শতরূপা সেনগুপ্ত
একবার আমি একলাই শতাব্দী এক্সপ্রেস ধরবার জন্য অপেক্ষা করছিলাম আসানসোল স্টেশনে। আমি তখন আসানসোলে পোস্টেড। কয়েক জন বন্ধু মিলে আসানসোলে আমরা যাতায়াত করতাম বাড়ি থেকেই, কারণ তখন পর্যন্ত কোনো বাড়িভাড়া পাওয়া যায়নি আসানসোলে। আমার বন্ধুর মধ্যে ছিল নীতিশ, পরেশ, বাদল, ভূপাল ও আমি। বাড়ি থেকে যাতায়াতের কষ্টটা আমারই সবথেকে বেশি হত কারণ আমার বাড়ি ছিল একেবারে দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জে। আসানসোল থেকে অনেক দূর! এরা সকলেই আমার সঙ্গে আসানসোলেই পোস্টেড ছিল। এই নিয়ে তিন বার ব্যাঙ্ক আমাদের বদলি করেছে কিন্তু প্রত্যেক বারই আমরা পাঁচ জন একসঙ্গেই থেকেছি, কেউ ছিটকে যাইনি এখন পর্যন্ত। তাই আমরা কোনোদিন ভাবতেও পারতাম না কেউ কোনোদিন আলাদা হয়ে যাব। হাতের পাঁচটা আঙুলের ঘুসির যা জোর, আমাদের পাঁচ বন্ধুর জোরও ছিল অনেক বেশি।
তবে এবারে ওদের সকলেরই কী যেন একটা অসুবিধে ছিল, যার জন্য আমি স্টেশনে একলা পড়ে গিয়েছিলাম। শতাব্দী এক্সপ্রেস ট্রেনটি রাঁচি থেকে আসবার কথা ছিল সন্ধ্যা ছ-টার সময়। স্টেশনে দাঁড়িয়েই আছি আর সব অ্যানাউন্সমেন্টগুলো শুনছি। প্রত্যেক বারই বলছে, অনিবার্য কারণবশত ট্রেনটি লেট আছে। কী সেই অনিবার্য কারণ কে জানে! ভেবেছিলাম ভাঁড়ের একটু চা খেয়ে ফ্রেশ হয়ে গাড়িতে উঠব কিন্তু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ক্রমশ ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করতে লাগল। শেষে এত দেরি হতে আরম্ভ করল যে চা ছাড়াও শিঙাড়া, কচুরি, বাদামভাজা সবই চলতে লাগল! মনে পড়ল ছোটোবেলাকার একটা কবিতা—
ঝাঁ ঝাঁ করা দুপুরেতে একা শুয়ে তেতলাতে
খালি খালি খিদে পায় কেন রে?
কবিতায় বলেছে, ‘শুয়ে’ আর আমি এখন স্টেশনে বসে। ব্যাপারটায় খুব-একটা তফাত নেই। এরপর রাত্তির সাড়ে দশটার সময় যখন আবার অ্যানাউন্স করল যে, গাড়ি আরও এক ঘণ্টা লেট আছে, তখন বেশ মন স্থির করেই স্টেশনে রাত্তিরের খাওয়াদাওয়াটাও সেরে নিলাম পুরি-সবজি সহযোগে। রাত ১২টা নাগাদ ট্রেন এলে সেখানে আদৌ কিছু খেতে দেবে কি না সে নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। স্টেশন এখন অনেক ফাঁকা হয়ে গেছে, বেশিরভাগ ভেণ্ডারগুলো সব তল্পিতল্পা গুটিয়ে যে যার যথাস্থানে চলে গেছে। কুলিদেরও খুব কম দেখা যাচ্ছে, তাই খুব স্বাভাবিক কারণেই ঠাণ্ডা ভাবটাও একটু বেশি লাগছে। এইরকম সময় দূর থেকে শতাব্দী এক্সপ্রেস শেষপর্যন্ত এল রাত বারোটা বাজার দু-মিনিট আগে। কিছুক্ষণ আগে পর্যন্তও ট্রেন দেরিতে আসার জন্য খুব রাগ আর বিরক্তি হচ্ছিল কিন্তু এখন ট্রেন দেখে বুকে বল এল, ধড়ে প্রাণ এল। আমি তো ভেবেছিলাম এই সপ্তাহে বুঝি আর বাড়িই যাওয়া হবে না, ওয়েটিং রুমে রাত কাটিয়ে আবার আসানসোলেই ফিরে যেতে হবে। যাইহোক গাড়ি দেখে মনের সব ক্লান্তি মুছে গেল, আবার উৎসাহ নিয়ে ট্রেনে উঠলাম। ট্রেন একেবারেই ফাঁকা ছিল। সবাই যে ধৈর্যত্যাগ করে এদিক-ওদিক চলে গেছে তা বেশ ভালোই বুঝতে পারলাম। আমার ওই বিরাট কামরাটার মধ্যেই লোক ছিল ছয় কি সাত জন। ট্রেনে ওঠবার কিছুক্ষণের মধ্যেই আশাতীতভাবে রাতের ডিনার দিল— ভাত, রুটি, ডাল, সবজি, মাছ আর টকদই। স্টেশনে খেয়ে এমনিতেই আমার পেট ভরা ছিল, তবে ভাবলাম গাড়িভাড়া যখন দিয়েছি, তখন যা পারি তা-ই একটু খাই। সবগুলো থেকেই খুঁটে খুঁটে একটু খেলাম। সারাদিনের ধকল ও সারা সন্ধ্যে অপেক্ষা করার দরুন শরীরে খুবই ক্লান্তি ছিল, ভাবছিলাম কখন দু-চোখের পাতা এক করব। খাওয়া শেষ হলে টিসু পেপারে হাত মুছে বাইরে বেসিনের কাছে গেলাম মুখ ধুতে। তখনই ঘটল এক ভয়াবহ লোমহর্ষক ঘটনা। মুখ ধুয়ে তোয়ালেতে মুখ মুছতে গিয়ে চোখ পড়ল আরশির দিকে। পুরোনো দিনের আরশি, তার চেয়েও বড়োকথা যে দেখে মনে হয় আরশিটা যেন বহুদিন পরিষ্কার করা হয়নি। যাইহোক সেইদিকে তাকিয়ে এমন একটা দৃশ্য আমি দেখলাম তাতে আমার সারা শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেল, শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে গেল, প্রচন্ড গা বমি বমি করতে লাগল, মাথাও কিছুটা ঘুরতে লাগল; মোটকথা সব মিলিয়ে নিজেকে খুবই অসুস্থ বলে বোধ হল। আরশিতে দেখলাম আমাদের ট্রেনটা যে-লাইন দিয়ে যাচ্ছে ঠিক তার পাশের লাইন দিয়ে আমাদের ট্রেনের সঙ্গে সঙ্গে তিন-চারটে কাটা মুণ্ডু ছুটছে; সেই মাথাগুলোর তলায় ধড় বলে কোনো বস্তুই নেই। তাদের মুখগুলো ছিল অসম্ভব ভয়াবহ গুলিভাঁটার মতো লাল দুটো চোখ, মুখে কোনো দাঁত নেই কিন্তু মুখটা হাঁ-করা, মনে হচ্ছিল তাদের বিশাল মুখগহ্বর যেন আমাকে গিলে খেতে আসছে। প্রত্যেকটা মুণ্ডুই ন্যাড়া কিন্তু অসম্ভব তেলা এবং চকচকে যেন খুব টাইট করে কেউ টুপি পরিয়ে দিয়েছে। শূন্যে ভেসে চলেছে সেই মুণ্ডু আর তার সঙ্গে বুকের মধ্যে দামামা পেটবার মতো এক বীভৎস আওয়াজ আমি অনুভব করলাম। সিনেমা সিরিয়ালে এই ধরনের ঘটনা দেখেছি বা উপন্যাস-গল্পেও হয়তো এসব পড়েছি কিন্তু এখন আমি যা দেখছি এ তো পুরো বাস্তব ঘটনা! তখন যে সত্যি আমার কী অবস্থা হয়েছিল, তা আমি এখন ঠিকমতো বোঝাতে পারব না। আমি এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম যে সম্ভবত সেটা দেখবার পর আমি অজ্ঞানই হয়ে যাই, এইভাবে কতক্ষণ কী যে ছিলাম জানি না। যখন জ্ঞান হল তখন দেখলাম, আমি আমার সিটটাতেই বসে আছি, আর ট্রেনের গার্ড ও অন্যান্য সহযাত্রীরা আমার চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিচ্ছে। আমার জ্ঞান ফিরলে গার্ডসাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, ‘স্যার, অচানক আপকা অ্যাইসা তবিয়ত কৈসে হোগিয়া?’ আমার ঘোরটা কাটতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লেগেছিল, তারপর আরও আস্তে আস্তে আমি সব কিছুই বললাম। সেবলল, ‘স্যার, আপ সব ভুল যাইয়ে, ইস লাইন মে রাতকো তো অ্যাইসা হোতাই হ্যায়, লেকিন আপ সোচ লিজিয়ে কি আপনে কুছ নেহি দেখা, কুছ নেহি সুনা।’ মানে সে বলতে চাইল যে গভীর রাত হয়ে গেলে এই লাইনে প্রায়ই এইসব অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে, কিন্তু সে আমায় এও অনুরোধ করল যে মন থেকে এই চিন্তা যেন আমি ঝেড়ে ফেলি। আমি গার্ডটিকে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘এমন ঘটনা তো অন্য কোথাও হয় না, এ লাইনেই-বা হয় কেন?’

‘তিন-চার বছর আগে এই লাইনে পাঁচ-ছ জন লোক ট্রেনে কাটা পড়েছিল, তারপর থেকে রাত হলে তাদের অতৃপ্ত আত্মা ট্রেনের ড্রাইভার এবং ট্রেনযাত্রীদের এইরকমভাবে ভয় দেখায়। এই সময় ট্রেনটিকে খুব জোরে চালাতে হয়, ট্রেন একটু ধীরগতি হলে বিদেহী আত্মাগুলোর আক্রমণ করার সম্ভাবনা খুব বেশি থাকে।’
আমি আবার গার্ডসাহেবকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘তাহলে এই লাইন দিয়ে ট্রেন চালানো তো খুব বিপজ্জনক—ড্রাইভারের পক্ষে আর ট্রেনযাত্রীদের পক্ষেও বটে। আমি না হয় পৈতেধারী বামুনের ছেলে তাই আমি রক্ষা পেলাম, কিন্তু অন্যদের তো এইসব দেখে ট্রেনের মধ্যেই স্ট্রোক হয়ে যাবে।’
‘না স্যার। যখন ট্রেন খুব লেট থাকে, মানে যখন মধ্যরাত হয়ে যায় তখনই এইসব ঘটে, যেমন আজ হল। কামরার মধ্যে কাচবন্ধ অবস্থায় থাকলে কিছু হবে না, কিন্তু আপনি কামরার বাইরে গিয়েছিলেন বলেই এটা হল।’
যাইহোক এই ঘটনা বার বার আমার মনে আসতে লাগল; শরীরের ক্লান্তি, ঘুম, অবসন্নতা, সব চৌপাট হয়ে গেল। হাওড়া স্টেশনে কখন পৌঁছোব সেটাই খালি মনে হতে লাগল। আমি বিশ্বাস করতাম যে, ভগবান তাকেই সেটা দেন যে সেটা সহ্য করতে পারে। ট্রেনযাত্রীদের মধ্যে সেই সহ্যক্ষমতা হয়তো কেবল আমারই ছিল, তাই আমি বাইরে গিয়েছিলাম। এই ধড়হীন কাটা মুণ্ডু দেখবার অভিজ্ঞতা হয়তো আমার ভাগ্যে লেখা ছিল আগে থেকেই, নয়তো পূর্বা এক্সপ্রেসের টিকিট পেতে পেতেও কেন পেলাম না!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন