শতরূপা সেনগুপ্ত
রাসু-বাসুর মা-বাবা এবার ঠিক করেছেন যে এবারের পুজোর ছুটিতে রাসুদের মামারবাড়ি বোলপুরে যেতেই হবে। প্রতি বছরেই তাঁরা বেড়াতে যান কিন্তু বোলপুর আর কখনোই যাওয়া হয় না। ওদিকে বাবা-মা-ভাই ভাইয়ের বউরা খুব দুঃখ করে যে বোলপুর এত নিরিবিলি ও শান্তির জায়গা, গাছে গাছে আম জাম কাঁঠালের এত প্রাচুর্য যে বলবার নয়; তা ছাড়া বিভিন্ন ধরনের ফুল তো আছেই। তাঁদের বক্তব্য যে, কলকাতার কাজের চাপের যে যাঁতাকল, তার থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য মাঝে মাঝে এইসব নিরালা শান্তিপ্রিয় জায়গায় একটু আসা দরকার; তাতে মনও শান্ত হয় আর কাজের এনার্জিও বাড়ে। এইজন্যই ঠিক হয়েছে যে এবার তাঁরা বোলপুরই যাবেন তবে বলে-কয়ে নয় একেবারে হঠাৎ করে গিয়ে উদয় হওয়া; যাকে বলে ‘সারপ্রাইজ ভিজিট’।
এই খবরটা সংগ্রহ করেই বাসু এসে খবর দিল তার দাদা রাসুকে, ‘জানিস দাদা, এবারে পুজোয় বেড়াতে যাওয়াটা না একটা স্পেশাল কিছু হবে।’
‘কেন রে, পুজোয় তো প্রতিবারই কোথাও না কোথাও যাওয়া হয়, এবারেও যাব তাতে স্পেশাল কী?’
‘আছে আছে, এ একেবারে খোলা আকাশের নীচে প্রকৃতির কোলে ...’
‘আঃ হেঁয়ালি করছিস কেন, সব কিছু একটু খোলসা করে বলবি?’
‘তবে শোন।’
এই ফাঁকে তোমরাও শুনে নাও বন্ধুরা।
‘এবার মা-বাবা ঠিক করেছেন যে আমাকে তোকে আর টুকুনকে নিয়ে আমাদের মামারবাড়ি বোলপুরে যাবেন প্রায় এক মাসের জন্য। ভাবতে পারিস? রেলগাড়ি চেপে খোলা আকাশ, খোলা মাঠ, সবুজ খেতের আলের ওপর দিয়ে রাখাল ছেলের বঁাশির ডাক শুনতে কীরকম লাগবে?’
‘দেখ ভাই, তোর মতো অত কল্পনাশক্তি আমার নেই তবে এটা যে দারুণ সুখের ব্যাপার তা নিয়েও সন্দেহ নেই।’
ছোটোভাই বাসু এই প্রস্তাবে এতটাই উত্তেজিত যে সে বলেই ফেলল, ‘জানলার ধারে বসে প্রকৃতিকে দেখা; ঝালমুড়ি, বাদামভাজা, কেক, বিস্কুট, গরম চা, পুরি-সবজি আরও কত ধরনের ফেরিওয়ালার ডাক মনে করে কলকাতার বিছানায় বসেই যে জিভে জল এসে যাচ্ছে দাদা।’
আসলে একটা কথা এইবেলা তোমাদের চুপি চুপি বলি শোনো। ছোটো-বড়ো প্রত্যেকের মধ্যেই না একটা শিশুভাব লুকিয়ে থাকে। ছোটোরা যা করে, বড়োদেরও তাই করতেই ইচ্ছে হয় মাঝে মাঝে, কিন্তু লজ্জায় বড়োরা সেটা করতে পারে না বা বলতে পারে না ছোটোদের কাছে ছোটো হয়ে যাওয়ার লজ্জায়, বুঝলে? কিন্তু ছোটোদের মনে কোনো দ্বিধা নেই তাই সেটাকে তারা প্রকাশ করে ফেলে উত্তেজনার বশে। বোলপুরে যাওয়ার কথা শুনে রাসু-বাসু আনন্দে নাচছে, স্বপ্ন দেখছে কিন্তু তাদের বাবা সুবিমলবাবুও যে অফিসের বিশাল কর্মচক্র থেকে ছুটি পেয়ে কিছুদিনের জন্য বেড়াতে যাবেন এতে কি তাঁর ভালো লাগছে না? নিশ্চয়ই লাগছে, না হলে নিজে থেকে তিনি কখনো টিকিট কাটার কথা বলেন? আর মা? মা-রও কি ভালো লাগছে না সারা বছর হেঁশেল ঠেলার পর মাস খানেকের জন্য গিয়ে বাপের বাড়ির আরাম খেতে? যাক গে, টিকিট কাটার কথা শুনে রাসু-বাসুর যে খুব স্বস্তি হল তা বলাই বাহুল্য।
পরের দিন সকাল বেলা ভাতটাত খেয়ে, চাদর নিয়ে মুখে পান গুঁজে বাবা যখন অফিসে বেরোতে যাবেন তখন একটা পিয়োন এসে একটা চিঠি দিল বাবাকে। চিঠিটা এসেছে বোলপুর থেকে। রাসু-বাসু-টুকুন ও মা সকলেই খুব আগ্রহী হলেন চিঠিতে কী আছে দেখবার জন্য। চিঠিটা পড়েছে বাবার হাতে, অতএব বাবা-ই আগে পড়লেন সেটা; কিন্তু পড়ে যেন সত্যি তিনি বোবা হয়ে গেলেন। এরপর মা চিঠিটা নিয়ে জোরে জোরে সকলকে শুনিয়ে পড়লেন। তার আগে বলি এটা লিখেছেন ছোটোমামা।
শ্রীচরণেষু
জামাইবাবু,
বিশেষ কারণে এবার আমরা (আমি ও রত্না) পুজোর সময় আপনাদের নিকট যাব বলে মনস্থ করেছি। কলকাতায় কিছুদিন থাকব কারণ ওখান থেকেই আমার কাজের সুবিধা হবে। পরে সব খুলে বলব। আশা করি আপনারা সকলে কুশলে আছেন। প্রণাম নেবেন।
ইতি
পটলচাঁদ
চিঠি পড়ে তো সকলের মাথায় বজ্রাঘাত। রাসু ও বাসুর চেঁচিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করল। তারাই যাবে বলে সবথেকে বেশি নেচেছিল, তারা যে স্বপ্ন দেখেছিল তা যে সব ভেঙেচুরে গেল। জীবনে ছোটোমামা মামি কোনোদিন কলকাতায় আসেন না পুজোর সময়, আর এখনই তাঁদের আসতে হল যখন রাসুরা যাবে বলে ঠিক হয়েছে? একেই বলে দুর্ভাগ্য। সত্যি, আমারই রাগ হচ্ছে ওদের কথা ভেবে, তোমাদেরও নিশ্চয়ই খুব দুঃখ হচ্ছে। আশা করে বসে থেকে সেটা না হলে কারই-বা রাগ না হয়? কথায় বলে ‘মামার বাড়ি ভারি মজা কিল চড় নাই’ — সেই আনন্দ থেকে ভগবান তাদের বঞ্চিত করলেন? কেন, তারা কার কী ক্ষতি করেছে বাবা? ভগবানের ওপর খুব রাগ হল তাদের। রাগ হল পিয়োনটার ওপর, চিঠিটা তো না আসতেও পারত, এমন ঘটনা তো কতই হয়; তাহলে অন্তত তাদের যাওয়াটা তো হত।

C-চিঠিটা পড়েছে বাবার হাতে... বোবা হয়ে গেলেন।
রাগে-দুঃখে কাউকে কিছু না জানিয়ে দু-ভাই ঠিক করল যে তারা চলে যাবে বাড়ি ছেড়ে ‘ফর এভার’। যাবার জায়গা ঠিক না থাকলেও বোলপুরে যাওয়ার স্বপ্ন যখন পূরণ হল না, তখন নিরুদ্দেশের পথেই যাবে তারা; তাতে অ্যাডভেঞ্চারের আনন্দটা তো পাওয়া যাবে। কিন্তু টাকা? টাকা কোথায় পাবে? যাক, সেসব ভাবার সময় নেই; তাতে জুতো পালিশ করে হোক, চায়ের দোকানে কাজ করে হোক, দোকানে ফাইফরমাশ খেটে হোক ঠিকই তারা চালিয়ে নেবে।
দু-ভাই যখন এই ধরনের প্ল্যান করছে, তখন তাদের সেই কথাগুলো ছোটোবোন টুকুন আড়াল থেকে শুনে ফেলেছিল বুঝলে? সে ভাবল মেয়ে বলে দাদারা তো চিরদিনই তাকে কমবুদ্ধিসম্পন্ন বলে ভেবে এসেছে, বলে এসেছে বোকা হাঁদা আদুরে ছিঁচকাদুনে ইত্যাদি। কিন্তু সত্যি তো আর সে সেইরকম কিছু নয়; দাদাদের ওই কথাগুলোর জবাব দেওয়ার একটা চান্স সে আজ পেয়েছে। তাই সে বলল, ‘এই দাদা, তোরা বাড়ি ছেড়ে যাবার কথা ভাবছিস নাকি? কেন? যাওয়া যে হবে না তারজন্য মনখারাপ তো সকলেরই লাগছে, তাই বলে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবি?’
রাসু বলল, ‘কী হবে আর থেকে বল তো, যেখানে কোনো কিছুই করার সুযোগ নেই?’
‘আচ্ছা শোন তবে। ব্যাপারটা যদি একটু উলটো করে ভাবিস, তবেই বুঝবি আমাদের যাওয়ায় বেশি লাভ না কি না-যাওয়ায়।’ দুই দাদা হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘মানে? কী বলতে চাইছিস?’ টুকুন বলল, দেখ, আমরা বোলপুরে যাচ্ছি না ঠিকই কিন্তু ছোটোমামারা তো আমাদের কাছে আসছে, আর ভেবে দেখ ছোটোমামা-মামি আসা মানেই তো রোজ সকালের জলখাবারে এলাহি ব্যাপার— শিঙাড়া, কচুরি, জিলিপি, দুপুরেও মাছ, মাংস আরও অনেক ভালো ভালো মেনু আর রাতে লুচি, পরোটা, আলুরদম তো আছেই। কেমন লাগে?’
রাসু-বাসু বলল, বাব্বা, তুই কি সবজান্তা হলি নাকি?
‘কেন, এটাই তো স্বাভাবিক রে। বাড়িতে লোক এলে তো এসবই হয়, ভালো করেই আপ্যায়ন হয় আর এরা তো মার-ই বাপের বাড়ির লোক। তারপর দেখ ছোটোমামা থাকলেই যখন-তখন সিনেমা, পার্ক, মেলায় যাওয়া— এসবও কি কম?’
এইসব আকর্ষণীয় কথাগুলো শুনে গলে গিয়ে রাসু বলে উঠল, ‘আর সিনেমার বিশ্রামের সময় পপকর্ন, বাদামভাজা, চিপস, টক-ঝাল লজেন্স খাওয়া?’ এই শুনে বাসুরও মনটা হয়তো অন্য জগতে চলে গিয়েছিল। এবার সে-ও মন্ত্রমুগ্ধের মতো বলে উঠল, ‘আর গল্প শোনা? সেইসব মার্ভেলাস ভূতের গল্পগুলো কি ছোটোমামা ছাড়া আর কেউ রসিয়ে বলবে?’
‘তবেই ভাব দাদা, আমরা বোলপুর গেলে কি এই সুন্দর সুন্দর জিনিসগুলো পেতাম?’
ছোটোবোনের মুখে এই কথাগুলো শুনে দু-ভাই কিছুক্ষণের জন্য হাঁ হয়ে গেল, কখন যে টুকুন অত সমঝদার ও বুঝমান হয়ে উঠল তা দু-ভাই ভেবেই পেল না। উলটো করে ভাবলে তা সত্যি দুঃখের আর কোনো কারণই থাকে না, তোমরা কী বল? কথাটা কি ভুল?
এরপর? এরপর আর কি, সুটকেস-ফুটকেস যা কিছু গোছানো হয়ে গিয়েছিল তা সব আবার খালি হল, জামাকাপড়, বইখাতা আবার সব যার যার নিজের জায়গায় চলে গেল। লোভনীয় সব খাবারগুলোর অমৃতস্বাদ ছেড়ে সত্যি কি আর বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার কোনো মানে হয়, তোমরা হলেও কি পারতে?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন