জ্ঞানোদয়

শতরূপা সেনগুপ্ত

‘ছোটকা, মনে আছে তো ডাকাতের ভালো হয়ে যাওয়ার গল্প তুমি বলবে বলেছিলে। এখন কি বলবে?’

‘ও বাবা! পানুবাবুর স্মরণশক্তিটা তো বেশ প্রখর হয়েছে দেখছি। ভাবলাম ভুলে গেছিস বুঝি। তা মনেই যখন পড়েছে, তখন আমার জন্য আগে এক গেলাস জল নিয়ে আয়। অনেক বকতে হবে তো!’

জল খেয়ে ছোটকা বলতে শুরু করল, ‘তোদের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নিশ্চয়ই তোরা দস্যু রত্নাকরের গল্প পড়েছিস? কেমন করে যে ভয়ংকর দস্যুরাজ রত্নাকর মরা মরা বলতে বলতে রাম রাম বলে বাল্মীকি মুনিতে রূপান্তরিত হলেন তা নিশ্চয়ই তোর অজানা নয়। তা ছাড়া এই নিয়ে তো রবীন্দ্রনাথের নাটকও আছে— বাল্মিকীপ্রতিভা? তবে আমিও এখন ওই ধরনেরই আরও একটা ঘটনা বলছি। এইগুলোকে অবশ্য গল্প না বলে ঘটনা বলাই ভালো, কারণ গল্পের গোরু তো গাছে ওঠে আর এগুলো তো সত্যি, বাস্তব ঘটনা। ঘটনাটা মা সারদাকে নিয়ে, মানে রামকৃষ্ণ সারদা মা-র কথা বলছি। বুঝেছিস তো?’ পানু বলল, ‘হ্যাঁ বলো।’ ছোটকা বলতে লাগল

‘একবার হয়েছে কী, কামারপুকুর থেকে মা সারদা পায়ে হেঁটে দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন। যাত্রাপথে তাঁর সঙ্গে ছিলেন ভূষণমামা ও চেনা-পরিচিত কয়েক জন মহিলা। দক্ষিণেশ্বরে যাওয়ার পথে পড়ে তেলো-ভেলোর মাঠ। সে অতি ভয়ানক জায়গা ও ডাকাতদের একটা ঘাঁটিও ছিল সেখানে। এদিকে কিছুদূর হাঁটবার পর মা সারদা অত্যন্ত ক্লান্ত বোধ করলেন, পা যেন আর চলে না। তিনি দলের অন্যান্যদের বললেন একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য। আগেকার দিনে মানুষ কত কষ্ট করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেত ভাবো। তখন তো আর ট্যাক্সি-অটো ছিল না, ছিল কেবল পালকি, সেও তো মানুষেই নিয়ে যেত। যাইহোক, অন্যদের মনে কিন্তু খুব ভয় ছিল কারণ সামনেই পড়বে সেই ভয়ংকর তেলো-ভেলোর মাঠ। তেলো আর ভেলো হল পাশাপাশি দুটো গ্রাম। এটা মায়াপুরের কাছে। তার ওপর আবার সেখানে ডাকাতদের আনাগোনা। তাই দলের লোকেরা বলল, ‘বিশ্রামে কাজ নেই, বরং তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে যাওয়া হোক যাতে সূর্যাস্তের আগেই মাঠটা পেরিয়ে যাওয়া যায়; নয়তো ডাকাতদের হাতে পড়ে আমাদের সর্বস্ব লুঠ হবে।’ কিন্তু সারদা মা-র বোধ হয় সত্যিই খুব পায়ে ব্যথা করছিল, তাই তিনি অন্যদের বললেন, ‘তোমরা এগিয়ে যাও আমি গাছতলায় একটু বসি।’ সঙ্গীরা সব এগিয়ে গেল প্রাণের ভয়ে। এখন মা সারদা ওই ঘন জঙ্গলে একলা। পায়ে ব্যথা তবুও কষ্টে পা টেনে টেনে চলছিলেন অন্ধকারের মধ্য দিয়ে। হঠাৎ সারা জঙ্গল কাঁপিয়ে রক্ত-জল-করা এক গর্জন শোনা গেল— ‘কে তুই, কোথায় যাচ্ছিস?’ মা দেখলেন দৈত্যের মতো একটি লোক মোটা লাঠি হাতে তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার মাথায় ঝাঁকড়া চুল, হাতে লোহার বালা আর কপালে লালটিপ। সারদা মা বুঝলেন তিনি ডাকাতের হাতে পড়েছেন। কিন্তু ভয় না পেয়ে খুব সপ্রতিভভাবে তিনি বললেন কী জানিস? বললেন, ‘আমি তোমার মেয়ে বাবা, যাচ্ছি তোমার জামাইয়ের কাছে দক্ষিণেশ্বরে।’ তাঁর কথার এই সুরের মধ্যে যে কী যাদু ছিল কে জানে! জানিস এতে ডাকাতসর্দারের মনের এক অসম্ভব পরিবর্তন হল, সে মনে মনে ভাবল— এত বছর ডাকাতি করছি, কই কেউ তো এমন মায়াবী সুরে কথা বলেনি! এরপর যা হল তা আরও আশ্চর্যের। তখন জঙ্গলের সেই ঘুটঘুট্টি অন্ধকার ভেদ করে এক আলোর জ্যোতি ছড়িয়ে পড়ল সারা তেলো-ভেলোর মাঠে; আর ওই আলোতেই মা সারদার মধ্যে সর্দার দেখল তাদের আরাধ্যা দেবী মা কালীকে। গোলমাল শুনে সর্দারের স্ত্রীও বেরিয়ে এসেছিল, তাকেও মা সারদা বললেন, ‘আমি তোমার মেয়ে গো মা, তোমার জামাইয়ের কাছে যাচ্ছিলাম রানিরাসমণির বাড়িতে। সঙ্গীরা সব এগিয়ে গেছে, আমার খুব ভয় করছিল, ভাগ্যিস তোমরা এলে তাই মনে সাহস পেলাম।’

এরপর ডাকাত ও ডাকাতস্ত্রীর মনে এক অলৌকিক উপলব্ধি হল। দুজনেই মা সারদাকে তাদের কুটিরে নিয়ে গেল, খুব আদর-যত্ন করল। খেতে দিল মুড়ি, মুড়কি আর চালভাজা। এ কোন ডাকাত ছিল জানি না তবে এই ডাকাত নাকি পরে ডাকাতি ছেড়ে অত্যন্ত কালীভক্ত হয়ে উঠেছিল। পরদিন ডাকাতসর্দার নিজে মাকে নিয়ে গেল তাঁর সঙ্গীদের কাছে। যাবার সময় ডাকাতসর্দারের স্ত্রীর সে কী কান্না, যেন মেয়ে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে। আসলে মা ভবতারিণী নিজেই মেয়ের রূপ ধরে এলেন সর্দারের কাছে। ঠিক এইরকম আর একটা ঘটনা ঘটেছিল রামপ্রসাদকে নিয়ে।

একবার সরস্বতী নদীতে মায়ের গান করতে করতে যাচ্ছিলেন রামপ্রসাদ। এমন সময় ডাকাতরা রামপ্রসাদকে বেঁধে নিয়ে এল বলি দেওয়ার জন্য। সরস্বতী নদীতে স্নান করিয়ে রামপ্রসাদকে তারা হাড়িকাঠের সামনে নিয়ে এল। তিনি বুঝতেই পারলেন যে তাঁকে বলি দেওয়া হবে। ডাকাতসর্দার জিজ্ঞাসা করল, ‘তোর শেষ ইচ্ছা কী?’ রামপ্রসাদ শেষ বারের মতো মায়ের একটি গান গাইতে চাইলেন। সেগানটা হল—

C-মা দেখলেন দৈত্যের মতো... এসে দাঁড়িয়েছে।

‘তিলেক দাঁড়া ওরে শমন বদন ভরে মাকে ডাকি’ —সেই গানে সেই গানের সুরে কী ছিল কে জানে, গান শেষ হলে দেখা গেল ফণাধর সাপ যেমন নিস্তেজ হয়ে পড়ে তেমনভাবে সর্দারের খাঁড়াও স্তব্ধ হয়ে গেল। এইসব দেখে মন্দিরে যারা ঢাকটাক বাজাচ্ছিল তাদের মধ্যে কেউ কেউ ভয় পেয়ে এদিক-ওদিক চলে গেল। সর্দার রামপ্রসাদকে অনুরোধ করল গানটা আবার গাওয়ার জন্য। সাধক গাইলেন গানটা। তারপর আশ্চর্যজনকভাবে সব ডাকাতরা ঘুমিয়ে পড়ল কিছুক্ষণ। ঘুম থেকে উঠে সকলেরই একটা অসম্ভব উপলব্ধি হল। সর্দার ঢাকিদের বলল, ‘তোরা বাজনা থামালি কেন রে, পুজো তো এখনও শেষ হয়নি।’ তখন অন্য ডাকাতরা সব বলল, ‘কিন্তু তোমার হাতের খাঁড়া তো স্তব্ধ হয়ে গেল ঠাকুর।’ সর্দার বলল, ‘আমি ঘুমের মধ্যে মায়ের কাছ থেকে নির্দেশ পেলাম যে এরপর থেকে বলি ছাড়াই মা পুজো নেবে।’ এরপর যারা সব এদিক-ওদিক চলে গিয়েছিল তারা সব একজোট হল ও মায়ের পুজোও হল।

‘একটা গানে অতগুলো ডাকাতের মনে কত পরিবর্তন হল, তা দেখ পানু। আগেকার সাধকদের সত্যি সে সব ক্ষমতা ছিল।

এই ঘটনার পর থেকে নাকি অলৌকিক কান্ডের মতো ডাকাতরা সকলেই মা কালীর দারুণ ভক্ত সাধক হয়ে উঠেছিল এবং শোনা যায় তারপর থেকে আর সে-মন্দিরে কোনোদিন নরবলি হয়নি।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%