শতরূপা সেনগুপ্ত
ভোম্বলমেসোর সঙ্গে কাল্টু, বল্টু আর ঘোন্টুর দারুণ ভাব। মায়ের বোন মাসিকে কাল্টুরা খুবই ভালোবাসে, কিন্তু ভোম্বলমেসো? তারা তাঁকে একেবারে অন্য চোখে দেখে। ভোম্বলমেসো হলেন তাদের একমাত্র প্রিয় বন্ধু। তাঁর কাছে কাল্টুরা গল্প শোনে, সিনেমা দেখে, মেলা পার্কে বেড়াতে যায়, তাস, ক্যারম, লুডো খেলে, আরও কত কী-না করে। মেসো এখন রিটায়ার করেছেন, কোনো পেছুটানও নেই, তাই স্বচ্ছন্দে দুজনে এসে তিন-চার দিন থেকে দিদির বাড়ি বেশ আদরযত্ন খেয়ে তারপর যান। আগে আগে মানে মেসো যখন চাকরি করতেন, তখন মাসি আসতেন সকালে, আর সন্ধ্যা বেলা অফিসফেরতা এসে খাওয়াদাওয়া করে মেসো মাসিকে নিয়ে যেতেন। তোমরাই এখন বল মেসো-মাসি আসবার কথা শুনলে তাদের মন আনন্দে নেচে উঠবে না কেন? মেসোর মধ্যে দিয়ে তারা যে সিনেমা হলের রঙিন পর্দা, পার্কের দোলনা, স্লিপ, ঢেঁকি, সাজানো ক্যারমবোর্ড — এ সব কিছু দেখতে পায়।
শনিবার কাল্টুদের স্কুলে ছুটি থাকে। তাই তারা বন্ধুরা মিলে ডাংগুলি খেলছিল রাস্তায়। হঠাৎ দুখানা রিকশা এসে থামল তাদের বাড়ির সামনে। কাল্টুরা দেখল একটা রিকশা থেকে নামলেন মেসো-মাসি ও আর একটা রিকশায় তাঁদের কিছু মালপত্র ছিল। কাল্টুরা ছুটে এসেছিল কিন্তু ভোম্বলমেসো রিকশাওয়ালাকেই বললেন মালগুলো বাড়িতে ঢুকিয়ে দিতে। মাসির শরীর নাকি আজকাল খুব বেগড়বাই করছে, তাই তাঁরা মনস্থ করেছেন কলকাতার কোনো ভালো বড়ো ডাক্তারকে দেখাবার জন্য। তার মানে এখন বেশ কিছুদিন তাঁরা থাকবেন কাল্টুদের বাড়ি। কারণ যা-ই হোক, মেসোকে দেখে কাল্টুরা আনন্দে আটখানা হয়ে গেল।
মেসো বললেন, ‘ও বাবা! তোরা তো বেশ জেন্টলম্যান হয়ে গিয়েছিস, কথা বলতে গেলে যে ভাবতে হবে।’
ঘোন্টু ছোটো, সে বলল, ‘কী যে বল না মেসো, তুমি আমাদের সঙ্গে ভেবেচিন্তে কথা বলবে, তাও কি হয়? তোমাকে দেখে আমার যে খুব আনন্দ হচ্ছে।’
আসলে কী বলো তো? ঘোন্টু তো ছোটো, তার বোঝবার ক্ষমতাই নেই যে এইরকম সময়ে এই কথা বলা ঠিক নয়। মেসো তো মাসির অসুখের জন্যই এসেছেন— এটা তো বুঝতে হবে; তাই না?
তবে ভোম্বলমেসো বেশ বুদ্ধিমান লোক তাই তিনি বললেন, তা বেশ, এ তো ভালোকথা, তা হ্যাঁ রে, তোদের মাধ্যমিক পরীক্ষার পরই তো লাইন নির্দিষ্ট হয়ে যাবে, দেখতে দেখতেই দিন কাটবে। আগে থেকে ঠিক করেছিস বড়ো হয়ে কে কী হবি?
কাল্টু বড়োভাই, বলল, ‘আমি ভাবছি ডাক্তার হব। চশমা পরে সুন্দর চেয়ারে বসে বেশ অনেক লোককে সেবা করব আর তাতে টাকাপয়সাও হবে অনেক। তাতে মা-বাবার দুঃখ ঘোচাব।’
‘ভালো, ভালো। তা তুমি কী হবে বল্টুভাই?’
‘আমি পাইলট হব, এরোপ্লেন করে অনেক অনেক দেশ বেড়াব, দেবতাদের মতো ভেসে ভেসে বেড়াব সিনেমা সিরিয়ালে যেমন দেখায়, আর ফিরে এসে সেগুলো নিয়ে গল্প লিখব।’
মেসো বললেন, বাবা, তার মানে তুই পাইলট লেখক দুই-ই হবি? আর ঘোন্টু?
‘আমারও দাদার মতো খুব বেড়াবার শখ, কিন্তু আকাশে নয় মাটিতে। তাই আমি রেলের অফিসার হব। আকাশ যেন হাতের বাইরের জিনিস।’
ঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে ছিল নিতাই। ও, নিতাই কে তা তো তোমরা জানই না। ও হল এবাড়ির কাজের লোক। ফাইফরমাশ খাটে, ঘরদোর ঝাড়াঝুড়ি করে, টুকটাক জিনিস কিনে আনে — এই পর্যন্ত। মেসো নিতাইকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আর তুই কী করবি রে?’ নিতাই বেশ সুন্দর উত্তর দিল, ‘দ্যাখো মেসো, আমার তো দাদাদের মতো অত পয়সা নেই আর প্যাটে অত বিদ্যেও নেই, তাই আমি ভাবতেছি আমি সাধু হয়ে রাতদিন ভগবানেরে ডাকব।’
মেসো বাহবা দিয়ে বললেন, বা রে, আমি মন্ত্রী হব, সমাজসংস্কারক হব, ডাক্তার হব, ইঞ্জিনিয়ার হব এসব ঢের শুনেছি, কিন্তু আমি সাধু হব—তোর এই সদিচ্ছেটাই তো সবথেকে ভালো।
তোমরাই বলো, এই ধরনের কথা মাথাতে আসাটাও কি অদ্ভুত নয়? আর ব্যাপারখানাকে তো আমার খুবই মজার বলে মনে হচ্ছে।
যাইহোক এইসব গল্পগাছার পর কাল্টুরা মেসোর কাছে বায়না ধরল যে বিকেলে পার্কে নিয়ে গিয়ে তাদের আলুকাবলি খাওয়াতে হবে। কিন্তু তাদের এটা জানা ছিল না যে বিকেলে মাসিকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। কিন্তু মেসো সেটাই জানালেন তাদের আর প্রমিস করলেন পরশু তিনি নিশ্চয়ই তাদের নিয়ে পার্কে যাবেন।

ডাক্তার মাসিকে পরীক্ষা করে বললেন ব্যাপার বেশ ঘোরতর, দু-দিন হাসপাতালে ভরতি হয়ে থরো চেক-আপ করাতে হবে; হাসপাতালে চেক-আপ করালে কাজটাও তাড়াতাড়ি হবে। কিন্তু অসুবিধেতে পড়লেন মেসো, তাঁর একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য বাড়ি ফিরতেই হবে দু-দিনের মধ্যে, কিন্তু দু-দিন বাদে তিনি আবার আসবেন। এইভাবেই বেশ আসা-যাওয়া চলত। কিন্তু দুঃখের কথা আর কী বলি? সবদিন তো একরকম যায় না। ভোম্বলমেসো এখন অনেক বুড়ো হয়েছেন, চোখের জোর, পায়ের জোরও কিছু কমেছে। কাল্টুরাও সব এখন অনেক বড়ো হয়ে গেছে, মাসিও এখন আর জীবিত নেই। তাই কাল্টুদের খবরাখবরও এখন তাঁর কাছে আর থাকে না, তবে শোনা গিয়েছিল নিতাই নাকি একদিন রাতে দরকারি কিছু জিনিসপত্র নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল।
একদিন হল কী, নামগান শুনে মেসো বাড়ি ফিরছেন, পথে দেখেন দারুণ ভিড় জমেছে, কেন কে জানে। জটলা ঠেলে কাছে গিয়ে দেখলেন বিশাল দেহ ও প্রকান্ড জটাধারী এক সন্ন্যাসী একটি বড়ো ধুনি জ্বেলে বসেছেন এবং তাঁকে ঘিরে আরও কয়েক জন সন্ন্যাসী রয়েছেন। দাড়ি-গোঁফে ঢাকা থাকায় মুখ তাঁর ভালো করে দেখা যাচ্ছে না তবে তাঁর পরনে ছিল লালরঙের ধুতি, গলায় কয়েকটা রুদ্রাক্ষের মালা, ডান হাতে একটা মোটা তামার বালা। এঁর নাম নাকি সুধানন্দ মহারাজ, মিথিলা থেকে ইনি এসেছেন এবং এঁর কথা নাকি অক্ষরে অক্ষরে সব মিলে যায়। সামনে দাঁড়াতে বাবাজি তাঁকে কাছে ডাকলেন, পাশে বসতে বললেন। সব ভক্তেরা মনের ইচ্ছে জানিয়ে একে একে প্রণাম করতে লাগল ও তারপর তারা ঘরে ফিলে গেল। এরপর বাবাজি চোখ খুললেন ও আশপাশে যাঁরা ছিলেন তাঁদের কিছু ফল মিষ্টি দিলেন। প্রসাদ পেয়ে তারাও সব চলে গেল, রইলেন শুধু বাবাজি আর ভোম্বলমেসো। তারপরেই ঘটল আসল ঘটনা।
তোমাদের কি খুব কৌতূহল হচ্ছে শোনবার জন্য? শোনো তাহলে। আমারও খুব বলতে ইচ্ছে করছে তোমাদের।
বাবাজি কাছে এসে পায়ে পড়ে লম্বা একটা প্রণাম ঠুকে বললেন, ‘মেসো, তুমি আমাকে চিনতে পারলে না, আমি যে তোমাদের নিতাই গো।’
কথাটা শুনে ভোম্বলমেসো দারুণ আশ্চর্য হয়ে গেলেন। ভালো করে আপাদমস্তক দেখে বললেন, ‘তুমি তো এখন দেখছি সাধু হয়েছ, কিন্তু এত সব ঘটনা ঘটল কী করে?’
‘মেসো, কী আর বলব দুঃখের কথা, ভগবানকে ডাকা এবং সাধু হওয়ার ইচ্ছে আমার বরাবরই ছিল এবং তারজন্য আমি সাধুদের পোশাকও জোগাড় করেছিলাম। তখন আমার বয়স কম ছিল, ভেবেছিলাম সাধু হয়ে সকলকে চমকে দেব।’
‘তারপর?’
‘এরপর কিছু না জেনেই দু-এক জন লোককে ভবিষ্যদবাণী করেছিলাম আর অদ্ভুতভাবে সেসব কথা সত্যিও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই মিলে যাওয়াই কাল হল। সকলে মনে করতে শুরু করল সত্যি বোধ হয় আমি কোনো বড়ো সাধু, আমার সব কথাই ফলে যাবে। কিন্তু আমি যে সত্যি কিছু জানি না তা-ও তাদের বলতে পারছি না লজ্জায়। এখন বাবা-মা ভাই-বোন সকলের জন্য আমার খুব মন কেমন করে ও আমি দেশে ফিরতে চাই, কিন্তু এই ভক্তের দল সব আমায় যেতে দেয় না।’ বলে নিতাইয়ের দু-চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। তার এই অবস্থা দেখে ভোম্বলমেসোর মনে খুব দুঃখ হল। যতই হোক অনেক দিনের চেনা ছেলে তো বটে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তাহলে আমি তোকে কীভাবে উপকার করব রে? তোকে সাহায্য করার জন্য তো আমি তৈরি।
‘তবে শোনো মেসো। ভগবান তোমাকেই বোধ হয় জুটিয়ে দিয়েছেন আমায় সাহায্য করবার জন্য। রাতের অন্ধকারে চাদর মুড়ি দিয়ে আমাকে তোমার বাড়ি নিয়ে চলো। ওখানে দাড়ি-গোঁফ কেটে পরিষ্কার হলে আর আমায় কেউ চিনতে পারবে না, তারপর মেসো তুমি আমাকে একটা পাঞ্জাবি আর পায়জামা দিয়ে সাহায্য করো ও স্টেশনে গিয়ে ট্রেনে তুলে দাও, তবেই আমি পালাতে পারব। তোমার সঙ্গে আমি থাকলে সেটা কারোর চোখেও পড়বে না আর আমার দিকে তাকাবেও না।’
এবার সব পড়ুয়া বন্ধুরা বলো তো, নিতাইয়ের এই প্ল্যানটা কেমন লাগল তোমাদের? কতদিন পরে সেআবার বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যেতে পারবে ভেবে যে আমারই খুব আনন্দ হচ্ছে।
তারপরের দিন ভোর বেলা ও আমারই পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে, দাড়ি-গোঁফ সব কেটে পরিষ্কার মুখে আমার সঙ্গে স্টেশনে গেল। ওর দেশ ছিল বঁাকুড়া। এখন এই ভোরে ওকে হাওড়া স্টেশনে নিয়ে গিয়ে ‘রূপসিবাংলা’-র টিকিট কেটে ট্রেনে উঠিয়ে দিলাম। সঙ্গে অবশ্যই কিছু টাকাপয়সাও দিলাম। ট্রেন বেরিয়ে গেল হুশ করে। জানলা দিয়ে অনেকক্ষণ ও আমায় টা-টা করল। ওর মুখ-চোখে খুব একটা আনন্দ উৎফুল্লতা ছিল, আর ছিল দু-চোখ ভরা একটা কৃতজ্ঞতার দৃষ্টি। আমারও খুব ভালো লাগল একটা ভালো কাজ করে আর কতদিন পরে যে ঘরের ছেলে আবার ঘরে ফিরবে এই ভেবে।
কি আমার ছোটো ছোটো বন্ধুরা, প্ল্যানটা বেশ জব্বর আর বেশ রোমাঞ্চকর নয় কি?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন