শতরূপা সেনগুপ্ত
বিভু ওস্তাদের ভাগ্যে এবার সত্যিই শিকে ছিঁড়ল। মানে কপালটাই তার খুলে গেল কপালজোরে। কিন্তু কী করে যে তেমনটা হল সেটা শুনতে তোমাদের নিশ্চয় খুব ইচ্ছে করছে? আমিও তো সেই গল্পটাই এখন তোমাদের বলব।
বিভুর আসল নাম হল বিভূতি। তার থেকে বিভু এবং তার থেকে বিভাই। তবে বিভু, বিভাই যা-ই নাম হোক না কেন, তার আসল পরিচয় হল সে গ্রামের মোড়ল প্রবুদ্ধ সমাজপতির ছেলে বিভূতি সমাজপতি। তাকে তোমরা কেউ চিনতে পারছ না তো? খুব স্বাভাবিক। সারাদিন পথেঘাটে ধুলো মেখে সে এত দুষ্টুমি করে বেড়ায় যে তার আসল রূপটা চেনা খুব মুশকিল। মোটকথা পলাশ গ্রামের এক নাদুসনুদুস কালিঝুলি মাখা কালোকুলো ছেলে হল আমাদের বিভু। সে সারাক্ষণ এতই দৌরাত্মি করে কাটায় যে মনে হয় তার বাড়িঘরদোর বুঝি কিছু নেই, কিন্তু তা তো আর নয়, বাড়ি তার যথেষ্ট ভালো; সেখানে তার মা-মামা ও মামি থাকেন। একটাই তার দুর্ভাগ্য যে তার বাবা ইহলোক ছেড়ে চলে গিয়েছেন কিছু বছর আগে, তারপর থেকে মামা-মামি এসে রয়েছেন। তাঁরা নি:সন্তান। মামা মানুষটি খুব ভালো, বাবার অভাব কোনোদিনই তিনি বুঝতে দেননি বিভুকে। বোনপোর পড়াশুনো, সখ-আহ্লাদ সবই তিনি মিটিয়ে চলেছেন। মামিকেও খারাপ বলা যায় না, যথেষ্টই স্নেহশীল। তাঁদের নিজেদের কোনো সন্তান নেই বলেই হয়তো বিভুকে তিনি সন্তানস্নেহেই দেখেন। অতএব বাড়ি তার অবশ্যই আছে কিন্তু বিভু বাড়িতে যে কতটুকু সময় থাকে সেটাই ভাববার। দুপুর, বিকেল বা সন্ধ্যায় তাকে গ্রামের মাঠে দেখা যায় কঞ্চি বা ঢিল্লঙ্গ নিয়ে। কখনো কোনো গেরস্থবাড়ির আমবাগান বা জামবাগানে, কখনো-বা কারোর বাড়ির পুকুরের ধারে একপাল ছেলের সঙ্গে হাতে ছিপ নিয়ে তাকে বসে থাকতে দেখা যেত। বলাই বাহুল্য যে এই বাহিনীর লিডার ছিল বিভু; তাই ওই বাহিনীকে আর সবাই ‘বিভুবাহিনী’ বলত। সারাদিন ধরে সারা পাড়াকে উক্ত্যক্ত ও আতঙ্কিত করে তোলাই ছিল তাদের কাজ।
তার মা ও মামা তাকে অনেক বোঝাতেন যে রাতদিন খেলা খেলা না করে পড়াশুনোর দিকে একটু বেশি মন দিতে। পুরুষমানুষ যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারে তবে ভবিষ্যতে কী হবে, পরবর্তীকালে বিয়ে করে স্ত্রী-সন্তানকে সে পালন করবে কী করে? কিন্তু তোমরা নিশ্চয় শুনেছ যে কথা আছে— ‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি’। বিভুকে কোনোমতেই এসব কথা শোনানো যেত না। সব কথা সে এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বার করে দিত। সে বলত রাত্তিরে সব যখন নিজঝুম নিস্তব্ধ ও শুনশান হয়ে যায় তখন মা সরস্বতী নাকি তার ওপর এসে ভর করেন, যার ফলে বইয়ের সব পড়াশুনো নাকি জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। মুখস্থ করবার শক্তি বেড়ে যায় ও বইয়ের সব লেখাগুলোও নাকি মুক্তোর মতো ঝকঝকে হয়ে ওঠে। সে আরও বলত যে রাতটা হল তার একান্ত নিজস্ব সময়; এই সময়ে কেউই তাকে কোনো কিছুতে বাধা দিতে আসবে না বা বিরক্ত করতে আসবে না তাই রাত্তিরে যেকোনো কাজই খুব মন দিয়ে করা সম্ভব যেটা সকালে হয় না। বোঝো এবার তোমরা, এইসব কথা শোনবার পর কি আর কিছু বলা যায়? তাই ওর মতে দিনের খেলা ছেড়ে পড়া করবার কোনো মানেই হয় না। তাই যেমনকার খেলা তেমনই সে খেলে যায় দিনের পর দিন। তবে তোমরা এটা ভেবো না যেন যে বিভুতি পড়াশুনোয় সত্যি খারাপ ছিল। ওর পড়া নিয়ে কোনোদিনই মা বা মামাকে কোনো চিন্তা করতে দেখা যায়নি। সত্যিই ওর মাথায় দারুণ বুদ্ধি দিয়েছিলেন ভগবান, ভালো বাংলায় যাকে বলে তীক্ষ্ণ মেধা। তাই সারাদিন দৌরাত্ম্য করেও রাতে যেটুকু সে পড়ত তাতেই সে টপাটপ পাস করে বেরিয়ে যেত ভালো রেজাল্ট নিয়ে; তাই তার ওপর কোনো জোরও খাটানো যেত না।
বিভূতি কিন্তু এখন আর আগের মতো নেই। সে এখন রীতিমতো বড়ো হয়েছে, সাবলম্বী হয়েছে। মুখ তার ঢেকে গেছে দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলে। আগের থেকে সে অনেক শান্ত ও সভ্যভব্যও হয়েছে। হাফ প্যান্টের বদলে ফুলপ্যান্ট পরা শুরু হয়েছে; হাতে ঘড়ি, চোখে চশমা আর ঘাড় ছেঁড়া গেঞ্জির বদলে ফুলশার্ট উঠেছে গায়ে। চলন-বলন, আচার-ব্যবহার এবং সাজপোশাকে এখন তাকে সমাজপতি মহাশয়ের ছেলে বলেই মনে হয়। তার মতো দৌরাত্ম্যবাজ ছেলের শান্তশিষ্ট হয়ে ওঠাটা চোখে পড়বার মতো ব্যাপারই বটে। বিভূতির এই পরিবর্তনে তার মা, মামা ও মাসিও একটু শান্তি পেয়েছেন।
এইরকম বেশ সুন্দরভাবেই দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল। হঠাৎ আবার একটা পুরোনো ব্যাপার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। শান্তশিষ্ট বিভূতি হঠাৎ সকলকে অবাক করে দিয়ে ছত্রিশ পাটি দাঁত বার করে একটা চিঠি নিয়ে এল নাচাতে নাচাতে ঘোরাতে ঘোরাতে। ছেলের রকম-সকম দেখে তো মা আর মামা রীতিমতো ভয় পেয় গেলেন, ভাবলেন তার বোধ হয় আবার পুরোনো অভ্যাসটা ফিরে এসেছে। মা ভাবলেন নিশ্চয়ই সে আবার কোনো দুষ্কর্ম করে কারোর কোনো দরকারি কাগজটাগজ কেড়ে নিয়ে এসেছে। সবাই তটস্থ হয়ে রইল নালিশ আসার জন্য। মামা মাকে বললেন, ‘দ্যাখো দিদি তৈরি থেকো নালিশ এই এল বলে।’ মা ভাইকে বললেন, ‘এই ছেলেকে নিয়ে কী করব বলতে পারিস? এত চেষ্টা করি, এত বোঝাই কিন্তু কেন ও আমাদের কথা শোনে না! ভগবান ওকে এত বুদ্ধি দিয়েছেন কিন্তু তবুও কেন এই দৌরাত্ম্যপনা? ও বোঝে না এতে ওর ক্ষতি হয়।’ মামা সব কথা শুনলেন তারপর অনিচ্ছাসত্ত্বে ভয়ে ভয়ে বললেন, ‘দেখি তো চিঠিটায় কী লেখা আছে?’ বিভূতিও হয়তো চাইছিল যে চিঠিটা মামা পড়ুক, কারণ অন্য সময় হলে চিঠিটা নিয়ে নাকের ওপর সে দশ বার ঘোরাত, ‘দিচ্ছি দেব না, দিচ্ছি দেব না’ করে মজা করত কিন্তু এখন অম্লানবদনে চিঠিসুদ্ধ হাতটা বাড়িয়ে দিল মামার দিকে। চিঠিখানা মামা পড়লেন জোরে জোরে। এবার দিদি-ভাই দুজনেরই চোখ কপালে ওঠবার পালা; কেন জান?

C-শান্তশিষ্ট বিভূতি... চিঠি নিয়ে এল...
আসলে চিঠিটায় লেখা ছিল— বিভূতি সমাজপতি কোনো এক সরকারি ব্যাঙ্কে একটি চাকরি পেয়েছে। সামনের সপ্তাহের সোমবার হল সেখানে জয়েনিং-এর তারিখ। কর্মস্থলটিও তাদের বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয়, পাশেরই গ্রামে।
খবরটা শুনে সকলেরই মুখ হাঁ হয়ে গেল। বিভূতির ডানপিটেমির জন্য তাঁদের মনে যে বিরক্তি বা চিন্তা ছিল তা সব গলে জল হয়ে গেল। সরকারি চাকরি কি চাট্টিখানি কথা। তাঁরা তো বুঝতেই পারলেন না বিভু কখনই-বা পড়ল কখনই-বা ফর্ম ফিলাপ করে পরীক্ষা দিল আর কখনই-বা পাস করল। সত্যি ঘুণাক্ষরেও তো তারা কেউ টের পাননি। রাতদিন তো তাকে খেলতেই দেখছেন। যাইহোক মা-মামা ও মামি যারপরনাই আনন্দিত হলেন এই খবরে। মা দু-হাত তুলে প্রণাম করলেন ঈশ্বরকে। সত্যি কার মধ্যে যে কী বস্তু লুকিয়ে থাকে তা বোঝা শক্ত। তোমাদের মধ্যেও যে কে ডাক্তার হবে, কে ইঞ্জিনিয়ার হবে, কে অফিসার হবে তা কি আগে থেকে বোঝা যায়? ছেলের ডানপিটেমির জন্য মা, মামা, মামি কারও চোখেই ঘুম ছিল না কিন্তু এখন সেই ছেলের জন্যেই তাঁরা গর্ব অনুভব করছেন কি না?
তাই বলছিলাম বিভূতির ভাগ্যে এবার সত্যি শিকে ছিঁড়েছে। ওই সাদাসাপটা চঞ্চল ছেলেটা যে তরে গেল বা তার যে একটা চিরস্থায়ী হিল্লে হয়ে গেল, তাতে তার তো ভাগ্যের মোড়ই ফিরে গেল। আর শুধু তারই-বা কেন, সংসারেও কি তার কোনো আঁচ পড়ল না? বাবা-মার সুকৃতি যেমন সন্তানের গর্ব, সন্তানও কি তেমন বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করে না? যাইহোক বিভূতির ভাগ্য যে হঠাৎ করে খুলে গেল—একেই বোধ হয় বলে কপালের জোর।
এবার তোমাদের চুপি চুপি একটা কথা বলি। খেলাধুলো, ঘোরাঘুরি, আমোদ-আহ্লাদ সবই তোমরা অবশ্যই করবে, জীবনে প্রত্যেকটা জিনিসেরই দরকার, কিন্তু তাই বলে পড়াশুনোয় কখনো ফাঁকি দেবে না কেমন? বলা তো যায় না কার কখন কপালের জোর খুলে যায়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন