শতরূপা সেনগুপ্ত
‘একী রে, তুই এক্ষুনি অফিস থেকে চলে এলি যে?’ জিজ্ঞেস করলেন অলীকবাবু তাঁর ছেলে সৌম্যদীপকে।
‘হ্যাঁ বাবা, অফিস তো কাছেই, খবরটা দিয়ে আবার আমি অফিসেই যাব। ভাবলাম তোমাকে জানানো উচিত তাই মাঝখানে এক বার এলাম।’
‘তা খবরটা কী?’
সৌম্যদীপ এক গেলাস জল খেয়ে গলাটা ভিজিয়ে বলল, দ্যাখো বাবা, অফিসে কানাঘুসো শুনছি যে এইবার কোম্পানি থেকে নাকি অনেককেই বিদেশে পাঠাবে, কিন্তু মুশকিল হল যে তারমধ্যে আমিও আছি।
‘হুঁ। তা কতদিনের জন্য?’
‘সব মিলিয়ে হয়তো দু-আড়াই বছর মতো হবে। তোমাদের অসুবিধের কথা ভেবে আমি আর ঊর্মিলা অনেক বারই এটা আটকাবার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু ওরা কোনো কথাই শুনল না। কী করা যায় বলো তো?’
অলীকবাবু প্রথমে ছেলের কাছে খুব আনন্দপ্রকাশ করলেন বটে কিন্তু এটা তো সত্যি যে কেউই এই বুড়ো বয়সে আর একলা থাকতে চায় না, তাই এরমধ্যে একটা দুঃখও আছে। মনে মনে তিনি ভাবলেন, সিকিউরিটি গার্ড থাকলেও এই বিশাল বাড়িতে বুড়ো-বুড়ির একলা থাকা কি নিরাপদ হবে? তবে সত্যি কী করা যায়। খবরটা দিয়ে অফিসে চলে গেলে অলীকবাবু এসব নিয়ে আবার দুশ্চিন্তা করতে বসলেন। বুড়ো বয়সে একটা-কিছু মাথায় ঢুকলে হয়, তাড়ানো যায় না। অলীকবাবুর স্ত্রী নেই, বিধবা দিদি নিরুপমা মানে সৌম্যদীপের পিসি থাকে ওদের সঙ্গে। পিসিমা এখন ভাইকে বললেন, ‘অলু শুয়ে পড়, সন্ধ্যা বেলা এ নিয়ে কথা হবে।’ কর্তা আর কী করেন, দোনামনা করে দিদির কথায় বিশ্রাম নিতেই চলে গেলেন, আর পিসিমা গেলেন রান্নাঘরে।
এমন সময় ‘ক্রিং ক্রিং’! উফ ঠিক বিশ্রাম নেওয়ার সময়ই যে লোকে কেন আসে! সারা সকালটা গেল, ঠিক দুপুর বেলাই আসতে ইচ্ছে হল। যাক গে, চেঁচিয়ে ডাকলেন কর্তা, ‘ও হরিয়া, এত বার করে বেল বাজছে শুনতে পাচ্ছিস না?’ কিন্তু তবুও সব চুপচাপ। নির্ঘাত ব্যাটা নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছে। কী আর করা, নিজেই তিনি দরজা খুলে দিলেন কিন্তু খুলে দিয়ে দারুণভাবে ভড়কেও গেলেন। কেন জান? দেখলেন দেহাতিদের মতো একদল লোক সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে অনেক বাক্স-প্যাঁটরা, পোঁটলাপুঁটলি; ও কোনো সংকোচ না করেই বলছে, ‘বাড়িটা কখন ছাড়ছেন?’ তাজ্জব কথা, বলে কী এরা, কবে নয় একেবারে কখন! অলীকবাবু বললেন, ‘আরে! আমার বাড়ি আমি ছাড়ব কেন, বাড়ি কিনেছি কি ছাড়বার জন্যে? এই জুলুমবাজির মানে?’ এতক্ষণে লুঙ্গি ও স্যাণ্ডো গেঞ্জিপরা একটা গুণ্ডামার্কা লোক বলল, ‘সেসব আমরা কিছু জানি না, সব খবরাখবর নিয়েই আমরা এখানে এসেছি, এখানেই আমাদের থাকতে দিতে হবে।’
‘বা রে বা! একি মগের মুল্লুক নাকি যে থাকতে চাইলেই থাকতে দিতে হবে? আমরা সব তবে কোথায় যাব?’ একথার কোনো উত্তর না দিয়ে গুণ্ডামতো লোকটা আবার বলল, ‘ও ম্যাদা, ও ভ্যাঁদা, সুটকেস-ফুটকেসগুলো ভেতরে ঢোকা তো।’ তারপর অলীকবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আরে মশাই অবাক হচ্ছেন কেন, আপনাদের প্রপ্রাইটার এবং সিকিউরিটিই এই ফ্ল্যাট দেখিয়ে দিয়েছে আমাদের জন্য। আমরাও রেডি হয়ে এসেছি এখানে থাকব বলে।’
অলীকবাবুর তো ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থা! তবুও বললেন, ‘কিন্তু সেটা কী করে সম্ভব হবে? দেখুন, আমার মনে হয় আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে। সবে এক বছর আগে তো আমি বাড়িটা কিনেছি, সই প্রমাণপত্র সবই আছে। তা ছাড়া আমার ছেলে-বউমা তো এখন অফিসে। তাদের না জানিয়ে ...’
‘দাঁড়ান, দাঁড়ান, সেসব আপনাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে হ্যাঁ, আমার কথা বিশ্বাস না হলে ছেলেকে ডাকতে পারেন। আর এসব গোলমেলে আইনফাইনের ব্যাপার আপনি বুঝবেন বলেও মনে হয় না।’
এই এতগুলো বছরের মধ্যে এইরকম দুর্বিপাকে অলীকবাবু কখনো পড়েননি। তিনি বেচারি সুগার পেশেন্ট, টেনশন চাপ নিতে পারেন না, তাই সত্যিই গুটিগুটি পায়ে তিনি ছেলের অফিসে গেলেন ছেলেকে ডাকতে। সৌম্য নেমে এল অফিস থেকে। বাবাকে দেখে অবাক হয়ে বলল, ‘এ কী তুমি?’
‘আরে দ্যাখ-না কিছুক্ষণ আগে কোত্থেকে কিছু আজেবাজে লোক সুটকেস-ফুটকেস সঙ্গে করে নিয়ে এসে আমাদের ফ্ল্যাটটা জবরদখল করবার চেষ্টা করছে, আমার কোনো কথাই শুনছে না।’
‘এ বাবা! চলো চলো দেখি আবার কী হল। বাড়িতে তো মা পিসি রয়েছেন, তাদের একা ফেলে এলে কী করে?’
‘প্রাণের ডাহায় বাবা, তবে বাড়ি বন্ধ করে এসেছি।’

C-দেখলেন দেহাতিদের মতো... বাক্স-প্যাঁটরা, পোঁটলাপুঁটলি।
অলীকবাবু বাড়ি গিয়ে চাবি খুলে দেখলেন সুটকেস-ফুটকেসগুলো তারা জায়গায় জায়গায় ঢুকিয়ে দিয়ে মহারাজ হয়ে বসে আছে। এবারে সৌম্য খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, কী ব্যাপার, আপনারা নাকি এই ফ্ল্যাটটার ‘পজেশন’ চাইছেন? কেন? কীসের জন্য?
‘স্যার, আমরা তো প্রথম থেকেই বলছি যে এই ফ্ল্যাটই আমাদের দেখানো হয়েছে থাকবার জন্য।’
‘সেটা কে আপনাদের দেখিয়েছে?’
‘কেন, প্রপ্রাইটার, সিকিউরিটি সবাই।’ সৌম্যর মাথাটাও এবার গুলিয়ে যাচ্ছে। এমন আবার হতে পারে নাকি? এটা কলিকাল হলেও দেশে এখনও আইন বলে তো একটা জিনিস আছে। আইনি কাগজে সইটই করবার পর তো একথা ভাবাই যায় না। তবুও হঠাৎ করে সৌম্যর মাথায় কী খেলে গেল কে জানে! বলল, ‘দাঁড়ান মশাইরা, আপনারা যে এত জোরের সঙ্গে কথাগুলো বলছেন, তা আছে কোনো কাগজপত্র আপনাদের কাছে? শুধু মুখের কথাতে যে কোনো কাজ হয় না, সেটা জানেন তো?’
ওরা অম্লানবদনে বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, এই নিন-না কাগজ, দেখে নিন-না আমরা সত্যি বলছি কি না।’ বলে লোকটি কয়েকটা টাইপ-করা কাগজ সৌম্যর দিকে এগিয়ে দিল। সে-কাগজগুলোর মধ্যে দু-তিনটি স্ট্যাম্প-লাগানো কাগজও ছিল বোধ হয়। ... আচ্ছা তোমরাই বলো, এমন বেআক্কেলে ব্যাপার কেউ কোনোদিন শুনেছে? দেখি সৌম্য কী বলে। সেবেশ কিছুক্ষণ কাগজগুলো দেখল উলটেপালটে। তারপর কপালে হাত দিয়ে সে বসে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর কাজের লোক নারানকে ফরমাশ করল এক গেলাস জল দেবার জন্য। নারান এসব দিক দিয়ে খুব তৎপর। শুধু মুখ হাঁ করতে যা দেরি। তাই সঙ্গে সঙ্গে জল এনে বলল, ‘এই নিন দাদাবাবু।’
জল খেয়ে ধাতস্থ হয়ে সৌম্য এবার বলল, ‘আপনারা কি সব্বাই চোখের মাথা খেয়েছেন? সব্বাই এই ফ্ল্যাট দেখিয়েছে আপনাদের জন্য? ইয়ার্কি? এই তুচ্ছ কারণে আমার এই হ্যারাসমেন্ট।’ এই ধরনের বকুনি শুনে দেহাতিগুলো একটু আমতা আমতা করে বলল, কে-কে-কে-কেন স্যার কী হয়েছে?’
‘কী হয়েছে? কী হয়নি সেটাই বলুন। আরে! এখানে তো ফ্ল্যাট নম্বর টু জি-র কথা লেখা আছে— মানে আমাদের নীচে কোনো একটা তলায়। তাদের তো সত্যি বম্বে যাবার কথা। আর আমাদেরটা তো টুএ। শিগগির বাবাকে প্রণাম করে মাপ চান।’
ব্যাস এরপর আর কারও মুখে কোনো কথা নেই। কথা বলবে কী? মুখ যে হাঁ-করা! বেশ কিছুক্ষণ ওইভাবে থাকবার পর হাঁ-মুখ বন্ধ হল মশার ভয়ে। যাইহোক গুণ্ডামতো লোকটাই বোধ হয় এদের মধ্যে একটু স্মার্ট, সে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইল। না বুঝে ওইসব কথাকাটাকাটি করবার জন্য তারা যে সত্যি অনুতপ্ত ও দুঃখিত, আর বুড়োমানুষকে শুধু শুধু ‘ট্রাবল’ দেওয়ার জন্য তারা যে দারুণভাবে লজ্জিত, এই কথা জানাতে তারা অলীকবাবুর পায়ের ওপরে গিয়ে পড়ল। অলীকবাবু অনেক অলীক নাটকই সকাল থেকে দেখছেন এখন এটাও দেখলেন।
সব ঠিকঠাক হয়ে গেলে পর সৌম্য আবার ছুটে চলে গেল অফিসে। অলীকবাবু ডাকলেন, ‘সৌম্য, ও সৌম্য— যাস না, শুনে যা... শুনে যা ...’
‘ওরে ওঠ ওঠ, চেঁচাচ্ছিস কেন? স্বপ্ন দেখছিস বুঝি? জল খাবি? সৌম্যরা তো ঘরে ঘুমোচ্ছে। ডাকব ওদের?’
দিদির ডাকে ধড়মড় করে উঠে বসলেন অলীকবাবু। ঢক ঢক করে এক গেলাস জল খেয়ে অলীক চোখে তাকালেন চারদিকে। দেখলেন বাইরে বেশ সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে, মৃদুমন্দ হাওয়াও দিচ্ছে। যথারীতি সব ফুচকাওয়ালা, দোসাওয়ালা, কোয়ালিটি ওয়ালস-এর ডাক শোনা যাচ্ছে। ছি ছি! আর তিনি কিনা এই ভর সন্ধ্যা বেলা পড়ে পড়ে ঘুমিয়ে এইসব উদ্ভট স্বপ্ন দেখছেন!
‘বাব্বা! যাস না, যাস না চিৎকারে এত ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি! এই বুড়ো বয়সে এ কি বাচ্চা ছেলের মতো স্বপ্ন দেখে চিৎকার করা?’ বলে চাবির গোছাটা কাধে ফেলে পিসি ঘর থেকে যেতে উদ্যত হলেন।
‘ও দিদি, শুনে যাও, স্বপ্নটা পরে ভুলে যাব।’
‘না, বুড়ো ছেলের স্বপ্ন শুনে আমার কাজ নেই।’
‘আহা, শোনোই-না, এটা যেমন-তেমন নয়, বলছি তো এর মধ্যে বেশ একটা নাটুকে ভাব আছে।’
অগত্যা আর কী করা যায়, সত্যিই তিনি ভাইয়ের পাশে বসেই পড়লেন। স্বপ্নের পুরো বৃত্তান্তটা শুনে হেসে গড়িয়ে পড়লেন নিরুপমা দেবী। বললেন, ‘হ্যাঁ রে, ভীমরতিটা তোর বেশ ভালোই হয়েছে বলে মনে হয়। সৌম্যর বদলি হওয়া নিয়ে কাল থেকে উঠতে-বসতে তোর যা চিন্তা— তারজন্যই এই স্বপ্ন দেখেছিস। আমি যদি গল্প লিখতে পারতাম তো এটা লিখেই ফেলতাম। তবে এ তো শুধু গল্প নয়, এ হল স্বপ্নগল্প; আর তুই হলি এর নায়ক, ওরফে আমার বুড়োখোকা।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন