শতরূপা সেনগুপ্ত
আফ্রিকা মহাদেশ বলতে প্রথমেই কী মনে পড়ে বলো তো? সেই সব নিগ্রো কালো কালো মানুষগুলোকে তাই না? সেই চ্যাপটা চ্যাপটা নাক, লম্বা-চওড়া, কোট-টাইপরা চেহারার লোকগুলোকে, তাই তো? শুধু কি তাই, আফ্রিকা নামের সঙ্গে ঘনজঙ্গল, ঝোপঝাড়, হিংস্র শ্বাপদ—এইসব কি মনে আসে না? সবুজের সমারোহ দেখতে দেখতে চোখ জুড়িয়ে যায় ঠিক কথা, কিন্তু ভেবে দ্যাখো সেই জঙ্গলের আড়ালে যদি কোনো মারাত্মক জন্তু লুকিয়ে থাকে এবং সুযোগ বুঝে ঝাঁপিয়ে পড়ে আক্রমণ করে, তবে সেটা চট করে কি কেউ আন্দাজ করতে পারবে? এ ছাড়া আফ্রিকায় প্রখর রোদ এবং যখন-তখন ঝড়বৃষ্টি হওয়ার ব্যাপার তো আছেই। প্রখর রোদ বলেই বোধ হয় মানুষগুলোর রং অত কালো।
আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে অনেক দেশ আছে। তার এক দেশ থেকে অন্য দেশে বেড়াতে যাওয়া ওখানের পর্যটকদের এক নেশা। এর ফলে তারা তাদের মনকে সমৃদ্ধ করে, বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করে। এইসব নিয়ে অনেক গ্রন্থ লেখা আছে। আজ এইরকমই একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা আমি তোমাদের বলব।
উগাণ্ডা থেকে একদল পর্যটক একবার কেনিয়ায় বেড়াতে যাচ্ছিল বাসে করে। বাসে তিরশটি সিট ছিল এবং সব সিটই ভরতি ছিল। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাস্তা কিন্তু চারিদিকে ঘন জঙ্গল ও জন্তুজানোয়ারদের আনাগোনা। বাসটির যাত্রীরা সকলে কাচ বন্ধ করে রেখেছিল প্রখর রোদ আটকানোর জন্যও বটে আবার হিংস্র জানোয়ারদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যও বটে। মোটকথা বাসের যাত্রীরা খুব উপভোগ করছিল যাত্রাটিকে। ওইরকম সূর্যকরোজ্জ্বল দিনে বাসে চেপে বেড়াতে যাওয়ার মজাই আলাদা। বাসে বসেই আরাম করে ব্রেকফাস্ট সেরে নেওয়া হয়েছিল টোস্ট, অম্লেট, চা আর কলা দিয়ে। বেড়াতে গিয়ে ফ্লাস্কের চা-কফির স্বাদই আলাদা। বাসটি যখন কেনিয়ার প্রায় কাছাকাছি এসে পড়েছে, তখন হঠাৎ অভাবিতভাবে আকাশের রূপ রং পালটে গেল, ঠাণ্ডা হিমেল হাড়-কাঁপানো হাওয়া বইতে লাগল, সারা আকাশ কালো অন্ধকার হয়ে গিয়ে শুরু হল প্রচন্ড ঝড়, জল ও বৃষ্টি। রৌদ্রমাখা সুন্দর দিনটি যে হঠাৎ করে এত বজ্র-বিদ্যুৎ সংবলিত ভয়াবহ দিন হয়ে উঠবে তা পাঁচ মিনিট আগেও কেউ আন্দাজ করতে পারেনি। দেখতে দেখতে সন্ধে নেমে এল; মাঝে মাঝেই প্রচন্ড জোরে কড়কড় করে বাজ পড়ছে, সামনের রাস্তাঘাট প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ড্রাইভারের বাস চালাতে খুব অসুবিধে হচ্ছিল সেই তুমুল বৃষ্টির মধ্যে। গাড়ির সামনের কাচের ওপরের ওয়াইপার দুটো মানে ড্রাইভারের সামনের কাচে যে দুটো লাঠি বৃষ্টির জল পরিষ্কার করে, সেই ওয়াইপার ঠিকমতো কাজ করছিল না; সব মিলিয়ে রুষ্ট বিধাতার এক প্রচন্ড অভিশাপ নেমে এল। এখন পথে যদি কোনো গাছ বা অন্য কিছু পড়ে থাকে তবে অ্যাক্সিডেন্ট হওয়া থেকে কেউই সেটা বঁাচাতে পারবে না। সত্যিকথা বলতে কী, বাইরের প্রকৃতি তখন এতটাই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল যে তাতে বাসের সকলেই বোধ হয় নিজেদের অজ্ঞাতসারে ঠাকুরনাম জপ করছিল আর কার ভাগ্যে কী দুর্ভোগ নেমে আসবে তা ভেবে পরস্পর পরস্পরের মুখের দিকে তাকাচ্ছিল। বাংলায় একটা কথা আছে যে, ‘যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধে হয়।’ ওই প্রচন্ড দুর্যোগের মধ্যে বাসটা চলতে চলতে হঠাৎ থেমেই গেল; কর্ণের রথের চাকার মতন একেবারে নট নড়নচড়ন। আর ঠিক এই মহামুহূর্তেই একটা অদ্ভুত ঘটনাও ঘটল।
ড্রাইভারটি হঠাৎ যেন দৈববাণীর মতো শুনতে পেল তার কানে কানে কেউ বলছে, ‘প্রকৃতিতে যে তান্ডব খেলা চলছে তাতে কোনো-না-কোনোভাবে এই বাসযাত্রীদের মধ্যে কারোর মৃত্যুঘণ্টা অবশ্যই বাজছে। কারণ কারোর প্রাণ না নিয়ে ওই অদৃশ্য শক্তি কখনোই সন্তুষ্ট হবেন না। কিন্তু সামনে যে অনেক দিনের পুরোনো বুড়ো গাছটি আছে, সেই গাছ ছুঁয়ে কেউ যদি বাসে ফিরে আসতে পারে, তবে ধরতে হবে যে সে বেঁচে যাবে; কিন্তু কেউ ফিরে না এলে বোঝা যাবে যে, সে আর রক্ষা পেল না, তারই মৃত্যু হবে।’ এই দৈবাদেশ পেয়ে ড্রাইভার বাসযাত্রীদের সকলকে এই কথা বলল এবং অনুরোধ করল, এক এক করে গিয়ে গাছটি ছুঁয়ে আসবার জন্যে। যাত্রীরাও ড্রাইভারের সেই অনুরোধ রাখবার চেষ্টা করেছিল, কারণ বাসের মধ্যে কোনো মৃত্যুপথযাত্রী আছে জেনে কেউই স্বস্তি পেল না ও এগোতেও চাইল না।
যাইহোক ওই প্রচন্ড ঝড়জল ও দুর্যোগের মধ্যেই এক-একজন করে যাত্রী নেমে ওই বুড়ো গাছটিকে ছুঁয়ে ফিরে আসতে লাগল। এরকমভাবে উনত্রিশ জন যাত্রী পর পর ফিরে এল। এরপর বাকি রইল একজন। এইবার সকলেই বুঝতে পারল যে ওই লোকটিরই মৃত্যু ঘটবে অবধারিতভাবে। যাত্রীরা তখন ভীষণভাবেই লোকটিকে বলতে লাগল গাছটিকে ছুঁয়ে আসবার জন্য। লোকটির মৃত্যু যে আসন্ন সেটা সে নিজেও হয়তো বুঝতে পেরেছিল, তাই হয়তো সে কিছুতেই বাস থেকে নামতে চাইল না গাছটিকে ছুঁয়ে আসবার জন্য। এক অদ্ভুত মৃত্যুভয় তাকে গ্রাস করল। ভয়ে সে কুঁকড়ে গেল। কিন্তু বাসের বাকি যাত্রীরা প্রাণভয়ে জোর করে টেনে-হিঁচড়ে লোকটিকে প্রায় ঠেলে নামিয়ে দিল বাস থেকে ওই প্রচন্ড দুর্যোগের মধ্যেই। লোকটি সবিস্ময়ে দেখল তাকে নামিয়ে দিয়ে আর অপেক্ষা না করে বাস হুশ করে বেরিয়ে গেল তাকে ফেলে। কেন জান? তারা তো ধরেই নিয়েছে যে লোকটির মৃত্যু অবধারিত। এইভাবে লোকটিকে নামিয়ে তারা হাঁফ ছেড়ে বঁাচল। যে একটু পরে মারাই যাবে তার জন্য আর মায়া বাড়িয়ে লাভ কী?

C-বাসটিই তার চোখের সামনে দাউদাউ করে জ্বলে গেল ও তাতে সব যাত্রীই মারা গেল।
প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে সে যখন ভয়ে আর শীতে কাঁপছে তখন কড়কড় কড়াৎ শব্দে একটি প্রচন্ড জোরে বাজ পড়ল। ভয়ে আতঙ্কে তার মুখ সাদা হয়ে গেল। ওই বৃষ্টিতেও তার গা দিয়ে ঘাম ঝরতে লাগল। সে চোখ খুলতেই চাইল না কারণ সে ভেবেছিল, তার সত্যিই বোধ হয় কিছু হয়ে গেছে; কিন্তু তবুও পরে সে আস্তে আস্তে চোখ খুলে দেখল এক অত্যাশ্চর্য ব্যাপার। দেখল, না তার কিছুই হয়নি কিন্তু যে-বাসটি তাকে ফেলে চলে গিয়েছিল সেই বাসটিই তার চোখের সামনে দাউদাউ করে জ্বলে গেল ও তাতে সব যাত্রীই মারা গেল।
এই অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটার কারণটা কী? মনে হয় সারা বাসের মধ্যে এই লোকটিই ছিল সবথেকে পয়া, যার জন্য এতবড় ঝঞ্ঝা হওয়াতেও বাসের কোনো ক্ষতিই হয়নি। বাজ তো এর আগে বহু বারই পড়েছে আর তা ছাড়া প্রকৃতিতেও যে দুর্যোগ চলছিল তাতে এতক্ষণে সব লোকের মৃত্যু হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল; কিন্তু সে বোধ হয় কোনো ভগবানের দূত ছিল, যার জন্য সকলে বেঁচে ছিল। সে-লোকটি যতক্ষণ বাসে ছিল ড্রাইভার-সহ সব যাত্রীরা বেঁচে ছিল, কিন্তু যেই তাকে নামিয়ে দেওয়া হল—ঘটে গেল বিপর্যয়।
কিছু কিছু ঘটনা আছে যা সব যুক্তি ও তর্কের মধ্যে সীমিত থাকে না, বুদ্ধিতে যেসবের কিছু ব্যাখ্যাও মেলে না; সে সব নিতান্তই অলৌকিক বা দৈব ঘটনা! এই ঘটনাটিও হয়তো তেমনই একটি ঘটনা, আর একেই বোধ হয় বলে ভাগ্যের পরিহাস।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন