শতরূপা সেনগুপ্ত
একটা জঙ্গলের মধ্যে কোনোরকমে লতাপাতা, বঁাশ ও কঞ্চি দিয়ে একটা ঘর তৈরি করে সেই ঘরে থাকত বাবা-মা ও তাদের এক ছেলে। ছেলেটির নাম ছিল কার্তিক। জন্মের সময় ছেলেটি দেখতে খুব সুন্দর হয়েছিল, তাই তার ওইরকম নাম। কার্তিকের বাবা ছিল এক কাঠুরে। তারা ভালো খেতেও পেত না, ভালো পরতেও পেত না। কাঠ বিক্রি করে যা-কিছু রোজগার হত, তাই দিয়েই কোনোরকমে তাদের দিন চলত। কিন্তু ওই তিন জনের মধ্যেই ভগবানে আস্থা, ভক্তি ও বিশ্বাস ছিল খুব বেশি। বড়োলোক যারা হয় তাদের হয়তো অঢেল টাকাপয়সা থাকে কিন্তু গরিবদের সহায় থাকেন ভগবান স্বয়ং। তাই বোধ হয় বলা হয়, যার কেউ নেই তার ভগবান আছেন। যত দৈন্যের দশাই হোক না কেন, ওই কাঠুরের পরিবারটি ভগবানকে নিবেদন না করে কোনোদিনই অন্নজল মুখে তুলত না।
কাঠুরের ছেলে কার্তিক মাঝে মাঝে বাবার সঙ্গে জঙ্গলে যেত কাঠ কাটা দেখতে। কিন্তু বাবাও তো ক্রমশ বুড়ো হয়ে যাচ্ছে, তাই ছেলেকে সে একদিন বলল, ‘দেখ বাবা কার্তিক; তুই আর আমার সঙ্গে বনে শুধু কাঠ কাটা দেখতে যাস না। তুই আলাদা যাস। তুই যতটুকু পারবি, ততটুকু কাঠ কেটে ঘরে আনিস।’
কার্তিক মেনে নিল বাবার কথা। কিন্তু যতই হোক কার্তিকও তো ছোটো ছেলে, কাঠ কেটে সেই কাঠ বয়ে আনতে তার ফর্সা মুখ-চোখ লাল হয়ে যেত, গা দিয়ে ঘাম ঝরে পড়ত। মাকে সে একদিন বলল, ‘মা, কাঠ বয়ে আনতে আমার হাতে-পিঠে খুব লাগে।’ মা প্রমাদ গুনলেন কিন্তু বললেন, ‘তোমার বাবা কাঠুরে আর তা ছাড়া আমরা খুবই গরিব, তোমাকে তো বাবা নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে। তবে জঙ্গলের ওই ঈশান কোণের দিকটায় ‘মধুসূদন’ বলে তোমার এক দাদা থাকেন, তোমার কোনো অসুবিধে হলে তাকে তুমি ডেকে নিয়ো।’ কার্তিক বলল, ‘আচ্ছা।’ মা-র এই কথাটা নিতান্তই একটা কথার কথা কিন্তু কার্তিক এতই সরল যে সে ওই কথাকে অবিশ্বাস করল না।
পরের দিন কার্তিক জঙ্গলে গেল কাঠ কাটতে। কাঠ বয়ে নিয়ে আসার সময় সে ভাবল মধুসূদনদাদা যদি আমার সঙ্গে বাড়ি পর্যন্ত যায়, তবে আমরা দুজনেই ভাগাভাগি করে কাঠ বইব আর তাতে কাউকেই বেশি ভার বইতে হবে না। এই ভেবে ঈশান কোণের দিকে গিয়ে চিৎকার করে সে ডাকল, ‘মধুসূদনদাদা... ও মধুসূদনদাদা কোথায় তুমি? এসো আমার সঙ্গে যাবে... ও মধুসূদন দাদা...’ একটু পরেই কার্তিক দেখল প্রায় তারই বয়সি এক ছেলে একটা আধছেঁড়া গেঞ্জি ও একটা হাফ প্যান্ট পরে হাসতে হাসতে তার দিকে এগিয়ে এল।
‘তুমি তো আমার মধুসূদনদাদা?’
‘ও মা! কাতু, তুই এখানে থাকিস বুঝি? তা রোজই বাড়ি ফেরার সময় তুই আমাকে ডাকবি, আমি সব কাঠ তোর বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাব।’
কার্তিক এতে খুব খুশি হল। এরপরে দুজনে একসঙ্গে গল্প করতে করতে পথ হাঁটতে লাগল। মধুদাদা বলল, তুই আমাকেই সব কাঠগুলো দে-না, তোকে কাঠ বইতেই হবে না। সকাল থেকে আমি তো কিছুই করি না, তাই এতে আমার কোনোই অসুবিধে হবে না।
কার্তিক প্রথমে একটু কিন্তু কিন্তু করছিল, তবে পরে তাকে হার মানতেই হল মধুদাদার জেদের কাছে।
এইরকম করে রোজই কেটে যায়। তবে কার্তিক এবার একটা অদ্ভুত জিনিস দেখল। সে রোজই দেখতে লাগল, সারা রাস্তা গল্প করতে করতে তারা দুজনে আসে কিন্তু বাড়ি ঢোকবার ঠিক আগেই সিঁড়ির ওপর কাঠের বস্তাটা রেখে মধুসূদনদাদা কোথায় যেন চলে যায়। তারপর শত ডাকলেও আর সে ফিরে আসে না।
কার্তিক একদিন মা কে বলল, ‘মা, আমার মধুসূদনদাদাকে আমি যখন ডাকি জঙ্গলের ঈশান কোণ থেকে তখন সে চলে আসে কিন্তু বাড়ি আসার পর ডাকলে আর সে আসে না, কেন গো?’
মা বলেন, ‘কী যে বলিস, সে আবার হয় নাকি?’
কার্তিক কিছুতেই বোঝাতে পারে না মাকে যে সত্যিই ওর সঙ্গে মধুসূদনদাদার দেখা হয়। সত্যি কী মুশকিল বলো তো? তোমাদের মাথায় কি এর সমাধানের কোনো উপায় আসছে?
কার্তিক পরের দিন মধুসূদনদাদাকে বলল, ‘তুমি কেন আমার বাড়ির সামনে থেকে চলে যাও? ওইজন্যে তোমার কথা বললে আমাকে যে কেউ বিশ্বাস করে না।’ বলে কার্তিক কাঁদতে লাগল।
মধুসূদনদাদা বলল, ‘কাতু, মনে দুঃখ করিস না। আমি তো তোকে আগেই বলেছিলাম যে আমি কাঠ নিয়ে শুধু তোর বাড়ি পর্যন্তই যাব।’
এবার কার্তিকই ভাবতে ভাবতে একটা উপায় বার করল। সে তার মাকে বলল কী জান? বলল, কাল যখন সে কাঠ কাটতে যাবে জঙ্গলে, তখন সে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে তার মা আর পাড়াপ্রতিবেশীদের মধ্যে ফুলমাসি, পুষ্পমাসি, অন্নদামাসি ও তার ছেলে পানুকে। কার্তিক বলল, ‘মা, তোমাদের সঙ্গে নিয়ে গিয়ে আমি দেখিয়ে দেব সত্যিই ওই জঙ্গলে আমার মধুদাদা থাকে। তবেই তোমরা সকলে আমার কথা বিশ্বাস করবে।’

C-মধুসূদনদাদা কার্তিকের বাড়িতে কাঠ পৌঁছে দিচ্ছে।
যাইহোক, সকাল বেলায় বাতাসা, রুটি আর ডাল খেয়ে কার্তিক সকলকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল জঙ্গলে।
এদিকে পানু ছেলেটির মনে ছিল ঘোর অবিশ্বাস। সে বলল, ‘কার্তিক, তোর কোনো দাদা আছে বলে তো কোনোদিন কোনোজন্মে শুনিনি। এখন সে আবার নূতন করে রাতারাতি গজাল কী করে?’
‘ওমা! আমি তো তার সঙ্গে রোজ গল্প করতে করতে কাঠ নিয়ে আসি, আর বলে কিনা সেনেই! যাক আজই তার প্রমাণ হয়ে যাবে।’
তারা হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে জঙ্গলের ঈশান কোণে গিয়ে পড়ল। সেখানে গিয়ে কার্তিক পরিত্রাহি চিৎকার করতে লাগল ‘মধুসূদনদাদা’ বলে। কিন্তু কী আশ্চর্য, সেইদিন আর কেউ ঘর থেকে বেরিয়ে এল না। রাগে দুঃখে কার্তিকের দু-চোখ ভরে জল এল। ভারি অভিমান হল দাদার ওপরে। প্রতিবেশীরা সকলে হেসে উঠল।
পরের দিন সে মনের দুঃখে জঙ্গলে এক গাছের তলায় বসে কাঁদছে, হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন বলে উঠল— ‘কী রে, বসে বসে কাঁদছিস যে, আজ আর আমার কাছে আসবি না?’
কাতু চোখ খুলে দেখে তার মধুদাদা। কাতু ভীষণ অভিমান করে বলল, ‘আমায় সকলে অবিশ্বাস করে বলে গতকাল আমি সকলকে নিয়ে গিয়েছিলাম তোমার সঙ্গে দেখা করাতে। তোমাকে কত ডাকলাম কিন্তু তুমি কিছুতেই এলে না। তারা আবার আমায় অবিশ্বাস করল। কেন তুমি এলে না গো, কোথাও গিয়েছিলে?’
এবার মধুসূদনদাদা কাতুকে বলল, ‘কাতু, এবার একটা কথা বলবার সময় এসেছে। দেখ, তোর সঙ্গে আমি অনেকটা পথ গল্প করতে করতে যাই ঠিক কথা, কিন্তু আমি সকলকে দেখা দিই না, দেখা আমি তাদেরই দিই যাদের মন শিশুর মতো সরল, সুন্দর; যার মনের মধ্যে কোনো ঘোরালো প্যাঁচ বা অবিশ্বাস নেই। তোর সঙ্গে কথা বলে আমি বুঝেছি, তুই নিতান্তই সাদাসাপটা সরল ছেলে, তাই তুই আমার দেখা পাস আর তাই আমি তোর মধুদাদা। কিন্তু তুই যাদের সঙ্গে করে এনেছিলি, তারা ঘোরতর জটিল, কুটিল ও প্যাঁচালো। সাধুতার থেকে অসাধুতাই বেশি। তাই কোনোদিনই তারা আমার দেখা পাবে না। তারা যদি ভালো হত তবে তোর কথা বিশ্বাস করত, কিন্তু করেনি। ঠিক এই কারণেই আমি তোর বাড়ি পর্যন্ত যেতাম কিন্তু আশপাশের লোকের কথা ভেবে আমি অদৃশ্য হতাম।’
‘তাই তোকে আমি বার বারই বলছি, যখন যেমন পরিস্থিতিই হোক তোর মনের সরলতা, সততা ও সাধুতাকে কখনোই পরিত্যাগ করবি না। এগুলি থাকলে তুই তোর এই মধুদাদাকে চিরদিনই পাশে পাবি, নয়তো আমি হারিয়ে যাব তোর কাছ থেকে।’
আচ্ছা এবার একটু ভেবে বলো তো আমার খুদে বন্ধুরা, এই মধুসূদনদাদাটি কে হতে পারে? আর যদি তোমরা একান্তই ভেবে বার করতে না পারো, তবে মা-বাবাকেও জিজ্ঞেস করতে পারো।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন