কী লজ্জার কথা!

শতরূপা সেনগুপ্ত

‘এই ফুলদা, এই একঘেয়েমির জীবন আর ভালো লাগে না বুঝলি?’ হতাশ নিশ্বাস ফেলে বলল টুকুন। টুকুন আর ওর ফুলদা মানে মিঠুন হল দুই সহোদর ভাই। টুকুন বড়োভাই মিঠুনকে ভালোবেসে ফুলদা বলে ডাকে। দুজনে পিঠোপিঠি ভাই তবে টুকুন যেমন চঞ্চল ও বকবক করে, মিঠুন তেমন নয়; ও বেশ শান্ত প্রকৃতির।

টুকুনের হতাশ হওয়া দেখে ওর ফুলদা বলল, কেন রে ভাই, কীজন্যে তোর মনে এই দুঃখ ও নিরাশাব্যঞ্জক উক্তি?

‘না না, তুই সত্যি ভেবে দেখ ফুলদা, এটা কারোর জীবন হতে পারে কী? পড়াশুনো করে খেয়েদেয়ে ইস্কুলে যাওয়া, ইস্কুলে ক্লাস-করা, তারপর সন্ধ্যা বেলা আবার পড়তে বসা, রাতে ডিনার খাওয়া ও শোয়া। এই খাড়া বড়ি থোড় আর থোড় বড়ি খাড়ার জীবন হলে খেলা-করা, সিনেমা দেখা, গল্পের বই পড়া, টিভি দেখা করব কখন? ইংরেজিতে যাকে বলে এন্টারটেনমেন্ট? আজকালকার ছেলে-মেয়েগুলো যে এত কেন ফাঁকিবাজ হয় তা এবার বুঝছিস? স্রেফ কড়া শাসনে রে, স্রেফ কড়া শাসনে—যাকে বলে বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো।’

‘বাবা, তুই তো দেখছি বেশ অনেক কিছুই বুঝে ফেলেছিস! কিন্তু আসল ব্যাপারটা কী একটু খুলে বলবি?’

‘কী বলি বল? সবই হচ্ছে কিন্তু কোথাও কোনো চার্ম নেই। কোনো নেমন্তন্নটেমন্তন্ন নেই, কোথাও বেড়াতে যাওয়া নেই, সিনেমাটিনেমা দেখা নেই— চারিদিকে নেই আর নেই। আছে কী, না খালি পড়া আর পড়া; উফ অসহ্য।’

ফুলদা বলল,

‘তবে কী করবি, আজকে যাবি একটা সিনেমা? কাছেই, ধর এই ‘‘প্রিয়া’’-তে। ওখানে তো চাঁদের পাহাড় না কী যেন একটা হচ্ছে। সন্ধে সাতটাতে শো, যাবি কী?

ফুলদার কথাগুলো শুনে টুকুন একটু আশ্বস্ত হল। বলল, ‘যাওয়াই যায়, আমি তো সাড়ে পাঁচটাতেই স্কুল থেকে চলে আসি; তবে আসল কথা মাকে-বাবাকে কী করে ম্যানেজ করব?’ শান্ত ছেলে মিঠুন বলল, মাকে আমি ঠিকই ম্যানেজ করতে পারব। কিন্তু বাবা... আচ্ছা সেও হবে ক্ষণ।

দু-ভাই যখন এইসব শলাপরামর্শ করছে তখন ভাঁড়ার ঘরে টুকিটাকি কাজ করছিল তাদের মা সুপর্ণা। এমন সময় কলিং বেলটা সজোরে বেজে উঠল। সুপর্ণা গিয়ে দরজা খুলে দিল। দেখল অভিনব দাঁড়িয়ে আছে একমুখ হাসি নিয়ে।

সুপর্ণা অবাক হয়ে বলল, ‘একী, তুমি এত আগে চলে এলে যে?’

‘কেন? ভালোই তো, কাজ হয়ে গেল চলে এলাম।’

‘না না, সে কথা নয়, শরীরটরির ঠিক আছে তো?’

‘কী আশ্চর্য, শরীর খারাপ হবে কেন? বসও চলে গেলেন, আমি আর কী করি, আমিও চলে এলাম। আর জানো তো সঙ্গে একটা ভালো খবরও নিয়ে এলাম।’

‘কী আবার হল?’

‘বলছি, দু-মিনিট বসো-না, সারাদিন তো কাজই কর।’ সুপর্ণা সামনের চেয়ারখানায় বসল। অভিনব বলতে লাগল, ‘মনে আছে বেশ কয়েক বছর আগে আমরা যখন কটকে যাচ্ছিলাম তখন গোপালনারায়ণ সোম বলে একজনের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল ট্রেনে?’

‘কে বলো তো?’

‘সেই যে, যে-ভদ্রলোক ব্যাঙ্কেই কাজ করতেন, খুব প্রভাবশালী লোক ...’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে, তো তার কী হয়েছে?’

‘তিনি আজ আমার অফিসে এসেছিলেন লোন সংক্রান্ত ব্যাপারে। ওঁর বড়োমেয়ের বিয়ে তো হয়ে গেছে, তবে সামনের আশ্বিনের তিন তারিখে ওঁর ছোটোমেয়ের বিয়েরও ঠিক হয়েছে। অফিসের সকলকেই উনি নেমন্তন্ন করেছেন। অনুষ্ঠানটা হবে এইচএইচআই মানে হিন্দুস্তান হোটেল ইন্টারন্যাশনাল-এ। তা বার বার করেই উনি আমাদের পরিবারের সকলকে যেতে বলেছেন।’

সব শুনে সুপর্ণাও বলল, ‘ও মা! কতদিন পরে একটা নেমন্তন্ন এল, ছেলেরা শুনলে খুব খুশি হবে।’

অভিনব বলল, ‘ডায়েরিটা একটু দ্যাখো তো, সেদিন বিকেলে কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেই তো?’

‘না বোধ হয়।’

‘তবে চলো আমরা চার জনেই বাড়ি বন্ধ করে ঘুরে আসি। এইরকম হোটেল-ফোটেলে নেমন্তন্ন তো বড়ো-একটা হয় না।’

‘ওরে টুকুন শুনে যা একটা নতুন খবর।’ ছেলেকে হাঁক পাড়ল অভিনব।

আড়াল থেকে খবরটা আগেই টুকুনের কানে গিয়েছিল। তবুও এখন বাবার সামনে সে খুব অবাক এবং আনন্দের ভাব দেখাল ও ভান করল যেন এইমাত্রই খবরটা শুনল। টুকুনদের ‘চাঁদের পাহাড়’ যাওয়া আর হল না। ও ভাবল ভাগ্যিস টিকিটটা কেটে ফেলা হয়নি।

এরপর হল কী, দেখতে দেখতে তেসরা আশ্বিনের সেই শুভ দিনটা এসে গেল। বাড়ি বন্ধ করে সেদিন অভিনব, সুপর্ণা, টুকুন ও মিঠুন গেল গোপালবাবুর মেয়ের বিয়েতে। চমৎকার করে বিয়ের জায়গাটা সাজানো। ফুলের তৈরি চমৎকার গেটের মধ্যে দিয়ে তারা ঢুকে গেল। চারিদিকে সুন্দর করে কাটা গাছ, গাছে রংবেরঙের বালব লাগানো, চারিদিকে আলোর রোশনাই আর ফুলের সুগন্ধ, এ ছাড়া রয়েছে মৃদুমন্দ বাজনার আবহ। মোটকথা পরিবেশটির আমেজ অতি হৃদয়গ্রাহী।

এখানে বলে রাখা ভালো যে অফিসের থেকে কোনো নেমন্তন্ন হলে স্বভাবতই অফিসের অনেক চেনা লোকের সঙ্গে অভিনবর দেখাসাক্ষাৎ হয়, চলতে থাকে হ্যালো-হ্যাণ্ডশেকের পর্ব। কিন্তু আজকের এই অনুষ্ঠানে সেটার একটু ব্যতিক্রম দেখা গেল। চেনা লোক কেউই খুব-একটা এগিয়ে এল না, এমনকী কোনো চেনাজানা লোক চোখেও পড়ল না। যাইহোক, মেয়ের কাছে গেল তারা। মেয়েটির জন্য যে উপহার তারা নিয়ে গিয়েছিল সুপর্ণা সেটি মেয়ের হাতে তুলে দিল। মেয়েটিও ঢিপ ঢিপ করে অভিনব আর সুপর্ণাকে প্রণাম করল। ফোটোগ্রাফারদের দাপটে ভিড়ে ভিড়াক্কার কিন্তু তবুও উঁকিঝুঁকি মেরে মনে হল মেয়েটি ফর্সা না হলেও দেখতেশুনতে খারাপ নয় মোটেই এবং বেশ হাসিখুশি।

অভিনবরা যখন সোফায় বসে আছে তখন কোথা থেকে হঠাৎ করে বেশ এক নাদুসনুদুস গোলগাল চেহারার লোক এসে ধপ করে অভিনবর পাশে এসে বসল। এক এক জন লোক থাকে যারা অন্যের কাছে পাত্তা পায় না বলেই নিজেই নিজের গুরুত্ব আদায় করে নেয়। ইনিও বোধ হয় সেইরকমই কেউ, কারণ অভিনব কিছু না জিজ্ঞেস করলেও নিজের পরিচয় দিয়ে তিনি বললেন, অধমের নাম জগমোহন সমাদ্দার। তা মশাই আপনি পাত্রপক্ষ না কন্যাপক্ষ?

‘না মশাই আমি কোনো পক্ষেরই নই, এখানে এসেছি স্রেফ অফিসের সুবাদে।’

‘ও, তা বেশ। এ দুটি আপনার ছেলে বুঝি?’ টুকুন আর ফুলদাকে দেখিয়ে ভদ্রলোক বললেন। উত্তরে অভিনব একটু মৃদু হাসল। ভদ্রলোক বললেন, ‘তা বেশ বেশ। তা ভাইয়েরা কী করা হয়?’ টুকুনের দিকে তাকিয়ে বললেন।

‘আমি ক্লাস টেন-এ পড়ি আর ফুলদা বিএ ফাইনাল ইয়ারে পড়ে ইকনমিক্স অনার্স নিয়ে।’

‘ও বাবা! তা বাড়ি কোথায় তোমাদের?’

‘এই তো রুবি হসপিটালের কাছে।’

‘ও, তা কাছেই।’ এবার তিনি অভিনবকে বললেন, ‘মশাই, চেনা কাউকে খুঁজে পাচ্ছেন না তো? তা পাবেনই-বা কীভাবে? খুব কম লোককেই বলেছে তো ...’

ভদ্রলোক এমনিতে ভালোই তবে বড্ড বেশি গায়ে-পড়া। আর এই ব্যাপারটাই অভিনবর অপছন্দ। ভাবছিল বলে যে আপনিও তো কথা বলার লোক পাচ্ছেন না দেখছি, নয়তো অচেনা লোকের সঙ্গে কি কেউ এত কথা বলে? কিন্তু একটা ব্যাপারে তার একটু খটকা লাগল। অভিনব ভাবল, ভদ্রলোক কেন বললেন কম লোককে নেমন্তন্ন করার কথা? অভিনব নিজে তো স্বচক্ষেই দেখেছে গোপালনারায়ণবাবু জনে জনে নেমন্তন্ন করছেন। তবে ওঁর নামে মিথ্যেকথা বলে জগমোহন লোকটার কী লাভ হবে? তা ছাড়া এ তো অভিনবদের অফিসেরও কোনো লোক নয়, তবে এতসব কথা এ-ই বা জানল কী করে?

C-ফুলের তৈরি চমৎকার গেটের মধ্য দিয়ে তারা ঢুকে গেল।

যাইহোক রাত ন-টার সময় বেশ খিদে খিদে ভাব নিয়ে অভিনবরা ডাইনিং টেবিলে গেল খেতে। খাবারের মেনু যে অতি উৎকৃষ্ট ছিল তা বলাই বাহুল্য। ভালো জায়গার জিনিস তো ভালো হবেই। দশটার সময় মৌরি-মিছরি চিবোতে চিবোতে তারা যখন উঠি উঠি করছে তখন— ‘হ্যালো, মিস্টার চৌধুরি, এত দেরি করে এলেন কেন? সবাই ওপরে আপনাকে খুঁজছিল। অনেকেই চলে গেছে, তবে এখনও কেউ কেউ আছে, যান সোজা ওপরে উঠে যান লিফট দিয়ে। আজ আমি আসি, অনেক দূর ফিরতে হবে তো।’

কী সর্বনাশ! তার মানে অভিনবরা তো ভুল জায়গায় এসে ভুল জায়গায়ই নেমন্তন্ন খেয়েছে। কথা শুনে অভিনব অতি কষ্টে মুখ বন্ধ করে রাখল, মুখে যে মৌরি-মিছরি রয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে তার মাথায় বজ্রাঘাত হল। কী হবে এখন? আরে, কার্ডে তো পরিষ্কার লেখাই ছিল যে গোপালনারায়ণ সোমের মেয়ে রঞ্জাবতীর বিবাহ হবে হোটেলের দোতলায়; আর তারা তো একতলায়। মানে এখানে অনাহূত অতিথি হয়ে তারা নেমন্তন্ন খেয়ে বসে আছে! ছি ছি কী লজ্জা! ... তাই কোনো চেনা মুখ চোখে পড়ছিল না। জগমোহনও তাই বলল খুব কম লোককে নেমন্তন্ন করেছে। একতলার লোকটা হয়তো সত্যি সত্যিই তাই করেছে। এরপর তো আর ওপরে যাওয়ার প্রশ্নই নেই আর অত কথা ভাববারও সময় নেই। এখন ‘চাচা আপন প্রাণ বঁাচা’ গোছের অবস্থা। তাই আর কোনোদিকে না তাকিয়ে অভিনবরা দৌড়ে গাড়িতে গিয়ে উঠে পড়ল। অভিনব নিজেই গাড়ির ড্রাইভার, তাই গাড়িও হুশ করে বেরিয়ে গেল।

গাড়িতে উঠে ফুলদাই আগে কথা বলল, ‘বাপি, কার্ডটা কি তুমি ভালো করে দেখনি?’’

‘দেখেছিলাম তো, বাড়ি থেকে বেরোবার সময়ও কথাটা মনে ছিল। তারপর কী থেকে যে কী হয়ে গেল... আর এটাও বলি, একতলা-দোতলার হোটেলে লোকে নেমন্তন্ন করেই-বা কেন? প্যাণ্ডেল-খাটানো বাড়িতে বেশ ঢুকলাম, খেলাম-দেলাম চলে এলাম। তা নয় যত্ত সব উলটোপালটা ব্যাপার।’ এরপর কথা বলল সুপর্ণা — ‘কোনো চেনাজানা লোককে যখন সত্যি দেখতে পাচ্ছিলে না বা সেই লোকটা জগমোহন না কী যেন, কম লোককে নেমন্তন্ন করেছে বলে একটা সন্দেহের কথা বলল তখনও কিছু মনে পড়ল না? যা ঘটল তা তো সিরিয়াল, সিনেমা, নাটক-নভেলের একটা গল্প।’ বলে একটু দম নিল সে। তারপর আবার বলল, ‘তা ছাড়া অফিসের চ্যাটার্জি সাহেবও তো দেখে গেলেন যে আমরা একতলায় বসে মৌরি চিবোচ্ছি। উফ, কী মস্ত দোষ, কী লজ্জার একশেষ ... সেকী ভাবল কে জানে! ভাবলে আমার তো লজ্জায় লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে।’

অভিনব ব্যাপারটাকে একটু হালকা করার চেষ্টা করে বলল, ‘দ্যাখো, যে-ভুল হয়েছে সেটাকে তো আর ফেরানো যাবে না, নি:সন্দেহে এই ভুলটা খুবই সাঙ্ঘাতিক, একেবারে প্রায় ক্ষমারই অযোগ্য, তবে এটাও তো ঠিক যে নেমন্তন্ন অন্য জায়গাতে খেলেও ভালোমন্দ খেয়ে পেটটা তো ভরিয়েছি। চ্যাটার্জি সাহেব আমাদের দেখেছে ঠিকই কিন্তু ছবি তো আর তুলে রাখেনি কোনো প্রমাণ স্বরূপ। তাই না রে টুকুন?’

টুকুন বেচারা আর কী করবে? এত ভারি ভারি কথার উত্তর দেওয়ার বুদ্ধি কি ওই বাচ্চা ছেলের থাকে? বাবার কথার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার ক্ষমতা বা সাহস কি ওর আছে? মা-বাবা-দাদা সকলেই তো তার খুব প্রিয়, সে কার দিকে যে যাবে তা-ই তো সে-বেচারা বুঝতে পারছে না; তবে একটা কথা সে বুঝেছে যে বাপি একটা বিরাট কিছু ভুল করে ফেলেছে এবং খুব একটা লজ্জার কাজ করেছে। কিন্তু এই ভেবে সে স্বস্তি পেয়েছে যে ছোটোরাই খালি ভুল করে না, কোনো কোনো সময় বড়োরাও দোষ করে। ভুল করলে ছোটোদের খালি বকা হয় কিন্তু বড়োদের সেইরকম বকবার কেউ নেই। কিন্তু মানুষ মাত্রেই ভুল করে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%