ক্ষণিকের অনুভূতি

শতরূপা সেনগুপ্ত

তপোব্রত সরকার। হ্যাঁ ব্যাচিলার মানুষ এই তপোব্রত সরকার। তবে তপোব্রত বড়ো কেজো মানুষও বটে। কাজ পেলে যেন আর কিছুই তিনি চান না। নাওয়া-খাওয়ার কথাও তিনি অনায়াসে ভুলে যেতে পারেন সামনে কোনো কাজ পড়ে থাকলে। কর্মজগৎ নিয়ে পড়ে থাকতে তিনি এতই ভালোবাসেন, যে এ ছাড়াও সমাজ বলে যে একটা-কিছু আছে তা তিনি মাঝে মাঝে ভুলেই যান। এরজন্য মায়ের সঙ্গে তাঁর কখনো-সখনো মনোমালিন্যও হয় কিন্তু কথায় বলে স্বভাব যায় না মলে; যে-স্বভাব একবার চেপে বসেছে, তা চলে যাওয়া কি অতটাই সহজ? ঠিক এই কারণে সারাজীবন বিয়েটাও তিনি করলেন না ফেঁসে যাওয়ার ভয়ে। তাঁর ধারণা বিয়ে করলে দায়িত্ব অনেকই বেড়ে যাবে, আর তখন তাঁর কর্মময় জগৎটিতে ব্যাগড়া পড়বে; সারাদিন কাজের মধ্যে ডুবে থাকার যে আনন্দ, তা থেকে তিনি বঞ্চিত হবেন। তার থেকে সব যেমনভাবে চলছে চলুক।

তবে এর থেকে তোমরা যেন ধরে নিয়ো না যে তাঁর কোনো বাড়িঘরদোর নেই। বাড়ি তাঁর অবশ্যই একটা আছে; সেই বাড়িতে থাকেন তিনি, তাঁর মা কুসুম দেবী এবং তার মাকে দেখভাল বা রক্ষণাবেক্ষণ করবার জন্য পুতুল নামে এক আয়া। বাবা মানুষটি অনেক দিন আগেই ইহলোক ত্যাগ করেছেন, তাই পুতুল চব্বিশ ঘণ্টাই কুসুম দেবীর সঙ্গে থাকে। শুধু ছ-মাস অন্তর একবার করে দু-তিন দিনের জন্য সে দেশে যায় আর তখন কুসুম দেবীকে পাড়াপ্রতিবেশীর ভরসাতেই থাকতে হয়। তাই মায়ের প্রতি টান ছাড়া আর অন্য কোনো পিছুটান নেই তপোব্রতর।

তপোব্রতর চাকরির ধরনটাও একটু অদ্ভুত গোছের। তিনি গভর্নমেন্টের প্রচারকার্যের সঙ্গে যুক্ত, তাই তাঁকে যখন যেখানে ডিউটি দেওয়া হয় তিনি সেইখানেই চলে যান আবার কিছুদিন পরে ফিরে আসেন বাড়িতে। এমনি করেই বেশ চলছিল। কিন্তু একবার হল কী, তাঁর বয়স যখন প্রায় গোটা পঁয়তাল্লিশ মতো হবে, তখন চাকরিসূত্রে মানে প্রচারকার্যের জন্যই তাঁকে একদম কলকাতা ছেড়েই চলে যেতে হয় বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলের দিকে। তারপর এ গ্রাম সে-গ্রাম করে তিনি ঘুরেই চলেছেন পনেরো-ষোলো বছর ধরে, মায়ের কাছে আর তিনি আসতে পারছেন না। মায়ের জন্য মাঝে মাঝে তাঁর মন কেমন করে ঠিকই কিন্তু পরের চাকুরে হয়ে তিনি কিছুই করতে পারেন না, নিতান্তই নিরুপায় তাঁর অবস্থা।

যাইহোক দীর্ঘ পনেরো-ষোলো বছর পর এই একষট্টি বছর বয়সে আবার তিনি নমো-নমো করে জন্মভূমি কলকাতা শহরে ফিরেছেন। এখন মনে তাঁর পুলক, আবার কতদিন পরে মাকে দেখবেন তিনি। দেখবেন সব চেনা মুখগুলোকে। কিন্তু গাড়ি করে যেতে যেতে সেই চেনা পথঘাট, দোকানবাজার, মানুষগুলোকে চিনতে তাঁর কষ্ট হচ্ছে কেন, চিরপরিচিত জায়গাটাকে তাঁর অচেনা লাগছে কেন? যারা একদিন তাঁর খুব পরিচিত ছিল, তারা এখন কোথায়? যে দোকানপাট ছিল তার দৈনন্দিনের আড্ডাখানা ও নিত্য আনাগোনার জায়গা, যে পথঘাট দিয়ে হাঁটতে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন, যে খোলা মাঠে তিনি ফুটবল-ক্রিকেট খেলতেন, তা সব কই? খোলা মাঠ তো কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! বাড়ি ছাড়া তো আর কিছু চোখেই পড়ছে না, আর সে পুকুরগুলোই-বা কোথায়, যেখানে সারাদিন ধরে মাছ ধরা হত? সেগুলো কি সব বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে? শহরের আকাশটাকেও তো আগে অনেকটা নীল বলে মনে হত, তবে কি আকাশটাও বদলে গেল? আর মানুষগুলো? সবাই তো একসাথে নিশ্চয় মরে যাবে না, তবে চেনা মুখগুলো সব কই? তপোব্রত নিজের মনে মনে বললেন, এ তো দেখছি মহা তাজ্জব ব্যাপার, এ কি ম্যাজিক না ভেলকিবাজি? এতগুলোর পরিবর্তন কি একসঙ্গে সব হতে পারে? বাধ্য হয়েই তপোব্রত একটি লোককে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ও মশাই শুনছেন, ‘‘সোনালি কফিহাউস’’ দোকানটা কোথায় একটু বলতে পারেন?’ লোকটি তো প্রথমে কোনোকিছু না বলেই আকাশমুখো হয়ে চলে যাচ্ছিল, তারপর কী দয়া হল ঘুরে এসে বলল,

‘কী বললেন? সোনালি কফিহাউস? এখানে সাত-আট বছর আছি, ওই নামে তো কোনো দোকানের নাম শুনিনি।’ তপোব্রত ভাবলেন, কী আশ্চর্য, অথচ ওই দোকানটাই আগে এই তল্লাটের সবথেকে বিখ্যাত দোকান ছিল! আর একজনকে তিনি শুধোলেন—

‘ও ভাই, সমন্বয়ের মাঠটা কোনদিকে বলতে পারেন?’

‘সমন্বয়ের মাঠ? সেটা আবার কী? আপনার বোধহয় কোথাও ভুল হচ্ছে, কোনো মাঠফাট এদিকে নেই।’ তবুও তপোব্রত আর এক বার বললেন,

‘ও, কিন্তু কালীমন্দিরের পাশে যেটা ছিল?’

‘হ্যাঁ কালীমন্দির এখনও আছে কিন্তু মাঠফাট নেই।’

ঝাড়াঝাপটা উত্তর। এরপর আর কথা চালানোর কোনো মানেই হয় না কারণ যে উত্তরটা জানার ছিল সেটা জানা হয়ে গেছে। তপোব্রত ভাবলেন এই ক-টা বছরে শহরের সব কিছু এত পালটে গেল? সরকারের কর্মকুশলতা যে এত বেশি, তা তো কই জানা ছিল না! তপোব্রত সরকার ছিলেন পাড়ার এক নামজাদা লোক, উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। রাস্তাঘাটে তাঁকে দেখলে সবাই নিজে থেকে এগিয়ে এসেই কথা বলত। কিন্তু এখন তা তো আর হচ্ছেই না, বরং আর পাঁচটা মানুষের মতো তিনিও যেন খুব-একটা পাত্তা পাচ্ছেন না; আর পাবেনই-বা কী করে, চেনা মুখগুলোই যে নেই। নিজের সম্মান হারানোর দুঃখ কি কম? কিন্তু কেন এমনটা হল? পনেরো-ষোলো বছরে এত আমূল পরিবর্তন? নিজের দিকে তাকিয়ে দেখলেন তপোব্রত— না কোনো অস্বাভাবিক কিছু তো চোখে পড়ছে না, তবে এমন অদ্ভুত কান্ডগুলো কেন ঘটছে!

এবার পথ চলতে চলতে হঠাৎ গড়িয়াহাটের রাস্তার পাশে ফুটপাথের একটা বুকস্টলে চোখে পড়ে গেল একটা ইংরেজি পত্রিকায় তাঁরই প্রাইজ পাওয়ার একটি ছবি। অফিসে ভালো কাজ করবার জন্য সরকার থেকেই প্রাইজটি তিনি পেয়েছিলেন, সম্ভবত দু-হাজার সালে। হিসেবমতো তাঁর বয়স তখন চুয়াল্লিশ কি পঁয়তাল্লিশ। নিজের ছবি দেখে স্বভাবতই তাঁর ভালো লাগল, নিজের রূপের গর্বে তিনি বিভোর হলেন। কী সুন্দর টানটান চামড়া, কাটা কাটা চোখ-মুখ, ফর্সা, মাথা-ভরতি কালো চুল—রীতিমতো সুন্দর, সুপুরুষ। কিন্তু এখন তো দু-হাজার ষোলো সাল। তাঁর বয়সও এখন ষাট কি একষট্টি হবে; মানে আরও পনেরো বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। তাই আগেকার কম বয়সের চাকচিক্য কি আর এখন থাকবে? এইরকম ভাবতে ভাবতে খুঁজে পেতে একটা আরশিওয়ালা দোকানের সামনে গিয়ে তিনি নিজের চেহারাটা দেখলেন আরশিতে।

একী! যা ভেবেছি ঠিক তাই! চমকে গিয়ে তিনি দেখলেন সেই পত্রিকার যুবকের চেহারার সঙ্গে যে এখনকার এই তপোব্রতর চেহারার কোনো মিলই নেই! কোথায় সে-রূপ? টানটান চামড়ার জায়গায় এখন তো অনেকটা ঝুলে-পড়া চামড়া, মাথায় কালোর চেয়ে বেশি সাদা চুল, রং অনেকটাই তামাটে, তারসঙ্গে আবার ভুঁড়িও হয়েছে একটু। এরপর নিজে নিজেই তিনি হেসে উঠলেন হো-হো করে। স্বগতোক্তি করে বললেন, ‘আরে চেহারাটাই এত পালটে গেছে, তো লোকের না চেনার আর দোষ কী? আমার নিজেরই তো নিজেকে চিনতে কষ্ট হচ্ছে; আর আমিই-বা তাদের চিনব কী করে। বয়স তো সকলেরই বেড়েছে, আমার চেহারা পালটেছে আর তাদের পালটায়নি তা তো হতে পারে না, তাই দু-পক্ষের কেউই বোধহয় কাউকে চিনতে পারছে না।’ ব্যাপারটা খুব মজার না? এ যেন চেহারা পালটানোর কম্পিটিশন। অনবরত জীবনের সঙ্গে লড়াই করতে হলে এত বছর পরে আগেকার সেই রূপলালিত্য কি থাকা সম্ভব? তবে অন্যকে দোষ দিয়ে কী হবে? তা ছাড়া শহরের আকাশটা তো সত্যি আর বদলে যেতে পারে না, ভগবানের আকাশ তো ভগবানেরই। বরং বদল হয়েছে ভূমির। কেন? খোলা মাঠ বা পুকুর বুজিয়ে উঠেছে বিশাল বিশাল বহুতল ফ্ল্যাটবাড়ি, চিলড্রেন্স পার্ক ও সব সাঁতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র—যারা আড়াল করে রেখেছে আকাশের কিছুটা অংশ। ইশ এই সহজ কথাগুলো আমার মাথায় এতক্ষণ আসছিল না। উলটে অন্য সব কিছুকে দোষ দিচ্ছিলাম? সত্যি, মানুষ হঠাৎ হঠাৎ এমন বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে! নিজের বোকামিতে নিজেরই তাঁর প্রচন্ড হাসি পেল এবার। তোমাদেরও নিশ্চয় তপোব্রত সরকারের নির্বুদ্ধিতা দেখে মজা লাগছে?

C-ফুটপাথের একটা বুকস্টলে চোখে পড়ে গেল একটা ইংরেজি পত্রিকায় তাঁরই প্রাইজ পাওয়ার...

যাক গে। তপোব্রত ভাবলেন এবার বাড়ি ফেরা যাক। এবার মা আবার আমাকে চিনতে পারলে হয়। তবে মা কি আর ছেলেকে চিনতে পারবেন না? যাক গে আগে থেকে কিছু বলব না বাবা, একটা সারপ্রাইজ দিয়ে দেখাই যাক না। এই ভেবে বাড়ির কড়াটা সন্তর্পণে নাড়লেন তপোব্রত।

ভেতর থেকে উত্তর এল— ‘কে এই সময়, তপু এলি কি?’ অপ্রত্যাশিতভাবে নিজের নামটা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তপোব্রত বলে ফেললেন, ‘তুমি কী করে বুঝলে আমি এসেছি?’

‘বা:, শোনো ছেলের কথা! তোর কড়া নাড়ার শব্দ আমি চিনি না? তা ঘরে এসে বোস বাবা, কী চেহারাই করেছিস রোদে জলে ঘুরে ঘুরে।’ শেষের কথাটায় কান দিলেন না তপোব্রত। বললেন, ‘এতদিন পরেও আমার কড়া নাড়াটা মনে রেখেছ মা?’ বলে মাকে জড়িয়ে ধরলেন তপোব্রত। মা মুচকি হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে থুতনি ধরে একটু আদর করে বললেন, ‘তপু, ভুলে যাস না তোর সঙ্গে আমার নাড়ির টান। সময় গেলে কি মা ছেলেকে ভোলে? আমি তোর মা না?’

এরপর মন্ত্রমুগ্ধের মতো সোফায় বসে গা-টা এলিয়ে দিলেন তপোব্রত। মাকে সারপ্রাইজটা আর দেওয়া হল না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%