আত্মার স্পর্শ

শতরূপা সেনগুপ্ত

যেই গ্রামের কথা বলছি, তার নাম হল কৃষ্ণগঞ্জ। এখানে ছিল চার বন্ধু— অতনু, মলয়, শিশির ও বাপ্পা। এদের চার জনকে নিয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যা বেলায় এক জমজমাট আসর বসত। কিন্তু এই আসরে কী হয়, কেনই-বা হয় তা তোমরা জান কি? তাহলে বলি শোনো, এইটি হচ্ছে একটি প্ল্যানচেটের আসর। প্ল্যানচেটের প্রতি এই চার জনের এক দারুণ কৌতূহল ও আকর্ষণ ছিল, তাই একশো টাকা দিয়ে পাল পাড়ায় কবরখানাটার পাশেই তারা এক বাড়িভাড়া নিয়েছিল। ঝুলটুল নোংরাটোংরা পরিষ্কার করে এখন তারা ঘরটিকে ঝাঁ-চকচকে করে তুলেছে। ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না হলে নাকি সেখানে আত্মা আসতে চায় না। এই প্ল্যানচেটের আসরে মিডিয়ম হয় বাড়িওয়ালারই মেয়ে উমা; অর্থাৎ কিনা যার ওপরে আত্মা ভর করে বা যার মধ্যে আত্মাটি ঢুকে পড়ে কথা বলায়। ওই চার বন্ধু আসরে নামায় তাদের প্রিয় আত্মাগুলিকে। ঘরটিতে এমনি প্রায় কিছুই নেই, আছে একটি তেপায়া টেবিল, কয়েকটি চেয়ার, একধারে একটি তক্তপোশ ও দক্ষিণ দিকে একটি জানলা। এ ছাড়া অতনু কিছু ধূপ ও মোমবাতি কিনে রেখেছিল কিন্তু বাড়িওয়ালা দয়া করে একটি ডিমলাইটের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন বলে মোমবাতি কেনাই পড়ে আছে।

এখানে বলে রাখা ভালো যে, যে চার বন্ধুর কথা বলেছি তাদের মধ্যে অতনু ছাড়া বাকিরা সব এক অফিসেরই কলিগ। অতনু রায় একমাত্র দলছুট, কারণ সে হল মনের অসুখের ডাক্তার। ডুমুরতলায় তার চেম্বার।

সেইদিনটা ছিল রবিবারের সন্ধ্যা। প্ল্যানচেট শুরু হয়েছিল সন্ধে সাতটা নাগাদ। অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও প্ল্যানচেটের আসর শেষ করে রাত সাড়ে ন-টা নাগাদ অতনু রায় বাড়ি ফিরছিল। তারিখটা ছিল ডিসেম্বর মাসের সাতাশ তারিখ। ক্রিসমাসের পর, অতএব একটা বেশ হাড়-কাঁপানো হিমেল শীতল হাওয়া সারা আবহাওয়ায় ছড়িয়ে রয়েছে। এর ওপর আবার বৃষ্টিও পড়ছে কখনো-সখনো। শীতকালের সন্ধ্যা যেমন হয়—চারদিকের আকাশ-বাতাসে একটা ধোঁয়ার আস্তরণ, নির্জনতার মধ্যে মাঝে মাঝে বাদুড়দের ফ্যাসফেসে আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, রাস্তাঘাট সব জনশূন্য ও অন্ধকার। অতনুর ভ্যানগাড়ি ছাড়া আর কোনো যানবাহনই নেই রাস্তায়। এক জায়গায় বর্ষার তোড়ে নদীর পাড় ভেঙে গিয়েছে, অনেকটা উঁচু পাড়ের তলায় খরস্রোতা চূর্ণি নদী। মনোবিজ্ঞানী অতনু রায় নদীর পাড়ের কাছাকাছি গিয়ে ভ্যানটাকে একটু আস্তে চালাতে বললেন কাদার প্রকোপ এড়াবার জন্যে। স্থানীয় লোকেরা বলেছিল জায়গাটা ভালো নয়, মাঝে মাঝেই ভূতের উপদ্রব হয়। এবার অতনু সচক্ষে দেখল নদীর পাড়ের ওপর সাদাকাপড়ে আপাদমস্তক মুড়ি-দেওয়া দুটো লোক। এই সময় ভ্যানটাও গেল খারাপ হয়ে, কাদায় চাকা বসে এক্কেবারে নট নড়নচড়ন। কী আর করে, অতনু ভ্যান থেকে নেমে পড়ল গজগজ করতে করতে আর ভাবল কতক্ষণে বাড়ি গিয়ে লেপের তলায় ঢুকে সে ঘুম মারবে। যেতে যেতে কী জানি সেদিন অতনুর একটু ভয় করছিল, খালি মনে হচ্ছিল কেউ যেন তাকে অনুসরণ করছে; কার যেন একটা নিশ্বাসের শব্দ ও গরম হাওয়া সেটের পেয়েছিল। ভয়টা ক্রমশ এতই বেড়ে গেল যে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাবারও সাহস হল না তার।

যাইহোক নানারকম ভয়টয় কাটিয়ে বাড়িতে ফিরলে পরে রঘু খবর দিল যে এক ভদ্রলোক তার সঙ্গে দেখা করবার জন্য নাকি আধঘণ্টা বসে আছেন। এটা শুনে অতনু একটু বিরক্তই হল, কারণ সে ভেবেছিল, বাড়ি ফিরে লেপের তলায় ঢুকে সেরঘুকে এক কাপ চায়ের অর্ডার দেবে কিন্তু তা আর হল না।

ড্রয়িং রুমে গিয়ে অতনু দেখল কোট-প্যান্ট-টাইপরা অতি সুপুরুষ একজন ভদ্রলোক— রীতিমতো লম্বা-চওড়া, ফর্সা সুন্দর চেহারা। নাক-মুখ-চোখ অতি তীক্ষ্ণ, পায়ে কেডস জুতো কিন্তু মাথায় কোনো চুল নেই। সেটি ঢাকতেই সম্ভবত একটি কাশ্মীরি টুপি রয়েছে সেখানে। ভদ্রলোকের নাম বারীন চ্যাটার্জি কিন্তু এতই সুন্দর এবং তীক্ষ্ণ চেহারা যে দেখে অবাঙালি বলেই মনে হয়। অতনুর হাতে একটা ব্যাগ ছিল, তাই আড় করে নমস্কার করে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি আমার কথা কীভাবে জানতে পারলেন?’

‘ইন্টারনেটে আপনার সম্বন্ধে সব জেনেই আমি এসেছি।’

‘ও, তাহলে বলুন আপনাকে আমি কীভাবে সাহায্য করব?

ভদ্রলোক বললেন, ‘দেখুন, অত্যন্ত বিপদে পড়েই আমি আপনার কাছে এসেছি। এইরকম বিপদে আপনি অনেককেই সাহায্য করেছেন বলে শুনেছি।’

‘বিপদটা কী?’ অতনু জিজ্ঞাসা করল।

‘আসলে আমার বোন ইন্দ্রাণী বেশ একটি শান্তশিষ্ট স্বাভাবিক মেয়ে ছিল; কিন্তু কয়েক দিন হল তার আচরণ দেখে হঠাৎ মনে হচ্ছে যে তার ওপরে নিশ্চয়ই কোনো খারাপ আত্মা ভর করেছে।’

‘কিন্তু তার জন্য তো আপনার অন্য কোথাও যাওয়া উচিত। আমি তো আর ভূত ছাড়াই না।’ অতনু বলল।

C-অতনু সচক্ষে দেখল নদীর পাড়ের ওপর সাদাকাপড়ে আপাদমস্তক মুড়ি-দেওয়া দুটো লোক।

‘দেখুন ড. রায়, সব দেখে-শুনে আমার মনে হয়েছে সমস্যাটি শুধু ভর করবার নয়, কিছু মানসিক বা সাইকোলজিক্যাল ব্যাপারও আছে এর মধ্যে।’

‘সে কেমন?’

ভদ্রলোক বললেন, ‘স্বাভাবিকভাবে আর কোনো কিছুই সে এখন করে না। সবসময় খুব রেগে থাকে, অস্থিরভাবে ঘরে পায়চারি করে আর সবথেকে আশ্চর্যের ব্যাপার হল— বোনটা আমার অনবরত অদ্ভুত ভাষায় কথা বলে।’

‘কোন ভাষায়?’

‘সম্ভবত উর্দুতে’।

‘মেয়েটি কি উর্দু কোনোদিন শিখেছিল বা পড়েছিল?’

ভদ্রলোক উত্তর দিলেন, ‘আমরা বাঙালি তাই বিদেশি ভাষা বলতে ইংরেজি ছাড়া আর কেউই কোনো ভাষা জানে না... তাই বলছিলাম আপনি যদি দয়া করে এসে আমার বোনকে কিছু পরামর্শ দেন তো খুব ভালো হয়।’

সেদিন রাত হয়ে গিয়েছিল, তাই তারপরের দিন তাঁরই গাড়িতে করে গেলাম তাঁর বাড়ি। কথা বলতে বলতে জানা গেল, যে বছর দশেক হল বারীনবাবু এই বাড়ি কিনেছেন। দরজা খুললেই মস্ত হলঘর, হলের পেছনে একটি বারান্দা, সেই বারান্দার পেছনে আছে একটু খোলা জমি যেখানে একটি গোরস্থান আছে। কলিং বেল টিপতে পরিচারিকা এসে দরজা খুলতেই দেখা গেল ইন্দ্রাণী সত্যিই অস্থির হয়ে ছুটোছুটি করছে এবং তার সঙ্গে ঘুরছে ছ-সাত জন লোক। মেয়েটি দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলতে বলতে এতই হাত-পা ছুড়ছে যে তাকে সামলাতেই লোকগুলিকে দরকার হচ্ছে। মেয়েটি কাউকেই তোয়াক্কা করছে না; কাউকে ধাক্কা মারছে, কাউকে কনুইয়ের গুঁতো দিচ্ছে।

অচেনা লোক অতনু রায়কে দেখেও সে তেড়ে গিয়েছিল।

অতনু দেখল এই অশান্ত অবস্থায় কোনোমতেই তার সঙ্গে কথা বলা যাবে না। তাই বারীনবাবুকেই সে জিজ্ঞাসা করল, ‘কোন সময় মেয়েটি একটু শান্ত থাকে?’

‘সন্ধ্যার পর সে অনেক শান্ত থাকে।’

‘আচ্ছা, কী দেখে আপনার মনে হল যে মেয়েটির দুর্বোধ্য ভাষাটি উর্দু?’

‘দেখুন, সন্ধ্যা বেলা হাঁটু গেড়ে বসে মেয়েটি নামাজ পড়ার মতো করে। তাই থেকেই আমি এটা ভেবে নিয়েছি।’

‘কাদের ওপর মেয়েটি সবথেকে বেশি রাগ দেখায়?’

‘বাড়িতে যেসব বয়স্কা মহিলারা আছেন, তাঁদের দেখলেই সে পাগলামি শুরু করে।’

এরপর বাড়ি ফিরে অতনু ভাবল কী সমস্যা হতে পারে মেয়েটার। আর উর্দু ভাষায়ই-বা কথা বলে কেন? উর্দু তো মুসলিমদের ভাষা। তবে কি মুসলমানের কোনো প্রেতাত্মা তার ওপর ভর করেছে? এই ধরনের ভারসাম্যহীনতা বা বিপর্যয় ঠিক কী কী কারণে হতে পারে, তার উত্তর খুঁজে পেতে বেশ কিছু বইও ঘাঁটাঘাঁটি করল অতনু। ডাক্তার মানুষ, তার আন্দাজেরও দাম আছে; খুঁজে খুঁজে ঠিক বার করল একটি বই। তাতে লেখা আছে যদি কেউ কোনো ইচ্ছা পূরণ করতে না পেরে অকালে মারা যায়, তবে সেই কামনা চরিতার্থ করতে সেই আত্মা অনেক সময়ই বাড়ির যুবতী মেয়েদের মধ্যে ঢুকে পড়ে নানারকম উৎপাত, জ্বালাতন করে। এই তত্ত্বটিই সারারাত অতনুর মাথায় ঘুরতে লাগল। তবে সে এটুকু বুঝতে পেরেছে যে ইন্দ্রাণীর মুখ থেকে কোনো কথা বার করতে গেলে দুটি জিনিসের দরকার। প্রথমত, তার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতানো; দ্বিতীয়ত, সে যখন শান্ত থাকে তখন তার সঙ্গে কথা বলা।

পরের দিন সন্ধ্যা বেলা অতনু গেল বারীনবাবুর বাড়ি। গিয়ে সব দেখে সে একেবারে হতবাক। দেখল মেঝেতে আসন পেতে বসে দুই হাত তুলে খুবই সুন্দরভাবে নির্ভুল উচ্চারণে নামাজ পড়ছে ইন্দ্রাণী। মনে হল এ যেন তার অনেক দিনের অভ্যাস। এই দেখে মনোবিদ অতনুর মনে আর কোনো সন্দেহই রইল না যে ইন্দ্রাণীর ওপর সত্যিই এক দুষ্ট মুসলমান আত্মা ভর করেছে। যাইহোক, ডাক্তারদের অনেক কিছুই জানতে হয়, আর মানুষের মনের বিজ্ঞান যারা পাঠ করে তাদের তো বটেই। অতনুরও তাই কিছু কোরানের শ্লোক জানা ছিল সেগুলিকেই সে খুব করে বলতে লাগল। মুসলমানের আত্মা ভর করায় ইন্দ্রাণী এখন মুসলিম রমণীরই আচরণ করছে, তাই সহজেই সে অতনুকে বন্ধু ভাবল আর অতনুও দেখল এই সুযোগেই ইন্দ্রাণীর কাছাকাছি থেকে সে মেয়েটির পেটের কথা আদায় করতে পারবে। সে এবার ইন্দ্রাণীকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কে? আপনার পরিবারের সদস্যদের ওপর আপনার এত রাগ কেন?’ ইন্দ্রাণী বলল, ‘আমি এক মুসলিম রমণী। বাড়ির পিছনে যে কবরস্থান আছে তার প্রথম কবরটিতেই আমি শায়িত আছি। প্রতিদিন সন্ধ্যায় কবর থেকে উঠে আমি নামাজ পড়তে যাই, সেদিনও যাচ্ছিলাম, তবে এই বাড়ির নীচ দিয়ে যাবার সময় একটি মেয়ে বারান্দা দিয়ে কিছু নোংরা ফেলে আমার মাথায়, তাই রেগে গিয়ে আমি তার মধ্যে ঢুকেছি।’

‘কিন্তু আপনি তো অদৃশ্য অশরীরী, আপনাকে মেয়েটি দেখবে কী করে?’

‘তা ঠিক, তবে ওই বাড়ির গুরুজনরা কেন ওকে শেখায়নি যে সন্ধ্যা বেলায় যখন-তখন কোনো নোংরা ছুড়ে ফেলতে নেই?’ অতনু এবার বলল, ‘ও তাই আপনার তাদের ওপর রাগ?’ মেয়েটি বলল, ‘হ্যাঁ।’ এবার অতনু আরও বন্ধুত্বের অভিনয় করে বলল,

‘তবে মেয়েটি সত্যি খুবই অপরাধ করেছে। এই অন্যায়ের কোনো ক্ষমাই হয় না। তবে দেখুন, ওই মেয়েটি আমারও খুব বন্ধু তাই আমি আপনাকে অনুনয় করে বলছি ওকে আপনি কোনো মর্মান্তিক শাস্তি দেবেন না। ভুল তো মানুষেরই হয়, দয়া করে ক্ষমা করে দিন ওকে।’

‘ঠিক আছে, ক্ষমা আমি করলাম তবে সেই মেয়েটি এবং তার বাড়ির প্রতিটি সদস্য আগামী সাত দিন যেন আমার সমাধিতে প্রদীপ জ্বালিয়ে, ভক্তিভরে ক্ষমাপ্রার্থনা করে আর মেয়েটিও ভবিষ্যতে যেন এরকম খারাপ কাজ না করে।’ মেয়েটি আবারও বলল, ‘আমি চললাম, আমার শর্ত অনুযায়ী কাজ না হলে এবার সকলে দ্বিগুণ শাস্তি পাবে।’

এরপর এক ঠাণ্ডা হিমশীতল বাতাস হু-হু করে বয়ে গেল। ইন্দ্রাণীর দেহ অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেল; অর্থাৎ বিদেহী আত্মা ইন্দ্রাণীর দেহ ছেড়ে চলে গেল। ইন্দ্রাণী এবার মুক্তি পেল, জ্ঞান ফিরলে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় সে ফিরে এল। পরে প্রতিবেশীদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছিল যে কিছুদিন আগেই পির শাহ আতাউল্লা নামে এক ধার্মিক মুসলমান মারা গিয়েছিলেন।

প্ল্যানচেটের আসরে অতনুরা একদিন সেই মুসলমান বিদেহী আত্মাকে নামাতে সক্ষম হয়েছিল। সেই বিদেহী আত্মা ডাক্তারবাবুকে বলেছিল, ‘মেয়েটি যে অপরাধ করেছে তারজন্য আমি কোনোদিনও তাকে ক্ষমা করতাম না কিন্তু তোমার ওপর আমি সন্তুষ্ট হয়েছি, তাই তোমার খাতিরেই আমি মেয়েটিকে ক্ষমা করলাম।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%