রঙিন পাথর

শতরূপা সেনগুপ্ত

সেদিনটা ছিল রবিবার। তোমরা তো জানই রবিবার হল ছুটির দিন। বিছানা ছেড়ে উঠতেই ইচ্ছে করে না, সব কিছুতেই একটা আলিস্যি আলিস্যি ভাব থাকে। আমারও ঠিক তেমনই হয়েছিল, দিন আর কাটতেই চায় না। এমন সময় হঠাৎ বন্ধু প্রলয়ের ফোন এল। প্রলয়ের নামটা শুনে প্রথমটা খুব অবাকই হয়েছিলাম কারণ অনেক দিন পর তার সঙ্গে যোগাযোগ হল। তারপর মনে পড়ল প্রলয় মানে সেই আমার ছোট্টবেলাকার বন্ধু, ঠিক তোমাদেরই মতো। একথা-সে কথার পর জানতে পারলাম সে এখন একটা সরকারি ব্যাঙ্কের বড়ো অফিসার। প্রলয় আমাকে অনুরোধ করল সন্ধ্যা বেলা চায়ের আসরে আসতে মোড়ের মাথায় কফি হাউসটায়। সেখানে অনেক পুরোনো বন্ধুরা আসবে। দেখাসাক্ষাৎ হবে আর গল্পগুজব, খাওয়াদাওয়া তো আছেই। আমি আর লোভ সামলাতে পারলাম না, চলে গেলাম সান্ধ্য আসরে। আসরে জমায়েতটাও ভালো হয়েছিল আর আসরও বেশ জমে উঠেছিল। পুরোনো সব বন্ধুদের কাছ থেকে পুরোনো সব স্মৃতির কথা, গল্পগাছা শুনতে দারুণ লাগছিল। প্রত্যেকেই নিজের নিজের কিছু কথা বলছিল। প্রলয় বলল, ‘এখন সে সুন্দরবনের গোসাবায় বদলি হয়ে গেছে। অনেক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা রয়েছে তার ঝুলিতে।’ শোনবামাত্রই আমরা সকলে তাকে চেপে ধরলাম তেমন একটা গল্প বলার জন্য। শুনলাম ব্যাঙ্কের অফিসার হওয়ার জন্য ওকে প্রায়ই এদিক-সেদিক যেতে হত চারিদিকের ঘন জঙ্গল, হিংস্র শ্বাপদ, সাপখোপ, জলের কামট, কুমিরকে অগ্রাহ্য করে। এর ফলে তার জীবনে নাকি অনেক আশ্চর্যজনক ও বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ হয়েছে। প্রলয় বলছিল সেইসব ঘটনার কিছু তার নিজের চোখে দেখা আবার কিছু অন্যের মুখে শোনা। তারপর বলল, ‘এইরকমই একটা অন্যের মুখে শোনা রোমহর্ষক একটা গল্প আমি তোদের বলছি। মন দিয়ে শোন।’ তোমরাও শোনো মন দিয়ে।

প্রলয় শুরু করল—

গোসাবায় একটা দ্বীপের নাম হল বালিদ্বীপ। ব্যাঙ্ক কতৃপক্ষের আদেশে একবার আমাকে সেই দ্বীপে যেতে হয়েছিল। আমি যে-লঞ্চে যাচ্ছিলাম, সেটা ব্যাঙ্কেরই লঞ্চ এবং সেখানে আমার সঙ্গে ছিল পঞ্চায়েত প্রধান গোপাল মন্ডল এবং আরও দু-তিন জন ব্যাঙ্কের কর্মী। আমাদের যে শুধু যেতেই হত তা নয় এই ধরনের কাজেকর্মে গেলে মাঝেমধ্যে সেখানে রাতও কাটাতে হত। একেই ঘনজঙ্গল তার ওপর আবার সাপখোপ বাঘ-ভাল্লুকের উপদ্রব। প্রথম প্রথম রাতে থাকতে বেশ ভয়ই করত তবে পরে অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। আমরা দিনের বেলা ব্যাঙ্কে কাজ করতাম বটে কিন্তু সন্ধে থেকে নানারকম গল্পগুজব, তাস খেলা, আড্ডা মারা এসব চলত। কেন বলো তো? কারণ ওই বাঘের রাজ্যে রাত পর্যন্ত কেউ অফিস করত না, দিনের আলো থাকতে থাকতেই সব বাড়ি চলে যেত।

কথা প্রসঙ্গে পঞ্চায়েত প্রধান গোপালবাবু একবার বলেছিলেন এইসব দিকে সাপের উৎপাত অসম্ভব বেশি। লঞ্চে যেতে যেতে তিনি বলেছিলেন বিশেষ করে জলাভূমির দিকে কেউটে, গোখরো, চন্দ্রবোড়া, শঙ্খচূড়, কালাস প্রভৃতি খুব বিষধর সব সাপ আছে। আমি তখন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ওইসব সাপের হাত থেকে কীভাবে নিস্তার পাওয়া যায়? গোপালবাবু বলেছিলেন, নিস্তার নেই স্যার, সাপ বাঘ এদের থেকে বঁাচিয়েই মানুষকে চলতে হয়। কিছু কিছু সাপ আছে যাদের বিষ অতি মারাত্মক, সেগুলো কামড়ালে কিছুক্ষণের মধ্যেই মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু কালাস বলে একটা সাপ আছে সেই সাপ কামড়ালে রক্তে তার বিষ মিশতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগে।

ওঁকে জিজ্ঞেস করলাম, তবে তো কালাস সাপে কামড়ানো লোকটাকে বঁাচানো যায়, কিন্তু ওই সময়টা কী করা হয়?

গোপালবাবু বললেন, কালাস সাপ কামড়ালে ঘণ্টা দুই সময় পাওয়া যায় তাই তৎক্ষণাৎ তাকে হয় হসপিটালে নিয়ে গিয়ে ভেনাম ইঞ্জেকশন দেওয়া হয় নয়তো এখানে একরকম সাপের ওঝা আছে যার কাছে নিয়ে গেলে সে দেহ থেকে বিষ বার করে দেয় এক অদ্ভুত প্রক্রিয়া চালু করে।

‘সেকীরকম?’

‘আসলে এই-জাতীয় ওঝাদের কাছে অনেক রঙিন রঙিন সব পাথর থাকে বলে শুনেছি। হলদে, সবুজ, নীল, গোলাপি ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের পাথর। এই পাথরগুলো হল এক সম্পদের মতো। আমাদের কাছে সোনা যেমন একটি সম্পদ, ওই শ্রেণির ওঝাদের কাছে রঙিন পাথরগুলিও তাই। উত্তরাধিকার সূত্রেই ওই পাথরগুলি তারা পেয়ে আসছে— দাদুর কাছ থেকে বাবা, বাবার কাছ থেকে ছেলে।’

‘সেগুলো দিয়ে তারা কী করে?’

‘এই পাথরগুলোর সাহায্যেই তারা জীবিকানির্বাহ করে। মানে সাপের কামড়ে যে-জায়গাটাতে ক্ষত হয়, সেই জায়গায় তারা সেই রঙিন পাথরটিকে একটুক্ষণের জন্য চেপে ধরে। এরপরে খুব আশ্চর্যভাবে দেখা যায় যে সেই পাথরের রং আস্তে আস্তে পরিবর্তন হয়ে যেতে থাকে; অর্থাৎ বোঝাই যায় যে দেহের বিষ টেনে নিচ্ছে পাথর।

আশ্চর্য হয়ে বললাম, তারপর?

‘তাদের পাশে একটা বড়ো বাটিতে থাকে কাঁচা দুধ। পাথরটির রং পরিবর্তন হওয়া দেখে তারা বুঝতে পারে যে ঠিক কোন সময় পাথর সরিয়ে আবার অন্য পাথর লাগাতে হবে। মানে পাথরের বিষ টানার ক্ষমতা আর আছে কি না সেটা বোঝাই হল এইসব ওঝাদের কাজ বা শিক্ষা।

গল্পটা সত্যিই তন্ময় হয়ে শুনছিলাম। বললাম, আচ্ছা ভূপালদা, এবার আমাকে বলুন অন্য পাথর দিলে আগের পাথরটা যেটা বিষে ভরে গিয়েছিল, সেটার কী হয় আর কাঁচা দুধই-বা কী কাজে লাগে?

‘এইবার সেই বিষাক্ত পাথরকে তারা কাঁচা দুধের বাটিতে ফেলে দেয়। আবার নতুন পাথর দিয়ে তারা জায়গাটিতে চেপে ধরে। এইরকম তিন-চারটে পাথরে বিষ উঠে এলে পাথরের রং যখন আর বদলায় না, তখন বোঝা যায় লোকটির শরীর থেকে সব বিষ চলে গিয়েছে। এইভাবে লোকটিও ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে।’

‘আর যে-পাথরগুলো বাটির কাঁচা দুধে ফেলা হয়েছিল সেগুলোর কী হয়?’

‘সেই ঘটনা স্যার আরও আশ্চর্যের। পাথরগুলো দুধে ডোবাবার ফলে সাদা দুধটা আস্তে আস্তে নীল—মানে বিষের রঙের হয়ে যায় আর রঙিন পাথরগুলোও বিষ ছেড়ে দেওয়ার ফলে আশ্চর্যজনকভাবে আবার আগেকার মতো হয়ে যায়, মানে আগেকার রং ফিরে পায়। ধন্য বটে এই জাদুপাথর। তারপর সেই পাথর আবার অন্য কোনো সাপে-কামড়ানো লোকের শরীরে তারা প্রয়োগ করে। এইভাবেই চলে তাদের জীবিকা। তাই বলছিলাম রঙিন পাথরগুলো ওঝাদের কাছে এক মহামূল্যবান সম্পদ।’

এতক্ষণ গল্পটা শুনছিলাম অত্যন্ত অভিভূত এবং আপ্লুত হয়ে। শুনতে শুনতে সত্যি অন্য জগতে চলে গিয়েছিলাম। পিসি সরকারের ম্যাজিকের থেকেও এই গল্প আরও আশ্চর্য বলে মনে হল আমার কাছে। কেন জান? ম্যাজিক দেখাতে গিয়ে পিসি সরকারকেও কারসাজি, হাতলেত্তি বা ছলনার ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। কিন্তু রঙিন পাথরের এই গল্পে সেই শ্রেণির ওঝাদের যা কৃতিত্ব, তা তো একেবারে সাদা চোখের ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনা, কোনো কারসাজির আশ্রয় তো নেই সেখানে। এ তো নিতান্তই ভগবানের ম্যাজিক।

অধ্যায় ২৫ / ২৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%