শতরূপা সেনগুপ্ত
‘শেষপর্যন্ত বজু এলি বাপ? যাক ভগবান তোকে যে এই সুমতিটুকু দিয়েছেন তা অতি আনন্দের বিষয়। তা পথে কষ্ট হয়নি তো? বাড়ি চিনতেও অসুবিধে হয়নি নিশ্চয়? কেমন আছিস? কতদিন দেখি না।’
এইরকম অনেকগুলো প্রশ্ন একসঙ্গে প্রবল উত্তেজনার বশে ব্রজগোপাল চ্যাটার্জির পিসিমা ঠাকরুন করে ফেললেন তাঁর আদরের ভাইপোকে। পিসিমার প্রশ্নমালা থামলে ব্রজগোপাল বললেন, ‘তা কী করব বলো, যা একখানা হৃদয়বিদারণকারী চিঠি লিখেছ, তাতে আর না এসে পারা যায়?’
‘হুঁ, নয়তো আসতিস না বোধ হয়?’
‘তা নয় পিসিমা, তবে অফিসের কাজের চাপের কথা আর কী বোঝাব বলো; সব কিছু ঠিকঠাক রেখে আসা যে কী শক্ত সেশুধু আমিই জানি।’
‘ও, তা তুই বোস বোস।’ বলে ব্যস্ত হয়ে পিসিমা বজুকে একটা জলচৌকি এগিয়ে দিলেন বসতে ও তার একধারে রাখলেন নাড়ু ও মুড়কি সহযোগে একবাটি মুড়ি ও এক গেলাস চিনির জল। বজু একটু অবাক হয়েই ভাবল পিসিমা কি জানতেন আমি এখন আসব! তা না হলে খাবারগুলো রেডি হল কী করে? যাক গে এখন অত ভাববার সময় নেই, ছুঁচোরা সব পেটের ভেতর ‘কালচারাল ফাংশন’ করছে তাই পরম পরিতৃপ্তি নিয়ে বজু সেই মুড়ি, নারকেল নাড়ু খেতে লাগল। তারপর এল ইয়া বাটি-ভরতি সদ্য দুইয়ে আনা গোরুর দুধ, কিছু ফল ও মিষ্টি। খাওয়াতে খাওয়াতে পিসিমা হাতপাখার হাওয়াও করলেন।
আসল ব্যাপার হল লক্ষ্মীপিসিমার মনে বড়োই দুঃখ যে পাচ-ছ বছর হয়ে গেল কিন্তু তাঁর ভাইপোর কোনো খবরাখবর বা দেখাসাক্ষাৎ নেই। তাই একটি চিঠিতে পিসিমা বজুকে লিখেছেন:
স্নেহের বজু
তোমার সঙ্গে দীর্ঘদিন কোনো যোগাযোগ নেই বলে আমি খুবই উদবিগ্ন। আমার এখন শরীর ভালো যাচ্ছে না, প্রায়ই জ্বরজারি, বুকে ব্যথা হয়। একাকিত্বের এই জীবন দুর্বিসহ। তাই আমার একান্ত অনুরোধ যে বুড়িপিসিমা মরার আগে তার সঙ্গে একবার দেখা করে যাও। অনেক স্নেহ ভালোবাসা নিয়ো।
ইতি
তোমাদের লক্ষ্মীপিসিমা
চিঠিটা পড়ে আবেগপ্রবণ ব্রজগোপাল সত্যিই ঠিক করলেন যে সামনের ছুটিতে তিনি পিসিমার বাড়ি থেকে ঘুরে আসবেনই আসবেন। ব্যাস, যেই ভাবা সেই কাজ। পরের দিন সকালেই তিনি রওনা দিলেন মিহিজামে লক্ষ্মীপিসিমার উদ্দেশ্যে। আর তারপরের ঘটনা তো তোমরা সব জানই।
যাইহোক পিসিমার হাতের সেবাযত্ন খাওয়ার পর বজুর চোখে পড়ল যে কুলুঙ্গির ওপরে একটি তাসের প্যাকেট রাখা আছে।
‘পিসিমা, তুমি তাস খেলতেও জান নাকি? কই কখনো বলনি তো?’
‘ওই একটু-আধটু জানি। আগে জানতাম না রে, তবে ওঁর সঙ্গে থেকে আমিও কিছু শিখে ফেলেছি। তবে খেলার লোক কই?’
‘গ্র্যাণ্ড! তবে এসো-না হয়ে যাক ক-হাত। কী কী জান?’
‘সব তো মনে নেই বাবা, তবে গ্রাবু, বিন্তি, ব্রে এখনও মনে আছে।’
বজু উৎসাহ নিয়ে বলল, ‘আমি তো গ্রাবুফ্রাবু জানি না, ব্রে-ই খেলি এসো।’
এরপর সত্যি অনেক রাত পর্যন্ত জমিয়ে তারা তাস খেলল। খেলতে খেলতে পুরোনো দিনের ছোটোবেলাকার সব ঘটনা শুনে তার মনটা উদাস হয়ে গেল। বজু লক্ষ করল পিসিমা বুড়ি হলেও তাস খেলা সম্পর্কে তার মন মাথা অতি পরিষ্কার; তাই স্মার্ট শহুরে ব্রজগোপালও মিহিজামের লক্ষ্মীপিসিমার কাছে হেরে হেরে ভূত হয়ে গেল।
এইভাবে কলকাতার কর্মক্লান্ত জীবন এড়িয়ে অনেক দিন পর পুকুরের টাটকা মাছ, খেতে সদ্যজাত সবজি, গাছপাকা ফল, খাঁটি দুধের পায়েস, ক্ষীর খেয়ে বজুর মন ভরে গেল আর দেখতে দেখতে ছুটিটাও কেটে গেল। ফিরে যাওয়ার সময় পিসিমা নানা ধরনের খাদ্য সহযোগে যেমন— আমসত্ত্ব, গুড়, মোরব্বা, নারকেল নাড়ু, তিলকুটো আর খেতের সবজি কিছু দিয়ে বিষণ্ণমনে আদরের ভাইপো বজুকে বিদায় দিলেন। বজুও পিসিমাকে প্রণাম করে, কোলাকুলি করে, আবার আসবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদায় নিল।
গড়িয়াহাটের কাছাকাছি এসে তার মনে পড়ল যে পিসিমার বাড়ি থেকে আসার সময় খাবার খেয়ে জল খাওয়া হয়নি, তাই তেষ্টায় এখন ছাতিটা ফেটে যাচ্ছে। তাই সামনের একটা পানের দোকান থেকে একটু শরবত খেয়ে পেট গলাকে একটু ঠাণ্ডা করে ব্রজগোপাল ফের হাঁটা লাগাল। বাড়ির কাছাকাছি এসে হঠাৎ তার অশোকের সঙ্গে দেখা। ব্রজগোপালের স্কুলের বন্ধুদের মধ্যে এক খুব কাছের বন্ধু হল অশোক। অশোক ব্যবসায় খুব নাম করেছে। তার এক কাঠের ব্যাবসা আছে। আরম্ভ করেছিল ছোটো অবস্থায় কিন্তু এখন তা ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। তার বাড়ি রুবি পার্কের কাছে কিন্তু ছুটির দিন মাঝে মাঝে সে কসবা বাজারেও আসে, যেমন আজ এসেছে। রাস্তায় হঠাৎ তাকে দেখে ব্রজগোপাল বলে উঠল—
‘আরে আরে! অশোক যে। কতদিন পরে দেখা। কেমন আছিস?’ অশোক অতিশয় অবাক হয়ে বলল—
‘ওমা! তুই-ই আমাদের ব্রজগোপাল না কি?’

C-বজুকে খাওয়াতে খাওয়াতে পিসিমা হাওয়া করছেন
অনেক দিন পরে দেখা, চিনতে ভুল হতেই পারে, কিন্তু তবুও অশোকের কথা বলার সুরটা ব্রজগোপালের মোটেই ভালো লাগল না, নিজেকে কেমন যেন অবাঞ্ছিত বলে মনে হল। যাইহোক মুখে ব্রজগোপাল বলল—
‘হ্যাঁ রে, দিন দুয়েকের জন্য একটু পিসির বাড়ি গিয়েছিলাম। তা তুই এ পথে, বাজার করতে বুঝি?’
অশোক কষ্ট করেই যেন একটু হাসল। অশোকটা এমনিতে বেশ কথাটথাই বলে তবে লক্ষ করলাম সেদিন সে নিশ্চুপ ছিল, আমি যে এতগুলো কথা বলে যাচ্ছি তার তো কোনো উত্তর নেই-ই বরং যেন পালাতে পারলেই বঁাচে। মনে হল— কী রে বাবা, আমি ভূত নাকি? নিজের জামাকাপড়ের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সবই তো ঠিক আছে। তবে? এবার নিজের মনেই ‘ধুত্তোর ছাই’ বলে চুপ করে গেলাম। একহাতে তালি বাজাবার চেষ্টা আর কতক্ষণ করব? তবে ও যে কেন এমন অদ্ভুত আচরণ করল সে-প্রশ্ন মনে থেকেই গেল।
যাক এবার নিজের বাড়ির দিকেই এগোলাম। বর্ষা কাল, কী জানি কখন আবার বৃষ্টি এসে যায় কে জানে! বাড়িতে বেল বাজাতে আমার ছোটোমেয়ে টুসু এসে দরজা খুলে আগে আমাকে জড়িয়ে ধরল।
‘বাপি তুমি এসে গেছ?’ তারপর অবাকচোখে আমাকে একটু নিরীক্ষণ করে বলল, ‘একী বাপী, তোমার এ কী চেহারা? কেমন করে হল এটা?’
হতভম্ব হয়ে বললাম, ‘তুইও আমায় দেখে অবাক হচ্ছিস নাকি? তোর অশোককাকু তো সারা রাস্তা আমাকে এড়িয়েই চলল! কী ব্যাপার বল তো, খারাপ কিছু কি হয়েছে আমার চেহারার মধ্যে? যাক গে এখন একটু শুতে দে, বড়ো ঘুম পাচ্ছে।’ দালানের তক্তপোশটা খালিই ছিল, সেখানেই পাখার তলায় জামাটা খুলে আরাম করে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু টুসু কি আর ছাড়ার পাত্রী? সে ফটফট করে বলে উঠল, ‘চেহারা খারাপ হবে কেন? বদলে গেছে এই যা। ভালোই হয়েছে, বেশ ইয়ং লাগছে। কালো চুল আর হাত-পা-মুখের চামড়াও বেশ টান টান লাগছে।’
এইরকম হইচই শুনে বোধ হয় কোথা থেকে যেন টুসুর জেঠিমা মানে আমার বউদি চলে এসে বললেন, ‘ওমা! চুলে কবে রং করালে ঠাকুরপো?
প্রচন্ড অবাকবিস্ময়ে এবং হতভম্ব হয়ে আমি বললাম, ‘চুলে? চুলে রং করিয়েছি আমি? কলকাতায় বসেই কোনোদিন করালাম না আর ওই গ্রামে গিয়ে করাব?’
‘আহা, ইচ্ছে হয়তো ছিল, সময়ের অভাবে হয়নি এতে লজ্জার কী আছে? সাদা চুলের চেয়ে কাঁচা-পাকা চুল দেখতে তো বেশ ভালোই লাগছে। ওখানে বাড়ির কাছে কি ছেলেদের রূপচর্চার কোনো দোকানটোকান ছিল?’’
এবার ব্রজগোপাল ক্রমশ ঝেঁঝোগোপাল হয়ে উঠছেন। ঝাঁঝিয়েই বললেন, ‘কী সব আজেবাজে বকছ বউদি? নেশা-ভাং করেছ নাকি? ভাবলে কী করে আমি চুলে রং করা বা রূপচর্চা করব? কত কষ্ট করে আসছি, এই চচ্চড়ে রোদ্দুরে কোনোরকমে পানের দোকানে একটু শরবত খেয়ে তেষ্টা মিটিয়েছি, আর এখন এসব কী রসিকতা? যাও যাও শুয়ে পড়ো গিয়ে আর আমাকেও শুতে দাও।’
‘ওরে অ টুসু ওই! ওই! ওই! শরবতই হল যত নষ্টের গোড়া রে ... নির্ঘাত ওতে কিছু মেশানো ছিল। ঠাকুরপো, রাগ কোরো না ভাই, আয়নায় এক বার নিজের চেহারাটা দ্যাখো কেমন কালো কালো চুল, টান চামড়া, ঝকঝকে দাঁত ... টুসু, আমার নেড়ু তো তোমায় আর বাবা-কাকা বলে মানবেই না ভাই, আর আমাকেও তো তোমার শাশুড়ির মতনই দেখতে লাগছে গো?’
এদিকে আমি তো পড়লাম মহা ফ্যাসাদে। অনেক ভেবেচিন্তে বউদিকে বললাম, ‘আমার চেহারার সঙ্গে তোমাদের চেহারাগুলো বেমানান লাগছে এই তো? তবে বরং এক কাজ করো। তোমরা সকলেই বরং এক গেলাস করে শবরতটা খেয়ে নাও ওই দোকানটা থেকে, তবে তোমাদের সকলেরই বয়স কম লাগবে আর কোনো চিন্তাও থাকবে না।’
এই প্রস্তাবে সকলেই বেশ রাজি হয়ে গেল। বউদি মনে করিয়ে দিলেন আমার বড়োমেয়ে লতা আর জামাই অর্ণবকেও সঙ্গে ডেকে নিয়ে যেতে। তারপর আমি সকলকে নিয়েই সেই দোকানের উদ্দেশ্যে চললাম। কিন্তু ভারি আশ্চর্য যে সারা গড়িয়াহাট তন্নতন্ন করে খুঁজেও সেই দোকান আর কোথাও পাওয়া গেল না আর আরও অবাক কথা যে, পেছনদিকে তাকিয়েও আর কাউকে দেখতেও পেলাম না। আমি হইহই করে টুসুর নাম ধরে চেঁচালাম, বউদিকেও ডাকলাম, তখন কোথা থেকে যেন এক ভদ্রলোক এসে আমাকে জাপটে টেনে ধরে বললেন, ‘করেন কী, করেন কী? অত উত্তেজিত হচ্ছেন কেন মশাই? সামনে যে গাড়ি আসছে, চাপা পড়বেন যে ...’ বললাম, ‘ছাড়ুন আমাকে, বাড়ির কাউকে আমি খুঁজে পাচ্ছি না যে ...’
‘ও বাপি, অমন কোঁক কোঁক করে আওয়াজ করছ কেন? ভয় করছে যে, ... মা-কে আনবে না মামার বাড়ি থেকে? অনেক বেলা হল যে, মা এসে রান্না না করলে আমরা খেতে পাব না যে?’
চোখ কচলে বললাম, ‘দিদি, জামাইবাবু সব কই?’
‘দিদিরা?’ টুসু আকাশ থেকে পড়ে বলল, ‘তারা তো নিজেদের বাড়িতে, তাদের এখানে আসবার তো কোনো কথা ছিল না!’
‘বটে? তা তোর জেঠু, জেম্মা কই?’
‘ওরা তো এখনও ঘুম থেকেই ওঠেনি।’
লজ্জা পেয়ে বলি, হুঁ, তা তোর মা কই?
বিরক্ত গলায় টুসু বলল, ‘উফ তুমি কবে থেকে এত ভুলো হয়েছ বাপি? মা তোমার সঙ্গে যেতে চাইল না বলে তুমি মা-কে মামার বাড়ি রেখে এলে না? আজ তো মা-কে নিয়ে আসবার কথা। মা বলে গেছে এসে পোলাও-মাংস রাঁধবে। ওঠো, ওঠো ...’
টুসুর এই কথাগুলো শুনে আমি আর একবার চোখ কচলে ঢক ঢক করে জল খেলাম, খানিকটা ধিক্কার লাগল নিজের প্রতি। সত্যি, কী লজ্জা কী লজ্জা! এত ভুল আমার? আমি এতই দিবাস্বপ্ন দেখছিলাম? কিন্তু স্বপ্ন জানলেও একটা খচখচানির ভাব থেকেই গেল মনের মধ্যে। নিজের মনকে প্রশ্ন করলাম, সত্যিই আমার চেহারার কোনো পরিবর্তন হয়নি তো? ভয়ে ভয়ে আরশির সামনে গিয়ে খুব আস্তে আস্তে ঠাকুরনাম জপতে জপতে চোখ খুললাম। দেখলাম সবই ঠিক আছে, চুলও কালো হয়নি, চামড়াও টান টান হয়নি, দাঁতও ঝকঝকে হয়নি। যে ষাট বছরের বুড়ো তা-ই আছি। খুব নিশ্চিন্ত হলাম, বাব্বা, স্বপ্নটা মজার হলেও যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিল!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন