আজব কান্ড

শতরূপা সেনগুপ্ত

বিভূতিকে মনে আছে তোমাদের? সেই যে বঁাকুড়ায় থাকত, খুব চঞ্চল, খুবই চনমনে, ছটফটে, খেলাধুলোয় ওস্তাদ ছেলেটা। বাইরের লোকে দেখত পড়াশুনোটা বাদে সবই ছিল তার খুব প্রিয়। কিন্তু তোমরাও যেন এই ভুলটা কোরো না, মানে ভেবো না যেন বিভূতি পড়াশুনায় খুব খারাপ ছিল। সেচালাক ছিল, তাই সকালে এন্তার খেলা করে রাত জেগে ঠিকই পড়ত এবং তাইতেই দারুণ রেজাল্ট করত। রাতটাই ছিল তার নিজস্ব সময়। কিন্তু লোকে দেখত সকাল বেলা সারাদিন রোদে জলে ঘুরে ধুলোবালি মেখে সে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সারা গ্রামে। সেতো খালি একলাই ছিল না, তার সঙ্গে আরও পাঁচ-দশটা ছেলে ছিল, যে-দলের নাম ছিল ‘বিভুবাহিনী’— একথাটা তোমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে। তাই গ্রামের লোকেদের কাছে বিভূতি নামটা ছিল একটা আতঙ্ক।

কিন্তু বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তখন বিভূতির মধ্যে অনেক কিছু পালটেছে। চটপটে, কইয়ে-বলিয়ে সে এখনও আছে বটে, তবে ছোটোবেলাকার মতো চঞ্চল, ডানপিটে, ডাকাবুকো স্বভাব আর তার নেই। শোনা যায় বিভূতি নাকি তার বুদ্ধির জোরে কাছেপিঠে কোন একটা জায়গায় একটা চাকরি জুটিয়েছে এবং সেটা হল একটা সরকারি ব্যাঙ্কের চাকরি; নিতান্ত কম কথা নয় বলো? কিন্তু বিভূতির একটা দোষও ছিল, মানে বদ অভ্যাস ছিল। গ্রামে থাকবার জন্যই হয়তো এই অভ্যাস হয়েছিল। সারাদিন হুজ্জতি করবার পর পুকুরে ডুব দিয়ে স্নান করে এসেই সে যদি বাড়া গরম ভাতের থালা না দেখতে পেত তবে তার মাথা প্রচন্ডরকম গরম হয়ে যেত। রাগারাগি, চেঁচামেচি, কথাকাটাকাটি এমনকী বাটি ঘটি ছোড়াছুড়িও হয়ে যেত কখনো-সখনো। মানেটা কী হল বলো তো? মানে হল আগে গরম ভাত পরে অন্য কাজ। এইজন্য কী অসুবিধে হত জান? এরজন্য নিত্যদিনই তার ঠাণ্ডা লাগত; সারাক্ষণই প্রায় ঘড়র ঘড়র নাকটানা। তোমরাই বলো, অভ্যাসটা বাজে নয়? কত বার তাকে বলা হয়েছে এই বিদঘুটে অভ্যাস ত্যাগ করতে কিন্তু কে শোনে কার কথা! ছোটোবেলা থেকে যার এই ব্যাপার তা তো হঠাৎ করে বদলানোও যায় না, তা যে মজ্জায় মজ্জায় গেঁথে গেছে।

কিন্তু এ পর্যন্ত খুব-একটা কিছু অসুবিধে ছিল না, অসুবিধেটা কোথায় হল জান? হল চাকরিক্ষেত্রে গিয়ে, তোমাদের বিভূতিদাদা যেদিন চাকরিতে জয়েন করল সেইদিন। ওর ম্যানেজার এসে ওর সঙ্গে কিছু দরকারি কথা বললেন। এর-তার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করিয়ে দিলেন ও পরে তাকে বিশ্রাম নিয়ে একটু ‘ফ্রেশ’ হতে বললেন। চাপরাশিকে দোকান থেকে দুপুরের খাবার আনতে দিলেন ডিমের ডালনা, আলুপোস্ত, পোস্তর বড়া, নারকেল দেওয়া মুগের ডাল ইত্যাদি। মেনু শুনে বিভূতি তো দারুণ খুশি হয়ে স্নান করতে ঢুকল। পুকুরে স্নান করা অভ্যেস, এখন শাওয়ার খুলে দিব্যি ঠাণ্ডা জলে ভিজিয়ে নিল সারা গা; শাওয়ার থেকে বৃষ্টির মতো জল পড়াতে তার খুব মজা লাগল। এই অভিজ্ঞতা তো তার গ্রামে থাকতে হয়নি। শাওয়ার কাকে বলে জানতই না। স্নান তো হল কিন্তু গরম ভাত? তার কী হল? চাপরাশিটা খাবার আনতে গেছে তো গেছেই, ফেরবার কোনো লক্ষণই নেই। এদিকে বিভুর পেটে যে ছুঁচো, পাতিহাঁস সব একসঙ্গে ডাকছে। কিন্তু কী দুর্ভাগ্য জান তোমরা? অনেকক্ষণ পরে এসে ব্যাটা খবর দিল যে সারা তল্লাটে ঘুরেও কোথাও কোনো দোকানেই নাকি গরম ভাত-তরকারি পাওয়া যাবে না। বুঝতেই পারছ নিশ্চয় কথাটা শুনেই বিভূতির মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। কিন্তু কী আর করা; নতুন চাকরি, নতুন ম্যানেজার, অভদ্রতা তো করা যায় না; অতএব মনের রাগ মনেই চেপে রাখতে হল তাকে। এদিকে হল কী, ম্যানেজারবাবুটিও বেশ অবাক হয়ে গেলেন ওই কথা শুনে; কিন্তু দমে গেলেন না, আবার রুটি-তরকারির ব্যবস্থা করতে বললেন। কিন্তু তাও সেদিন মিলল না। তখন বিভূতি ভাবতে শুরু করল, না, চাকরিটি এবার ছেড়েই দিতে হবে। না খেয়ে লোকে থাকতে পারে নাকি? বঁাকুড়ার পাশাপাশি গ্রামে তো এমন দৈন্যের দশা হওয়ার কথা নয়। এরা বলছে বটে আজকের দিনের জন্যই নাকি খালি এটা হচ্ছে, কিন্তু এমন যে সত্যিই বার বার হবে না তারই-বা কী মানে আছে? না, তার অনেক বুদ্ধি আছে, নিশ্চয় সে অন্য চাকরি জুটিয়ে নিতে পারবে; কিন্তু আত্মাকে কষ্ট দেওয়া? নৈব নৈব চ। এইসব নানা আজগুবি চিন্তা তার মাথায় আসতে লাগল। কিন্তু চাকরিটা ঠিক ছাড়তেও ইচ্ছে করছিল না তার। একেই সরকারি তার ওপর ব্যাঙ্কের চাকরি।

তবে তোমাদের নিশ্চয় মনে আছে যে আগে বলেছিলাম যে বিভূতির খুব বুদ্ধি ছিল। কোনো কিছুতেই হেরে যাওয়ার ছেলে সে নয়। তাই নিরন্তর তার মনে হতে লাগল যে কেন ওইরকম অদ্ভুত ঘটনা ঘটবে, অথচ এখানে যে কোনো দোকান নেই তাও নয়। তবে? সে তার বাহিনীর মানে বিভুবাহিনীর সমস্ত ছেলেদের ওপর দায়িত্ব দিল যে দোকানে দোকানে ঘুরে এর কারণ খুঁজে বার করতে। তবে তদন্ত করে যা শোনা গেল তা আরও আশ্চর্যের এবং হাসির। শোনা গেল বিভূতির জয়েনিং-এর দিনে ছিল শেতলষষ্ঠী, তাই সেদিন সব জিনিসই শীতল পাওয়া যাবে— পানতা ভাত, ঠাণ্ডা চা ও অন্যান্য সব বাসি খাবার। এই গ্রাম বা এর কাছাকাছি কোনো গ্রামেই গরম ভাত-তরকারি তো নয়ই এমনকী রুটি-লুচি-পরোটাও কিছুই পাওয়া যাবে না। তাই সেদিন বেচারি চাপরাশিটার কোন দোষই ছিল না, খাবার না আনার জন্য। সেকী করবে, দোকানেই যদি না পাওয়া যায়?

C-বিভুবাহিনী দোকানে খাবার সম্বন্ধে খোঁজ নিচ্ছে।

কথাগুলো শুনে রাগ তো দূরের কথা, ম্যানেজারবাবু আর বিভূতি দুজনেই প্রথমে ভীষণ অবাক হল তারপর হো-হো করে হেসে উঠল। ওই গ্রামে সবসময় খাবার পাওয়া যায় কি না-যায় সেই নিয়ে বিভূতির মনে একটা সন্দেহ ছিল। তারজন্য চাকরিটাও সে ছেড়ে দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু এখন সে ঈশ্বরকে প্রচুর ধন্যবাদ দিল সেটা বঁাচিয়ে দেওয়ার জন্য। একেই কি বলে ভাগ্যবানের বোঝা ভগবানে বয়?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%