঝতে পারল বাড়িটা একটা ভৌতিক বাড়ি।

এইসব কথা সাবু অবশ্য তার ভাইদের বলেনি। যতই হোক ওরা সব ছেলেমানুষ, একবার আনন্দ করে আসতে চেয়েছে, আগে থেকে ভয় পেলে হয়তো আর আসতেই চাইবে না। সত্যি সাবুর ফেরার সময় এবার সোমু আর তপু বায়না ধরল যে তারাও তাদের দাদাভাইয়ের সঙ্গে যাবে। তাদের স্কুলে এখন বড়োদিনের ছুটি, অতএব পড়াশুনোর কোনো বালাই নেই আর অন্য কারোরও বলবার কিছু নেই। তাই সোমু আর তপুকে সঙ্গে নিয়ে সাবু সোনাঝুরিতে চলে গেল।

বাড়িটা দেখে ভাইয়েরা খুব খুশি। কী সুন্দর চারদিক খোলামেলা, তাদের খুব মনোমতো। সব ঘরগুলো তারা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল।

‘তোমার বাড়িটা কী ভালো দাদাভাই, ইস এখানে যদি আমরা সকলে থাকতাম...’ — সোমু বলল।

‘আমার কিন্তু সবচেয়ে পছন্দ এই টিভিটা। বাবা-মা যা ‘‘পড়তে বোস’’ ‘‘পড়তে বোস’’ করেন, কিছু দেখতেই পাই না, এখানে বেশ প্রাণভরে টিভি দেখব। না রে?’

‘হ্যাঁ, ফিরব তো সেই শনিবার, আর আজ তো সবে রবিবার। পুরো ছ-দিন! উফ কী মজা!’

এরপর রঘুর আনা খাবার ও বিকেলে চা-টা খেয়ে সাবু ভাইদের নিয়ে একটু কাছেপিঠে আশপাশটা ঘুরিয়ে আনল। কাছেপিঠের মন্দির, কিছু কয়লাখনি, কয়লাখনির পেছনের দিকে জঙ্গলে ঘেরা শ্মশানটাও সাবু তাদের দেখাল। শ্মশানের ধারে পাশেই তার অফিসটা; সেখানটা খানা ডোবা পুকুরে ভরতি। সেই পুকুরে নাকি বহুজনেই জলে ডুবে আত্মহত্যাও করেছে, তাই ভয়ের চোটে রাতের বেলা কেউ ওদিক মাড়ায় না। কিন্তু সাবু তো আর পাগল নয় যে সেভাইদের ওইসব কথা বলবে। বলেওনি। গ্রামগঞ্জের রাস্তাঘাট ভালো নয়, আর বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। সবজায়গায় আলো নেই তাই টর্চের ভরসায় অতি সাবধানে তারা পথ চলছিল। বাড়ি ফিরে তারা দেখল যে রঘু খাবার নিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছে।

গ্রামে বোধহয় বেশি রাত পর্যন্ত কেউ জেগে থাকে না। সন্ধ্যার পর একটু অন্ধকার হলেই যখন চারদিক সব নিজঝুম নিস্তব্ধ হয়ে যায়, তখন খেয়ে নিয়ে তারা শুয়ে পড়ে। সাবুরাও তাই শুয়ে পড়ল আলো নিভিয়ে, পাশে রইল চার ব্যাটারির বড়ো টর্চ। সোমু জিজ্ঞাসা করল, এত আগে শুয়ে তোমার ঘুম হয় দাদাভাই?

‘আগে হত না রে, তবে আজকাল হয়; আর কীই-বা করব এখানে?’ বলে সাবু নাকডাকায় মন দিল। ঘরের আলো নেভানো কিন্তু খুদে দুটোর কিছুতেই ঘুম এল না। তপু হঠাৎ ‘উফ’ বলে একটা স্বগতোক্তি করল।

C-রাত এগারোটা নাগাদ... রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে

‘কী রে চমকালি কেন?’ সোমু জানতে চাইল।

‘ওই দেখ-না।’ সকলে সবিস্ময়ে দেখল মশার তেলসমেত গুডনাইটটা নিজে থেকেই ছিটকে এসে ঘরের মেঝেতে পড়ে রয়েছে। সাবুর ঘুম ততক্ষণে ভেঙে গেছে, সেভাবল এ কেমন হল, দরজা-জানলা সব বন্ধ আর বন্ধ ঘরে তো হাওয়া আসতে পারে না! এরপর অনেকক্ষণ কেটে গেছে, খুদে ভাইরা জেগেই শুয়ে রয়েছে আর ভাবছে রাতটা কাটলে বঁাচি। এমন সময় আবার তাদের মনে হল খাটের পায়া ধরে কে যেন টানছে।

‘খাটের পায়া নড়ছে দাদাভাই! ভীষণ ভয় করছে, প্লিজ আলোটা জ্বালাও।’ তৎক্ষণাৎ সাবু টর্চ জ্বেলে ঘরের চারিদিকে আলো ফেলে দেখল— না, কেউ কোথাও নেই। উঠে গিয়ে ঘরের আলো জ্বালিয়ে দিল, মুখ-চোখে একটু জল দিল। ঘড়িতে দেখল দুটো বাজতে দশ মিনিট। এবার গিয়ে আবার শুয়ে পড়ল, তবে সারারাতই আলো জ্বালা থাকল।

পরের দিন সকালের রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনটা দেখে সোমু আর তপুর মনটা আবার ভালো হয়ে গেল। রাতের ভয়ের কথাও তাদের আর মনে পড়ল না। ভালো-মন্দোয় মিশিয়ে সারা দিনটা বেশ সহজভাবে কেটে গেল।

এল রাত। তারা যখন আবার বিছানায় শুয়েছে, তখন দেওয়াল ঘড়িতে ঢং ঢং করে দশটা বাজল। শোয়ার পক্ষে সময়টা বেশই তাড়াতাড়ি কিন্তু আর কীই-বা করার আছে? খাওয়া যখন হয়ে গেছে তখন শুতে তো হবেই। কিছুক্ষণ যেতে না যেতে সোমু-তপুর মনে হল সদর দরজায় কে যেন ঠক ঠক করছে আর সেইসঙ্গে রান্নাঘরের ভেতর থেকে দরজা ধমাস ধমাস করে এক নারীকন্ঠ যেন কেঁদে কেঁদে বলছে— ‘আমায় মুক্তি দাও, মুক্তি দাও, মুক্তি দাও।’ প্রচন্ড এক জোর শব্দে এবার সবিতেন্দ্রর ঘুম ভেঙে গেল, নিস্তব্ধ বাড়িখানা থরথর করে কেঁপে উঠল। দেখল রান্নাঘরের দরজাটা প্রায় ভাঙবার উপক্রম হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়— বেশ কিছুক্ষণ ঠক ঠক আওয়াজটা হবার পর সেটা আস্তে আস্তে থেমে গেল, এবার তারসঙ্গে নারীকন্ঠের সেই কান্নাটাও।

তারপর যা এক দৃশ্য তারা দেখল তাতে তাদের বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল, মুখ-চোখ ফ্যাকাশে সাদা হয়ে গেল। দরজায় কড়া নেড়ে কাজ হয়নি বলে একেবারে সটান সামনাসামনি চলে এসেছে। তারা তিন জনেই দমবন্ধ করে দেখল ঘরের কোণে এক জোড়া গুলিভাঁটার মতো লাল চোখ নিয়ে এক ভূতমূর্তি একদৃষ্টে তাকিয়ে তাদের যেন গিলে খেতে আসছে। সেই চোখে মণি বলে কোনো বস্তু নেই, পুরোটাই একটা আগুনের ডেলা। দন্তহীন মুখ বিস্ফারিত করে তাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে। সেযেন এক বিশাল গহ্বর! সাবুরা অনুভব করল ভূতটা এত জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে যে তাতে সর্বশরীরের লোম যেমন খাড়া হয়ে যাচ্ছে, তারসঙ্গে এক হিমেল হাওয়ার স্পর্শও টের পাওয়া যাচ্ছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক অপরূপ সুন্দরী নারীমূর্তি, তার লম্বা এলোচুল, পরনে অতি সুন্দর এক বেনারসি শাড়ি ও পায়ে নূপুর পরা। হাতছানি দিয়ে সে সোমুকে ডাকছিল। সাহসী ছেলে সাবুকে ঘটনাটা দারুণ ভয় পাইয়ে দিল। ভয়ের চোটে কেউই বিছানা ছেড়ে নড়তে পারছিল না, কিন্তু একমাত্র সোমুই মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই নারীর কাছে যাবার চেষ্টা করছিল। সর্বশক্তি প্রয়োগ করে সাবু বঁা-হাতে টর্চটা নিয়ে সোমুকে জাপটে ধরল, বলল, ‘যাস না সোমু ফিরে আয়, ওই মায়াবিনি তোকে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলবে।’ সাবুর আর্তনাদ শুনে সেই নারী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল, তারপর খিলখিল করে হাসতে হাসতে অদৃশ্য হয়ে গেল। সোমু তখন দাদাভাইয়ের বুকে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে রয়েছে। নারীমূর্তি অদৃশ্য হওয়ায় কিছুটা মনে বল পেয়ে সাবু টর্চ জ্বালিয়ে চারিদিকে ঘোরাতে লাগল কিন্তু ভূতমূর্তিটাকে আর দেখা গেল না।

কিন্তু এরপর কি আর শুয়ে থাকা যায়? সোমু-তপুর পক্ষে কি আর ওই ভৌতিক বাড়িতে মা-বাবাকে ছেড়ে থাকা সম্ভব? পরের দিন সকালে খুদে দুটোর কান্নাকাটি ও অসম্ভব জেদাজেদিতে সাবু সেইদিনই প্যাসেঞ্জার ট্রেন ধরে কলকাতায় চলে এল। সাবু সরকারের কাছে আবেদন করে সমস্ত ঘটনা জানিয়ে বলল তাকে যদি কোনো শান্তিপূর্ণ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়া যায় তবেই সে আবার ওই চাকরিতে যোগদান করতে পারবে, নয়তো নয়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%