শতরূপা সেনগুপ্ত
শ্রীকান্ত সোম লোকটি অতি সজ্জন ব্যক্তি। অন্তত পাড়ায় তাঁর নামে সেইরকম প্রচারই আছে। দানধ্যান করা, লোককে সাহায্য করা, লোককে সেবা করা—এইসব গুণের জন্য তাঁর যথেষ্ট নামডাক। তিনি কারোর কোনো দুঃখকষ্ট মোটে দেখতে পারতেন না। অন্যের মনের কষ্ট দেখলে সবসময়ই সমব্যথী হয়ে তিনি ভাবতেন কেমন করে সেই দুঃখকে দূর করা যায়। তিনি জীবনে কখনো কাউকেই মুখের ওপর ‘না’ বলতে পারতেন না, তাই তাঁর দোরগোড়া থেকে কেউই কোনোদিন ফিরে চলে যায়নি। মোটকথা শ্রীকান্ত সোমের বাইরের চেহারা বা যাকে ইংরেজিতে বলে ‘ইমেজ’, সেটি খুব ভালো।
এই শ্রীকান্ত সোমের একটি বড়ো চমৎকার ডাকনাম ছিল। সেটা কি জান তোমরা? সেই নামটি হল ‘ঘড়িবাবু’। কেন এমন অদ্ভুত নাম? শোনো তবে। কারণটি বড়োই মজার। শ্রীকান্ত সোমের পরিবারে যতজন সদস্য ছিল অর্থাৎ ছেলে, বউ, নাতি, নাতনি এমনকী কাজের লোক পর্যন্ত— সকলের হাতঘড়িই জমা থাকত কর্তার কাছে। আরও শুনবে? সকাল সাতটা থেকে আটটা মানে ওই এক ঘণ্টা সময়ে কর্তা বাড়ির প্রত্যেকটি ঘড়িতে দম দিতেন এবং পরিষ্কার করতেন প্রত্যহ। এক দিনের জন্যও ভুল হত না। এতে বাড়ির অন্য লোকেদের একটি কাজ কমেছিল ঠিক কথা কিন্তু এর একটা অসুবিধাও ছিল। যার যখন কোথাও যাবার দরকার হত তখন চাবি খুলে ঘড়িটি বার করে নিতে হত আলমারি থেকে; কারণ আলমারির তাকেই পর পর ঘড়িগুলো সাজানো থাকত। কিন্তু ফিরে এসে আবার ঘড়ি খুলে আলমারিতেই রেখে দিতে হত। এমন করে প্রায় আট-দশটা ঘড়ি থাকত। এ ছাড়া খাবার ঘরে একটা হলঘরে একটা আর তিনটি শোবার ঘরে, তিনটি ঘড়ি ঝুলত দেওয়ালে।
ঘড়ি জিনিসটাকে খুব পছন্দ করতেন শ্রীকান্তবাবু। তিনি বলতেন ঘড়ি হল একটি প্রবহমান জীবনের প্রতিচ্ছবি। ঘড়িও চলছে তার নিজের পথে, জীবনও বয়ে চলেছে তার নিজের খাতে। দুটির মধ্যে মিল তাই খুব বেশি বলেই কর্তা মনে করতেন। তাই সদস্যদের মধ্যে কেউ যদি কোনোদিন ঘড়িতে দম দিতে ভুলে যায় তবে জীবন থেমে যাবে হয়তো—এটিই তাঁর ধারণা ছিল। তাই অতগুলো ঘড়িতে দম দেওয়ার দায়িত্বটা তিনিই গ্রহণ করেছিলেন। কোনো ব্যাটারিচালিত ঘড়িতে ব্যাটারি ফুরিয়ে যদি ঘড়ি বন্ধ হয়ে যেত তবে মহা এক শোরগোল পড়ত সারা বাড়িতে। ছুটে গিয়ে আগে ব্যাটারি কিনে আনা হত তারপর নাওয়া-খাওয়া বা অন্য কাজ। কর্তার কী অদ্ভুত সাইকোলজি তাই না? ছেলে-বউরা সব মুখ টিপে হাসত কর্তার এই ঘড়িপ্রীতি দেখে। স্বামীর কাছে গিয়ে বড়োবউ ইনিয়েবিনিয়ে বলত, ‘বাবা এত রোগে ভুগছেন, এত কষ্ট পাচ্ছেন, কোথায় নিয়মে খাবেন, শোবেন, বিশ্রাম নেবেন তা নয় এখনও সারা বাড়ির ঘড়িতে ঠিক দম দেওয়া চাই।’
শ্রীকান্ত সোমের জীবনের প্রতি ভালোবাসা ছিল অত্যন্ত বেশি। ঘড়ি বন্ধ হলে তাঁর জীবনও যে বন্ধ হয়ে যেতে পারে সেই একটা অজানা ভয় তাঁর মনে ছিল। তাই তিনি বড়োবউমাকে বলতেন, ‘বউমা, চলমান জীবনে ধাক্কা আসা কি ভালো? তাই আমি ঘড়িতে দম দিই। তুমি ছেলেমানুষ, এ ব্যাখ্যা বুঝবে না, কিন্তু আমি বুঝি।’
কিন্তু সত্যিই মানুষ তো আর অমর নয়। শেষপর্যন্ত ছিয়ানব্বই বছর বয়সে সত্যিই দেহ রাখলেন শ্রীকান্ত সোম। শেষের দিকে সত্যিই বার্ধক্যজনিত রোগে খুবই ভুগছিলেন শ্রীকান্ত সোম। আজ এই খারাপ, কাল ওই খারাপ লেগেই থাকত আর সত্যি ওইভাবে কষ্ট পেয়ে বেঁচে থাকবার মতো কষ্টকর আর কিছুই হয় না। তাই তাঁর মৃত্যুতে ছেলে-বউরা যে খুব মর্মাহত হয়েছিল তা নয় বরং কর্তা যে শতকষ্ট থেকে মুক্তি পেয়েছেন সেটাই ছিল তাদের সান্ত্বনা।
কর্তার মৃত্যু যখন তিন-চার দিন হয়ে গেছে, তখন মেজোছেলের ছেলে নীতু হঠাৎ মাকে বলল, মা দ্যাখো দ্যাখো, একমাত্র খাবার ঘরের ঘড়িটা ছাড়া বাড়ির সব ঘড়িগুলো কেমন বন্ধ হয়ে গেছে?
‘ও মা সত্যি তো! তোর দাদুও তো বলতেন যে ঘড়ি বন্ধ মানে জীবনও বন্ধ হয়ে যাওয়া, এ যে দেখি মুখের কথাই একদম সত্যি হয়ে গেল।’
এরপর মেজোবউ তার বড়ো জা এবং ছোটো জাকে ডেকে বলল, ‘দ্যাখো দ্যাখো দিদি, বাবার ঘড়িতে দম দেওয়া নিয়ে আমরা কতই হাসাহাসি করেছি কিন্তু এখন দ্যাখো সত্যি বাড়ির চারটে ঘড়িই বন্ধ!’ ছোটো জা শম্পা বলল, কিন্তু আজ সকালেও তো বাবা সব দেওয়ালঘড়ি, হাতঘড়িগুলোতেই দম দিয়েছেন, তবে এটা কী করে হল?
শুনে বড়োবউয়ের স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল হল। সেবলল, ‘চল চল দেখি তো হাতঘড়িগুলোর কী অবস্থা?’ বউরা শ্বশুরমশাইয়ের আলমারি খুলে সাজানো ঘড়িগুলো সব বার করল। কিন্তু ঘড়িগুলো দেখে এক অজানা ভয়ে তাদের হাত-পা ঠাণ্ডা হওয়ার জোগাড়; কী দেখল তারা জান? দেখল, সেদিন সকালে দম দেওয়া সত্ত্বেও সব ঘড়িগুলিই বন্ধ হয়ে পড়ে আছে ঠিক দশটা বেজে তেইশ মিনিটে। শম্পা বলল, ‘কেন এমনটা হল দিদি?’ নীতু ধারেকাছেই বোধ হয় ছিল। সে উত্তর দিল, ‘আরে, দশটা তেইশ মিনিটেই তো দাদু মারা গিয়েছিলেন! দেওয়াল ঘড়িগুলোতেও সময় দ্যাখো সব দশটা তেইশ মিনিট।’

‘ও মা! সেকী! কোথায় যাব রে?’
‘এই তাজ্জব কথাটাই তো এতক্ষণ তোমাদের বলবার চেষ্টা করছিলাম।’ শম্পা বউদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটো, সেবলে উঠল, ‘ও দিদি, এবার যে আমার খুব ভয় করছে গো, এমনটা আবার হয় নাকি?’
এবার আমি আমার গল্পের পড়ুয়াদের জিজ্ঞাসা করি— কী কারণ থাকতে পারে বলো তো এমনটা হওয়ার পেছনে? আমার তো মাথায় কিছুই আসছে না, শুনেছি সব কিছুর নাকি কারণ, যুক্তি কিছু থাকে না, এটাও কি তেমন কিছু? ঘড়ি বন্ধ হতেই পারে, কিন্তু সবই কর্তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে? এর কোনো সদুত্তর আছে কি না এ একেবারেই এক অলৌকিক কান্ড! তবে এটুকুই খালি পরিষ্কার বোঝা গেল যে সত্যিই চলমান জীবনের সঙ্গে চলমান ঘড়ির একটি সম্পর্ক আছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন