পাটালিকাটা ও পাটালিচাটা

শতরূপা সেনগুপ্ত

একবার পাঁচ বন্ধু মিলে ট্রেনে করে বর্ধমান থেকে কলকাতায় ফিরছিলাম। তখন সময়টা ছিল বিকেল বেলা, তাই স্বভাবতই তখন একটু চা খাবার জন্যে মনটা ছোঁকছোঁক করে। তার ওপর আবার ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখা গেল অল্প অল্প বৃষ্টিও পড়ছে। তাই ভাঁড়ে পাঁচটা চা আর ঠোঙা-ভরতি বেগুনি আর আলুর চপ সহযোগে পাঁচ বন্ধু মিলে জমিয়ে বসলাম আড্ডা দিতে।

শুনে তোমাদের খুব লোভ হচ্ছে কি? আমার তো হচ্ছে, জিভে জল চলে আসছে, মনে হচ্ছে তেলেভাজার গন্ধটাও নাকে চলে আসছে। অতীন বলল, ‘এই সময় একটা মজার গল্প শুনলে তার সঙ্গে তেলেভাজাটা জমত ভালো।’ তখন গৌতম বলে এক বন্ধু বলল, ‘শোনো তাহলে, আমার স্টকে একটা খুব মজার গল্প আছে, এখন আমি তোমাদের সেটা বলব।’

... দুই ভাই ছিল। জগদ্দল আর বিহ্বল। তারা দুজনেই ছিল অস্বাভাবিক রকমের কৃপণ। দুজনের কেউ বিয়ে করেনি খরচের ভয়ে। একটা খুব কম পয়সার ঘরভাড়া করে দুজনে সেই ঘরে থাকত। তবে সেটাকে ঠিক ঘর বলা যায় না কারণ, সেই ঘরে আলো-পাখার কোনো গল্পই নেই। আলো-পাখার ব্যবস্থা থাকলে হাত সুইচের দিকে যাবেই আর তাতে খরচও বাড়বে, তার চেয়ে ভালো লাইনগুলোকেই কেটে দেওয়া। হ্যাঁ, তা-ই তারা করেছিল। সন্ধ্যা বেলা যখন বেশ গাঢ় অন্ধকার হয়ে আসত তখন একগাদা শুকনো পাতা জোগাড় করে তারা তাইতে আগুন লাগাত, সেই আগুনই ধিকধিক করে জ্বলত বেশ কিছুক্ষণ ধরে এবং তাইতেই কিছুটা অন্ধকার দূর হত; আর হাতপাখা তো আছেই, তাই রাতে ঘুমোতেও তাদের কোনোই অসুবিধে হত না। পাতার আগুনটা নেভবার আগেই তারা রাতের খাওয়া শেষ করে নিত। রাতের খাওয়া বলতে হয় চালে-ডালে ফোটানো খিচুড়ি; নয় ভাত ফুটিয়ে নুন, তেল, পেঁয়াজ, লঙ্কা দিয়ে খাওয়া; নয়তো চিঁড়ে সেদ্ধ আর গুড়-বাতাসা। সকালে তো তারা কাজেই বেরিয়ে যেত, তাই খাওয়ার কোনো চিন্তাও ছিল না। এর মধ্যে জগদ্দল এক ব্যাঙ্কের চাপরাশি ছিল আর অন্যজন মানে বিহ্বল সেই ব্যাঙ্কেরই সিকিউরিটি গার্ড, না দারোয়ান ছিল বোধ হয়। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তারা দুজনেই চুক্তি করিয়ে নিয়েছিল যে তাদের সকালের খাওয়াটা মানে লাঞ্চটা যেন ব্যাঙ্কের ক্যান্টিন থেকেই হয়ে যায়; কিন্তু যদি কোনো কারণে ক্যান্টিন বন্ধ থাকত তবে সামনের মন্দিরের ভোগ খেয়েই তাদের চলে যেত। দুটোই প্রায় বিনা পয়সাতেই হচ্ছে, কী হাড়কেপ্পন বলো? এরপর বিকেলে তারা ঘরে ফিরে আসত আর তারপরের রুটিন তো জানাই আছে। দুজনে যে রোজগারটুকু তারা করত তা খুবই সামান্য বটে। কারণ চাপরাশি, দরোয়ানের মাইনে আর কতই-বা হবে, কিন্তু তাইতেই তাদের যথেষ্ট চলে যেত। কীভাবে? কারণ তারা দুজনেই অসম্ভব কৃপণ ছিল। সংসারের খরচা বলে কিছু ছিলই না।

একদিন ব্যাঙ্কের চাপরাশি জগদ্দল লক্ষ করল যে, কোন একটা কোম্পানি তাদের ব্যাঙ্কের বড়োসাহেবের জন্যে পাঁচ কিলো পাটালি গুড় ও গোবিন্দভোগ চাল নিয়ে এসেছে। আজ নাকি তাঁর জন্মদিন। সেই গুড় ও চাল দিয়ে ক্যান্টিনে পায়েস রান্না হচ্ছে। সেই সুন্দর গোবিন্দভোগ চালের পায়েসের গন্ধ নাকে এল জগদ্দলের। পায়েসের সুগন্ধে সারা ব্যাঙ্ক ম-ম করতে লাগল। বিহ্বলও পেল সেই সুঘ্রাণ। বাড়ি ফেরবার সময় দুই ভাই-ই বলাবলি করতে লাগল যে তাদের দুজনেরই খুব ইচ্ছে হয়েছে পাটালি গুড় খাবার। জগদ্দল প্রথমে বলল, ‘হ্যাঁ রে, পাটালির গন্ধে খুব খাবার জন্য লোভ লাগছিল তাই না?’

‘সেই তো। এক এক সময় মনে হয় এক তাল পাটালি কিনে খেয়েই নিই কিন্তু পকেটে হাত দিয়ে পরক্ষণেই মনে হয়—না বাবা তাতে অনেক খরচ হয়ে যাবে।’

‘সেটাই তো মুশকিল। মানুষ কৃপণ বলে তো আর তার রসনা কৃপণ হতে পারে না বল? কিন্তু কুঁজোরও তো মাঝে মাঝে চিত হয়ে শুতে ইচ্ছে করে না কি? খাবারের লোভ সংবরণ করা সত্যিই কষ্টকর।’

‘তবে দাদা, তুমি একটা কাজ করতেই পারো। অন্তত পঁচিশ গ্রাম পাটালিও যদি একবার কেনো, তবে তাও সে অনেক দিনই যাবে। তাই না?’

আসলে জগদ্দলের থেকেও বিহ্বলের পাটালি খাবার ইচ্ছে অনেক বেশি, তাই সে এমনভাবেই দাদাকে উসকে দিল।

এরপর অনেক চিন্তাভাবনার পর জগদ্দল সত্যিই পঁচিশ গ্রাম পাটালি কিনল এবং সেটিকে যত্ন করে তুলে রাখল। এরপর রোজই কর্মক্ষেত্র থেকে এসে পাটালির মোড়কটিকে সে দেওয়াল আলমারি থেকে বার করে, লম্বা নাক টেনে গন্ধ শুঁকে আবার তা আলমারিতে তুলে রাখে। এইরকমভাবে দিন পনেরো হয়ে যাওয়ার পর পাটালিটাতে যখন একটু ছাতা পড়তে শুরু করেছে, তখন জগদ্দল সিদ্ধান্ত নিল— না, আর নয়, এবার এটিকে একটু খেয়ে দেখতে হবে।

রবিবার সন্ধ্যায় দাওয়ায় বসে দুই ভাইয়ের গল্প হচ্ছিল, গল্পের মাঝপথে পকেটে হাত চালিয়ে সেই মহামূল্যবান মোড়কটিকে বার করল জগদ্দল। তার ভাবখানা দেখে মনে হল হিরে-জহরত গোছের যেন একটা কিছু আছে সেই মোড়কে। বিহ্বলকে বলল, ‘বুঝলে ভায়া, অকারণ ছাতা পড়ছে এটিতে, এবার এটিকে একটু খেয়েই দেখা যাক।’

C-বুঝলে ভায়া, অকারণ ছাতা পড়ছে এটিতে, এবার এটিকে একটু খেয়েই দেখা যাক।

বিহ্বল তৎক্ষণাৎ বলল, ‘হ্যাঁ দাদা, সেই বরং ভালো হবে।’ আসলে বিহ্বল ভাবল সেও যদি একটু ছিটেফোঁটা পায়, তবে তাই-বা মন্দ কী? সত্যিকথা বলতে কী, এই দিনটির জন্যেই তো সে অনেক দিন অপেক্ষা করেছে।

মোড়কটিকে অনেকক্ষণ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে ‘ঘ্রাণেনং অর্ধভোজনং’ করে মোড়কের গায়ে বেশ ক-বার হাত বুলিয়ে জগদ্দল নখ দিয়ে দু-বার পাটালিটি কেটে খেয়ে মুখ দিয়ে এমন এক শব্দ করে ঢেকুর তুলল যে মনে হল, যেন অনেকই খেয়েছে।

‘বুঝলে ভায়া, আর বেশি খাওয়া উচিত হবে না, এইভাবে খেলেই অনেক দিন চলবে।’

‘হ্যাঁ, সেতো বটেই দাদা।’ তবে বিহ্বল দেখল এ তো ভারি বিপদ হল, জগদ্দল ব্যাটা তো তাকে একটুও খেতে বলে না; এখন কী করা যায়। এদিকে খেতে যে দারুণ ইচ্ছে করছে।

এখন ওই আলো-আঁধারিতে ভাগ্যিস মশা বাপধনেরা আক্রমণ করেছিল জগদ্দলকে তাই রক্ষে।

জগদ্দল মশা মারতে যেই ঘাড় ঘুরিয়েছে, অমনি বিহ্বল কী করল জানো? এদিক-ওদিক তাকিয়ে চট করে বিহ্বল পাটালির ডেলাটা তুলে দু-বার জোরসে চেটে নিয়ে আবার কাগজের মোড়কের ওপর রেখে দিল ও মশাদের আশীর্বাদ করল। তারা জগদ্দলকে না কামড়ালে কি বিহ্বলের পাটালিচাটা হত? যাক গে এসব কিছুই জগদ্দল জানতে পারল না, সে দেখল পাটালি যেমন ছিল তেমনই আছে। কাগজে মুড়ে আবার সেটিকে পকেটস্থ করল জগদ্দল।

এইভাবে দুজনের রসনারই তৃপ্তি হল এবং প্রমাণিত হল যে বিহ্বল দাদার চেয়ে আরও উঁচুদরের কৃপণ। এই হল পাটালিকাটা আর পাটালিচাটার গল্প।

গল্পটা শুনে আমরা সকলে হো-হো হো-হো করে হেসে উঠলাম। ধন্যবাদ দিলাম গৌতমকে এই দারুণ গল্পটি বলে আমাদের চায়ের আসর জমানোর জন্য।

তোমাদেরও নিশ্চয় বেদম হাসি পাচ্ছে গল্পটা শুনে। হেসে নাও ভালো করে, তাতে মনটাও হালকা হবে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%