আচ্ছা জব্দ

শতরূপা সেনগুপ্ত

ওহে ছোটো ছোটো সব বন্ধুরা, উকিল ব্যারিস্টার সম্পর্কে তোমাদের কোনো অভিজ্ঞতা আছে কি? তোমরা নিশ্চয় জান যে তারা অনায়াসেই ‘হ্যাঁ’-কে ‘না’, ‘না’-কে ‘হ্যাঁ’, ‘দিন’-কে ‘রাত’ এবং ‘রাত’-কে ‘দিন’ করতে পারে? জান না? তবে শোনো একটা মজার গল্প।

হরিচরণ চাটুজ্যে আর ভবতারণ মুখুজ্যে দুজনেই পরস্পরের আজন্মকালের বন্ধু। দুজনে খিদিরপুরে একই স্কুলে পড়তেন। তাঁদের মধ্যে ভাবও ছিল যত, রেষারেষির সম্পর্কও ছিল তত। রেষারেষিটা ছিল পড়াশুনো ও ফার্স্ট-সেকেণ্ড হওয়া নিয়ে। ওঁদের দুজনের মধ্যে একবার ইনি ফার্স্ট তো উনি সেকেণ্ড বা উনি ফার্স্ট তো ইনি সেকেণ্ড হতেন এবং অবধারিতভাবেই ফার্স্ট বয় সেকেণ্ড বয়কে কলা দেখাতেন বা দুয়ো বলতেন। ছোটোবেলাকার সেই ঝগড়া আজ বুড়ো বয়সে এসেও বোধহয় তাঁরা ছাড়তে পারেননি, তাই আজও তাঁদের মধ্যে প্রায়ই খটামটি হয় কখনো কখনো। যাইহোক হায়ার সেকেণ্ডারি পরীক্ষাতেও একজন হলেন ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট আর অন্যজন ফার্স্ট ক্লাস সেকেণ্ড। এরপর ওঁদের লাইন বেঁকে গেলেও একজায়গায় মিল থাকল দুজনেরই, এঁরা আইনের লোক। ভবতারণ হলেন হাইকোর্টের উকিল আর হরিচরণ হলেন নামি ব্যারিস্টার। অনেক ঘাটের জল খেয়ে আজ বুড়ো বয়সে আবার তাঁরা এক জায়গাতে, মানে পাশাপাশি ফ্ল্যাটেই এখন তাঁরা থাকেন। তাঁদের স্ত্রীদের পরস্পরের মধ্যেও বেশ ভাব। হামেশাই এর তরকারি ও বাড়িতে, ওর রান্না এ বাড়িতে চালান হয়; এমব্রয়ডারিতে ফুল তুলতে বা তাসের প্যাকেট নিয়ে প্রায়ই দুই গিন্নির মোলাকাত হয়। তাই দুই কর্তার মধ্যে মাঝেমধ্যে খটামটি লাগে বলে তোমরা যেন ভেবে বোসো না যে সত্যিই তাঁদের মধ্যে কোনো ঝগড়া বা মনোমালিন্য আছে। তাঁদের ঝগড়া নিতান্তই সাময়িক, আসলে ঝগড়া না হলে ‘ভাব’-এর মহিমা কী করে বোঝা যাবে বলো?

একদিন রবিবারে বাজার করতে গিয়ে দুই বন্ধুর দেখা হল। দুজনের বাড়িই এক জায়গায়, তাই বাড়ি ফিরতে ফিরতে দরকারি কথাটা হরিচরণই প্রথমে আরম্ভ করলেন।

‘ভাই ভব, একটা কথা অনেক দিনই তোমায় বলব বলব করছি কিন্তু বলা আর হয়ে উঠছে না।’

‘অত কিন্তু কিন্তু কোরো না তো, তুমি আমার এত বন্ধু আর এত সংকোচ? বলে ফ্যালো চটপট।’

‘আচ্ছা তাহলে শোনো ভাই, আর দেরি না করে উইলটা তুমি এবার করেই ফ্যালো।’

হরিচরণের ঠাণ্ডা গলায় এই গরম কথাটা শুনে ভবতারণ বোধহয় হোঁচট খেয়ে পড়েই যাচ্ছিলেন। সামনে বাঘ-ভাল্লুক পড়লেও বোধহয় এমন হতভম্ব অবস্থা কারোর হয় না। চোখ কপালে তুলে পঞ্চসুরে ভবতারণ বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী বললে? উইল করব? কার উইল, কবে কেন কীজন্যে?’ হরিচরণ বললেন, ‘আরে এত চমকাচ্ছ কেন? উকিল হয়েছ আর ‘উইল’ শোননি বুঝি? আমিই উইল করব ঠিক করেছি। দ্যাখো ভাই আর কথা বাড়িয়ো না, কাজ শেষ করে একেবারে বাবা বিশ্বনাথের চরণে গিয়ে পড়ব বলে ভেবেছি।’

‘তুমি? তুমি উইল করবে কী কারণে? স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ, নাতিনাতনি নিয়ে ঘর করতে করতে হঠাৎ এই দুর্মতি হল কেন তোমার?’

‘হঠাৎ নয়, হঠাৎ নয়, বলো তুমি পারবে কি না? নয়তো আমি অন্য পথ দেখব।’

‘না না হরিচরণ, পারা না পারার কথা নয়, তবে হঠাৎ উইল করবে কেন সেটা বলবে তো? সারা পরিবারের জন্য বেশ তো ড্যাংডেঙিয়ে সব বাজার করে নিয়ে যাচ্ছ সকলকে ভালোমন্দ খাওয়াবে বলে। তবে হঠাৎ এমন কথা কেন?’

‘আঃ ভবতারণ, ভবিষ্যতের কাজ কি আগে থেকে করে রাখা যায় না? উইল করা মানেই কি মরে যাওয়া? উইল তো সেই আমায় করতেই হবে। এখনই কাজটা সেরে রাখলে নিশ্চিন্দি। বিশ্বনাথের কাছে যাবার আগে এসব ঝুটঝামেলা সেরে রাখাই ভালো।’ তারপর হরিচরণ একটু বিমর্ষ গলায় বললেন, ‘ভগবান কখন কাকে ডাকেন তা কি বলা যায়? তিনি আমার দুঃখ বুঝেছেন তাই আমায় ডাকাডাকি করছেন।’

ভবতারণ আশ্চর্য হয়ে বললেন, ‘তুমি কি মনে কোনো দাগা পেয়েছ হরিচরণ? তুমি তো এই ধরনের কথা বল না সচরাচর!’

এবার হরিচরণ সত্যিই বাচ্চা ছেলের মতো ভেউভেউ করে কেঁদে বললেন, ‘শোনো তবে, আমাকে এ সংসারে আর কেউ মানে না জানো! বলে আমার নাকি বুড়ো বয়সে ভীমরতি হয়েছে, আমি নাকি ধান শুনতে কান শুনি, আমি নাকি সব ভুলে যাই। মানে এরা আমায় মানুষ জ্ঞানই করে না। আমার ছেলের বউয়েরা মানে ওই একরত্তি মেয়েরা আমায় সবসময় পাহারা দেয়, মনোমতো খেতে চাইলে খেতে দেয় না; বলবে— বাবা, আপনার দাঁতে কষ্ট হবে।... হুঁ:, কত সব চিন্তা। আসলে সব কুঁড়ের বেহদ্দ; অতি ভক্তি যে চোরের লক্ষণ তা কি আর আমি বুঝি না? আর শুধু কি তাই? তারপর জানো, স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা করবারও জো নেই আমার। ছাতে উঠতে গেলে হার্টে কষ্ট হবে, হার্টে কষ্ট হবে করে হাঁ হাঁ করে। প্রাণভরে খেতে গেলে ‘‘সুগার সুগার’’ বলে চিৎকার করে। আবার একফোঁটা নাতিগুলোকে পাহারাদারির শিক্ষা দিয়েছে। তাদের কাছ থেকে তো সবদিক দিয়েই হেরে যাচ্ছি। এখন তুমিই বলো-না, বিশ্বনাথের কাছে যাবার ইচ্ছেটা কি আমার ভুল?’

ভবতারণ এতক্ষণে বুঝলেন বন্ধুর আর কিছুই হয়নি, হয়েছে প্রবল অভিমান। তবে এ বড়োই জটিল কেস। ভবতারণ অবশ্য এটুকু বুঝেছেন যে এই মারাত্মক অভিমানকে ঠাণ্ডা করতে গেলে, প্রথমেই তাকে বোঝাতে বসলে হবে না, তার মধ্যে ঢুকে তার কথায় সায় দিয়ে আগে বন্ধুর বিশ্বাস অর্জন করতে হবে তারপর বোঝাতে হবে। কিন্তু কীভাবে এটা করা যায়? ভাবতে ভাবতে হঠাৎই মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। ভবতারণ বললেন, ‘না না, এ তোমার পুত্র, পুত্রবধূদের দারুণ অন্যায়। তুমিই এই সংসারকে হাতে করে গড়েছ, ছেলেদের বিয়ে দিয়ে তুমিই তাদের ঘরে এনেছ, তবে তাদের একটা কৃতজ্ঞতাবোধ থাকবে না তোমার প্রতি? না না, এ আমি কখনোই সমর্থন করছি না। সত্যিই তো, আমি তোমার জায়গায় থাকলেও ঠিক এইরকম কাজই করতাম ভাই।’

ভবতারণের এই কথাগুলো শুনে হরিচরণের মনটা বোধহয় একটু নরম হল। বললেন, ‘তাহলে এবার বলো, আমি কতটা মনোকষ্টে আছি। যাদের আমি এতটা বড়ো করে তুললাম তারাই কিনা এমন করছে? কেন, আমি বুড়ো বলে?’

ভবতারণ বললেন, ‘সত্যিই তো, এ কেমন আচরণ তাদের! তবে একটা কথা কী জানো, কেউ তোমায় চায় না বা ভালোবাসে না এমনটা হয়তো নয়।’

‘কেন আমায় ভালোবাসার কী দেখলে হঠাৎ?’

ভবতারণ বললেন, ‘জানো তো সব জিনিসকে সোজাভাবে দেখল ঠিক উত্তর মেলে না, এটাকেও উলটো করেই দ্যাখো।’

হরিচরণ আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মানে?’

‘আমার তো মনে হয় তোমাকে সকলে চায় ও ভালোবাসে বলেই তোমার শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে তারা এত ভাবে। নিজের লোকের ক্ষতি তারা অবশ্যই চায় না। বুঝলে না তো? দ্যাখো পাড়ার লোকের হার্ট বা সুগার নিয়ে তো তারা অত ব্যতিব্যস্ত নয়, তোমাকে নিয়েই তাদের চিন্তা, কারণ তোমাকে ওরা ভালোবাসে। এই ভালোবাসাটাও তো একটা খুব বড়ো পাওয়া ভাই।’

‘হুঁ, তা নাহয় বুঝলাম। কিন্তু ওরা আমাকে ‘‘বুড়ো’’ বলে কেন?’

ভবতারণ মুখ টিপে হেসে বললেন, ‘এ ভাই তোমার বড্ড বাড়াবাড়ির কথা। নাতিপুতিরা যদি বুড়োকে ‘‘বুড়ো’’ বলে তবে সেটা কি কিছু দোষের? আমার তো মনে হয় ‘‘বুড়ো’’ শব্দটার মধ্যে বেশ একটা ভারিক্কি সম্ভ্রমের ভাব আছে।’

‘কেন?’

‘কেন আবার, বুড়ো দেখলে বাসে লোকে বেশ জায়গা ছেড়ে দেবে, ভোট দিতে গেলে বেশি লাইনে দাঁড়াতে হবে না, ট্রেনে চাপলে বেশ একতলার বার্থটি পাবে আর তখন তো ছোটোবেলাকার মতোই অন্যদের কলা দেখাবে।’ তারপর ভবতারণ বন্ধুর দিকে একটু ঝুঁকে এসে বললেন, ‘আর এর থেকে তোমার ছেলে-বউরাও বাদ পড়বে না বুঝলে?’

C-হরিহরণ চ্যাটুর্জের সঙ্গে নাতিপুতিরা

অকাট্য সব যুক্তি। হরিচরণ আর কী করেন, বললেন, ‘হুঁ, তা ঠিক বটে, তবে বলে কেন আমি কানে শুনি না? কানের কোনো দোষ তো আমার নেই।’

‘আরে, এটা তো মন্দ করতে গিয়ে তারা ভালোই করে ফেলেছে। মানে ঠিকমতো শুনতে না পেলেই তো বুড়োর মর্যাদা তুমি পাবে। ছেলে, বউ, নাতিনাতনি সব মান্যিগন্যি করবে, কাছে কাছে ঘুরবে। আমি তো বলব বরং শুনতে পেলেও না শোনার ভানই করবে। তাতেই তো লাভ।’

‘হুঁ, তাহলে আর উইলটা করব না বলো?’

‘নো, নো, নেভার। ওই চিন্তা মন থেকে একবারে মুছে ফ্যালো হে।’

এরপর কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে থেকে হরিচরণ বললেন, ‘না থাক, ভেবে দেখলাম তুমিই আমার পরম হিতৈষী ও এক নম্বর বন্ধু। তোমাকে ছেড়ে আমিই কি থাকতে পারব? তুমিই তো আমার ফ্রেণ্ড, ফিলোজফার অ্যাণ্ড গাইড; ভাগ্যিস উইলের কথাটা তোমাকেই প্রথমে বলেছিলাম। তাই তো জ্ঞানচক্ষুর উন্মীলন হল ভাই। উফ কী ভুলটাই না করতে যাচ্ছিলাম। তোমার এই উপকারের কথা আমি কখনোই ভুলব না ভবতারণ— স্বর্গে গিয়েও নয়। উফ ধন্যি বটে তোমার বুদ্ধি।’

এবার তোমরাই বুঝে নাও কী তুখোড় বুদ্ধি দিয়ে ভবতারণ হরিচরণের ‘হ্যাঁ’ কে ‘না’-তে রূপান্তর করল। যে উইল করবেই বলে বদ্ধপরিকর ছিল, শেষে তারই মুখ দিয়ে বেরোল ‘উইল করব না।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%