শতরূপা সেনগুপ্ত
আচ্ছা, পড়াশুনো থেকে ছুটি পেয়ে দিদা বা ঠাকুমার কাছে গল্প শুনতে তোমাদের নিশ্চয় খুব ভালো লাগে? আর মনে করো তো সঙ্গে যদি একটু কুলের আচার বা আমের আচার পাওয়া যায় তবে গল্পের আসরটা তো বেশ জমে ওঠে তাই না? আমরা যখন খুব ছোটো ছিলাম তখন পাশের বাড়িতে আমাদেরও একজন ঠাম্মা ছিলেন যিনি পা ছড়িয়ে বসে আমাদের নানা ধরনের গল্প শোনাতেন। সেই ঠাম্মার জীবনেরই এক দারুণ মজার গল্পের কথা আজ আমি তোমাদের বলব।
আমি ও আমার কয়েক জন বন্ধু যখন খুব ছোটো মানে যখন প্রায় পড়াশুনো ভালো করে আরম্ভই হয়নি তখন রোজ সকালে ন-টা সাড়ে ন-টা বাজলেই জলখাবারটি খেয়ে আমরা তাঁর কাছে চলে গিয়ে বায়না ধরতাম গল্প শোনবার। তিনি আমাদের খুব ভালোবাসতেন এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতেন আমাদের সঙ্গে। ওঁর একটা নাম ছিল ঠিকই কিন্তু আমরা ওঁকে ফোকলা ঠাম্মা বলতাম। কেন জান তো? সেও এক মজার ব্যাপার। তাঁর বয়স মোটেই বেশি ছিল না, কিন্তু ছত্রিশ পাটি দাঁতের প্রায় সব দাঁতগুলোই পড়ে গিয়ে খুবজোর দশটা কি বারোটা দাঁত তাঁর ছিল। তাই তাঁকে আমরা ওই নামে ডাকতাম। ফোকলা ঠাম্মার বাড়িতে ছিলেন দাদু আর ফোকলা ঠাম্মার মতোই আর এক ঠাম্মা; তাঁকে আমরা ছোটঠাম্মা বলতাম। ছোটঠাম্মার অবশ্য মুখ-ভরতি সাজানো দাঁত ছিল। তবে তিনি গল্পটল্প বলতেন না।
যাইহোক ফোকলা ঠাম্মা গল্প বলা শুরু করবার আগে আমাদের বন্ধু নন্তু ঠাম্মার ভাঁড়ার থেকে এক শিশি ভরতি কুলের আচার, বেশ কিছু নারকেল নাড়ু আর গোটা দশেক প্লেট এনে ঠাম্মার কাছে রাখত। গল্প শুরু করবার আগে ঠাম্মা আমাদের জনে জনে ডেকে একটি প্লেটে গোটা দু-তিনটে নাড়ু আর তার পাশে খানিকটা করে আচার দিতেন। আমরা এক-একজন করে উঠে গিয়ে যে-যার প্লেটগুলো নিয়ে আসতাম। গল্প শোনার সঙ্গে সঙ্গে এই আচার আর নাড়ুর লোভটাও তো কম নয়। তোমরা হলে পারতে লোভ সামলাতে?
এরপরে দাওয়ায় পা ছড়িয়ে বসে ঠাম্মা শুরু করতেন গল্প বলা। তিনি বলতেন রাজারানির গল্প, ভূতের গল্প, আরব্য রজনির গল্প, পঞ্চতন্ত্রকথা, গোপালভাঁড়ের গল্প, ঠাকুরদার ঝুলি, ঠাকুমার ঝুলির গল্প, আরও কত কী তার ইয়ত্তা নেই। তাঁর গল্প শুনতে শুনতে আমরা ভীষণ মশগুল হয়ে থাকতাম, বাড়ি যেতে ইচ্ছেই করত না; শেষমেষ ঠাম্মাই বকেঝকে আমাদের বাড়ি পাঠাতেন নাওয়া-খাওয়া করবার জন্য। নন্তুটা ছিল সবথেকে দুষ্টু। তার বাবা-মা গিয়েছিলেন হায়দ্রাবাদে তাঁদের মেয়ে মানে নন্তুরই দিদির কাছে। নন্তুকে তাঁরা ফোকলা ঠাম্মার বাড়িই রেখে গিয়েছিলেন। সে ঠাম্মাকে ছাড়তেই চাইত না।
এরপর একদিন শোনা গেল কী জান? শোনা গেল, সেই ফোকলা ঠাম্মা দাঁত নিয়ে নাকি অসম্ভব কষ্ট পাচ্ছেন। সকালে কোনোরকমে গলা ভাত, আলুসেদ্ধ আর মাছের ঝোল; বিকেলে শুধু চা আর রাতে সুজি, কলা, দুধ, খই, ছানা ইত্যাদি সব নরম নরম খাবার খেতেন। মোটকথা তাঁর দাঁতের যন্ত্রণার কথাটা সকলকেই খুব ভাবিয়ে তুলেছিল। সবথেকে বেশি মুশকিল হয়েছিল আমাদের, মানে আমরা যারা ওঁরা কাছে গল্প শুনতাম। দাঁতের ব্যথায় তো গল্পও বলতে পারবেন না, তার সঙ্গে সঙ্গে আচার আর নাড়ুটাও যে ফসকে যাবে সেটাও কি কম দুঃখের কথা? তাই আমরা মনপ্রাণ দিয়ে প্রার্থনা করতে লাগলাম যে ঠাম্মার অসুখ যেন তাড়াতাড়ি সেরে যায়।
নন্তুটা ঠাম্মার কাছেই শুত, তাই ঠাম্মা কেমন থাকলেন তার খবর আমরা নন্তুর কাছেই পেতাম। একবার হল কী, নন্তুর ঠাণ্ডা লেগে খুব জ্বর এসেছিল, সেতো ওষুধবিষুধ খেয়ে মুড়ি দিয়ে শুয়েছে, এমন সময় মনে হল কে যেন তাকে খুব জোরে ধাক্কা মেরে উঠতে বলছে। এদিকে সেএকটু আগেই শুয়েছে তাই সে চোখের পাতা খুলতেও পারছে না বেচারি। তবুও সে জোর করেই উঠে জিজ্ঞেস করল, কী হল ঠাম্মা, এত ডাকছ কেন? খুব ঘুম পাচ্ছে যে।
‘ঘুমকে বলিহারি দিই, বাড়িতে এতরকম কান্ড ঘটে গেল আর তুই কিছুই টের পেলি না তো?’
নন্তু ধড়মড় করে উঠে বসে বলল, ‘কেন কেন, কী হয়েছে বাড়িতে?’
ঠাম্মা খুক খুক করে হেসে বললেন,
‘আর বলিস না দাদু, দেখ দেখ এই তিপ্পান্ন বছর বয়সে আমার কী সুন্দর দাঁত হয়েছে।’
‘সেকী? এ কি পিসি সরকারের ম্যাজিক নাকি? কই দেখি দেখি।’
‘না না আমার খুব লজ্জা করছে রে, আমি কিছুতেই দেখাব না। এই যে তোর সঙ্গে কথা বলছি, হাসছি এতে কি তুই কিছুই বুঝছিস না?’
নন্তু দেখল, আরে সত্যি তো! ঠাম্মার ঝকঝকে দাঁত রয়েছে, কিন্তু এটা কী করে হল?
ঠাম্মা এবার বললেন, ‘নন্তু, আমার দাঁত ওঠায় আমি সত্যি খুবই আনন্দিত। আবার আমি আগের মতো খেতে পারব, হাসতে পারব। আমার এই আনন্দের কথা এখন সব্বাই জানে তুই ছাড়া। তুই এতই কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমোচ্ছিলি যে বলবার সুযোগই পাইনি। এখন দেখ গে যা বাড়ি কেমন লোকে লোকারণ্য হয়েছে।’ নন্তু বেচারা কাঁচা ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে নীচে সদর দরজার কাছে এসে দেখল সত্যি বাড়িতে প্রচুর লোকের ভিড় আর পেছনে হাত দিয়ে অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে দাদু পায়চারি করছেন। যে কোনোদিনও হয়তো আসেনি বা যাকে হয়তো কোনোদিন বাড়িতে দেখাই যায়নি সে পর্যন্ত চলে এসেছে মজা দেখতে। আর শুধু কি তাই? আত্মীয়স্বজন, ছেলে, মেয়ে, পাড়ার সব বন্ধুবান্ধব সব্বাই খবর পেয়ে এসে ভিড় করেছে। আর সবাই মুখে চাপা দিয়ে মৃদু মৃদু হাসছে এমন অদ্ভুত ঘটনা শুনে।

এমন সময় হয়েছে কী রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল ননা পুরুত। তাকে পাকড়াও করে দাদু বললেন ওই অদ্ভুত ঘটনার কথা এবং কী করলে শুভ হবে সেকথাও জিজ্ঞাসা করলেন। পুরুতঠাকুর তো শুনে আঁতকে উঠলেন, বললেন, ‘আর কিছুদিন পর তো দাঁত পড়বার কথা, এখন নতুন দাঁত গজাচ্ছে? এ তো অশুভ! তবে আমাদের শাস্ত্রে বলে এইরকম অবস্থায় যদি কোনো দন্তপূজা করা যায় তবে এর দোষ কেটে যায়।’
দাদু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘দন্তপূজায় কী কী লাগবে?’ তখন পুরুতমশাই বললেন, ‘দন্তপূজায় লাগবে একটি পেপসোডেন্ট মাজন, একটা ভালো টুথব্রাশ, কিছু তুলো, এক বান্ডিল টিস্যু পেপার, একটি লিস্টারিনের শিশি এবং একটি দাঁতের পাটি। এ ছাড়া নৈবেদ্যের জন্য লাগবে চাল, কলা, ফল ও মিষ্টান্ন। ও, নতুন দাঁত যেহেতু উঠেছে তারজন্য লাগবে এক বাটি গোবিন্দভোগ চালের পায়েস। কারণ এটিকে অন্নপ্রাশন বলেই ধরতে হবে।’ পুরুতঠাকুর বললেন, ‘আর দেরি করে লাভ নেই, পরশু বুধবার একটা শুভদিন আছে। ওই দিনই পুজো হবে।’
পুজোর কথা শুনে তো তোমাদের মতো সব ছোটো ছোটো বন্ধুরা খুব খুশি। একে তো বাড়িতে পুজো তায় আবার এত মজার পুজো। নারায়ণ পুজো, লক্ষ্মী পুজো, দুর্গা পুজো, গণেশ পুজো প্রভৃতি দেবতাদের নিয়ে অনেক পুজোর কথা তোমরা নিশ্চয়ই শুনেছ, কিন্তু মানুষকে নিয়ে কোনো পুজোর কথা শুনেছ কি? তোমাদের বন্ধুরাও বোধ হয় শোনেনি।
দেখতে দেখতে পুজোর দিনক্ষণ এসে গেল। ফোকলা ঠাম্মা গঙ্গাজলে স্নান করে পবিত্র হলেন। সকলে অবাক হয়ে দেখতে লাগল নূতন ধরনের পুজোর নতুন রকম-সকম। একটি থালায় ছিল লিস্টারিন, পেপসোডেন্ট মাজন, টুথব্রাশ প্রভৃতি দাঁতের সরঞ্জামগুলি, দুটি থালায় ভরতি ফল ও মিষ্টি ও একটি থালায় নৈবেদ্য। পুরুতবাবাজি অত্যন্ত ভক্তিপূর্ণ চিত্তে বাবা দন্তেশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে লাগলেন যেন নতুন করে আর ঠাম্মার দাঁত না ওঠে।
‘একী, বিড়বিড় করছিস কেন রে? কোনো স্বপ্নটপ্ন দেখছিস নাকি? জল খাবি? জ্বরটা কেমন আছে দেখি ...’
নন্তু ধড়মড়িয়ে উঠে বসল বিছানায়। চোখ দুটো দু-হাতে বেশ খানিকটা কচলে নিয়ে বলল, ঠাম্মা, ক-টা বাজে গো, সকাল হয়ে গেল নাকি?
‘এখন তো সবে রাত চারটে। ঘুমিয়ে পড় বাবা। আবার তো কিছুক্ষণ পরেই ছেলেগুলো আসবে গল্প শুনতে। দাঁতব্যথা কম আছে আজ, আমি গল্প বলব। তবে এখন খুব ঘুম পাচ্ছে।’ বলে পাশ ফিরে শুলেন ঠাম্মা।
কিন্তু নন্তুর কি আর ঘুম আসে? মাথাটা একবার ঝাঁকিয়ে সেনিজের মনেই বলল, ঠাম্মার দাঁতের চিন্তা এত বেশি ছিল যে আমি একটা এতবড়ো স্বপ্নই দেখে ফেললাম?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন