ভূতুড়ে পাদুকা

শতরূপা সেনগুপ্ত

ছোটোকাকা হল বিট্টুর প্রাণের বন্ধু। ছোটোকাকা সম্মানে বড়ো হলে কী হবে, দুজনের মধ্যে বয়েসটার তফাত তো খুব বেশি নয় তাই ছোটোকাকা বা ছোটকাকে বিট্টু তার মনপ্রাণের কথা সবই বলে। সেই ছোটকাই একদিন বিট্টুকে বলল, এই বিটে তোর সঙ্গে তো অনেক দিন গল্প করা হয়নি—যাকে বলে জমিয়ে আড্ডা, তা তোর পড়াশুনো সব ঠিকমতো চলছে তো?

‘ছোটকা, আমার নাম বিটে নয় বিট্টু।’

‘আচ্ছা আচ্ছা ওই হল। চাঁদের এপিঠ আর ওপিঠ। বুঝিস না কেন, বিটে বিটাই এগুলো এক-একটা আদরের ডাক? তুইও তো আমায় ছোটোকাকা না বলে আদর করে ছোটকা বলিস, এতে রাগের কী আছে?’ বিট্টু বলল, ‘আচ্ছা তা নাহয় হল কিন্তু প্রথমেই মুড খারাপ করে দিলে তো?’

‘কেন, মুডের আবার কী হল?’

‘তুমি আমায় বলো তো খেলা নিয়ে কথা না বলে সবসময়ই তোমরা পড়া পড়া কর কেন? না পড়লে বুঝি বড়ো হওয়া যায় না? যারা ইংলিশ চ্যানেল পার হয়েছে বা যে-মেয়েটার কাঠের পা থাকা সত্ত্বেও দারুণ নেচেছে, তারা কতদূর লেখাপড়া করেছে গো? রবীন্দ্রনাথের খ্যাতি তো বিশ্বজোড়া, কিন্তু তিনি যে খুব পড়েছিলেন তা তো শুনিনি। তা ছাড়া সাহিত্যের ইতিহাসের ক্লাসেও আমরা পড়েছি, আগেকার দিনে মেয়েদের তো লেখাপড়াই শেখাত না, তবে তারা সব বড়ো বড়ো মহিলা কবি কী করে হল?’

‘বাপ রে বাপ, না:, তোর সঙ্গে কথায় পারা যাবে না, আচ্ছা বাবা আমি কথা ফিরিয়ে নিলাম; কিন্তু যে দরকারি কথাটা বলতে এসেছি সেটা শুনবি তো?’

‘হুঁ বলে ফ্যালো।’

‘তবে এবার মন দিয়ে শোন, এখন তো আমি অফিস যাব কিন্তু রাতে একটা নেমন্তন্নতেও যাব। বউদিকে তো আর বলতে পারি না, তুই সোনা আমার চটিটা একটু পালিশ করে রাখতে পারবি?’ বিট্টু বিজ্ঞের মতো বলল, দ্যাখো ছোটকা, বিট্টু পারে না এমন কি কোনো কাজ আছে? সব কিছুই তার নখদর্পণে। তোমার এই কাজটাও আরাম সে হয়ে যাবে। তবে ...

‘সিনেমা দেখাতে হবে। তাই তো? তা নিশ্চয় দেখিয়ে দেব। তবে সোনা, তোকে যে দায়িত্বটা দিয়ে গেলাম সেটা কিন্তু করিস। ব্রাশ কালি সব চটির পাশেই আছে।’

এই বলে ক্রিম রঙের গিলে-করা নকশাদার পাঞ্জাবি আর তসর রঙের ধাক্কাপাড় কোঁচানো ধুতিটা খাটের ওপর সযত্নে শুইয়ে রেখে ছোটকা অফিসে চলে গেল।

এদিকে কী মজার ব্যাপার হল শোনো। চটি জোড়া পালিশ করবার নাম করে বিট্টুবাবুর খুব সুবিধে হয়ে গেল। কেন জান? তার মা বা অন্য কেউ যখনই কোনো কারণে তাকে ডাকছে, তখনই সকলকে হুট আউট করে দিয়ে বেশ গম্ভীর হয়ে সে বলছে, ‘এখন আমার অনেক কাজ, সময় হবে না, ছোটকার জুতো পালিশ করতে হবে।’ মেজোজ্যাঠা বললেন, ও বিট্টু, কাগজগুলো খুব অগোছালো হয়ে আছে, একটু গুছিয়ে দে।

অমনি সে বলে উঠল, ‘এখন আর নিশ্বাস ফেলবার সময় নেই গো, দেখি ওবেলা সময় হয় কি না।’ এইভাবে চটি পালিশের দোহাই দিয়ে সে সারাদিন টিভি দেখে, মোবাইলে গেমস খেলে, কমিকস পড়ে নিজের ইচ্ছেমতো দিন কাটাল।

সন্ধ্যা বেলা অফিস থেকে এসে বাড়ি ঢোকবার মুখেই ছোটকার দেখা হয়ে গেল তার আদরের ভাইপোর সঙ্গে।

‘কী হে বিট্টুচাঁদ, যা যা বলেছিলাম সব করেছ তো ঠিকঠাক করে?’

‘হ্যাঁ ছোটকা, তোমার এই ভাইপো কোনোদিনও কথার খেলাপ করে না; দ্যাখো গে কত ঝকঝক করছে তোমার চটি।’

‘বা:, সত্যিই খুব চকচকে হয়েছে তো? এরজন্যে সত্যিই তো তোর কিছু পুরস্কার পাওয়া দরকার। দাঁড়া, ফিরে এসে নিশ্চয় তোর প্রাইজের ব্যবস্থা করব।’

এমন সময় মা ছোটকার জন্য এক কাপ চা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন ও বললেন,

‘বাব্বা, কী মহামন্ত্র ভাইপোর কানে দিয়ে গেছ বাবা, কিছু বলতে গেলে সারাদিন ধরেই বলে চলেছে ছোটকার জুতো পালিশ করতে হবে।’

কথাটা শুনে একটু মৃদু হেসে চা-টা গলায় ঢেলে ছোটকা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে, মুখ পালিশ করে, গায়ে সেন্ট মেখে বেরিয়ে গেল নেমন্তন্ন রক্ষা করতে। ভাইপো মশকরা করে বলে উঠল, ‘ভালো করে খেয়ো ছোটকা, লজ্জা কোরো না কিন্তু।’ তারপর সেমা কে বলল, ‘মা, পেছন থেকে ছোটকার হাঁটাটা একটু অন্যরকম লাগল না?’ মা বললেন, ‘কই আমি তো কিছু দেখলাম না, তোর বাপু সবেতেই একটু খুঁত ধরা চাই। যা নিজের কাজ কর গে যা।’ বলে দু-হাত কপালে ঠেকিয়ে দুর্গা দুর্গা করে তিনিও নিজের কাজে চলে গেলেন।

C-বিট্টু দরজা খুলতেই...চটি খুলে বেরিয়ে গেল

এরপর কী হল জান? ছোটকা খেয়েদেয়ে যখন বাড়ি ফিরছে তখন এক অদ্ভুত আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। শুধু আশ্চর্যই নয়, এটাকে ভূতুড়ে ঘটনাও বলা যায়। অটো থেকে নেমে ভাড়াটা যখন সে ড্রাইভারকে দিতে যাবে তখন তার মনে হল মাথাটা যেন তার বনবন করে ঘুরছে আর তার বঁা-দিকের পা-টাকে অদৃশ্য কোনো শক্তি যেন প্রবলভাবে নীচের দিকে ধরে টানছে—যারজন্য মাটিতে ঠিকঠাক পা-ই রাখা যাচ্ছে না। সে প্রথমে ভাবল নিশ্চয় খাওয়ার চাপাচাপিতে কোনো গ্যাস-অম্বল হয়েছে তাই এমনটা হচ্ছে। কিন্তু ক্রমশ যখন সেটা বেড়েই চলতে লাগল তখন ছোটকা ভয় পেয়ে গেল আর ভাবল না বাবা অটো করে গিয়ে কাজ নেই আর, ভূতের গোঁত্তা খেয়ে যদি গাড়ি থেকে পড়ে যাই তো কেলেঙ্কারি হবে। কলিকালের সন্ধ্যা বেলা, বিশ্বাস নেই ভূতুড়ে ব্যাপার কি না। তাই নিজেই আস্তে আস্তে সে হেঁটে চলল বাড়ির দিকে। বাড়ি পৌঁছেও গেল। তারপর হাঁক দিল, ‘ও বিট্টু, শিগগির দরজা খোল।’

এদিকে হঠাৎ করে কী হল জান? বিট্টু দরজা খুলতেই চৌকাঠ ডিঙোতে গিয়ে টাল সামলাতে না পেরে ছোটকার পা থেকে চটি খুলে বেরিয়ে গেল, চশমাটা মেঝেতে ছিটকে পড়ল, সে হুমড়ি খেয়ে বিট্টুর ওপর পড়ল। বিট্টু বেচারি ভার সামলাতে না পেরে চিতপটাং হয়ে গেল আর ছোটকা তার ওপর উপুড় হয়ে পড়ল। এতগুলো ঘটনা পর পর ঘটে গেল চক্ষের নিমেষে। তখন রাত্তির আটটা সাড়ে আটটা হবে। বাবা অফিস থেকে চলেও এসেছেন তাই কী ভগবানের দয়া যে বাবা-মা দুজনেই বাড়ি ছিলেন। একসঙ্গে অতগুলো সব বিদঘুটে আওয়াজ শুনে হাতের সব কাজ ফেলে তাঁরা ছুটে এসে এই দৃশ্য দেখে তো একেবারেই হতভম্ব। যাইহোক বাবা ছোটকাকে ধরে ধরে ঘরের দিকে নিয়ে গেলেন, আর মা ধরলেন আমাকে।

‘কী করে এমনটা হল রে?’ বাবা জিজ্ঞেস করলেন ছোটকাকে।

‘কী জানি দাদা, বোধ হয় ভূত আমায় ভর করেছে। অটো থেকে নামার পর থেকেই অনেক আজব কান্ড হচ্ছে আমার সঙ্গে।’

এরপরে ঘটল সেই মোক্ষম ব্যাপারটা, যেটা কোনোভাবেই তোমরা কেউ আন্দাজ করতে পারবে না। তোমাদের খুব শুনতে ইচ্ছে করছে তো? তাহলে বলেই ফেলি, শুধু শুধু আর তোমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নেব না।

ঘরের দিকে যেতে গিয়ে সকলকে চমকে দিয়ে ছোটকা এক প্রবল আর্তনাদ করে উঠল, ‘ও বউদি গো, এখানে এটা কী পড়ে আছে জুতোর সেলফে?’

‘কেন?’

মা তখন আমাকে ঘরে নিয়ে যেতে যেতে বললেন,

‘জুতোর সেলফে আর কীই-বা থাকবে ব্রাশ কালি ছাড়া?’

গলা কাঁপিয়ে ছোটকা তারস্বরে বলল, ‘না না না না, এটা তো মনে হচ্ছে বঁা-পাটির চটির অর্ধেক সোলটা।’

‘মানে? কী বলতে চাইছিস তুই?’ বাবা জিজ্ঞাসা করলেন।

‘আরে আমি যে-চটিটা পরে গিয়েছিলাম এ তো তারই অর্ধাংশটা! এই বিটে, শিগগির আমার চটি দুটো নিয়ে আয় তো দেখি তার কী অবস্থা।’

বিট্টুর আর আনার মতো অবস্থা ছিল না, তাই বাবা-ই পায়ে করে টেনে আনলেন সেটা। ও মা, কী কান্ড! সত্যি বঁা-পাটিটার অর্ধেকটা সোল নেই যে, সেটা তো চমৎকারভাবেই শোভা পাচ্ছে জুতোর সেলফে। আর সেটা এমনই পরিচ্ছন্নভাবে খুলে গেছে যে চটি পরে বোঝাই যাবে না কোনো তফাত। তা ছাড়া পায়ে চটিপরা থাকলে বাইরের কেউ বুঝতেই পারবে না যে বঁা-পাটিটা আধ ইঞ্চি আর ডান পাটিটা দেড় ইঞ্চি। এবার ছোটকার সঙ্গে সঙ্গে তোমাদের মাথাটাও বোধ হয় বনবন করে ঘুরছে। এ কী অনাসৃষ্টি কান্ড বলো তো? ছোটকা আবার চেঁচামেচি করে বলল, ও বউদি, এটা তো সবে গত বছরে কিনলাম, তার আজ এই অবস্থা! অত দামি জিনিসের এই পরিণতি! এবার তোমরা বোঝো ব্যাপারখানা।

তবুও বাবা বললেন, আরে তুই হুমড়ি খেয়ে পড়ার সময় সোলটা খুলে যায়নি তো?

‘দাদা গো, তাই যদি হবে সোলটা তো ছিটকে মাটিতে পড়ে থাকবে, জুতোর সেলফে সাজানো থাকবে কী করে?’ সত্যি তো কথা, এ তো অকাট্য যুক্তিই বটে।

‘দাদা গো, র্যাক থেকে নিয়ে আসবার সময়ই এটা হয়েছে।’ বলে ছোটকা কেঁদেই ফেলল। তারপর বলল, ‘হ্যাঁ রে বিটে, তোর তো শুনি সবদিকেই খুব নজর, তবে এটা কী করে হল? চটিটা নিয়ে আসবার সময় তুই লক্ষ করলি না যে ওটা পড়ে আছে?’ বিট্টু এবার মুখ খুলল। বলল, ‘না গো, ওদিকে আর কে তাকাতে গেছে বলো? তুমি পালিশ করতে বলেছিলে, দারুণভাবে পালিশ করেছি, নজর আমার পালিশের দিকেই ছিল। তবে হ্যাঁ, তুমি বেরোবার পর মাকে আমি বলেছিলাম যে তোমার হাঁটাটা একটু অন্যরকম লেগেছিল। কিন্তু চটিটাতে আঠার আঠাত্ব চলে গিয়ে যে সোলের এমন দশা হয়েছে তা আর কী করে জানব? তার মানে আসল দোষটা জুতো কোম্পানির, আমাদের কারোরও নয়, ভূতেরও নয়। অটো থেকে নেমে মাথাঘোরা, পায়ে টান পড়া, আমার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়া— যার ফলে চশমার কাচটাই তোমার ভেঙে গেল তার একমাত্র কারণ হল ওই চটির সোল খুলে যাওয়ায় ব্যালেন্সের অভাব হয়েছিল যে! তা এতে আমার দোষটা কোথায় বলো তো? কী করে জানব চটির অর্ধেক সোল নেই?’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%